Sunday, June 22, 2025

 

           অনুগল্প ডজন চারেক : প্রতিদিনের ঘটনার অন্তর্লগ্ন দর্শন থেকে সূক্ষ্মতার আঘাত

                                          মধুপর্ণা কর্মকার 


আমাদের হস্টেল শ্রীসদনে সহ-আবাসিকা ভূগোল বিভাগের ছাত্রীরা থাকতেন, স্নাতক স্তরে পড়ার সময় তাদের কাছে ভূগোল বিভাগের একটি পত্রিকায় ‘চীনের স্টোন ফরেস্ট’ বিষয়ে একটি লেখা পড়েছিলাম সঙ্গে ছবি, সেই প্রথম আমার অধ্যাপক মলয় মুখোপাধায়ের লেখার সঙ্গে পরিচয়। পরবর্তীতে ‘জীবন কথার নদী’ এবং ‘নৈঃশব্দের ভূগোল’ বই দুটি পড়েছি। আমি মলয়দার সরাসরি ছাত্র নই, বিশ্বভারতীর ভাষাভবনের ভাষা-সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু জ্ঞানচর্চার ইন্টারডিসিপ্লিনারী চরিত্র সমকালীন/পূর্ববর্তী চিন্তাবিদদের কাজের প্রতি আকর্ষণ অনিবার্য করে তোলে। সেইসুত্রে এখানে কয়েকটা কথা বলবার -

একজন বিজ্ঞানী, একজন ভূগোলবিদ যখন সাহিত্য তৈরি করেন, ন্যারেটিভ তৈরি করেন তার কিছু বৈশিষ্ট্য পাঠক হিসাবে লক্ষ্য করেছি। অভিজ্ঞতা যখন গল্প, ভ্রমণকথা, স্মৃতিকথায় উঠে আসে তখন অ্যাকাডেমিক সিটজেনশিপের ভিতরে একটি ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়। যখন একজন বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ একজন গবেষক, যিনি পেশাসূত্রে নিস্পৃহ, উদাসীন থাকতে বাধ্য হন, তিনি যখন ক্রিয়েটরের ভুমিকায় আসে্ন, তিনি যখন গল্প বলেন আমাদের কাছে বহুমাত্রিক বাস্তব প্রকট হয়। জ্ঞান নির্মাণের স্বীকৃত এবং প্রচলিত নিয়মের বাইরে অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা থেকে যে গল্প তৈরি হয়, আমাদের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, সাফারিং তার সংগে সেলফ এক্সপ্রেশন এবং সৃষ্টির আন্তঃসম্পর্ক, তার যে ব্যাতিক্রমী বৈশিষ্ট্য পাঠক হিসাবে আমাকে অভিভূত করে। ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা চিন্তাকে জটিলায়িত করার অদ্ভুত কিছু সূত্র অধ্যাপক মলয়দার লেখা থেকে আহরণ করতে পেরেছি -এইভাবে সংবেদনশীল লেখক, বিজ্ঞানীরা পরবর্তী প্রজন্মের মানসজগতকে আকার দেন, সমৃদ্ধ করেন, সময়ের সিঁড়িতে কয়েকধাপ এগিয়ে দেন।

