Monday, August 30, 2021

 ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস।

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস, অরন্ধন,  দ্বিতীয় বর্ষ ।। দশম ওয়েব সংস্করণ ।। ১৩ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ৩০ আগষ্ট ২০২১


মধুপর্ণা

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি একটি সূক্ষ্ম অথচ প্রভাবশালী ক্ষমতার বিন্যাস রচনা করে। প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ বৈষম্য জারিত হয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন কাজে কথায়, উচ্চারণে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। তার প্রতিনিয়ত চর্চা যে বাতাবরণ তৈরি করে তার মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক, উচ্চনীচের সমীকরণ রচিত হতে থাকে। তার ভিতরেই আমাদের যাবতীয় সম্পর্ক নির্মিত হয় বা বলা ভাল, সম্পর্ক এই ক্ষমতার সূক্ষ্ম রাজনীতির বুনোটের বাইরে কিছু নয়। যা কিছু আমাদের কাছে সাধারনভাবে অপাপবিদ্ধ, সরল, সহজ হিসাবে প্রতিভাত হয়, তার চলন এবং রেখা সমূহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে মানুষের ভিতরে পারস্পরিক এবং অন্তবর্তী রাজনীতি কতটা লিঙ্গ, উচ্চনীচের ক্ষমতা বিন্যাসের প্রতিফলন। পরিবারবদ্ধ, সমাজবদ্ধ, বিবাহে আবদ্ধ, সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষ এই সমীকরণের মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত চর্চা করে চলেছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সমীকরণ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোজাত বৈষম্যকে নিজের মধ্যে বহন করে চলে। প্রতিটি ঘটনা, কাজ, কথা, টানাপোড়েন একটি বৈষম্যপূর্ণ নারী বিদ্বেষী সমাজের প্রতিবিম্ব হাজির করে প্রতিনিয়ত। এই যে আমরা কিছু কথা প্রায়শই শুনে থাকি, "ঘরের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না", অথবা "সম্পর্কের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না” এখন কথা হল আমরা রাজনীতি বলতে ঠিক কি বুঝি। আমাদের কথা প্রতিটি বাক্য, শব্দ, শব্দের ব্যবহার সব কিছুর মধ্যেই একটি তরল ক্ষমতার প্রবাহ চলমান থাকে। এর ভিতরে নারীকে হেনস্থা করার জন্য আয়োজন সর্বত্র বিছিয়ে রয়েছে। এই কাঠামোগত বিষক্রিয়া যা জারিত করে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের জীবন আর মানুষের সম্পর্কের বয়ান, দু কলম লিখে তা বদলানো যায় না। কি করে বদলানো যায় ? কোনো ভাবেই কি যায় ?

যে প্রোগ্রামিং বা পদ্ধতিক্রম জারি রয়েছে তা মানুষকে সেভাবেই তৈরি করবে। জন্মদাগের মত রয়ে যাবে কাঠামোর অসুখ মানুষের মনে, ইচ্ছায়, অভ্যাসে, চাহিদায়। এখন আনলার্ন বা অর্জিত জ্ঞান বাতিল করে নিজেকে মুক্ত চিন্তক হিসাবে গড়ে তুলতে এবং নতুন অভ্যাস ও ইচ্ছাপরম্পরায় নিজেকে অন্বিত করতে যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার আয়োজন আমাদের কাছে নেই এবং তার যে কোনো সম্ভবনা সমূলে বিনাশ করে আমাদেরই কাঠামো। এই আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকের মত কেউ কেউ চিৎকার করে। ঐ যেমন মেহের আলি চিৎকার করত “ তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়!" তেমনি এই ক্ষমতার প্রবাহ থেকে এই কাঠামো উপজাত জটিল বিন্যাস থেকে আমাদের আশু মুক্তি নেই।

নারীকে আরোপিত জীবনের পাঠ ভুলে নিজের জীবন বেছে নিতে হবে, নির্মাণ করতে হবে স্বতন্ত্র জীবনচর্যা। নারীবাদ মানে স্বতন্ত্র জীবনবোধ। আরোপিত অবদমনের চক্রান্ত চিহ্নিত করা এবং সেই আগ্রাসনের আয়োজন অস্বীকার করার স্পর্ধা। এত সূক্ষ্ম ভাবে এই বহুস্তরিক লিঙ্গবৈষম্যের জাল বিছিয়ে রাখা আছে যে তাকে বিশ্লেষণ করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমরা নিজেদের অভ্যাস বদলাতে পারি মাত্র কাঠামো বদলাতে পারি না। এই এত চারিদিকে কথাবার্তা, সভা সমিতি, সাম্য সাম্য খেলা। ব্যক্তিমানুষের অভ্যাস আর তজ্জনিত ইচ্ছার বদল না হলে কিছুই বদলায় না। ওয়ান ফাইন মর্নিং লিঙ্গসাম্য দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকবে না জেনেও বিশ্লেষণ করে যেতে হয়, তার কারণ একটা ঘন্টা শতাব্দীর পর শতাব্দী পরম্পরাক্রমে বাজিয়ে যেতেই হয় কেউ না কেউ তার শব্দ কান পেতে একান্তে কখনো শুনবে বলে। তারপর থেকে আরো একটা প্রতিধ্বনি শুরু হয়ে আরো কিছুদূর যাবে বলে। অভ্যাস আর ইচ্ছা বদল করে লিঙ্গসাম্যের চর্চা কখনো শুরু হবে বলে।

Wednesday, August 25, 2021

 




                 শান্তিনিকেতনের মেয়েদের হস্টেলে বিনোদন; অবসর যাপনের একটি বিকল্প নির্মাণ। (১)

                                                                  মধুপর্ণা 

শান্তিনিকেতনে আবাসজীবনের শুরুর দিকে  হস্টেলে আমরা  একরকম প্রযুক্তি থেকে দূরেই ছিলাম। উত্তরশিক্ষায় অর্থাৎ একাদশ দ্বাদশ শ্রেনীতে যখন পড়ি  তখন থাকতাম শান্তিনিকেতনের প্রথম মেয়েদের হস্টেল শ্রীসদনে (প্রতিষ্টা - ১৯০৯)  মেনব্লকে দোতলায় ডর্মেটরিতে।  তখন ফোন রাখা বারণ। হস্টেলের ওয়েটিং রুমে ফোন আসবে বাড়ি থেকে তখন ডেকে দেওয়া হবে কথা বলার জন্য। কেউ কেউ লুকিয়ে ফোন রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু মাঝেমধ্যেই ধরা পড়লে হুলস্থুল কান্ড হত। টিভি রুমে টিভিতে শনি রবিবার ডিডি বাংলায় সিনেমা। ব্যাস। তখন আমাদের বিনোদন গুলোর আদল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, সময় উদযাপনের আয়োজন ছিল অন্যরকম। হস্টেলে অনেককেই দেখতাম নানা ধরনের হাতের কাজ করতে। দেখতাম,  যারা পাঠভবন থেকে পড়েছে তারা বহুরকমের কাজ জানে। রাখী তৈরি করা, কার্ড বানানো, সরা আঁকা, সেলাই  বহুকিছু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বা বিভাগীয় অনুষ্ঠানের জন্য তারা বানাতো। আনন্দমেলায় বিক্রির জন্য সারা হস্টেল জুড়ে জিনিসপত্র বানানোও চলত। উত্তরশিক্ষায় কুমকুমদি কাজ দিতেন। আনন্দমেলার জন্য রুমাল করতে গিয়ে কুমকুমদির কাছ থেকে সেলাই শিখেছিলাম। এদিকে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় “ওয়ার্ক এডুকেশন” সূত্রে আমাদের রাজনগর বালিকা বিদ্যালয়ে সেলাই শেখানো হয়েছিল। শান্তনিকেতনে হস্টেলে গিয়ে কুমকুমদির কাছে থেকে শিখে আনন্দমেলার জন্য রুমাল বানাতে খুবই ভাল লাগত তখন।

