ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস।
ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস, অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ ।। দশম
ওয়েব সংস্করণ ।। ১৩ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ৩০ আগষ্ট ২০২১
মধুপর্ণা
ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি একটি সূক্ষ্ম অথচ প্রভাবশালী ক্ষমতার বিন্যাস রচনা করে। প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ বৈষম্য জারিত হয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন কাজে কথায়, উচ্চারণে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। তার প্রতিনিয়ত চর্চা যে বাতাবরণ তৈরি করে তার মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক, উচ্চনীচের সমীকরণ রচিত হতে থাকে। তার ভিতরেই আমাদের যাবতীয় সম্পর্ক নির্মিত হয় বা বলা ভাল, সম্পর্ক এই ক্ষমতার সূক্ষ্ম রাজনীতির বুনোটের বাইরে কিছু নয়। যা কিছু আমাদের কাছে সাধারনভাবে অপাপবিদ্ধ, সরল, সহজ হিসাবে প্রতিভাত হয়, তার চলন এবং রেখা সমূহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে মানুষের ভিতরে পারস্পরিক এবং অন্তবর্তী রাজনীতি কতটা লিঙ্গ, উচ্চনীচের ক্ষমতা বিন্যাসের প্রতিফলন। পরিবারবদ্ধ, সমাজবদ্ধ, বিবাহে আবদ্ধ, সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষ এই সমীকরণের মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত চর্চা করে চলেছে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সমীকরণ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোজাত বৈষম্যকে নিজের মধ্যে বহন করে চলে। প্রতিটি ঘটনা, কাজ, কথা, টানাপোড়েন একটি বৈষম্যপূর্ণ নারী বিদ্বেষী সমাজের প্রতিবিম্ব হাজির করে প্রতিনিয়ত। এই যে আমরা কিছু কথা প্রায়শই শুনে থাকি, "ঘরের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না", অথবা "সম্পর্কের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না” এখন কথা হল আমরা রাজনীতি বলতে ঠিক কি বুঝি। আমাদের কথা প্রতিটি বাক্য, শব্দ, শব্দের ব্যবহার সব কিছুর মধ্যেই একটি তরল ক্ষমতার প্রবাহ চলমান থাকে। এর ভিতরে নারীকে হেনস্থা করার জন্য আয়োজন সর্বত্র বিছিয়ে রয়েছে। এই কাঠামোগত বিষক্রিয়া যা জারিত করে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের জীবন আর মানুষের সম্পর্কের বয়ান, দু কলম লিখে তা বদলানো যায় না। কি করে বদলানো যায় ? কোনো ভাবেই কি যায় ?
যে প্রোগ্রামিং বা পদ্ধতিক্রম জারি রয়েছে তা মানুষকে সেভাবেই তৈরি করবে। জন্মদাগের মত রয়ে যাবে কাঠামোর অসুখ মানুষের মনে, ইচ্ছায়, অভ্যাসে, চাহিদায়। এখন আনলার্ন বা অর্জিত জ্ঞান বাতিল করে নিজেকে মুক্ত চিন্তক হিসাবে গড়ে তুলতে এবং নতুন অভ্যাস ও ইচ্ছাপরম্পরায় নিজেকে অন্বিত করতে যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার আয়োজন আমাদের কাছে নেই এবং তার যে কোনো সম্ভবনা সমূলে বিনাশ করে আমাদেরই কাঠামো। এই আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকের মত কেউ কেউ চিৎকার করে। ঐ যেমন মেহের আলি চিৎকার করত “ তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়!" তেমনি এই ক্ষমতার প্রবাহ থেকে এই কাঠামো উপজাত জটিল বিন্যাস থেকে আমাদের আশু মুক্তি নেই।
নারীকে আরোপিত জীবনের পাঠ ভুলে নিজের জীবন বেছে নিতে হবে, নির্মাণ করতে হবে স্বতন্ত্র জীবনচর্যা। নারীবাদ মানে স্বতন্ত্র জীবনবোধ। আরোপিত অবদমনের চক্রান্ত চিহ্নিত করা এবং সেই আগ্রাসনের আয়োজন অস্বীকার করার স্পর্ধা। এত সূক্ষ্ম ভাবে এই বহুস্তরিক লিঙ্গবৈষম্যের জাল বিছিয়ে রাখা আছে যে তাকে বিশ্লেষণ করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমরা নিজেদের অভ্যাস বদলাতে পারি মাত্র কাঠামো বদলাতে পারি না। এই এত চারিদিকে কথাবার্তা, সভা সমিতি, সাম্য সাম্য খেলা। ব্যক্তিমানুষের অভ্যাস আর তজ্জনিত ইচ্ছার বদল না হলে কিছুই বদলায় না। ওয়ান ফাইন মর্নিং লিঙ্গসাম্য দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকবে না জেনেও বিশ্লেষণ করে যেতে হয়, তার কারণ একটা ঘন্টা শতাব্দীর পর শতাব্দী পরম্পরাক্রমে বাজিয়ে যেতেই হয় কেউ না কেউ তার শব্দ কান পেতে একান্তে কখনো শুনবে বলে। তারপর থেকে আরো একটা প্রতিধ্বনি শুরু হয়ে আরো কিছুদূর যাবে বলে। অভ্যাস আর ইচ্ছা বদল করে লিঙ্গসাম্যের চর্চা কখনো শুরু হবে বলে।
No comments:
Post a Comment