শান্তিনিকেতনের মেয়েদের হস্টেলে বিনোদন; অবসর যাপনের একটি বিকল্প নির্মাণ। (১)
মধুপর্ণা
শান্তিনিকেতনে আবাসজীবনের শুরুর দিকে হস্টেলে আমরা একরকম প্রযুক্তি থেকে দূরেই ছিলাম। উত্তরশিক্ষায়
অর্থাৎ একাদশ দ্বাদশ শ্রেনীতে যখন পড়ি তখন
থাকতাম শান্তিনিকেতনের প্রথম মেয়েদের হস্টেল শ্রীসদনে (প্রতিষ্টা - ১৯০৯) মেনব্লকে দোতলায় ডর্মেটরিতে। তখন ফোন রাখা বারণ। হস্টেলের ওয়েটিং রুমে ফোন আসবে
বাড়ি থেকে তখন ডেকে দেওয়া হবে কথা বলার জন্য। কেউ কেউ লুকিয়ে ফোন রাখার চেষ্টা করত।
কিন্তু মাঝেমধ্যেই ধরা পড়লে হুলস্থুল কান্ড হত। টিভি রুমে টিভিতে শনি
রবিবার ডিডি বাংলায় সিনেমা। ব্যাস। তখন আমাদের বিনোদন গুলোর আদল ছিল সম্পূর্ণ
ভিন্ন, সময় উদযাপনের আয়োজন ছিল অন্যরকম। হস্টেলে অনেককেই দেখতাম নানা ধরনের হাতের
কাজ করতে। দেখতাম, যারা পাঠভবন থেকে পড়েছে
তারা বহুরকমের কাজ জানে। রাখী তৈরি করা, কার্ড বানানো, সরা আঁকা, সেলাই বহুকিছু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বা বিভাগীয়
অনুষ্ঠানের জন্য তারা বানাতো। আনন্দমেলায় বিক্রির জন্য সারা হস্টেল জুড়ে জিনিসপত্র
বানানোও চলত। উত্তরশিক্ষায় কুমকুমদি কাজ দিতেন। আনন্দমেলার জন্য রুমাল করতে গিয়ে
কুমকুমদির কাছ থেকে সেলাই শিখেছিলাম। এদিকে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় “ওয়ার্ক
এডুকেশন” সূত্রে আমাদের রাজনগর বালিকা বিদ্যালয়ে সেলাই শেখানো হয়েছিল। শান্তনিকেতনে
হস্টেলে গিয়ে কুমকুমদির কাছে থেকে শিখে আনন্দমেলার জন্য রুমাল বানাতে খুবই ভাল
লাগত তখন।
যাবতীয় বিনোদন আর বিনোদনের অভ্যাস
ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। হস্টেলে একে অন্যের কাছ থেকে বিভিন্ন দক্ষতা ছাত্রীরা শিখত তারপর নিজেরা
চেষ্টা করত। পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে উত্তরশিক্ষায় আসা “বহিরাগত” ছাত্রীরা
ধীরে ধীরে শিখে নিত নানা ধরনের কাজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর অন্যদের দেখতে দেখতে নিতান্ত আনাড়ী ছাত্রীটিও দক্ষ হয়ে উঠত নানাধরনের কাজে। সময়
যাপনের নিজস্ব প্রকরণ আর উপায়ের স্বতন্ত্র একটি আদল নির্মিত হয়ে উঠত এইভাবে।
বিনোদনের একটি নিভৃত বয়ান গড়ে উঠত প্রত্যেকের। কেউ সেলাই করে, কেউ পদ্য লেখে, কেউ সরা আঁকে অথবা পরিকল্পনা করে রাখে সামনের আনন্দবাজারে কি ধরনের কাজ সে করবে।
পরীক্ষা শেষ হবার পর অনেককেই দেখতাম কাপড়,
সুতো কিনে আনতে অথবা কার্ড আর রং কিনে আনতে। বাড়ি যাবার আগে যতটা সময় পাওয়া যাবে তখন নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অথবা
বাড়ি গিয়েও দীর্ঘ ছুটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা করে নিয়ে যাওয়া জরুরি ছিল অনেকের কাছেই। অবসর যাপনের এবং বিনোদনের একটি ভিন্ন মাত্রা ছিল যা কোনো সাপেক্ষতায় যুক্ত নয়,
