Sunday, March 15, 2026

 

                                               এইসব দিনগুলো

                                                  মধুপর্ণা

এইসব বইপড়া দিন গুলি অপূর্ব। সামঞ্জস্যপূর্ণ অতিরেকবিহীন। বিস্মৃতি থেকে বহুদূরে প্রতিস্থাপন করে আনন্দ ভিতরে বাহিরে। অবাঞ্ছিত কোলাহল ধীরে ধীরে চলে যায় ত্রিসীমানা থেকে। সেইসব দিন ফিরে আসে। মা নতুন শাড়ী পড়লে যেমন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম শৈশবে তেমনি আনন্দে ভরে যায় অন্তরাত্মা। বিস্ময় অদ্যাবধি একমাত্র মুলধন। একটি করে দিন চলে যায় এক একটি পাতার মত, একটি দিনের ডালে জন্মায় আরো একটি দিন। নিরবিচ্ছিন্ন সময়ের স্রোত। বাহ্যিক আওয়াজ  আর উপাদেয় লাগে না। যারা যে খেলা খেলতে চায়, খেলতে দাও। নিজেদের তৈরি করা ব্যুহে নিজেরাই ডুবে যায় মানুষ – এমনই নিয়তি। ভারতবর্ষ সাধনার দেশ আর প্রকৃতি জাগ্রত সত্তা। এই কথা যে জেনেছে তার কাছে বৃথা হয়ে গেছে অনেককিছুই। ননীবালার জীবনের প্রতি অবশেসন ক্রমে বাড়তে থাকে। ভণিতাহীন একজন যোগারূঢা পথবৈরাগী, অভাববোধহীন পূর্ণ সত্তা। পথ খুঁজছে সবাই আর সে পথে এসে দাঁড়িয়েছে তাই পথ আপন গতি পেয়েছে।

পরিসর এক অদ্ভুত মাত্রা। বাহ্যিক অথবা নিজস্ব একান্ত ব্যক্তিগত পরিসর এইসব চর্চার পর, ভার্জিনিয়া উলফ থেকে পিঞ্জড়া তোড়, ইউটোপিয়া কিম্বা ডিসটোপিয়া নানা কথকথার পর …বেগম রোকেয়া কোনো এক কল্পলোকের কথা চিন্তা করেছিলেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’এ। তারপর যখন নিগূঢ় অন্তর্লোক, সাধনার তটভূমির কথা শুনি হতবাক লাগে। আরশিনগর, বারামখানা কোনো ফিজিক্যাল স্পেস নয়। অথচ বহু মানুষের সেখানে যাতয়াত। মনস্তত্ত্বের এক একটা দরজা অথবা বেড়া অতিক্রম করে তারা পৌঁছে গেছে গন্তব্যে। তূরীয় আনন্দলোক। রিপুর সীমা আর পার্থিব সীমা পেরিয়ে অন্য এক স্তর, যা সাধনালব্ধ। টিকিট কেটে যাওয়া যায় না। নেই কোনো যানবাহন। সেই ৯/৩৪ স্টেশন ও নয়। অথচ বারবার মানুষেরা অন্য এক পরিসরে যেতে চায়। কল্পনা করে। আর সাধকেরা  চলে যায় ভিতরে রাস্তা কেটে। নেহাত কল্পনায় তারা অপেক্ষা করে না, আকাঙ্ক্ষা করে না। চলে যায়। রাস্তা খুঁজে বের করে নেয়। তারপর এইসব থেকে সুতো কেটে যায় চিরকালের মত। কিছুই আর স্পর্শ করে না তাদের। সংযোগ আর যোগের দুনিয়ায় যোগাযোগের পদ্ধতি ভিন্ন। সেখানে জলের ধর্ম আর বাতাসের ধর্ম আর আকাশের ধর্ম ক্রিয়াশীল। হাতফেরতা কোনো কিছুই আসে যায় না।



Thursday, March 12, 2026

 

 

                                      
                                             
