পুরুলিয়ার পলাশ পরব
( অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, প্রথম ওয়েব সংস্করণ, ১২ বৈশাখ ১৪২৮, ২৬ এপ্রিল ২০২১ এ প্রকাশিত। ) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক ।
ধর্ম নিয়ে হানাহানি আর ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বিচিত্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কূটচক্র দেখতে দেখতে যখন আমাদের মন আর মনন বিরক্ত হয়ে উঠেছে তখন ঋতুউৎসব গুলিই একমাত্র স্বস্তির আশ্বাস বয়ে আনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে ঋতুউৎসবের যে ধারা প্রচলন করেছিলেন তা আমাদের প্রকৃতি সংলগ্নতার পাঠ দেয়। ধর্মীয় মেরুকরণের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ঋতুউৎসবে যোগ দিতে পারার মত অনাবিল আর কিছু হতে পারে না হয় তাে। পুরুলিয়ার কবি নির্মল হালদার, আমাদের নির্মলদার তত্ত্বাবধানে “অনিকেতের বন্ধুরা" বসন্তে আয়ােজন করে “পলাশ পরব”। পুরুলিয়ার প্রকৃতি, জনজীবন জন্ম দিয়েছে ও নির্মাণ করেছে যে কবিকে, তাঁর গড়ে তােলা সংস্কৃতির ধারাটিও সেই রসদে পুষ্ট। মৌলিকত্ব আর নিজস্বতা এই সাংস্কৃতিক বাতাবরণকে করেছে অনাড়ম্বর মানবিকতার কাছাকাছি, দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা।
পুরুলিয়ার
সঙ্গে যোগাযোগের আসলে শুরু আছে, শেষ
নেই। এই আত্মীয়তার গতি এক রৈখিক। শুরু হয় তারপর নিজস্ব চলনে বাড়তে থাকে,
গভীর হয়। পরিসর বিস্তৃত হয়। রাজধানীর প্রচারসর্বস্বতা আর আত্মহারা
উজ্জ্বল আলো থেকে অনেকদূরে রুখা শুখা মাটির কাছে একান্তে
বসতে পারার মত অবসর তৈরি করে এই পলাশ পরব। আনন্দ আর ফুর্তির মধ্যে পার্থক্য যখন
প্রায় গুলিয়ে যাচ্ছে, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় যখন মানুষের মনকে
আর থিতু হতে দিচ্ছে না, দেউলেপনার অসুখে আক্রান্ত যখন আমরা
সবাই, অন্তঃসারশূন্যতার উদযাপনে মসগুল থাকাই যখন ধীরে ধীরে
হয়ে উঠছে বেঁচে থাকার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তখন পলাশ পরবের ডাক
আন্তরিকতার পাঠ দেয়, নির্মলদার সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা চারা
গাছ গুলো - পুরুলিয়ার ভুমিপূত্রকন্যাদের সঙ্গে কয়েকটা দিন অদ্ভুত সুন্দর ভাবে
কাটে। চেতনার ধুলােবালি সাফ হয়ে যায়। সান্নিধ্যের অকৃত্রিমতায় কয়েকদিন কেটে
যায়।
ফুটিয়ারী
জলাধারের পাশে অহল্যাভূমি অতিথি নিবাসে এপ্রিলের তিন চার তারিখ আয়োজিত হয়েছিল
পলাশ পরব। অনুষ্ঠানের প্রতিটি গানে পুরুলিয়ার মাটির গন্ধ। ঝুমুরের কিংবদন্তী
শিল্পী কিরীটি মাহাতোর গান, সন্ধায় ছৌ নাচ
ইত্যাদি আস্বাদনের অবকাশ পলাশ পরবকে করে তুলেছিল স্বয়ং সম্পূর্ণ। একটি জনজীবনকে
কতটা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন ও উপলব্ধি করতে পারলে সেখান থেকে একটা উৎসবের জন্ম
দেওয়া যায় যার প্রতিটি মুহুর্তে সেখানকার মানুষের বেঁচে থাকার, জীবনচর্যার নির্যাস মিশে থাকে। পুঁজিবাদের থাবার নীচে যখন সমস্তই নিজস্বতা
হারিয়ে ক্রমে বিকট হয়ে উঠছে আমাদের উদযাপনের ইচ্ছা আর প্রক্রিয়া, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে পলাশ পরব ভিন্ন আবেদন নিয়ে একাত্মতার কাছাকাছি নিয়ে
যায়।
No comments:
Post a Comment