যাবতীয় বিনোদন আর বিনোদনের অভ্যাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। হস্টেলে একে অন্যের কাছ থেকে বিভিন্ন দক্ষতা  ছাত্রীরা শিখত তারপর  নিজেরা চেষ্টা করত। পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে উত্তরশিক্ষায় আসা “বহিরাগত” ছাত্রীরা ধীরে ধীরে শিখে নিত নানা ধরনের কাজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর অন্যদের দেখতে দেখতে নিতান্ত আনাড়ী ছাত্রীটিও দক্ষ হয়ে উঠত নানাধরনের কাজে। সময় যাপনের নিজস্ব প্রকরণ আর উপায়ের স্বতন্ত্র একটি আদল নির্মিত হয়ে উঠত এইভাবে। বিনোদনের একটি নিভৃত বয়ান গড়ে উঠত প্রত্যেকের। কেউ সেলাই করে, কেউ পদ্য লেখে, কেউ সরা আঁকে অথবা পরিকল্পনা করে রাখে সামনের আনন্দবাজারে কি ধরনের কাজ সে করবে। পরীক্ষা শেষ হবার পর অনেককেই দেখতাম  কাপড়, সুতো কিনে আনতে অথবা কার্ড আর রং কিনে আনতে। বাড়ি যাবার আগে যতটা সময় পাওয়া যাবে তখন নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অথবা বাড়ি গিয়েও দীর্ঘ ছুটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা করে নিয়ে যাওয়া জরুরি ছিল অনেকের কাছেই। অবসর যাপনের এবং বিনোদনের একটি ভিন্ন মাত্রা ছিল যা কোনো সাপেক্ষতায় যুক্ত নয়, নিজের ভিতর থেকে উৎসারিত। বাইরে থেকে তীব্র কোনো প্রভাবক ছাড়াই নিজের নিভৃতির মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং বিভিন্ন কাজের ভিতরে নিজেকে প্রকাশ করার একটি নিবিড় প্রক্রিয়া সেইসূত্রে তৈরি হতে থাকত। এর ভিতরেই গড়ে উঠত বিনোদনের বিকল্প পরিসর যা আত্মক্ষয়ী নয়, আত্মনির্মাণে সহায়ক।যার যা তৈরি করতে ইচ্ছা করছে সে যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী না ও হয়, হস্টেল খুঁজে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য যে সেই বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। এইভাবে পারস্পরিক কাজ এবং দক্ষতা লেনদেনের একটি সাবলীল প্রক্রিয়া হস্টেলের মধ্যে বহমান ছিল। সোসাল মিডিয়া আর তীব্র উত্তেজক বিনোদনের কোনো অভ্যাস তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রমানসকে গ্রাস করে নি। নির্মাণের, সাধনার মধ্যে থেকে উঠে আসত নিজের বিনোদিত হবার স্বতন্ত্র ধাঁচ, যা কাউকে ছাপিয়ে নিজেকে জাহির করে না অথচ স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এই অনন্য ভাবে সাধারণ  হবার তালিম শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দর্শনের মধ্যে যেমন রয়েছে তেমনি তা হস্টেলে মেয়েদের বিনোদিত হবার, আনন্দিত হবার স্বতন্ত্র আদলটিও গঠন করে দিত অজান্তেই।

দ্বাদশ শ্রেনীর প্রি ডিগ্রী পরীক্ষা হবার পর স্নাতকে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত যে সময় পাওয়া গেছিল তাতে আমিও তৈরি করেছি্লাম দুটো সালোয়ার। কুমকুমদি নকশা করে দিয়েছিলেন আর সেলাই গুলোও শিখিয়েছিলেন। আর আমি সেলাই গুলো করেছিলাম। প্রায় ষোল বছরের আবাসজীবনে এই লকডাউন সূত্রে দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার সুবাদে সেইসব খুঁজে পাওয়া গেল। মনে পড়ে গেল অজস্র কথা আর দৃশ্য পরম্পরা। 





Friday, August 20, 2021

 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শ শালা -  মধুপর্ণা কর্মকার। ২৩ শে কার্তিক ১৪২৭।  নভেম্বার ৯ ,২০২০। 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শশালা।  - মধুপর্ণা কর্মকার।  ৩ জানুয়ারী ২০২১ / ১৯ শে পৌষ ১৪২৭। 


শান্তিনিকেতেন, ডিসেম্বার,  ২০২০। 





বিষণ্ণ কুয়াশার অলৌকিক সকাল, কোপাই এর পাড়। 

শান্তিনিকেতন, ডিসেম্বার ,২০২0।

১। 
২। 


 

 

করোনা পরিস্থিতি ও নারী - অবস্থা ও অবস্থান।

 মধুপর্ণা কর্মকার। 

( অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ, ২৩ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ৭ই জুন ২০২১ এ প্রকাশিত।) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 

বিশ্বজুড়ে গত দেড় বছর যাবত অতিমারী আমাদেরকে পর্যুদস্ত করে রেখেছে, এ নিয়ে আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণও আমরা রোজ পড়ছি, শুনছি। সমাজ জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন, ইত্যাদির প্রভাব সম্পর্কিত আলোচনায় আমাদের মন আর মগজকে ক্রমাগত খাদ্য জুগিয়ে চলেছে সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম কখনও প্রয়োজনীয় ভাবে কখনও অপ্রয়োজনীয় ভাবে। বহুল আলোচিত এই বিষয়ের ভিতরে নিজেদের ইচ্ছা ও চাহিদামত আমাদের খুঁজে নিতে হচ্ছে রসদ। করোনা পরিস্থিতিতে নারীরা কেমন আছেন? সমাজের বিচিত্র স্তরের নারীরা ? “আমাদের সমাজের নারী" এই ভাবে এক গাত্রে ফেলা যায় নারীদের? যায় না। শ্রেনী, বর্ণ, জাতি, ধর্ম ভেদে বদলে যায় নারীদের অবস্থা ও অবস্থান। বিভিন্ন অবস্থানের নারী বিভিন্ন বিষয়ে আলাদা আলাদা ভাবে প্রভাবিত হন। এই সহজ সত্য বুঝতে আমাদের সময় লেগেছে বহুদিন কিন্তু সমাজে - নারীর সমস্যা" আসলে বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, সমাজের স্তর বিভাজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্যার সঙ্গে পাল্টায়, ভোল বদল করে , মাত্রায় হয় তারতম্য। সমাজের ভিন্ন অবস্থানের নারী ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত হয়, বিভিন্ন ঘটনার সংঘাতে ভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়।

   এই করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক বিভিন্ন স্তরে মানুষের বিচিত্র সমস্যা ইত্যাদির আড়ালে ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অবস্থানের মেয়েরা কেমন আছেন তার খোঁজ। তথাকথিত “বড় আর গুরুত্বপূর্ণ" ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেয়েদের সমস্যা। এই চাপা পড়ে যাবার গল্প নেহাত পুরোনো নয়, এই ধারা বহমান। পিতৃতান্ত্রিক মানস গঠন ঠিক করে দেয় কোনটা বড় ইস্যু , কোনটা প্রাসঙ্গিক আর কোনটা নয়। কি নিয়ে আলোচনা হবে, কোন বিষয় প্রচার করা হবে, কোন কোন বিষয় পুনঃ পুনঃ প্রচার করে মানুষের মস্তিষ্কের কোণায় কোণায় পৌঁছে দেওয়া হবে, কোন ঘটনার কোন বিশেষ ব্যখ্যাটি মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তােলা হবে তা খুব সূক্ষ্ম ভাবে নির্ধারণ করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। এই নির্বাচনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে নারীদের সমস্যা। কারন তা ব্যবস্থার কাছে অস্বস্তিকর। 