হলুদ আলোর বিকেলে

                                                     মধুপর্ণা 

তারপর শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি শেষে অদ্ভুত হলুদ আলো এসে ছড়িয়ে পড়ে। অলৌকিক এই সব বিকেল বহুযুগের ওপার থেকে উড়ে এসে এই মার্চ মাসের দ্বিতীয় হপ্তায় হঠাৎ ভন্ডুল করে দেয় সব। এই গোধুলি আলোয় পার্থিব জগত অপার্থিব মনে হয়। পরিচিত গাছ, পরিচিত কোপাই নদী, পরিচিত ঝোপঝাড়, পরিচিত রাস্তা, পরিচিত সব কিছুর উপর থেকে বাস্তবের রূঢ়তা সরিয়ে লেপে দেয় মমতার প্রলেপ। সাধারণ চারপাশ মায়াময়, নিবিঢ়, অনন্য। অজান্তেই এই হলুদ আলোর প্রতি গেয়ে উঠি – এলে কি দুকূল হতে কূল মেলাতে এই অকূলে! ভাল লাগে, এই কথাটার থেকে বড় সত্য আর কিছুই নয়। বৃহৎ আকাশের নীচে ধূসর মাটির পৃথিবীতে বেঁচে থাকার ঘটনাটি ঘটতে দেখে আনন্দ হয়। একমাত্র এই সত্যকে সত্য বলে মনে হয়। জাগতিক হযবরল , বিড়াল অথবা রুমালের বাইরে এই আলো আশ্চর্য সুন্দর। নতুন গান শুনলে ভাল লাগে, নতুন বই পড়লে ভাল লাগে  -সুধীর চক্রবর্তীর বই পড়ে মাতোয়ারা লেগেছিল বহুদিন পর। সূক্ষ্ম তীব্র ভাবে যারা ঘটনাকে, মানুষকে, চারপাশকে দেখে এবং অনুভূতিকে ভাষায় অনুবাদ করে  -সেইসব বই পড়তে গিয়ে অদ্ভুত আনন্দ হয়। এই সব হলুদ আলোর বিকেলে মস্তিষ্ককে চালনা করা বন্ধ করে দি। যে দিকে ইচ্ছে হয় যেতে দিই।ঘটনা, কথা, ছবি পর পর আসে। বাধা দিই না। বৌদ্ধ একটা গুম্ফায় মুর‍্যালে একটি অদ্ভুতদর্শন প্রাণী দেখে সন্ন্যাসীকে জিগ্যেস করেছিলাম, এর অর্থ কি? উনি যা বলেছিলেন তার মর্মবস্তু এই যে, আমাদের মন বানরের মত অস্থির। এ ডাল সে ডাল করে লাফিয়ে বেড়ায়। তাকে ধ্যান দিয়ে সিধা করতে হয়। বসাতে হয় একক মগ্নতায়। চেতনপ্রবাহ তাহলে এই বানরের বিচরণ ক্ষেত্র! মগ্নচৈতন্য লাগাম রেখে চলে না, তার গতি সাবলীল। এই সব হলুদ আলোর বিকেলে আস্কারা দিতে হয় চেতনার প্রবাহকে। পর পর মনে পড়ে বেনারসে শরবতের দোকান, জানকী ঘাটে এক দেয়ালে কৃষ্ণের অপটু ম্যুরাল, তারপর মনে পড়ে কার্শিয়াং এর এক হোমস্টের মালিক কিভাবে বলেছিল, আমাদের এখানে কোনো ঘরে ঘোড়া ভিউ নেই, সব ঘর থেকে চারপাশ দেখা যায়। অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিলাম, ঘোড়া ভিউ মানে কি ? তিনি বলেছিলেন ঘোড়া কেবল সামনে দেখে, চারপাশ দেখে না, তাই আমরা তাই পর্যটকদের বলি এমন ঘর নিন যাতে সবদিক দেখা যায়, ঘোড়ার মত নয় মানুষের মত দেখুন! তারপর মনে পড়ে উড়িষ্যায় পিপিলি গ্রাম যেখানে জগন্নাথদেবের চাঁদোয়া তৈরি হয়, গরমে হতোদ্যম হয়ে বসে আছি, এক দোকানী বললেন, আপনি কি আসাম থেকে? না, আপনাকে দেখে মনে হয় অসমীয়া। বললাম, না বাঙালী। দার্জিলিং এ মধুরিমাদিও বলেছিল, তুই এখানে আর কিছুদিন থাকলে তোকে পাহাড়ী মনে হবে। যাক, মনে পড়ে গিড্ডে পাহাড়ে সেই মোমো দোকানের আন্টির কথা, সাংঘাতিক ভাল মোমো বানান। কুয়াশার ভিতর ঠান্ডার ভিতর সকালে কেঁপে কেঁপে মোমো খেতে যেতাম। নেতাজী ঐ পাহাড়ে ছিলেন কিছুদিন, একটা মিউজিয়াম রয়েছে। সেখানে তাঁর বান্ধবী এমিলির ব্যবহৃত পিয়ানো রয়েছে আরও ছবি, আসবাব ইত্যাদি। পিয়ানোর ছবি দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, সব বিখ্যাত লোকেরা পিয়ানো কেন বাজায় ! এই সব ‘লুজ টক’ বন্ধুদের মধ্যে খুবই স্বাভাবিক।  