করোনা পরিস্থিতি ও নারী - অবস্থা ও অবস্থান।
( অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ, ২৩ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ৭ই জুন ২০২১ এ প্রকাশিত।) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।
বিশ্বজুড়ে গত দেড় বছর যাবত অতিমারী আমাদেরকে পর্যুদস্ত করে
রেখেছে, এ নিয়ে আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণও আমরা রোজ পড়ছি,
শুনছি। সমাজ জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন, ইত্যাদির প্রভাব সম্পর্কিত আলোচনায় আমাদের
মন আর মগজকে ক্রমাগত খাদ্য জুগিয়ে চলেছে সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক
মাধ্যম কখনও প্রয়োজনীয় ভাবে কখনও অপ্রয়োজনীয় ভাবে। বহুল আলোচিত এই বিষয়ের ভিতরে
নিজেদের ইচ্ছা ও চাহিদামত আমাদের খুঁজে নিতে হচ্ছে রসদ। করোনা পরিস্থিতিতে নারীরা
কেমন আছেন? সমাজের বিচিত্র স্তরের নারীরা ? “আমাদের সমাজের নারী" এই ভাবে এক গাত্রে ফেলা যায় নারীদের? যায় না। শ্রেনী, বর্ণ, জাতি,
ধর্ম ভেদে বদলে যায় নারীদের অবস্থা ও অবস্থান। বিভিন্ন অবস্থানের
নারী বিভিন্ন বিষয়ে আলাদা আলাদা ভাবে প্রভাবিত হন। এই সহজ সত্য বুঝতে আমাদের সময়
লেগেছে বহুদিন কিন্তু সমাজে - নারীর সমস্যা" আসলে বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়,
সমাজের স্তর বিভাজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্যার সঙ্গে পাল্টায়,
ভোল বদল করে , মাত্রায় হয় তারতম্য। সমাজের
ভিন্ন অবস্থানের নারী ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত হয়, বিভিন্ন
ঘটনার সংঘাতে ভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়।
এই
করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক বিভিন্ন স্তরে মানুষের বিচিত্র সমস্যা ইত্যাদির আড়ালে
ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অবস্থানের মেয়েরা কেমন আছেন তার খোঁজ।
তথাকথিত “বড় আর গুরুত্বপূর্ণ" ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেয়েদের
সমস্যা। এই চাপা পড়ে যাবার গল্প নেহাত পুরোনো নয়, এই ধারা বহমান। পিতৃতান্ত্রিক মানস গঠন ঠিক করে দেয় কোনটা বড় ইস্যু ,
কোনটা প্রাসঙ্গিক আর কোনটা নয়। কি নিয়ে আলোচনা হবে, কোন বিষয় প্রচার করা হবে, কোন কোন বিষয় পুনঃ পুনঃ
প্রচার করে মানুষের মস্তিষ্কের কোণায় কোণায় পৌঁছে দেওয়া হবে, কোন ঘটনার কোন বিশেষ ব্যখ্যাটি মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তােলা হবে তা
খুব সূক্ষ্ম ভাবে নির্ধারণ করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। এই নির্বাচনে অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে নারীদের সমস্যা। কারন তা ব্যবস্থার কাছে অস্বস্তিকর।
করোনাকালে
লকডাউন হবার পর সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সবাই যখন গৃহবন্দী হল তারপর মেয়েদের সমস্যা
শুরু হল তুমুল ভাবে। প্রথমত আমাদের কাছে একটা মিথ্যা ভীতি তৈরি করা হল যে বাড়ি হল
সব থেকে সুরক্ষিত জায়গা। এখানে মেয়েরা সব থেকে নিরাপদ। কিন্তু বাইরের মত ঘরের
মধ্যেও পিতৃতন্ত্রের থাবা জাল বিস্তার করে আছে। এখানেও রয়েছে পুরুষতন্ত্রের দাঁত,
নখ। পরিবারের কাঠামো আর সামাজিক স্তর ভেদে পরিবারের মেয়েরা শােষিত
বা নিপীড়িত। নিরাপত্তার নামে, সুরক্ষার নামে কখনো কোন
ছদ্মবেশ ছাড়াই পরিবার মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে
বেঁধে রাখতে চায়। সেই সময় থেকে নানা সূত্রে বাড়ির বাইরে যেতে পারলে কিছুক্ষনের
জন্য হলেও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে তারা। বাইরে কাজের সূত্রে বা বন্ধু বান্ধবীর কাছে
গিয়ে নিজেদের কথা বলার অবকাশ বা নিজের মনের শুশ্রষা করার সুযোগ পায়। লকডাউনে সে
সব সুযোগ বন্ধ। তার ফলে মানসিক ভাবে তারা গেঁজিয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রেই। অন্যদিকে
গার্হস্থ্য হিংসা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবেই। বাড়ির ছেলের বাইরে কাজ বন্ধ তাই
বাড়িতে রয়েছে কিন্তু তারা কত অংশে পরিবারের কাজে সাহায্য করেন সে কথা আমরা
কিছুটা অনুমান করতে পারি। নিজের হেনস্থাকারীর সঙ্গে বিরতি ছাড়াই অনেক নারী থাকতে
বাধ্য হচ্ছেন। অনেক নারী কাজ হারিয়েছেন তার ফলে অনটন উঠেছে চরমে। একটি সামাজিক
সত্য নগ্নভাবে উঠে এসেছে পরিবার নারীদের জন্য প্রশ্নাতীত নিরাপদ জায়গা নয়। এবং
যাবতীয় সামাজিক বা জাতীয় সমস্যার একটি স্বতন্ত্র মুখ রয়েছে। সব সমসার
সাধারণীকরন নারীর সমস্যাকে তুলে আনতে পারে না তা এই মহামারীর পরিস্থতি আরও
আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
No comments:
Post a Comment