   করোনাকালে লকডাউন হবার পর সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সবাই যখন গৃহবন্দী হল তারপর মেয়েদের সমস্যা শুরু হল তুমুল ভাবে। প্রথমত আমাদের কাছে একটা মিথ্যা ভীতি তৈরি করা হল যে বাড়ি হল সব থেকে সুরক্ষিত জায়গা। এখানে মেয়েরা সব থেকে নিরাপদ। কিন্তু বাইরের মত ঘরের মধ্যেও পিতৃতন্ত্রের থাবা জাল বিস্তার করে আছে। এখানেও রয়েছে পুরুষতন্ত্রের দাঁত, নখ। পরিবারের কাঠামো আর সামাজিক স্তর ভেদে পরিবারের মেয়েরা শােষিত বা নিপীড়িত। নিরাপত্তার নামে, সুরক্ষার নামে কখনো কোন ছদ্মবেশ ছাড়াই পরিবার মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে রাখতে চায়। সেই সময় থেকে নানা সূত্রে বাড়ির বাইরে যেতে পারলে কিছুক্ষনের জন্য হলেও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে তারা। বাইরে কাজের সূত্রে বা বন্ধু বান্ধবীর কাছে গিয়ে নিজেদের কথা বলার অবকাশ বা নিজের মনের শুশ্রষা করার সুযোগ পায়। লকডাউনে সে সব সুযোগ বন্ধ। তার ফলে মানসিক ভাবে তারা গেঁজিয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রেই। অন্যদিকে গার্হস্থ্য হিংসা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবেই। বাড়ির ছেলের বাইরে কাজ বন্ধ তাই বাড়িতে রয়েছে কিন্তু তারা কত অংশে পরিবারের কাজে সাহায্য করেন সে কথা আমরা কিছুটা অনুমান করতে পারি। নিজের হেনস্থাকারীর সঙ্গে বিরতি ছাড়াই অনেক নারী থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক নারী কাজ হারিয়েছেন তার ফলে অনটন উঠেছে চরমে। একটি সামাজিক সত্য নগ্নভাবে উঠে এসেছে পরিবার নারীদের জন্য প্রশ্নাতীত নিরাপদ জায়গা নয়। এবং যাবতীয় সামাজিক বা জাতীয় সমস্যার একটি স্বতন্ত্র মুখ রয়েছে। সব সমসার সাধারণীকরন নারীর সমস্যাকে তুলে আনতে পারে না তা এই মহামারীর পরিস্থতি আরও আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। 


 

সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা"?

মধুপর্ণা কর্মকার 

( অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, ত্রয়োদশ সংস্করণ, ১৮ ই মাঘ ১৪২৭, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২১ এ প্রকাশিত) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 

   উত্তমদা সেদিন বললেন সমাজ জীবনে মেয়েদের ভুমিকা নিয়ে কিছু লিখতে। তারপর সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখলুম যেদিকেই তাকাই সব দিকেই বৈষম্য। অন্তত যে লেন্স থেকে সমাজকে দেখার চেষ্টা করছি, গবেষণা সূত্রে। সেদিক থেকে দেখলে আরো নানা বৈষম্যের মধ্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লিঙ্গ বৈষম্য। এখানে বলে নেওয়া ভাল সব বৈষম্যই আসলে পরস্পর সম্পর্কিত। আরো নানা বৈষম্যের সংগে লিঙ্গ বৈষম্যের সম্বন্ধ অতি ঘনিষ্ঠ । বিশেষ একটি লিঙ্গের মানুষকে কারন ছাড়াই সমস্যার মধ্যে দূর্গতির মধ্যে হেনস্থার মধ্যে ফেলে রাখে আমাদের সমাজ। এখন কোন দিকটা নিয়ে লিখি। আসলে বিষয় হল কাঠামো। একটা কাঠামোর মধ্যে যখন সমস্যাটা থাকে তখন সেখান থেকে যা যা উৎপন্ন হবে সব কিছুর মধ্যেই থাকবে সেই কাঠামোর গুণ। তাই সমাজের অভ্যন্তরে যে বৈষম্যের বীজ রোপিত হয়ে আছে তাই আসলে ডালপালা মেলে আমাদের সমাজের সর্বত্র ছড়িয়েছে। এখন যদি সমাজের দিকে তাকাই তাহলে সবদিকেই সেই বিষবৃক্ষের ফল দেখতে পাব। ভাষায়, শিল্পে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, পোশাকে, পেশায়, সিনেমায়, বিজ্ঞাপনে, শিক্ষায়, ধর্মে। এই এক একটি বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা আলোচনা করে কি লাভ, কতদূর তার প্রভাব আমি জানি না। মূল কাঠামোটাকে আঘাত করতে পারলে তবেই লিঙ্গ বৈষম্যপূর্ণ সমাজের ডালপালা আর উৎপাদিত ফলের চরিত্র গুনাবলী আপনিই বদলে যাবে হয়তো।

   তারপরেও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ছোট ছোট বিষয় গুলো তুলে ধরে আলোচনা করার দরকার আছে। কেন আছে? তার কারন আমরা নিমজ্জিত হয়ে আছি বৈষম্যের ভয়াল নাগপাশে। সেখানে ভ্রম ও বিভ্রম বিস্তর। যা কিছু প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান ধ্যান ধারনা সেই সব থেকে নিজেকে মানসিক ভাবে বের না করতে পারলে আমাদের কাছে লিঙ্গ বৈষম্যের চেহারাটা ধরা পড়ে না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে না কার্য কারন। তাই ছোট ছোট বিষয় গুলােকে সন্দেহ করতে শিখলে, সমালোচনা করতে শিখলে তবেই মূল জায়গায় নজর পড়বে। কাঠামোকে প্রশ্ন করার কথা আমাদের মনে আসবে । তাই উত্তমদা যেভাবে বললেন, সমাজ জীবনে মেয়েদের ভূমিকা বা অবস্থান নিয়ে লেখার কথা তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আর তাৎপর্যপূর্ণ। সেই ভাবে সমাজের নানা ক্ষেত্রকে পর্যবেক্ষন করে সেই পটভুমিতে আলোচনা করাটাও জরুরি।

  লিঙ্গ অসাম্য যেভাবে আমাদের সমাজের মজ্জার মধ্যে ঢুকে আছে সেখান থেকে আমাদের মন ও মনন বের করে আনতে হলে লিঙ্গ বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি এবং সেই সচেতনতার প্রতিনিয়ত চর্চা জরুরি। যখন আমরা সামাজিক নানা বিষয়ের সংগে সংগে নিজেদের প্রতিটা কাজ, প্রতিটি কথার আত্মসমালোচনানা করতে করতে নিজেদের জীবনচর্যার খোলনলচে বদলাতে বদলাতে এগিয়ে যেতে পারব তখন এই তথাকথিত সচেতনতার একটা অর্থ দাঁড়াবে। অন্যথায় এই সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা" ও "অবস্থান" একটা বিষয় মাত্র হয়ে থেকে যাবে। তা নিয়ে লেখা হবে দিস্তা দিস্তা ছাপাও হবে বিস্তর। কিন্তু জগদ্দলের মত চেপে থাকা লিঙ্গ বৈষম্যের এই ভার নামবে না আমাদের সমাজের ভিত্তি থেকে। নারীরা বহন করে যাবেন এই দূর্বিষহ বোঝা, তাদের ক্ষমতার বুদ্ধির অপচয় হবে সর্বত্র। এবং আমরা "নারীকেন্দ্রিক" লেখা লিখে নিজেদের ইগো সেঁকে নিতে থাকব ক্রমাগত।

  সমাজ জীবনে "নারীর" ভুমিকা যখনই বলছি তখনই একটা "আদারিং" করছি অর্থাৎ একটা নারীকে "অপর" ভাবার একটা সূক্ষ্ম বিষয় এখানে কাজ করছে। যেন নারী সমাজের মূল উপাদান নয়, বিচ্ছিন্ন কিছু। "সমাজ জীবনে পুরুষের অবস্থান ও ভুমিকা" বিষয়ে কেউ প্রবন্ধ পৃথিবীর কোন প্রান্তে আদৌ লিখবে না। কয়েকটা শিরোনাম যদি ভাবার চেষ্টা করি, অমুক সাহিত্যে পুরুষের অবস্থান আলোচনা, তমুক শিল্পে সংস্কৃতিতে পুরুষের অবদান, হ্যান সিনেমায় পুরুষের চিত্রায়ন বিষয়ে মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ, ত্যান শিক্ষায় অথবা ধর্মে পুরুষের অবস্থান ও ভূমিকা আলোচনা । কেমন হাস্যকর শােনাচ্ছে না ? তার কারন সমাজটা যেন তাদেরই। যার মালিকানা স্বীকৃত, তার আবার ভূমিকা কিসের ? একাধিপত্যের এটাই ভাষা। "অপর" বানানো। তারপর সেই "অপর"কে ছেলে ভুলানাের মত ভুলিয়ে রাখা। সক্ষমতা সম্পর্কে, অবস্থান সম্পর্কে বিস্মৃত করে রাখা যাতে নিজেদের ক্ষমতা কায়েম রাখা যায়। এইবার “পুরুষ"এর জায়গায় "নারী" বসিয়ে শিরোনাম গুলো আরেকবার পড়ুন। এইবার খুব চেনা লাগছে নিশ্চয়। কারন আমরা শিরোনাম গুলো আখছার শুনছি সমাজের সর্বত্র, দেখছি পত্র পত্রিকায়, অ্যাকাডেমিক লেখায়, সেমিনারে, বিজ্ঞজনদের আড্ডায়। শুনে আমাদের আস্বাভাবিক কিছু মনে হচ্ছে না। এক ধরনের অস্বীকৃতি থেকে এই "ভুমিকা"র বিষয়টা আসে। তার মূল অংশকে লঘু করে তাকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ভূমিকা আলোচনা করা হয়। আলোচনার বিষয় নির্বাচন ও আ্লোচনার ভাষা আসলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা বৈষম্যের বিষাক্ত ঘন অন্ধকারের রাজনীতির বাইরে নয়। এ নিয়ে নারীবাদী ভাষাতাত্ত্বিকগণ তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। আপাতত সেদিকে আর যাচ্ছি না। তবে শেষে এইটুকু বলি, প্রচলিত আলোচনার বিষয়, তার বয়ান, ভাষার সংগে লিঙ্গরাজনীতি প্রসূত ক্ষমতার সম্পর্ক - বিষয় গুলো শুনতে জটিল মনে হলেও আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত তার চর্চা করছি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে।

  - গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

কথাবার্তা ২

মধুপর্ণা কর্মকার

( অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, দশম ওয়েব সংস্করণ, ৫ই পৌষ ১৪২৭, ডিসেম্বার ২০, ২০২০ এ প্রকাশিত। ) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 যা কিছু আমরা স্কুল কলেজে পড়ি না, প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃত নয় সেই সব দক্ষতা, জ্ঞান নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের তাচ্ছিল্য আছে।প্রতিষ্ঠানিক যা কিছু তার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা প্রবল। কিন্তু তার বাইরে যা কিছু চর্চিত হয় তার প্রতি আমাদের সমীহ তেমন নেই। তার একটা বিরাট অংশ দেখা যাচ্ছে নারীর বিভিন্ন দক্ষতা। পিছিয়ে রাখা (পিছিয়ে পড়া বলা যাবে না।) মানুষের দক্ষতাকে ধর্তব্যে আনে না বিশেষ কেউ। তার মধ্যে আবার আছে আরাে অবদমিত কেউ। তিনি আর কেউ না। তিনি প্রান্তিক নারী। সার্বিক ভাবেই নারীর কাজ, নারীর অবদান অস্বীকৃত থেকে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। তার যে কাজ গুলো দৃশ্যমান সেখানে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। নারীর শ্রম আমাদের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে ভিতর থেকে। বিপুল কায়িক শ্রম ও সময়ের বিনিয়োগ দিয়ে নারী সভ্যতাকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু তার কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন অংসখ্য কাজ রয়েছে যা সমাজে প্রায় অদৃশ্য বা বলা ভাল আমাদের সমাজ যেন দেখেও দেখে না। কিন্তু তার সুফল ভোগ করে নির্বিকার চিত্তে। বলা বাহুল্য সেই সব তথাকথিত অদৃশ্য কাজ যা নারী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করে আসছে সেইসব কাজই আমাদের সমাজের চালিকা শক্তি। তাহলে সেইসব কাজ স্বীকৃত ও সমাদৃত নয় কেন? এখানেই পিতৃতন্ত্রের রাজনীতি।

 প্রান্তিক নারীর দৈনন্দিন শ্রমের কথা যদি ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে সে যেকাজ গুলো মূলত করে সেগুলো নিয়ে সমাজ বিশেষ ভাবে উপকৃত হয়। সে রান্না করে। প্রতিদিনের খাবার যেমন সে বানাতে জানে তেমনি বছরের নানা সময়ের নানা অনুষ্ঠানের সময় সে হতে পারে পুজোপাৰ্বন বা হতে পারে ঋতু উৎসব তখন আরো নানা বিচিত্র খাবার সে বানায়। পিঠে পুলি, নবান্ন, নাকু , খই মুড়ি । সে জানে ধান থেকে কি কি পদ্ধতিতে নানা ধরনের খাবার বানানাে যায়। ধান বিশেষ পদ্ধতিতে সেদ্ধ হলে তারপর সেই চাল থেকে ভাত হবে। তার পরিবার সন্তান সন্ততিরা তাই খেয়ে রোজ দিনযাপন করবে। ধান থেকে আবার ভিন্ন পদ্ধতিতে চাল হলে তা থেকে মুড়ি হবে। আরো ভিন্ন ভাবে হবে চিড়ে, খই। আতপ থেকে হবে পায়েস। আরো কত কি সে জানে। যা থেকে যুগ যুগ ধরে মানুষেরা, নারীর পরিবার তার সন্ততিরা টিকে আছে। সে সন্তান পালন করে। নানা পরিচর্যায় লালন পালন করে সে গড়ে তােলে , বড় করে তার সন্তান। এই লালন পালনকে “মেয়েলি" কাজ নাম দিয়ে হেয় করে আসছে। কিন্তু এই লালন পালনের দক্ষতার মাঝেই টিকে আছে আমাদের চলমান সমাজ। সে ঘরদোর সাফসুতরো করে, নিকোয়, ঝাঁট দেয়। সচল রাখে গৃহস্থালী। এই অত্যন্ত সহজ, স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া কাজ গুলো গুরুত্বহীন ভাবে দেখা হয় তার কারন এগুলো করে একজন নারী। নারী সম্পর্কিত যা কিছু সবকিছু হেয় করে দেখলে পিতৃতন্ত্রের অসুস্থ অহং তৃপ্ত হয়। নারীর ওপর আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষায় পিতৃতন্ত্র অযুক্তির পরম্পরা নির্মাণ করে আর তা সমাজে লাগু করে। সে সময় পেলে ছবি আঁকে ঘরের দেয়ালে। তাকে যথাযথ শিল্প হিসাবে স্বীকার করা হয় না। যেন নিতান্ত সময় কাটানোর জন্য কিছু গুরুত্বহীন কাজ। সেলাইকে শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি পেতে অনেক সময় লেগেছে। তার একটাই কারন সেলাই এর মাধ্যমে শিল্প তৈরি করে মূলত মেয়েরা। এইভাবে দেখা যাবে যা কিছু কাজ নারী করে ও যা কিছু কাজ নারী সম্পর্কিত সেইসব নিয়ে এক ধরনের তুচ্ছ তাচ্ছিল আছে। সেই কাজগুলাে যা মূলত চালিকা শক্তি। তাকে গুরুত্ব দেওয়া না হোক স্বীকার করলেও নারীকে শক্তিশালী করে তােলা হবে, তাকে তার উপযুক্ত জায়গা দেওয়া হবে যাতে সে নিজেকে চিনবে। সেই আতঙ্কে তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়। যেন এই কাজ গুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে কেউ চাইলেই পারে। এ জন্য দক্ষতার দরকার হয় না। আর এই সব কাজ নিতান্ত মেয়েলি। এই মেয়েলি' তকমার মধ্যেই রয়েছে লিঙ্গবৈষমের রাজনীতি। যেন এই কাজ গুলো স্বীকারের অযোগ্য। তা স্বীকার করে গুরুত্ব দেওয়া যায় না। কিন্তু তা অবলীলায় ভোগ করা যায়। তার দক্ষতা নকল করে বাজারে বেচেছে কেউ কেউ। কিন্তু কোনোভাবেই নারীকে তার কাজের জন্য তার দক্ষতার জন্য প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এইভাবেই পিতৃতন্ত্র তার বিষাক্ত ও ভয়ংকর বিন্যাস বহাল রাখে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যস্থাও যেহেতু পিতৃন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত এবং পিতৃতন্ত্র বহাল রাখার একটি হাতিয়ারও বটে। সেখানেও দেখা যাবে একই বিষয়ের প্রতিফলন। নারীর অসামন্য কিছু দক্ষতা যা খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না যেন, বা দেখলেও তা ভুলে যেতে হয় তৎক্ষনাৎ সেইসব অতিপ্রয়োজনীয় অথচ প্রকট দৃশ্যমান নয় যা কিছু তা দিয়ে টিকে আছে আমাদের মনুষ্য সভ্যতার রেশ।