সেই সূত্রে মনে পড়ে, ‘পিয়ানো’ নামে একটা সিনেমা রয়েছে, এক বোবা মেয়ের গল্প। পিয়ানো টীচারের সঙ্গে প্রণয় হয়ে পড়ায় মেয়েটির স্বামী তার আঙুল কেটে দিয়েছিল পাথরের ওপর থেঁতলে। তারপর তার পিয়ানো সমুদ্রে ফেলে দিতে গিয়েছিল। মেয়েটি একটা দড়ি দিয়ে পিয়ানোর সঙ্গে নিজের পা বেঁধে নিয়েছিল, ফলে পিয়ানো ফেলে  দেবার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিও সমুদ্রে তলিয়ে যায়। সেই অবর্ণনীয় দৃশ্য মেয়েটি সমেত পিয়ানো সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই বিকেলে হলুদ আলোর মত আলো ছিল ঐ দৃশ্যে। বোবা মেয়েটি কাল গাঊন পরে ডুবে যাচ্ছে তার একমাত্র আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, অবলম্বন পিয়ানোর সঙ্গে, তার  নির্বাক ভাষা একমাত্র বুঝতে পারত তার শিক্ষক, তার পাষন্ড স্বামী তাই পিয়ানো সমেত স্ত্রীকে নির্মম শাস্তি দেয়। তারপর মনে পড়ে কিভাবে একটি ইংলিশ মিডিয়ামের বাচ্চা ছাত্র কবিগুরু অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতা শুনিয়েছিল। তাকে শুধরে দিতে গিয়ে থমকে গেছিলাম, কে কবিগুরু আর কে নয় এই বাচ্চাটিকে বলে লাভ কি ! তার মনে হয়েছে অন্নদাশঙ্কর কবিগুরু, ঠিক আছে, তার ওটা মনে হওয়া। তারপর মনে পড়ে ডাবলিনে লিফি নদীর পাড়ে একটা বিকেল, সীগালের ডাক, হু হু করে উঠছিল সেই বিকেল। মনে পড়ে আমাদের গ্রামে ভদ্রকালীর থান, বৃদ্ধ বটের কথা। এইভাবে অসংলগ্ন কথার প্রবাহ চলতে থাকে, ঠাহর হয় হলুদ আলো পেরিয়ে কখন সন্ধে হয়ে গেছে। উঠে গিয়ে  চা বসাই। পাহাড়ে একটি গেরুয়া বসনের সন্ন্যাসীকে লটারীর টিকিট কাটতে দেখেছিলাম, পার্থিব সব মোহ মায়া কাটিয়ে তিনি কেন এই কাজ করলেন তার ব্যাখ্যা সচেতন ভাবে এড়িয়ে গেছি। হনুমান টকের সেই পাইন গাছ যাকে বলে এসেছিলাম যা মানুষকে বলিনি কোনদিন। মিরিকের সেই ব্রীজ, ঘন বৃষ্টির ভিতর ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি বৃষ্টির ফোঁটা শুভেন্দু লেকের জলে কিভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে দেখার নেশা ছাড়তে পারিনি বলে। সেই ছাতার দোকানীর কথা মনে পড়ে, কেমন ছাতা চান? প্রশ্নের উত্তরে বলে বসি, যে ছাতা হারায় না তেমন ছাতা দাও, যদিও সেটা হারিয়ে গেছে পেলিং এ। থেকে থুকপার দোকানটা, পাহাড়ী রেল স্টেশন বোঝাতে এক বন্ধু বলেছিল, ছিমছাম! তারপর সেই মেয়েটি দিল্লী থেকে চাকরি ছেড়ে পাহাড়ে হীল করতে এসেছে, প্রচুর কথা হয়েছিল তার সঙ্গে, কিভাবে কর্পোরেট জীবনে সে হাঁপিয়ে উঠেছে এবার সে ডান্সার হতে চায়। কার্শিয়াং এ চা বাগানের সেই গাছটার কথা মনে পড়ে যাকে বলে এসেছিলাম, আবার আসিব ফিরে, এসে বলব, সুধা তোমাকে ভোলেনি!  

 

 

 

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...