‘খুব বাড় বেড়েছে!' এই বেড়ে
যাওয়া "বাড়" নারী-স্বাধীনতার লক্ষ্যে জরুরি সোপান।
দ্বিতীয় বর্ষ ।। একাদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৭ ভাদ্র ১৪২৮ ।।
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
মধুপর্ণা
"খুব বাড় বেড়েছে দেখছি!”
এই বাক্যটা জীবনে সহস্রবার শোনেনি এমন মেয়ে আমাদের সমাজে
খুঁজে পাওয়া মুসকিল। এমনকি যারা সমাজের, পিতৃতন্ত্রের বেঁধে
দেওয়া নিয়মের পান থেকে চুন না খসিয়ে তথাকথিত 'সুশীলা'
হিসাবে বিরাজ করেন তাঁরাও এই বাক্যবন্ধ শোনেন কখনও না কখনও। কারণ
নিয়মের নিগড় বড় কড়া। এবং বিপজ্জনক কথা হল পিতৃতন্ত্রের সুবিধামত তা বদলায়।
তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে সারাজীবন শিক্ষানবিশি চালিয়ে যেতে হয়। তারপরও
অসম্পূর্ণ শিক্ষার অপমান নিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়। আর বাকি যারা 'বেয়াদপ', 'আংশিক বেয়াদপ" 'সহবতহীন', 'যাচ্ছেতাই' নারীরা
রয়েছেন, প্রতিনিয়ত অথবা কখনও কখনও সীমা লঙ্ঘন করে পরিবার,
সমাজ এবং ঘনিষ্ঠজনেদের বিরাগভাজন হয়ে থাকেন তাদের বাড় বেড়ে
যাওয়া কেন এত গাত্রদাহের কারণ পিতৃতন্ত্রের? কেন এই বেড়ে
যাওয়া বাড় হজম করতে পারা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়? কেন বাড়
বেড়ে না যাওয়া "ভালো মেয়ে" আর গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠার শীলমোহর?
“বাড়" বলতে বোঝায় বৃদ্ধি, অগ্রগতি,
বিস্তার। কিন্তু এই শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্র এবং ভঙ্গী শব্দটির ওপর
একটি স্ল্যাং বা অশিষ্ট শব্দের অর্থ আরোপ করেছে, যা সীমা
ছাড়ানোর জন্য নিন্দাসূচক ভাবে নঞর্থক একটি প্রতীতি তৈরি করে। খুব বাড়
বেড়েছে", "এত বাড় ভাল না' এই
বাক্যগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত।
কেউ জোরে হাসলে বা কথা বললে বাড় বেড়ে যায়, কারো লিপস্টিক গাঢ় হলে বাড় বেড়ে যায়, কেউ অবদমন
পছন্দ না হওয়ায় চিৎকার করলে বাড় বেড়ে যায়, কারো
জামাকাপড় সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নর্ম ছাড়িয়ে গেলে বাড় বেড়ে যায়, কারো ইচ্ছা-আকাংখা একান্তই নিজের হলে তাতেও বাড় বেড়ে যায়, কারো বক্তব্য ধারালো হলে বাড় বেড়ে যায়, কারো
নিজেকে উদযাপন করার ইচ্ছা হলে বাড় বেড়ে যায়, কেউ নিজের
ব্যক্তিগত বন্ধু নিজে খুঁজে নিলে বাড় বেড়ে যায়, কারো
কয়েকজন পুরুষবন্ধু থাকলে বাড় বেড়ে যায়, আমাদের সমাজে
মেয়েদের নিজের মত কিছু ইচ্ছা হওয়াটাই মূলত বাড় বেড়ে যাওয়া।
এই বাড় বা বৃদ্ধির সঙ্গে সীমার ধারণা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
আমাদের সমাজ মেয়েদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে। যে সীমা গুলো লঙ্ঘন
করে গেলেই সমাজের রোষের মুখে, হেনস্থার মুখে পড়তে হবে মেয়েদের।
আর আমাদের সমাজে মেয়েদের হেনস্থার জন্য আয়োজিত আছে ভাষার বিস্তীর্ণ পরিসর।