বর্তমান পুঁজিকেন্দ্রিক বস্তুবিশ্বে এক প্রজন্মের গবেষক, লেখক, গল্পকার পরবর্তীর প্রজন্মের পাঠক গবেষকদের কি দিয়ে যাবেন? পূর্ববর্তী বিজ্ঞানী লেখক দিয়ে যান একটা দৃষ্টিভঙ্গি, একটি জানলা যেখান দিয়ে পরিচিত পৃথিবীকে ভিন্ন ভাবে দেখা যায়, দিয়ে যান একটি দাঁড়ানোর তাত্ত্বিক তল যাকে আমরা পারিভাষিক ভাবে বলি স্ট্যান্ড পয়েন্ট - পয়েন্ট অব ভিউ, দিয়ে যান কিছু লেন্স যা দিয়ে এই ভ্রান্ত পরিবেশচেতনা, সামাজিক- অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ দিয়ে তৈরি যে নিকট বাস্তব তার ভিতরের তন্তুবিন্যাস গুলো স্পষ্ট দেখা যায়। অন্দরের দর্শন স্পষ্ট হয়ে যায়। একবারে ভিন্ন বিষয়ের ছাত্র এবং গবেষক হওয়ার পরও অধ্যাপক মলয়দার বইগুলি থেকে আমি পেয়েছি একটি লেন্স, একটি আলাদা জানলা যেখান থেকে আমাদের পরিচিত ‘সাধারণ’ পৃথিবীকে অন্যরকম দেখায়। পার্সপেক্টিভ, দৃষ্টিভঙ্গি যা আমাদের পূর্ববর্তী চিন্তাবিদরা আমাদের দিয়ে যান, দৃষ্টিভঙ্গির উত্তরাধিকার আমাদের চিন্তন প্রক্রিয়ায় গাঢ় প্রভাব ফেলে।

‘জীবন কথার নদী’ উপন্যাসে লেখক নদী ও নারীকে সমান্তরালে রেখেছেন, উপরিতলে গল্প রয়েছে কিন্তু তার ভিতরে অন্তঃশীলা নদীর মত বয়ে যাচ্ছে আরেকটি ধারা সেটি ইকো ফেমিনিজম, প্রকৃতিকেন্দ্রিক নারীবাদ। আমার মনে হয় আমাদের আইডিয়া, সামষ্ঠিক চিন্তন প্রক্রিয়াটিও বহমান নদীর মত। হাত বদলে হাত বদলে এগিয়ে যায়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের লেখকদের, চিন্তাবিদদের একটি স্রোত বয়ে যায়। এই ডিজিটাল সভ্যতায় যেখানে আমাদের অনুভূতির স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড, সেখানে সাবেকি স্টোরি টেলিং, ন্যারেটিভ মেকিং, গল্প তৈরি, গল্প বলা এবং গল্প শোনার, গল্পের খাতিরে একত্রিত হবার এই ঐতিহ্য এই সময়ের বিচিত্র বিশৃঙ্খলার ভিতরে পাঠক হিসাবে আমার কাছে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

স্টোরি টেলিং এর আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মান কেউ কেউ সেখানে তার অনুভূতির জগৎ যতবেশি সূক্ষ্ম এবং তীব্র হতে থাকে তার গল্পের ধার ‘সহৃদয়হৃদয় সংবাদী’ পাঠকের অন্তঃস্থলকে আঘাত করে তত সূক্ষ্ম ভাবে। লেখা হচ্ছে, ‘Scientifically, the reason well-told stories are so impactful is that the act of listening lights up same parts of the brain that would activate if living the story in real time. Stories are also an unmatched learning tool’১. একজন স্টোরিটেলারের যে সৃষ্টিশীলতা তার মধ্যে রয়েছে unique perspective. গল্প শুধুমাত্র বিনোদন, আবেগ মোক্ষণ নয়, গল্প আসলে হতে পারে নলেজ এক্সচেঞ্জের একটা মুদ্রা বা কারেন্সি। পেশোয়ারের ‘কিসসাবাজার’কে মনে করা হয় সাউথ এশিয়ার সভ্যতার আদিতম গল্পের বাজার যেখানে মানুষেরা গল্প শুনতে যেতেন, সেখানে কিসসাবাজেরা  তাঁদের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং জীবনের যে সংকট গুলো,পাজল গুলো তারা সলভ করে ফেলেছেন তার গল্প শোনাতেন, গল্পের মধ্যে পুরে দিতেন এই জীবনের উত্তাল সমুদ্রকে কিভাবে নেভিগেট করতে হয়, বৈচিত্র্যকে কিভাবে অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত করতে হয় তার সুত্র। গল্পবাজেরা/ স্টোরিটেলাররা  এক একজন সান্তিয়াগো যারা পাঠককে তথ্য এবং উপলব্ধির নির্যাস দিয়ে জীবন শেখান, বাঁচতে শেখান। গল্প বলার, গল্প শোনার শৌখিনতার থেকেও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। গভীর জীবনবোধে অন্বিত হয়ে বাঁচার উপাদান সংগ্রহ করতে হয় আমাদের, দর্শনের হাত ধরতে হয়। পরিবারে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের থেকে ছোটদের গল্প শোনার  অবকাশ নিউক্লিয়ার পরিবারে নেই, আমাদের কারোর জন্য কারো পর্যাপ্ত সময় নেই ব্যস্ততার নিদারুণ ক্রুর অজুহাতে, জীবন বিবিক্ত এই ‘নাগরিক, উন্নত’ বাঁচায় গল্প আমাদের একটা করে জানলা খুলে দেয়, কিছু খোলা হাওয়া ভিতরে আসে।