  ঠিক এই ব্যবহার মানুষেরা প্রকৃতির সংগে করে থাকে। পিতৃতন্ত্রে জারিত সভ্যতা নারী ও প্রকৃতিকে একই মনোভাব থেকে ব্যবহার করে ও শােষণ করে। নিজের প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছায়। যথাযথ সংবেদনশীলতা ও স্বীকৃতি ছাড়াই। আর এই যে পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতি তাতে দেখা যাচ্ছে সব থেকে বেশি প্রভাবিত হন ও ক্ষতির সম্মুখীণ হন প্রান্তিক নারী। যাদের জীবন প্রকৃতি সংলগ্ন ও যাদের জীবন অনেকাংশে প্রকৃতিনির্ভর । পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি মনোভংগী যার বৈশিষ্ট্য হল দমন ও অপব্যবহার। এই মনোভাব একদিকে নারীর ক্ষতি করছে অন্যদিকে প্রকৃতির।

 - গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।


 

কথাবার্তা-১

 মধুপর্ণা কর্মকার

(অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, অষ্টম ওয়েব সংস্করণ, ৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৭, ২৩ নভেম্বর, ২০২০) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

   আমাদের সমাজের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব মেয়েদের স্বাধীন জীবন যাপনে পিতৃতন্ত্রের বেজায় আপত্তি। জীবন যাপন, চালচলন, পােশাক আশাক, রুচি অভ্যাস সবই করতে হবে" নিয়ম মতে"। আসলে এই নিয়মের সূত্রগুলাে যদি খােলার চেষ্টা করি তাহলে আমরা দেখতে পাব মেয়েদের কাছ থেকে সমাজ যা চায়, তা হল পরিষেবা। তাই তাকে বেঁধে রাখতে হবে কঠিন শাসনে। পুরুষের ইচ্ছা, প্রয়োজন মেটানাের জন্য তাকে বানিয়ে নেবে সমাজ, আর শিখিয়ে নেবে তার নিয়মাবলি। তার শারীরিক ও মানসিক শ্রমকে কাজে লাগিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পোক্ত করবে তার ভীত। তাকে ব্যবহার করবে নিজেদের ইচ্ছে মত। তাই তাকে ব্যক্তি মানুষ হতে দিলে চলবে না। পূর্ণ মানুষ হিসাবে তাকে সমাজে চলা ফেরা করতে দেবে না। শুধু হিসাব কষে রাখা আছে তার কাছ থেকে কি পেতে পারে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। সেই হিসাবের পান থেকে চুন খসলে কি হতে পারে তা আমরা দেখছি সমাজের যত্রতত্র। 

   এখন প্রশ্ন হল সমাজের অর্ধেক অংশকে এইভাবে অবদমন করে রেখে কি ধরনের মােক্ষলাভ হচ্ছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ পালিশ করে নিচ্ছে তার অহং। জন্মসুত্রে তারা সমাজের কাছে যে ক্ষমতার ছাড়পত্র পেয়েছে তাতে তারা শান দিয়ে নিতে পারছে। আর সমাজ তাতে পিছিয়ে পড়বে তা অবধারিত। নারী বিদ্বেষ , নারীর প্রতি বৈষম্য এক ধরনের যুক্তিহীনতা যা আমাদের সমাজ কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে। এই অন্ধত্ব, অযৌক্তিকতার চর্চা আমাদের সমাজে চলছে যে সমাজ যে সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গর্ব। সেই গর্বে খানিকটা যুক্তি থাকলে বাধে  হয় ভাল হত। সেখানে একটি মাত্র স্বরের আধিপত্য আর সেই স্বরকেই যুক্তি বলে ঘোষণা করার মধ্যে দৈন্য আছে, সমৃদ্ধি নেই। নারীকে ব্যক্তি ভাবা, তার প্রতি ব্যবহারে বদল আনা, সমাজে সংস্কারে বদল আনার পর সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে না হয় গর্ব করা যাবে, ততদিন মুলতুবি থাক। সমাজের সব স্তরের নারীকে উপযুক্ত শিক্ষা, বাঁচার রসদ দেওয়া হােক যাতে তার নিজের ইচ্ছা, অনুভূতি, স্বাতন্ত্র তৈরী হয়। যখন তারা অন্যের ইচ্ছায়, অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ইচ্ছায় দাগ বােলাতে নারাজ হবে, অকপটে নির্ভয়ে তখন তারা নিজেদের ব্যক্তি মানুষ হিসাবে চিনবে। সেদিন না হয় সমাজ নিয়ে সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করা যাবে। অবদমনকে ভিত্তি করে যে ইমারতই গড়া হােক তার উচ্চতা, ঔজ্বল্য মোহিত করতেই পারে কিন্তু জেনে রাখা ভাল তার স্থায়িত্ব বেশি দিন নয়। ধীরে হােক, খুব নীরবে হোক, একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে যা এই ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেবে।নারীকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে দাও, নির্ভয়ে বাতিল করতে দাও যা কিছু তার অপছন্দ, বেছে নিতে দাও যা কিছু তার ইচ্ছায় সে লালন করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চাপা পড়ে থাকা আত্মবিশ্বাসের পুনোরদ্ধার হোক। অন্য কোথাও থেকে ধার করে নয়, নিজের ভিতর থেকে শক্তি উৎপাদন করে তাকে আত্মস্থ হতে হবে। যদিও এই প্রক্রিয়ার পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভূমিকা শুধু ভয়ংকর পাথরগুলো যা তারা এতদিন চাপিয়ে রেখেছিল সেইগুলাে তার উপর থেকে নামিয়ে নেওয়া। বাকি উজ্জীবনের কাজ তারা নিজেরাই করবে। 

     নারীকে এটা দাও সেটা দাও বলছি বটে কিন্তু মনে হয় এই বয়ানের খানিকটা বদল প্রয়ােজন। তােমরা বরং নিজেদের মাথায় ঢুকিয়ে নাও যে কি কি ব্যবহার নারীর সংগে করা যাবে না, যায় না। কারণ সে নারী বলে নয়। তোমাদের মস্তিস্কে যুক্তি থাকাটাও দরকার। অযৌক্তিক কাজ করা যায় না বলে নারীর ওপর থেকে অবদমন সরিয়ে নিতে হবে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে শিক্ষিত যুক্তিশীল হতে হবে যাতে তার গা থেকে "পিতৃতান্ত্রিক" শব্দটা খসে পড়ে। ক্ষমতা আছে বলে এই শব্দটা মানুষজন সমীহ করে চলে, আসলে এই কাঠামোর ভিত্তি হল অশিক্ষা, যুক্তিহীনতা আর অসংবেদনশীলতা। এই তিনটি একত্রিত হয়ে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তথাকথিত মহিমার নির্মাণ। তাই অযথা সমীহ করার কোন কারণ তো  দেখি না। বরং যুক্তি দিয়ে সংবেদনশীলতা দিয়ে সংস্কার করার প্রয়ােজন আছে বলেই মনে হয়। প্রশ্ন চারিদিকে, প্রশ্নের ক্যাকোফনি বিস্তর। প্রশ্নের নির্দিষ্ট অভিমুখ প্রয়োজন। পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করা হোক, জবাব নেই সে কথা সবাই জানে। প্রশ্ন তাকে নিজেকে বদলে ফেলার জন্য। পিতৃতন্ত্রের ফাঁকা অহং এর প্রকণ্ঠে প্রতিধ্বনি হয়ে ঘুরে বেড়াক প্রশ্ন গুলো। উত্তর খোঁজা বৃথা। এই ক্রমাগত প্রশ্ন করতে করতে এর ভিতর থেকে ভিন্ন পরিসর তৈরি হবে আশা করা যায়।

 -গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

 

পুরুলিয়ার পলাশ পরব

 মধুপর্ণা কর্মকার

( অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, প্রথম ওয়েব সংস্করণ, ১২ বৈশাখ ১৪২৮, ২৬ এপ্রিল ২০২১ এ প্রকাশিত। ) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক ।

 

