কথাবার্তা-১
(অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, অষ্টম ওয়েব সংস্করণ, ৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৭, ২৩ নভেম্বর, ২০২০) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।
এখন
প্রশ্ন হল সমাজের অর্ধেক অংশকে এইভাবে অবদমন করে রেখে কি ধরনের মােক্ষলাভ হচ্ছে।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ পালিশ করে নিচ্ছে তার অহং। জন্মসুত্রে তারা সমাজের কাছে যে
ক্ষমতার ছাড়পত্র পেয়েছে তাতে তারা শান দিয়ে নিতে পারছে। আর সমাজ তাতে পিছিয়ে
পড়বে তা অবধারিত। নারী বিদ্বেষ , নারীর
প্রতি বৈষম্য এক ধরনের যুক্তিহীনতা যা আমাদের সমাজ কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে
রয়েছে। এই অন্ধত্ব, অযৌক্তিকতার চর্চা আমাদের সমাজে চলছে যে
সমাজ যে সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গর্ব। সেই গর্বে খানিকটা যুক্তি থাকলে বাধে হয় ভাল হত। সেখানে একটি মাত্র স্বরের আধিপত্য
আর সেই স্বরকেই যুক্তি বলে ঘোষণা করার মধ্যে দৈন্য আছে, সমৃদ্ধি
নেই। নারীকে ব্যক্তি ভাবা, তার প্রতি ব্যবহারে বদল আনা,
সমাজে সংস্কারে বদল আনার পর সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে না হয় গর্ব করা
যাবে, ততদিন মুলতুবি থাক। সমাজের সব স্তরের নারীকে উপযুক্ত
শিক্ষা, বাঁচার রসদ দেওয়া হােক যাতে তার নিজের ইচ্ছা,
অনুভূতি, স্বাতন্ত্র তৈরী হয়। যখন তারা
অন্যের ইচ্ছায়, অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ইচ্ছায় দাগ বােলাতে
নারাজ হবে, অকপটে নির্ভয়ে তখন তারা নিজেদের ব্যক্তি মানুষ
হিসাবে চিনবে। সেদিন না হয় সমাজ নিয়ে সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করা যাবে। অবদমনকে
ভিত্তি করে যে ইমারতই গড়া হােক তার উচ্চতা, ঔজ্বল্য মোহিত
করতেই পারে কিন্তু জেনে রাখা ভাল তার স্থায়িত্ব বেশি দিন নয়। ধীরে হােক, খুব নীরবে হোক, একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে যা এই
ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেবে।নারীকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে দাও, নির্ভয়ে
বাতিল করতে দাও যা কিছু তার অপছন্দ, বেছে নিতে দাও যা কিছু
তার ইচ্ছায় সে লালন করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চাপা পড়ে থাকা আত্মবিশ্বাসের পুনোরদ্ধার
হোক। অন্য কোথাও থেকে ধার করে নয়, নিজের ভিতর থেকে শক্তি
উৎপাদন করে তাকে আত্মস্থ হতে হবে। যদিও এই প্রক্রিয়ার পুরুষতান্ত্রিক সমাজের
ভূমিকা শুধু ভয়ংকর পাথরগুলো যা তারা এতদিন চাপিয়ে রেখেছিল সেইগুলাে তার উপর থেকে
নামিয়ে নেওয়া। বাকি উজ্জীবনের কাজ তারা নিজেরাই করবে।
নারীকে
এটা দাও সেটা দাও বলছি বটে কিন্তু মনে হয় এই বয়ানের খানিকটা বদল প্রয়ােজন।
তােমরা বরং নিজেদের মাথায় ঢুকিয়ে নাও যে কি কি ব্যবহার নারীর সংগে করা যাবে না,
যায় না। কারণ সে নারী বলে নয়। তোমাদের মস্তিস্কে যুক্তি থাকাটাও
দরকার। অযৌক্তিক কাজ করা যায় না বলে নারীর ওপর থেকে অবদমন সরিয়ে নিতে হবে। পিতৃতান্ত্রিক
সমাজকে শিক্ষিত যুক্তিশীল হতে হবে যাতে তার গা থেকে "পিতৃতান্ত্রিক"
শব্দটা খসে পড়ে। ক্ষমতা আছে বলে এই শব্দটা মানুষজন সমীহ করে চলে, আসলে এই কাঠামোর ভিত্তি হল অশিক্ষা, যুক্তিহীনতা আর
অসংবেদনশীলতা। এই তিনটি একত্রিত হয়ে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তথাকথিত মহিমার
নির্মাণ। তাই অযথা সমীহ করার কোন কারণ তো দেখি না। বরং যুক্তি দিয়ে সংবেদনশীলতা দিয়ে
সংস্কার করার প্রয়ােজন আছে বলেই মনে হয়। প্রশ্ন চারিদিকে, প্রশ্নের
ক্যাকোফনি বিস্তর। প্রশ্নের নির্দিষ্ট অভিমুখ প্রয়োজন। পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করা হোক,
জবাব নেই সে কথা সবাই জানে। প্রশ্ন তাকে নিজেকে বদলে ফেলার জন্য।
পিতৃতন্ত্রের ফাঁকা অহং এর প্রকণ্ঠে প্রতিধ্বনি হয়ে ঘুরে বেড়াক প্রশ্ন গুলো।
উত্তর খোঁজা বৃথা। এই ক্রমাগত প্রশ্ন করতে করতে এর ভিতর থেকে ভিন্ন পরিসর তৈরি হবে
আশা করা যায়।
-গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
No comments:
Post a Comment