‘স্থানচ্যুত
তুমি হও স্থানে উন্নীত’, ‘যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে’, ‘আপন সাধন কথা না কহিও যথা তথা’, শব্দবন্ধ গুলো ঘুরপাক খায়। এইসব ফাল্গুনের নির্জন
সন্ধ্যায় কতকগুলো বই পড়ে বিগড়ে যায় সামাজিক সত্তা। মস্তিস্ক ভরে যায় শতাব্দী প্রাচীন
শ্লোকে, কথায়, শব্দের আঘাতে। কথা বেঁধে গেছে ফকির, দরবেশ, বাউল। সেই কথারা আছড়ে পড়ে,
আচ্ছন্ন করে দেয়। ননীবালার কথা চিন্তা করি, মলিন তার বেশ, রুক্ষ অঙ্গে সাধনার নির্জনতা।
গুরুকে পাড়ে পৌঁছে দিতে স্বয়ং নৌকা হয়ে সমাজ, সংসার ছেড়ে এসেছিলেন ননীবালা। বাউলসাধকটির
শুদ্ধ মনন সে অনন্তলতার মত অবলম্বন করেছিল নিবিড় সংরাগে। ‘আনখা মেয়েছেলে’ থেকে অধিষ্ঠিত
হয়েছিল আশ্রমজননীতে। মায়াকীর্ণ হট্টগোল থেকে ননীবালা, মিনতি,সাধনারা সমাজ থেকে চলে
গেছে গভীর নির্জন পথে হেঁটে বহুদূর যাবে বলে। কতদূর তারা হেঁটেছিল আমি জানি না, মানুষ
মনে মনে বহুদূর চলে যায়, বাইরে তাকে দেখে বোঝা যায় না। গভীর নির্জন পথ বেয়ে, নদী পেরিয়ে,
সমাজ পেরিয়ে, দোকানপাট পেরিয়ে, নিয়ম পেরিয়ে, প্রত্যাশা আকাঙ্ক্ষা পেরিয়ে চলে যায়। তাদের আর ফেরানো যায় না জনপদের নিশ্চিন্ত
আশ্রয়ে। সমস্ত পরিচিতি ত্যাগ করে সে গায়ে জড়ায়
কথার বসন, নৈঃশব্দে রাঙা, অভিজ্ঞতার কারুকার্য তাতে। একান্ত অন্তর্লোকের সেই গুহ্য
যাত্রায় ননীবালা্রা একাকী, নিঃসঙ্গ, পূর্ণ, একক। ঘুম পেয়ে যায়, বইপত্রের ভিতরে ঘুমিয়ে
পড়ি, তারপর অস্পষ্ট ননীবালা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্বিকার মুখে তার যন্ত্রণার আবছা
দাগ, ধুলোয় ধুলোময় তার মলিন অবয়ব, আর উজ্জ্বল তার চোখ, উজ্জ্বলতার ভয় আমার আজন্মের
তাই তাকাতে পারি না। ননীবালার মুখে অনুভুতি ছটফট করে না, স্থির। লোকালয় ছেড়ে ঘর গৃহস্থালী
ছেড়ে চলে গেলে মানুষ এইরকম স্থির হয়ে যায়। সমাহিত আর স্নিগ্ধ হয়ে যায়। স্থৈর্য এসে
ঝাপটা মারে, বিক্ষত করে দেয় না, ধাক্কা দেয়। আকাশে মানানসই চাঁদের নীচে ধুলোর রাস্তায়
ননীবালার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকি। ননীবালা অপেক্ষা করে না। চলে যায়। উধাও হয়ে যায়। হতবম্ব
হয়ে বসে থাকি। ননীবালারা চলে গেছে রূপ নিয়ে বহুদূরে। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা্
কিছুই আটকাতে পারে নি। স্থানচ্যুত একটা সত্তা স্থানে উন্নীত হতে চলে গেছে। আপন সাধনার
কথা গোপন রাখতে চলে গেছে মন নিয়ে অনেকদুর। দুনিয়ার কোনোকিছুই সে বাঁধতে পারে নি। তাই
সে বেঁধেছে কয়েকটা গান। শব্দকে সে আয়ত্ত্বে এনে বেঁধে ফেলেছে পঙক্তিতে। আর এই বহু বহু
বছর পর বেঁধেছে সে অন্য একজনের মনোযোগ। ভাষার
ভিতর গুপ্ত কুঠুরি তৈরি করে ভাব ভরে দরজা আটকে
দিয়ে তুমি চলে যাচ্ছ ননীবালা? আমি যে কিছুই
বুঝতে পারছি না। নিঃশব্দ কিভাবে শব্দকে খায়? আপনারে আপনি তুমি কিভাবে হয় সাবধান? দৈব
হাসিতে ভরে যায় তার মুখের প্রতিটি রেখা। তুমি যে গান গাও তাতে কে কার সিগনিফায়ার বলে
যাও! মরিয়া চিৎকার করি। তার মুখে তাচ্ছিল্যের বিভ্রান্ত হাসি, রাখো তোমার কেতাবি বিদ্যে!
তন্দ্রার ভিতর ধীরে ধীরে কাউকে চলে যেতে দেখি দূরে মাটির রাস্তায়, একাকী, সংযমী পদক্ষেপে,
আত্মস্থ কারুণ্যে।
ননীবালার
একান্তে চলে যাওয়ার দিকে চন্দ্রাহত আমি দাঁড়িয়ে থাকি, হাতে শুকনো বইয়ের পাতা খস খস
করে। বুকের ভিতর শুকনো পাতা খস খস করে, মাথার ভিতর শুকনো পাতা উড়ে যায়। ননীবালা শব্দকে,
ধ্বনিকে বাঁধার গুপ্ত বিদ্যা জানে। ননীবালা শব্দকে দেহ দিয়ে জেনেছে। দেহের ভিতরের শূন্যতা
আর স্রোত দিয়ে জেনেছে, শব্দকে সে এমবডি করেছে। আর আমি করেছি মুখস্থ! তাকে আমি খুলে
বলি মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা, কি কি সে অতিক্রম করতে পারে না, সেই সীমায় আটকে থাকায়
চলচ্ছ্বক্তিহীন কারো নাগালে কিভাবে ধরা দেবে দুনিয়াদারীর গহন ঘনীভূত নৈঃশব্দ। তাই নদীর
পাড়ে বসে জল পিপাসায় মরে যায় কত লোক। পান করার বিদ্যা রপ্ত নেই বলে, আরাধ্যকে ভোগরাগের
তরিকা জানা নেই বলে। ননীবালা এইসব জেনে চলে গেছে
মায়ামৃগ হয়ে নির্বাণের সন্ধানে। পথবৈরাগী ননীবালার অজানিত নেই সামাজিক জীবনের
নিস্ফলতা, নিরর্থকতা। মোহ কিম্বা আসক্তি তাকে আটকাতে পারে নি। তাই সে আপন রাস্তা দেখেছে।
আর তাকে দেখেছে বহু লোক।
No comments:
Post a Comment