  ধর্ম নিয়ে হানাহানি আর ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বিচিত্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কূটচক্র দেখতে দেখতে যখন আমাদের মন আর মনন বিরক্ত হয়ে উঠেছে তখন ঋতুউৎসব গুলিই একমাত্র স্বস্তির আশ্বাস বয়ে আনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে ঋতুউৎসবের যে ধারা প্রচলন করেছিলেন তা আমাদের প্রকৃতি সংলগ্নতার পাঠ দেয়। ধর্মীয় মেরুকরণের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ঋতুউৎসবে যোগ দিতে পারার মত অনাবিল আর কিছু হতে পারে না হয় তাে। পুরুলিয়ার কবি নির্মল হালদার, আমাদের নির্মলদার তত্ত্বাবধানে “অনিকেতের বন্ধুরা" বসন্তে আয়ােজন করে “পলাশ পরব”। পুরুলিয়ার প্রকৃতি, জনজীবন জন্ম দিয়েছে ও নির্মাণ করেছে যে কবিকে, তাঁর গড়ে তােলা সংস্কৃতির ধারাটিও সেই রসদে পুষ্ট। মৌলিকত্ব আর নিজস্বতা এই সাংস্কৃতিক বাতাবরণকে করেছে অনাড়ম্বর মানবিকতার কাছাকাছি, দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা। 

  পুরুলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের আসলে শুরু আছে, শেষ নেই। এই আত্মীয়তার গতি এক রৈখিক। শুরু হয় তারপর নিজস্ব চলনে বাড়তে থাকে, গভীর হয়। পরিসর বিস্তৃত হয়। রাজধানীর প্রচারসর্বস্বতা আর আত্মহারা উজ্জ্বল আলো থেকে অনেকদূরে রুখা শুখা মাটির কাছে একান্তে বসতে পারার মত অবসর তৈরি করে এই পলাশ পরব। আনন্দ আর ফুর্তির মধ্যে পার্থক্য যখন প্রায় গুলিয়ে যাচ্ছে, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় যখন মানুষের মনকে আর থিতু হতে দিচ্ছে না, দেউলেপনার অসুখে আক্রান্ত যখন আমরা সবাই, অন্তঃসারশূন্যতার উদযাপনে মসগুল থাকাই যখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বেঁচে থাকার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তখন পলাশ পরবের ডাক আন্তরিকতার পাঠ দেয়, নির্মলদার সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা চারা গাছ গুলো - পুরুলিয়ার ভুমিপূত্রকন্যাদের সঙ্গে কয়েকটা দিন অদ্ভুত সুন্দর ভাবে কাটে। চেতনার ধুলােবালি সাফ হয়ে যায়। সান্নিধ্যের অকৃত্রিমতায় কয়েকদিন কেটে যায়। 

   ফুটিয়ারী জলাধারের পাশে অহল্যাভূমি অতিথি নিবাসে এপ্রিলের তিন চার তারিখ আয়োজিত হয়েছিল পলাশ পরব। অনুষ্ঠানের প্রতিটি গানে পুরুলিয়ার মাটির গন্ধ। ঝুমুরের কিংবদন্তী শিল্পী কিরীটি মাহাতোর গান, সন্ধায় ছৌ নাচ ইত্যাদি আস্বাদনের অবকাশ পলাশ পরবকে করে তুলেছিল স্বয়ং সম্পূর্ণ। একটি জনজীবনকে কতটা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন ও উপলব্ধি করতে পারলে সেখান থেকে একটা উৎসবের জন্ম দেওয়া যায় যার প্রতিটি মুহুর্তে সেখানকার মানুষের বেঁচে থাকার, জীবনচর্যার নির্যাস মিশে থাকে। পুঁজিবাদের থাবার নীচে যখন সমস্তই নিজস্বতা হারিয়ে ক্রমে বিকট হয়ে উঠছে আমাদের উদযাপনের ইচ্ছা আর প্রক্রিয়া, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে পলাশ পরব ভিন্ন আবেদন নিয়ে একাত্মতার কাছাকাছি নিয়ে যায়।

 -গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

 মেয়েদের হস্টেল আর হস্টেলের মেয়েরা

মধুপর্ণা কর্মকার

( অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, সপ্তম ওয়েব সংস্করণ, ২৩ শে কার্তিক ১৪২৭, ৯ নভেম্বর ২০২০  এ প্রকাশিত)  অরন্ধন। 




নারী শিক্ষা সূত্রপাতের বন্ধুর পথ পেরিয়ে যখন মেয়েরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে শুরু করল এমনকি বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় অন্য জেলায় অন্য রাজ্যে গেল পড়াশুনার জন্য, সেইখানে থাকতে শুরু করল বছরের পর বছর, ক্রমে মেয়েদের হস্টেল হয়ে উঠল তাদের জীবনে তথা সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে  শুধু তারা  পরিবার ছেড়েই থাকছে না, নতুন জায়গা- নতুন শহর দেখছে, বিভিন্ন মানুষজনের সংগে মিশছে, পরিবারের কয়েকটি ভুমিকার বাইরে গিয়ে পড়াশুনার মধ্যে দিয়ে নিজেদের চিনছে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যেমন বদলে যাচ্ছে, তেমনি ধীরে ধীরে ঘটছে একটি সামাজিক রূপান্তর। এদেশে মেয়েদের আবাসজীবন খুব বেশিদিনের পুরোনো নয়, নারী শিক্ষার সমান্তরালে প্রায় দেড়’ শ বছরের কি তারও কম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেই প্রথম যুগে যে কয়েকটি মেয়েদের হস্টেল তৈরী হয়েছিল বিশ্বভারতীর ‘শ্রীসদন’ (১৯০৯ সাল) তাদের মধ্যে একটি। নানা প্রতিবন্ধকতার পাহাড় পেরিয়ে যাঁরা শিক্ষালাভের জন্য পরিবারের নিগড় কেটে বাইরে আসতে পেরেছিলেন সেই নারীরাই সমাজকে এগিয়ে দিয়েছিলেন কয়েক ধাপ। আবদ্ধ গার্হস্থজীবন থেকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে নারীর পরিচিতির ইতিহাস বেশ প্রতিকুলতার।  পরিবারের বাইরে  ভিন্ন একটি সামাজিক পরিসরে নারীর বসবাস-  এই বিষয়টা মেনে নিতে এবং অভ্যস্ত হতে অনেক সময় লেগেছিল পুরুষশাসিত সমাজের। নির্ধারিত কিছু পারিবারিক ভূমিকার বাইরে হস্টেলে এসে তারা নিজেদের দেখল নতুন ভূমিকায়। নিজেদের দেখল, অন্যদের দেখল, পরস্পরকে দেখল। একদিকে পড়াশুনা করার নতুন অভিজ্ঞতা অন্যদিকে পরিবারের বাইরে সমবয়সীদের সাথে থাকার অভিজ্ঞতা। এর ভিতরেই  নতুন সাপেক্ষতায় ঘটল নারীর আত্মআবিষ্কার। নারীর সামাজিক ভূমিকায় এল বদল, শুধুমাত্র গার্হস্থ্য জীবনে কন্যা, স্ত্রী, মাতা এই ভুমিকার জায়গায় দেখা দিল নতুন  পরিচয়, তারা ছাত্রী, তারা আবাসিক। সাংসারিক কাজকর্ম ছাড়াও তাদের এখন নতুন কাজ পড়াশুনা, যে মগজে কেবলই গৃহকর্ম আর পরিবারের সদস্যদের পরিষেবা দেবার চিন্তা পাক খেত সেখানে ঘটল তুমুল পরিবর্তন, বাইরের পৃথিবী, অনেক মানুষের সঙ্গে, আলাপ তাদের সাহচর্য জন্ম দিল নতুন মননশীলতার, চর্চিত হতে থাকল নতুন জগত, আর সম্ভবনাময় ভবিষ্যতের কথা। পারিবারিক কয়েকটি সম্বন্ধ ছাড়াও মেয়েরা পরিচিত হল আরো নানা মাত্রার সম্পর্কের সঙ্গে।  বদলের এই সন্ধিক্ষণ খুব সাবলীল ভাবে আসে নি।
                পরিবার ও হস্টেল একই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর অন্তর্গত দুটি প্রতিষ্ঠান। তারপরও দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। হস্টেলে সমবয়সী বা প্রায় সমবয়সীদের সঙ্গে বেড়ে ওঠে ছেলেমেয়েরা। পরিবারের প্রত্যক্ষ নজরদারীর বাইরে তাদের নিজস্ব জীবনবোধ তৈরি হয়।  ধীরে ধীরে নিছক পড়াশুনা করার জায়গার থেকেও হস্টেল আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যা ছাত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গি  মানসভূমি নির্মাণে বিশেষ ভুমিকা নেয়। হস্টেল জীবনের প্রভাব থেকে যায় সারাজীবন। পরিবারের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার বিকল্প হিসাবে দেখা দেয় হস্টেলজীবন। মেয়েদের হস্টেলে  থাকা ও পড়াশুনা করার মধ্যে একটি বিশেষ মাত্রা আছে যা তার অস্তিত্ববোধের সঙ্গে, চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এত বিশাল এক একটা বাড়ি, তার মধ্যে শত শত মেয়েরা একসাথে থাকে, সামাজিক অবস্থান ভেদে প্রত্যেকের রুচি আলাদা, বোধ আলাদা, উদ্দেশ্য আলাদা, সমস্যা আলাদা, প্রতিকুলতা আলাদা, তা থেকে রেহাই পাবার সংগ্রাম আলাদা। গ্রাম থেকে মফস্বল থেকে মেয়েরা শহরে আসছে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। তাদের শ্রেনী, ধর্ম, জাতি, বর্ণ সবই আলাদা। কিন্তু তারা হস্টেলে নিচ্ছে একত্রবাসের পাঠ। এই একত্রবাসে তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে, সমঝোতা করতে শিখছে, পাচ্ছে স্বাধীনতার স্বাদ। শুধু তাই নয় প্রচন্ড রক্ষনশীল পরিবারের মুসলিম পরিবারের মেয়েটি এখানে এসে পাচ্ছে ধর্মীয় জীবন যাপন না করার অবকাশ। নিজের পছন্দের পোশাক পরার অবকাশ। অত্যন্ত অস্বচ্ছ্বল পরিবারের মেয়েটি এখানে পাচ্ছে একটা পড়ার জায়গা, পড়ার টেবিল, নিজের জন্য  সময়। এমনকি অনেকে হস্টেলে এসে প্রথম ব্যবহার করছে শৌচাগার, আলো, পাখা। পরিবারের কাজে ,পরিবারের জমিতে চাষের কাজে সময় দিতে গিয়ে যার সময় থাকত না পড়াশুনা করার সেই  মেয়ে হস্টেলে এসে পাচ্ছে পড়ার অবসর। বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় তারা সমৃদ্ধ হচ্ছে, নিজেদের ইচ্ছা অনুভূতির প্রকাশে ধীরে ধীরে অকপট হয়ে উঠছে। সামাজিক গোঁড়ামি, কুসংস্কার ইত্যাদি থেকে নিজেদেরকে বের করে নিয়ে তারা নিজেদের জীবন নির্মাণ করে তুলছে। ছেলেদের হস্টেলের তুলনায় তাদের হস্টেলে কেন ভিন্ন নিয়ম চর্চা হবে, নিয়মে কেন বৈষম্য থাকবে  - আরো অনেক দাবী নিয়ে ভারতের নানা প্রান্তের হস্টেলের মেয়েরা আন্দোলনে সামিল হচ্ছে। সার্বিকভাবে আবাসিক মেয়েদের  জীবনের উদযাপনে হস্টেল আগেও যেমন ভূমিকা নিয়েছে, অনেকখানি এখনও নিয়ে চলেছে।