‘অনুগল্প ডজন চারেক’ প্রকাশিত হয় ২১ শে মে, ২০২৫। বই ঘর পাবলিশার্শ শান্তিনিকেতন, প্রকাশক জয়ন্ত চক্রবর্তী। প্রচ্ছদ করেছেন অরুনেন্দু মুখোপাধ্যায়। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁদের ‘যাঁরা আশেপাশের নানান ঘটনা থেকে জীবন দর্শন তৈরির রসদ খোঁজেন’। এখানে উল্লেখ্য বইটির প্রতিটা গল্পে রয়েছে আমাদের সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসা দর্শন। প্রতিদিনের ‘তুচ্ছ’ ঘটনা, আমাদের দৈনন্দিনের কথা, সংলাপ যা আপাতদৃষ্টিতে খুব ‘সাধারণ’ মনে হয়, কিন্তু লেখক এই সবকিছুকে দেখেন কিছুটা দূর থেকে যেমন একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টিকে দূর থেকে দেখে বুঝতে পারেন পারিপার্শ্বের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য। এই বৃহৎ আকাশের নীচে মানুষের পৃথিবীতে ঘটে চলা কোনো ঘটনাই তুচ্ছ নয়, উচ্চারিত কোনো কথাই আকস্মিক নয়। প্রতিটি ঘটনার পটভূমি আছে, প্রতিটি কথা একটি ভাষিক মহাস্রোতের অংশ। লেখক তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে, গভীরতা দিয়ে দেখতে পান সেই যবনিকার ভিতরের কাহিনী গুলো তাতে ‘তুচ্ছ’, ‘সাধারণ’ ঘটনা, কথা ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠে। যাঁরা বাঁচেন প্রচলিত আত্মহারা স্রোতের অনেকটা গভীরে তাঁদের কাছে মানুষের পৃথিবী ধরা দেয় ভিন্ন মাত্রায়, যেখানে “অনুভূতির ঢেউরা অতি আধুনিক জীবনচর্চায় ধাক্কায় ভেঙ্গে না গিয়ে আরো নরম ঢেউ তৈরি’ হয় (সূচনাংশ – মলয় মুখোপাধ্যায়) তিনি আরো লিখছেন, ‘ইদানীংকালের সংখ্যা সাজানো জীবনচর্চাতে অনুভুতিরা পিছনের সারিতে গিয়ে বসেছে।… গতিময় জীবনবোধ নরম মনের আবদারদের ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয় না” প্রতিদিনের ঘটনা আর কথার সমুদ্র থেকে লেখক খুঁজে নেন সূত্র যা একটা দর্শন দিয়ে একটা সময়কে অতীত আর ভবিষ্যতের সঙ্গে বেঁধে দেয়। তিনি  চেয়ছেন গল্পগুলির মধ্যে ‘অনুচ্চারিত জীবনদর্শনের’ অনুরণনে অনুরণিত হোক পাঠক।