আপাতভাবে কিছু যৌণগন্ধী গালিগালাজকেই আমাদের মনে হয় নারীর বিরুদ্ধে তৈরি করা
বিদ্বেষের একমাত্র বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু নারীবিদ্বেষের বীজ আরো গভীরে প্রথিত আছে।
দৈনন্দিনের ভাষা ব্যবহারের মধ্যে, শব্দের মধ্যে, উচ্চারণের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। সীমার সামান্যতম বিচ্যুতিতে নারীকে শুনতে
হয় যাবতীয় কুৎসিত আক্রমনাত্মক কথা। 'বাড় বেড়ে যাওয়া সেই
সীমা নির্ধারণের সাবধান বাণী। সেই সীমা ছাড়ালে বা ছাড়ানোর চেষ্টা করলে আক্রমণ
নেমে আসবে। বহু ব্যবহারে ক্লিশে একটি উদাহরণ আবারো উল্লেখ করি - সীতাকে গন্ডী কেটে
দিয়ে রামের বিপদের আশঙ্কায় লক্ষণ মায়ামৃগের পিছু ধাওয়া করেছিল। এদিকে সীতা
ছদ্মবেশী রাবণের ছলনায় তাড়িত হয়ে গন্ডী থেকে বেরিয়ে তাকে ভিক্ষা দেয়, তারপরের গল্প আমরা সবাই জানি। যুদ্ধ, লংকাদহন,
সীতা উদ্ধার ইত্যাদি। রাময়ণের কেন্দ্রীয় সংকটের সূত্রপাত সেই
সীতার নিরাপত্তার গন্ডী ছেড়ে বেরিয়ে আসা থেকে। “লোকশিক্ষার্থে" এই ঘটনা
আপামর সাধারণের উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়েছিল কি? যে পুরুষের
তৈরি করা নিরাপত্তার বলয় থেকে নারী বেরিয়ে গেলেই বিপদ। যে বিপদ শুধু তাকে নয়,
সংকটে ফেলবে গোটা সমাজকে। এইরকম ছোট বড় ব্যাসার্ধের গন্ডী দৃশ্যমান
ভাবে বা অদৃশ্যভাবে আমাদের সমাজে মেয়েদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা থেকে
আরেকটা গণ্ডী বদলে যাচ্ছে কিন্তু সেখান থেকে বেরোতে পারছে না কেউ। যারা বেরোতে
চেষ্টা করছে তাদের শুনতে হচ্ছে “খুব বাড় বেড়েছে" অথবা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ। বাড়
বেড়ে যাওয়া আসলে স্পর্ধা বেড়ে যাওয়া। সমাজের নির্ধারিত ছাড়পত্রকে অস্বীকার
করার একটা ক্ষমতা। বাড় বেড়ে যাওয়া নারীরা সমাজে নিন্দিতা। এবং নারী স্বাধীনতার
ইতিহাসে তাঁরা অথবা তাঁদের নামগোত্রহীন সমষ্ঠিই হবে একদিন নন্দিত।
এই সীমা আবার শ্রেণী, জাতি, বর্ণ, ধর্ম, বয়স, লিঙ্গ, এলাকা এবং অবস্থান ভেদে ভিন্ন। একজন শ্রমজীবি
নারী, একজন গৃহবধূ, একজন ছাত্রী,
একজন আবাসিকা, একজন গণিকা, একজন বালিকা, একজন তরুণী সবার আলাদাভাবে সীমার
বন্দোবস্ত আছে। তাদের সীমা ছাড়ানোয়, বাড় বেড়ে যাওয়ার
মাত্রা ভিন্ন। সামাজিক স্তরভেদে সীমা লঙ্ঘনের মাত্রায় হয় তারতম্য। প্রতিটি
সামাজিক স্তরের নিজস্ব তন্তুবিন্যাস অনুযায়ী পিতৃতন্ত্র বহাল রাখার জন্য ভিন্ন
ভিন্ন সীমা নির্ধারণ করে। এই বিভিন্ন স্তরের ভিন্ন অবস্থানের বাড় বেড়ে
যাওয়া" মেয়েগুলো একদিন একযোগে চিৎকার করবে। সেদিন তাদের বাড় শুধু বেড়ে
যাবে না, সব সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাবে পিতৃতন্ত্রের নাগালের
বাইরে। এতটাই দূরে যেখান থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসে না, কেবল
অট্টহাসির প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
No comments:
Post a Comment