Friday, August 20, 2021

 

সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা"?

মধুপর্ণা কর্মকার 

( অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, ত্রয়োদশ সংস্করণ, ১৮ ই মাঘ ১৪২৭, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২১ এ প্রকাশিত) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 

   উত্তমদা সেদিন বললেন সমাজ জীবনে মেয়েদের ভুমিকা নিয়ে কিছু লিখতে। তারপর সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখলুম যেদিকেই তাকাই সব দিকেই বৈষম্য। অন্তত যে লেন্স থেকে সমাজকে দেখার চেষ্টা করছি, গবেষণা সূত্রে। সেদিক থেকে দেখলে আরো নানা বৈষম্যের মধ্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লিঙ্গ বৈষম্য। এখানে বলে নেওয়া ভাল সব বৈষম্যই আসলে পরস্পর সম্পর্কিত। আরো নানা বৈষম্যের সংগে লিঙ্গ বৈষম্যের সম্বন্ধ অতি ঘনিষ্ঠ । বিশেষ একটি লিঙ্গের মানুষকে কারন ছাড়াই সমস্যার মধ্যে দূর্গতির মধ্যে হেনস্থার মধ্যে ফেলে রাখে আমাদের সমাজ। এখন কোন দিকটা নিয়ে লিখি। আসলে বিষয় হল কাঠামো। একটা কাঠামোর মধ্যে যখন সমস্যাটা থাকে তখন সেখান থেকে যা যা উৎপন্ন হবে সব কিছুর মধ্যেই থাকবে সেই কাঠামোর গুণ। তাই সমাজের অভ্যন্তরে যে বৈষম্যের বীজ রোপিত হয়ে আছে তাই আসলে ডালপালা মেলে আমাদের সমাজের সর্বত্র ছড়িয়েছে। এখন যদি সমাজের দিকে তাকাই তাহলে সবদিকেই সেই বিষবৃক্ষের ফল দেখতে পাব। ভাষায়, শিল্পে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, পোশাকে, পেশায়, সিনেমায়, বিজ্ঞাপনে, শিক্ষায়, ধর্মে। এই এক একটি বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা আলোচনা করে কি লাভ, কতদূর তার প্রভাব আমি জানি না। মূল কাঠামোটাকে আঘাত করতে পারলে তবেই লিঙ্গ বৈষম্যপূর্ণ সমাজের ডালপালা আর উৎপাদিত ফলের চরিত্র গুনাবলী আপনিই বদলে যাবে হয়তো।

   তারপরেও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ছোট ছোট বিষয় গুলো তুলে ধরে আলোচনা করার দরকার আছে। কেন আছে? তার কারন আমরা নিমজ্জিত হয়ে আছি বৈষম্যের ভয়াল নাগপাশে। সেখানে ভ্রম ও বিভ্রম বিস্তর। যা কিছু প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান ধ্যান ধারনা সেই সব থেকে নিজেকে মানসিক ভাবে বের না করতে পারলে আমাদের কাছে লিঙ্গ বৈষম্যের চেহারাটা ধরা পড়ে না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে না কার্য কারন। তাই ছোট ছোট বিষয় গুলােকে সন্দেহ করতে শিখলে, সমালোচনা করতে শিখলে তবেই মূল জায়গায় নজর পড়বে। কাঠামোকে প্রশ্ন করার কথা আমাদের মনে আসবে । তাই উত্তমদা যেভাবে বললেন, সমাজ জীবনে মেয়েদের ভূমিকা বা অবস্থান নিয়ে লেখার কথা তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আর তাৎপর্যপূর্ণ। সেই ভাবে সমাজের নানা ক্ষেত্রকে পর্যবেক্ষন করে সেই পটভুমিতে আলোচনা করাটাও জরুরি।