 তিনি গল্পগুলি আটটি সাবথিমে ভাগ করেছেন, মানবিকতার মোড়কে, বোধ কাজ করে, জীবন জীবিকা, সমাজ চিত্রের ক্যানভাসে, শিশুমনের হদিশ, আর্থ-সামাজিক উঠোনে, চলো নিয়ম মতে, পর্যটনের এপাশ-ওপাশ।  মোট ৪৮ টি অনুগল্প এখানে সংকলিত হয়েছে। প্রতিদিনের যাপিত জীবনের মলিনতার ভিতর, দৈনন্দিনের দৈন্যের ভিতর, মানুষের রিপু তাড়িত জীবনের ভিতর, চালাকিতে শঠতায় বস্তুবিশ্বে জিতে যাবার চূড়ান্ত পরাজয়ের ভিতর লেখক দেখেছেন কিভাবে সামাজিক সত্তার বাইরে এখনও মানুষ মহাকালের সন্তান, দেখেছেন অস্তিত্ত্ববোধের ভঙ্গুর ভয়াবহতা। সামাজিক- অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বুনটে গাঁথা আমাদের বাস্তবতা কিভাবে আমাদের মানবিক অবস্থান থেকে পদস্খালন ঘটায়, কিভাবে ধূর্ততায়, ক্রুরতায় পলায়নবাদী সামাজিক মানুষ খোঁজে আশ্রয়, কিভাবে প্রকৃতি বিযুক্ত মানুষ, বিষাক্ত সভ্যতায় নিজেকে অন্বিত করে উত্তরণের ভাণ করে প্রতিদিনের রমরমা বজায় রাখে যেখানে “অনুভূতিরা গিয়ে বসে পিছনের সারিতে” লেখক জানেন পালিয়ে যাবার কোনো জায়গা নেই, সভ্যতার অসুখ তার জন্য কোনো নিরাপদ মানবিক আশ্রয় মজুদ রাখেনি। ব্যক্তিকে ফিরতে হবে অনুভূতির সূক্ষ্মতায়, ফিরতে হবে আত্মশুদ্ধিতে, প্রতিদিনের মমত্বের অনুশীলনে, ভিতরের মনুষ্যরাক্ষসকে আহুতি দিয়ে ফিরতে হবে আনন্দে, পারস্পরিক ভালোবাসায়, ফিরতে হবে প্রকৃতির ভিতর সম্পূর্ণ সমর্পণে, ফিরতে হবে অনন্তের সন্তানদের অনন্তের কাছে।

প্রতিটি অনুগল্প এক একটা বিদ্যুতের ঝলকের মত। স্বল্প পরিসরে ক্ষণিকের তীব্র দ্যোতনা দিয়ে যায়। মূলত সমাজ জিজ্ঞাসা প্রাধান্য পেয়েছে গল্পগুলিতে। প্রথম গল্প ‘সৌজন্যতায় আছি’তে রয়েছে প্রৌঢ পুরুষের একাকিত্ব আর সৌজন্যের অন্তঃসারশূন্যতা, সামাজিকতার আলগা বাঁধন যেখানে সৌজন্যের বাইরে কেউ কাউকে নিয়ে ভাবিত নয়। অথচ বাইরে একটি প্রলেপ ভিতরে সহমর্মিতার তুমুল অনটন। ‘যাচাইটুকু’ গল্পে দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসের দৈন্য যেখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিতে হয় অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য হবার জন্য। ‘মানবিকতার মোড়কে’ – এই বিষয়ের গল্প গুলির মধ্যে মূলত স্থান পেয়েছে সামাজিকতার ভিতরে ঘূণ ধরে যাওয়া আন্তঃসম্পর্ক যেখানে বাহ্যিক মুখোসের ভিতর ব্যক্তির রিপুতাড়িত, আত্মরতিময়, বিকৃত এবং বিক্রীত সত্ত্বা খুব সহজে বেরিয়ে আসে – গৃহকর্তা সন্দেহ করে কাজের মাসিকে, প্রতিষ্ঠিত বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানের মালিক বন্ধুর অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্বন্ধ পাঠককে বিচলিত করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের শীতলতা জানে ঘরের সিলিং ফ্যানটি, আজীবন স্ত্রীর কাছে অপঠিত থেকে যাবার আক্ষেপে চোখ জলে ভরে যায় সুবলবাবুর। একমাত্র একাকীত্বের যন্ত্রণার ভিতর তিনি নিজেকে খুঁজে পান।