নিজের ভিতর থেকে উৎসারিত। বাইরে থেকে তীব্র কোনো প্রভাবক ছাড়াই নিজের নিভৃতির মধ্যে
আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং বিভিন্ন কাজের ভিতরে নিজেকে প্রকাশ করার একটি নিবিড় প্রক্রিয়া
সেইসূত্রে তৈরি হতে থাকত। এর ভিতরেই গড়ে উঠত বিনোদনের বিকল্প পরিসর যা আত্মক্ষয়ী
নয়, আত্মনির্মাণে সহায়ক।যার যা তৈরি করতে ইচ্ছা করছে সে যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী না ও হয়, হস্টেল খুঁজে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য যে সেই বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। এইভাবে পারস্পরিক কাজ এবং দক্ষতা লেনদেনের একটি সাবলীল প্রক্রিয়া হস্টেলের
মধ্যে বহমান ছিল। সোসাল মিডিয়া আর তীব্র উত্তেজক বিনোদনের কোনো অভ্যাস তখন
শান্তিনিকেতনের ছাত্রমানসকে গ্রাস করে নি। নির্মাণের, সাধনার মধ্যে থেকে উঠে আসত
নিজের বিনোদিত হবার স্বতন্ত্র ধাঁচ, যা কাউকে ছাপিয়ে নিজেকে জাহির করে না অথচ
স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এই অনন্য ভাবে সাধারণ হবার তালিম শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দর্শনের মধ্যে
যেমন রয়েছে তেমনি তা হস্টেলে মেয়েদের বিনোদিত হবার, আনন্দিত হবার স্বতন্ত্র আদলটিও
গঠন করে দিত অজান্তেই।
দ্বাদশ শ্রেনীর প্রি ডিগ্রী পরীক্ষা হবার পর স্নাতকে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত যে সময় পাওয়া গেছিল তাতে আমিও তৈরি করেছি্লাম দুটো সালোয়ার। কুমকুমদি নকশা করে দিয়েছিলেন আর সেলাই গুলোও শিখিয়েছিলেন। আর আমি সেলাই গুলো করেছিলাম। প্রায় ষোল বছরের আবাসজীবনে এই লকডাউন সূত্রে দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার সুবাদে সেইসব খুঁজে পাওয়া গেল। মনে পড়ে গেল অজস্র কথা আর দৃশ্য পরম্পরা।


Khub bhalo laglo pore...khub sundor hather kaaj tomar! One of your many hidden talents. Erokom bhabei likhe jao.
ReplyDeleteThank you swan ...
DeleteDarun shotti! 💛💚 etoh bhalo laglo pore r hater kaaj dekhe! Kichu bolar neu just. Agun!
ReplyDeleteThank you Sohini.
Deleteখুব সুন্দর হয়েছে। তোমার হোস্টেল জীবনের এমন সুন্দর বর্ণনা মুগ্ধ করলো। তুমি তোমার জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে এভাবেই ধরে রেখো সযত্নে। ভালো থেকো।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ উত্তমদা ।
Deleteপুরনো কত কথা মনে পড়ে গেলো। চালতা তলায় বসে রোদে পিঠ দিয়ে কুমকুমদির শেখানো সেলাই করতে করতে হাসি মজা চিৎকার। আমার প্রথম বছরের আনন্দমেলাতে কার্ড বানারোর স্মৃতি।আহা সেসব দিন...
ReplyDeleteহ্যাঁ, এই সেদিনের কথা, বৃষ্টি হল বলে নাট্যঘরে আনন্দবাজার। লিখতে গিয়ে খেই হারিয়ে যায়, কোনটা ছেড়ে কোন কথাটা বলি। উত্তরশিক্ষার স্মৃতি অতুলনীয়।
ReplyDelete