 ছবি - বিশ্বভারতীর প্রথম মেয়েদের হস্টেল ‘শ্রীসদন’( প্রতিষ্ঠা -১৯০৯ সাল)। প্রসঙ্গত বলি এই হস্টেলে আমার প্রথম আবাসজীবনের সূচনা আর কেটেছে বেশকিছু বছর। 


গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

                   শিল্পের অনুপ্রেরণা যখন নারী - একটি লিঙ্গ রাজনীতির বুনট ।

                                           মধুপর্ণা

(অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, অষ্টম ওয়েব সংস্করণ, ১৬ শ্রাবণ, ১৪২৮, ২ আগস্ট ২০২১ এ প্রকাশিত।) মধুপর্ণা https://arandhansunyadasak.blogspot.com/2021/08/blog-post_79.html

 

শিল্প সাহিত্য চর্চার দিকে তাকালে দেখা যাবে শিল্পী অথবা সাহিত্যিক হিসাবে সংখ্যাধিক্য পুরুষের, অন্তত যারা নিত্য চর্চিত হন। সেখানে চিত্রিত হয়েছেন অথবা বর্নিত হয়েছেন নারী। সংশ্লিষ্ট শিল্পীর মুগ্ধতা অথবা যাবতীয় অনুভূতি সেই নারীকে ঘিরে বর্নিত হয়। কবি সাহিত্যিক আঁকিয়ে যাবতীয় শব্দ গুলো যেন পুরুষের জন্যই তৈরি। তাহলে কি নারীরা শিল্প অথবা সাহিত্য সৃষ্টি করেন না ? করেন। তাঁরা পরিচিত হন “নারী শিল্পী”, “নারী সাহিত্যিক” বা “মহিলা সাহিত্যিক” হিসাবে। তাহলে শিল্পী বা সাহিত্যিক এই শব্দগুলির ওপর একাধিপত্য কাদের? যার আগে জুড়ে দিতে হয় একটি লিঙ্গবাচক শব্দ।

আপাতত আমি যে বিষয়ে বলতে চাইছি, নারীকে “অনুপ্রেরণা” বা মিউজ হিসাবে উপ্সথাপন করার মধ্যে একটি লিঙ্গ রাজনীতি রয়েছে। বিষয় এবং বিষয়ী - এই সম্পর্কটি অত্যন্ত জটিল। নারীকে যখন সাব্জেক্ট হিসাবে উপ্সথাপন করা হচ্ছে, তখন যিনি বর্ণনা করছেন তিনি একটি ক্ষমতার জায়গায় নিজেকে আসীন রেখেছেন। এবং ক্ষমতা কাঠামোর যাবতীয় বিন্যাসের ভিতর থেকে তিনি নির্মাণ করছেন যে শিল্প সেখানে নারী একপ্রকার লিঙ্গ রাজনীতির শিকার হচ্ছেন। সূক্ষ্ম ক্ষমতার জালিক বিন্যাস সেখানে বিষয় এবং বিষয়ী একটি ক্ষমতার সম্পর্ক। শিল্পে বা সাহিত্যে নারীর শরীর, মন, যৌণতা,  মনন সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত “ নারীত্ব” এর জারকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশন করার যে প্রবণতা তার মধ্যস্থ লিঙ্গ রাজনীতি আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে অনেক সময়ই। অন্তত আমাদের আস্বাদনের যে অভ্যাস নির্মিত হয়েছে তার আদলের  মধ্যেও রয়েছে প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ বৈষম্যের এবং তৎসংলগ্ন রাজনীতির ছাপ। পুরুষ শিল্পীর বা সাহিত্যিকের নির্মিত  শিল্পের মধ্যে রয়েছে এই রাজনীতি যা আমরা সাধারণত প্রশংসা ( তোল্লাই) দিয়ে থাকি। বা বলা ভাল এই ভাবে আস্বাদনে আমরা অভ্যস্ত, আমাদের সাংস্কৃতিক ক্ষমতা কাঠামো আমাদের এই ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

চিত্রে, চলচিত্রে, সাহিত্যে তথাকথিত শিল্পের যাবতীয় মাধ্যমে নারীকে অনুপ্রেরণা হিসাবে ব্যবহার এবং তার উপ্সথাপন কিছু প্রশ্ন তৈরি করে। পরবর্তীতে বিশদে আলচনার পরিসর খোলা রইল। 

গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।



‘না’। পূর্ণচ্ছেদ ।

মধুপর্ণা কর্মকার।

 

(অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, নবম ওয়েব সংস্করণ, ৩০ শে শ্রাবণ ১৪২৮, ১৬ ই আগস্ট ২০২১ এ প্রকাশিত।)  অরন্ধন