  লিঙ্গ অসাম্য যেভাবে আমাদের সমাজের মজ্জার মধ্যে ঢুকে আছে সেখান থেকে আমাদের মন ও মনন বের করে আনতে হলে লিঙ্গ বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি এবং সেই সচেতনতার প্রতিনিয়ত চর্চা জরুরি। যখন আমরা সামাজিক নানা বিষয়ের সংগে সংগে নিজেদের প্রতিটা কাজ, প্রতিটি কথার আত্মসমালোচনানা করতে করতে নিজেদের জীবনচর্যার খোলনলচে বদলাতে বদলাতে এগিয়ে যেতে পারব তখন এই তথাকথিত সচেতনতার একটা অর্থ দাঁড়াবে। অন্যথায় এই সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা" ও "অবস্থান" একটা বিষয় মাত্র হয়ে থেকে যাবে। তা নিয়ে লেখা হবে দিস্তা দিস্তা ছাপাও হবে বিস্তর। কিন্তু জগদ্দলের মত চেপে থাকা লিঙ্গ বৈষম্যের এই ভার নামবে না আমাদের সমাজের ভিত্তি থেকে। নারীরা বহন করে যাবেন এই দূর্বিষহ বোঝা, তাদের ক্ষমতার বুদ্ধির অপচয় হবে সর্বত্র। এবং আমরা "নারীকেন্দ্রিক" লেখা লিখে নিজেদের ইগো সেঁকে নিতে থাকব ক্রমাগত।

  সমাজ জীবনে "নারীর" ভুমিকা যখনই বলছি তখনই একটা "আদারিং" করছি অর্থাৎ একটা নারীকে "অপর" ভাবার একটা সূক্ষ্ম বিষয় এখানে কাজ করছে। যেন নারী সমাজের মূল উপাদান নয়, বিচ্ছিন্ন কিছু। "সমাজ জীবনে পুরুষের অবস্থান ও ভুমিকা" বিষয়ে কেউ প্রবন্ধ পৃথিবীর কোন প্রান্তে আদৌ লিখবে না। কয়েকটা শিরোনাম যদি ভাবার চেষ্টা করি, অমুক সাহিত্যে পুরুষের অবস্থান আলোচনা, তমুক শিল্পে সংস্কৃতিতে পুরুষের অবদান, হ্যান সিনেমায় পুরুষের চিত্রায়ন বিষয়ে মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ, ত্যান শিক্ষায় অথবা ধর্মে পুরুষের অবস্থান ও ভূমিকা আলোচনা । কেমন হাস্যকর শােনাচ্ছে না ? তার কারন সমাজটা যেন তাদেরই। যার মালিকানা স্বীকৃত, তার আবার ভূমিকা কিসের ? একাধিপত্যের এটাই ভাষা। "অপর" বানানো। তারপর সেই "অপর"কে ছেলে ভুলানাের মত ভুলিয়ে রাখা। সক্ষমতা সম্পর্কে, অবস্থান সম্পর্কে বিস্মৃত করে রাখা যাতে নিজেদের ক্ষমতা কায়েম রাখা যায়। এইবার “পুরুষ"এর জায়গায় "নারী" বসিয়ে শিরোনাম গুলো আরেকবার পড়ুন। এইবার খুব চেনা লাগছে নিশ্চয়। কারন আমরা শিরোনাম গুলো আখছার শুনছি সমাজের সর্বত্র, দেখছি পত্র পত্রিকায়, অ্যাকাডেমিক লেখায়, সেমিনারে, বিজ্ঞজনদের আড্ডায়। শুনে আমাদের আস্বাভাবিক কিছু মনে হচ্ছে না। এক ধরনের অস্বীকৃতি থেকে এই "ভুমিকা"র বিষয়টা আসে। তার মূল অংশকে লঘু করে তাকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ভূমিকা আলোচনা করা হয়। আলোচনার বিষয় নির্বাচন ও আ্লোচনার ভাষা আসলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা বৈষম্যের বিষাক্ত ঘন অন্ধকারের রাজনীতির বাইরে নয়। এ নিয়ে নারীবাদী ভাষাতাত্ত্বিকগণ তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। আপাতত সেদিকে আর যাচ্ছি না। তবে শেষে এইটুকু বলি, প্রচলিত আলোচনার বিষয়, তার বয়ান, ভাষার সংগে লিঙ্গরাজনীতি প্রসূত ক্ষমতার সম্পর্ক - বিষয় গুলো শুনতে জটিল মনে হলেও আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত তার চর্চা করছি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে।

  - গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments:

Post a Comment

                                            বাদল দিনের ছবি ও গান                                              মধুপর্ণা তারপর পরিচিত বর্ষ...