Wednesday, November 4, 2026

 

                                        উৎসবের মরসুম

                                            মধুপর্ণা

সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত, উৎসবের মরসুম, পথচলতি মানুষের জামাকাপড়ে রঙীন আভা, চোখেমুখে আনন্দের ছাপ, পরিচিত পথঘাট ঝলমল করছে, সোসিও এস্থেটিক সেন্সিবিলিটির জোগান চারিদিকে, কন্ঠস্বর থেকে চাপা খুশি ঝড়ে পড়ছে যেখানেই পাতো কান, অটোমেটিক চলাচল, তারমধ্যে একদুজন আত্মস্থ, নিকট বাস্তব থেকে দূরত্ব কিছুটা, লেনদেন সীমিত, চোখের দৃষ্টি আলাদা, আত্মহারা নয়, ধাতস্থ, সবাই সবাইকে দেখছে,কিন্তু একই জায়গা সবার কাছে আলাদা আলাদা দৃশ্য হিসাবে প্রতিভাত। তাহলে লেন্সটা বাইরে নেই, ভিতরে। যোগিনীর চিরাচরিত সাদা আর মলিন শাড়ী, পুরাতন ঝোলা কাঁধে এসে বসে, বলি, উৎসবের সময় অন্তত কিছু আলাদা, কিছু নতুন, কিছু ভিন্ন, কিছু অভিনব… তার সাফ সটান উত্তর- কনজিঊমার না, যতটুকু না হলে নয়, আর নতুনের কথা যদি বলিস সে দৃষ্টি নতুন, আনন্দ নতুন, ইচ্ছা নতুন, উপলব্ধী নতুন, পথ নতুন। উৎসবের সময় আর নতুন চাস! ঘুরিয়া বেড়াইব রে হৈয়া মাতোয়ারা… মাধুকরি করিব আনন্দ সমাচার… গাহিতে থাকে, বলি, রাখো তোমার আউলিয়াপনা। নতুন খাদ্য কিছু চাও কি? বলিয়া দুইটা নাড়ু বাহির করিয়া দিই। নতুন পোশাক পড়িনি বলে গঞ্জনা দিস! সেদিন পাহাড়ের তলায় একটা ঝর্ণায় স্নান করিয়া মনে হৈল নতুন হৈয়া গিয়াছি, ক্লেদ মালিন্য কিছু নাই আর অবশিষ্ট। তাহা কি নতুন হৈল না! নবীন বালিকার মত ঠাহর হৈল ঝর্নায় পাহাড়ে গাছে, পাথরে মাটিতে, বাতাসে একাকার সেইখানে বসিয়া। জল পান করিয়া। আর কি নতুন চাস এই উৎসবের মরসুমে! ধ্যান করিয়া, স্নান করিয়া, জল পান করিলে, আর কিছুদিন সৃষ্টিশীল কাজে নিমগ্ন থাকিলে, সচেতনে থাকিলেই নতুন তুমি, তাহার উপর কি চাপাইলে নতুন কি পুরাতন, মলিন কি উজ্জ্বল তাহাতে কি…এইবার যোগিনীকে পাকড়াও করি, নতুন জায়গা ঘুরলি কি নতুন জামার মত রঙের আভা লাগে? নতুন জলে চান করিয়া তুমি একপ্রকার নতুন হৈয়া আসিলে। নতুন কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির সহিত কথাবার্তা বলিলে কি নতুন নাড়ু খাওয়ার মত মনে হয়? নতুন একটা দৃষ্টিসংস্কার জানিতে পারিলে কি নতুন গাড়ি চড়িয়া ঘুরিবার মত মজা হয়? যোগিনী হাসিতে হাসিতে লুটাইয়া পড়ে, বলে, বলে এই তো ধরিয়া ফেলিয়াছ। একটা সুত্র তোকে আমি ধরিয়ে দেব তুই তাহাতে রেল গাড়ির মত একটা করিয়া কামরা বসাইবি, একটার পর একটা। বলি, অর্থ এই যে, তুমি বলিবে, ইঞ্জিনধর্মী একটি কথা, আর আমি তাহাতে কামরামূলক কথা সংযোজন করিব। যোগিনী বলে, হ্যাঁ, এইটিই আসলে সখী সংবাদ। সখীত্ব ইহাই। তাহারপর সেই কামরা গুলি সমেত ইঞ্জিনটি চালাইয়া দিতে পারিলেই ব্যাস। আমরা ইন্সট্রুমেন্ট, যাহা প্রোগ্রামিং করিবে তাহাই চলিতে থাকিবে, তোমার আত্মজ্ঞান থাকিলে তুমি ধাতস্থ আর না থাকিলে অটোপাইলট। ঐ যে ভীড়ের ভিতর এক দুজন দেখিতে পাস ধাতস্থ, তাহাদের আত্মজ্ঞান আছে। কম্পাসে দিক ঠিক আছে। অনেক গুলি স্তর, সব ধামা চাপা দিয়া উপরে নতুন জামা পড়িয়া নতুন হওয়া মুসকিল। বরং যন্তর খানা ভিতর হৈতে মেরামত করিয়া উপরে মলিন জামা খানিও উজ্জ্বল বোধ হয়।

 

 

                                    করালবদনম

                                       মধুপর্ণা

 

অতঃপর করাল বদনম মুক্তকেশী চতুর্ভুজার আবির্ভাব কাল উপস্থিত হয়। ঘোর অন্ধকারে আলোকময়ী নাচিতে থাকে। তারপর বহুদিনের অর্জিত শান্তি ফিরিয়া আসে। শীতের বাতাস আর সকালের শান্ত অবয়ব। একটা রাস্তা বহুদুর দেখা যায়। শুধু ছোট ছোট পদক্ষেপ গুলির আয়োজন করতে হয় একে একে। কে প্রথম কালীকে কল্পনা করিয়াছিল জানা নাই। ঔদ্ধত্ব, অন্যায়, আস্ফালন বাড়িয়া গেলে তাহা দমন করিতে নারীদের জাগিতে হয়। প্রতিটা নারীর ভিতর একটি করিয়া করালবদনম লুক্কায়িত। অসুস্থতা চারিপাশে বাড়িয়া উঠিলে তাহাকে জাগাইতে হয়। হিংস্রতা আর ক্ষমতার দর্প সীমা ছাড়াইলে নারী সেই রূপ ধারণ করিতে পিছপা হয় না। সেদিন এক নারীকে হাঁটিতে দেখিয়া তাহার দৃঢ়তা, মদগর্ব দেখিয়া সেদিন হতবাক হৈয়া গিয়াছি। কোন স্তরে থাকিলে এই প্রকারে হাঁটিতে পারে মানুষ জানা নাই। ধুলার রাস্তার পাড়ে একটি ফকির গাহিতেছিল, “আমার জীবন বৃক্ষের গোড়া কাটায়ো, কখন পড়বে ঢলিয়া…বেলা গেল রে, ভবের মায়ায় রইলি রে মন ভুলিয়া…”

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...