মেয়েটি  বলল –‘না’।  এই ‘না’ পুরুষতন্ত্রের কাছে থ্রেট, মেয়েদের ‘না’ মেনে নিতে শুধু অসুবিধা হয় না তাদের, আতংক তৈরি করে। সেই আতংক প্রকাশ পায় আগ্রাসনের আকারে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে মেয়েদের ‘না’ কিভাবে পুরুষতন্ত্র মেনে নিতে পারে না। এই ‘না’ এর সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য সমাজ বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। প্রথমত তাচ্ছিল্য করে উপেক্ষা করে,  তারপরও আয়ত্ত্বে না এলে  অবদমন করে, নিষ্পেষণ করে। পুরুষতান্ত্রিক একাধিপত্যের আকাঙ্খায় “না” এই ছোট শব্দটি ফাটল ধরায়। পুং অহং এর ফাঁপিয়ে তোলা ফানুসের কাছে এই ‘না’ হয়ে ওঠে সংকট। সামাজিক কাঠামো যখন নারীকে ‘অপর’, ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’, ‘আংশিক মানুষ’ হিসাবে দেখতে চায়, নারীকে গড়ে তুলতে চায় পুরুষের স্বেচ্ছ্বাচারের একচ্ছত্র ক্ষেত্র হিসাবে তখন নারীর মুখ নিঃসৃত থেকে একটি শব্দ ‘না’ পিতৃতান্ত্রিক মানসকাঠামোর জন্য হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দ্বিমত হবার, অস্বীকার করার অধিকার নারীকে দিতে নারাজ সমাজ। নির্দেশিত নিয়মপালন করে যাওয়া এবং প্রশ্ন না করা তাদের কাছে প্রত্যাশিত। সেখানে যখন প্রতিস্পর্ধী ‘না’ উচ্চারিত হয়, তার প্রতিধ্বনি ঘুরপাক খেতে থাকে পুং অহং এর ক্ষমতাদর্পী অলিন্দে। এই না এর সম্মুখীণ হলে পুরুষতন্ত্রের দাঁত-নখ ক্রমে নগ্ন হয়ে পড়ে। নারীর ‘না’ কে তারা পাল্টা অস্বীকার করে এবং কৌশলে হোক বা ত্রাস সৃষ্টি করে হোক তারা ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ বা সম্মতিতে রূপান্তরিত করতে চায়।

 নারীর প্রতিরোধ স্পৃহাকে কোনো ক্রমে বিদ্ধস্থ করতে পারলে পুং অহং স্বস্তি এবং নিরাপদ বোধ করে। শুধুই প্রতিরোধ নয়, নারীর ইচ্ছা, পছন্দ, নিজস্ব পরিসরের বেড়া, নিজের সীমানা নিশ্চিত করার জন্য ‘না’ ভীষণ জরুরি। এখানেই পুরুষতন্ত্রের সমস্যা শুরু হয়। এই সবগুলির বেড়া বিনষ্ট করে দিতে পারলে নারীকে গ্রাস করতে সুবিধা হবে বলে সে ধারণা করে। বাহ্যিকভাবে অবদমনের মধ্যে রেখেও সে স্বস্তি বোধ করে না। তার মন, মনন, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে তাকে উপনিবেশ বানিয়ে নিজের আয়ত্ত্বে রাখতে চায়। সেই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে, একাধিপত্যের আয়োজন নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে নারীর ‘না’ মূর্তমান হুমকি। পিতৃতন্ত্রের অসুস্থ মানস প্রবণতাকে মুহুর্তে তছনছ করার ক্ষমতা রয়েছি এই নেতিবাচক শব্দটির। একই সঙ্গে তা ডেকে আনে হিংসা, আক্রমণ। পুরুষতন্ত্র এই নারীকে শায়েস্তা করে নিজের অহং তৃপ্ত করতে চায়, নিজের হীনমণ্যতা যার প্রতিফলন হয় উচ্চস্মণ্যতায় -তাতেও কবোষ্ণ তা দিয়ে লিঙ্গ বৈষম্যপূর্ণ সমাজে জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতার ধার ঝালিয়ে নিতে চায়।  

 দৈনন্দিন ইচ্ছা, পছন্দ থেকে শুরু করে সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা, যৌণতা, সিদ্ধান্তগ্রহণ, পারিবারিক অর্থনীতি, সম্পত্তি বাটোয়ারা সর্বত্র নারীর মতামত অবহেলিত হয়। আরোপিত মত মেনে না নিলেই বাঁধে দ্বন্দ্ব। এই মেনে না নেওয়ার মধ্যে একটি অসীম শক্তির সম্ভবনা রয়েছে। ‘না’ এর মধ্যে রয়েছে লিঙ্গ বৈষম্যপূর্ণ সমাজে নারী পুরুষের পারস্পরিক সমীকরণের খোলনলচে বদলে দেবার ক্ষমতা, এর মধ্যেই নিহিত আছে সমাজ রূপান্তরের বীজ। লিঙ্গ সাম্যের জন্য কনসেন্ট বা সম্মতির পাঠ নেওয়া জরুরি। নারীর ‘না’ কে, অসম্মতিকে মর্যাদা করতে শেখা জরুরি। ব্যক্তিগত পরিসরে তার অসম্মতি মানে অনুরোধ বা আদেশের পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা সম্মতিতে পরিণত হবে – এই বিষাক্ত সংস্কৃতিকে সর্বাগ্রে বর্জন করা দরকার। সামাজিক চাপ তৈরি করে, ভয় দেখিয়ে, মানসিকভাবে হেনস্থা করে, নারীর অসম্মতিকে অগ্রাহ্য করে পুরুষতন্ত্র তার ক্ষমতা প্রদর্শন করে  থাকে। নারীর ‘না’ বলাকে তৎক্ষনাৎ স্বীকার করা এবং অসম্মতি – সম্মতির স্বচ্ছ সিমানা নির্ধারণ  করা জরুরি। ব্যক্তিগত পরিসরে নারীর ‘না’ মানে অসম্মতি। তার ভিন্ন কোনো কাব্যিক বা অতিরঞ্জিত অর্থ খোঁজার প্রয়োজন নেই। তাই মেয়েটি যখন বলল – ‘না’। তখন তার একমাত্র এবং কেবলমাত্র অর্থ হল – না। পূর্ণচ্ছেদ। 

 

গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

লিঙ্গসাম্যের পদ্য ১ " না ।"                                                             লিঙ্গসাম্যের পদ্য ১

না।

মধুপর্ণা কর্মকার।

 

তোমাকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে যারা

তাদের দিকে তাকিয়ে বলো  -  না ।

তোমার সীমা ভেঙ্গে তোমাকে তছনছ করার উদ্দেশ্য নিয়ে যারা

শকুনের মত ঘুরছে তোমার চারদিকে। তাদের দিকে সোজা তাকিয়ে বলো – না।

তোমার আত্মাকে বিষ ঢেলে নীল করতে চাইছে যারা । চোয়াল শক্ত করে বলো – না।

তোমাকে ঘুড়ি বানাতে চেয়ে লাটাই হাতে দাঁড়িয়ে আছে যারা । তাদের দিকে বুলেটের মত ছুঁড়ে দাও – না।

যে নিষাদ পেতেছে ফাঁদ, কবুতর ভেবে তোমার নরম মাংস খাবে বলে। তার চোখের দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়ে বলো – না।

হিতৈষীর বেশে যে তোমার আত্মবিশ্বাস ব্লটিং পেপারের মত শুষে নিতে এসে দাঁড়িয়েছে তোমার সামনে, তাকে তর্জনী তুলে চিহ্নিত করে বলো - না।

তোমাকে উপনিবেশ করে প্রভুত্ব কায়েম করতে চায় যে বা যারা তাদের আপ্যায়ন করো ‘না’ দিয়ে।

চৌহদ্দি থেকে পত্রপাঠ বিদায় করে দাও না এর বাতাস দিয়ে। তারপর কড়া লিকারের চা বানিয়ে নিজে খাও।  

তোমার জীবনকে নিজের করে তোলার জন্য তোমাকে নিজের চারপাশে কাটতে হবে না এর পরিখা।

নারী, যাবতীয় ক্ষয়কামী ও ক্ষমতালোভী পুরুষতান্ত্রিক উপদ্রবকে ‘না’ বলে,  তুমি ডুবে যাও তোমার নিজস্ব ধ্যানে।

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...