‘বিপদতারণের মা’ গল্পে মাকালীর গয়না হারিয়ে যাওয়ায় সকলের আত্মম্ভরী শোক, দুঃখের ভিতর বিপদতারণের মা বুঝতে পারে ‘সোনার ফাঁস’ থেকে মার মুক্তি পাবার কথা। ‘অন্য কারো মতো’ গল্পে প্রেমিক প্রবীর প্রমিকা সেবন্তীকে তুলনা করে ‘সানলাইট’ বিজ্ঞাপনের মেয়েটির সঙ্গে। ‘শেষ পোড়ানোটা’ গল্পে দেখা যায় তিরিশ বছর আগে ডিভোর্স হয়ে যাওয়া স্ত্রী  মৃত স্বামীকে পোড়ানোর খরচ স্বামীর নতুন স্ত্রীর হাতে দিতে রাজী নন যদিও মৃত স্বামীকে দেখার ইচ্ছে তার আজীবনের মত মরে গেছে। ‘জীবন জীবিকা’ অংশে ‘জীবিকা যখন’ গল্পে দেখা যায় ট্রেনের হকার শঙ্করের ‘কমপ্লিট থ্রোট রেস্ট’ প্রেসক্রাইব করে ডাক্তার কিন্তু ইশারায় তো জীবিকা তার চলবে না। ‘আলাপচারিতার ওপাশটাতে’ গল্পে লেখকের শান্তিনিকেতনের ‘ছাউনি’ বাড়িতে টোটো করে অনুষ্ঠানের চেয়ার দিতে এসে কেতাবুদ্দিন মিঞা বলে যান স্কুলে তিনি যান নি কিন্তু ‘জীবনটাতো  নকল করার ইস্কুল বটে’।

‘জীবন দেখতে’ গল্পে একজন রিকশাওয়ালা আব-দা বলে যান ‘স্যার, পৃথিবীতে সব মানুষই তার চেনাজানার গন্ডীকে বাড়তে চায়। সকলের মধ্যে নিজেকে আলাদা ভাবতে মানুষ ভালবাসে… আমাদের এই মস্ত পৃথিবীটাতে মাত্র কয়েক বছরের জন্য আসা… সবটাই তো মনের সঙ্গে লড়াই’।

‘সমাজচিত্রের ক্যানভাসে’ পর্বের গল্প ‘হ্যালোজেনের আলোটার বাইরে’ গল্পটি পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। এখানে নারায়ণ সর্দারের নাতি পাড়ার বৃন্দাবন মন্ডলের মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রিত নয়, সে ফেলে দেওয়া পাতা থেকে খাবার কুড়িয়ে নেবার জন্য দাদুর হাত ধরে বিয়ে বাড়ির দিকে দ্রুত যেতে চায় কারণ কুকুরদের সঙ্গে লড়াই করে তাক খাবার সংগ্রহ করতে হবে, এই লড়াই সহজ নয়। সামাজিক মর্যাদা, সম্পদের সুষম বন্টনের লড়াই কত যোজন দূর? যেখানে একটি বাচ্চাকে এঁটো খাবারের জন্য লড়াই করতে হয় রাস্তার কুকুরের সঙ্গে!

‘ভাসিয়ে দিয়ে গেলে’ গল্পে দেখা যাচ্ছে স্বামী মারা যাবার পর শোক সভায় কে কোন শাড়ি পড়বে, কোন শাড়ির সাথে কোন ব্লাউজ ম্যাচ করবে এই নিয়ে ‘সুপ্ত আলোচনা’। ‘মায়ের শাড়ি হবে শোক মানানসই জরি পাড়। সাদাটে হালকা রঙের প্যাণ্ডেল’। এই শ্লেষ মানুষের সম্পর্ক আর তার তলানিতে চলে যাওয়ার দৈন্যকে নগ্ন করে দেয়। আভিজাত্য, অর্থসংগতির সঙ্গে শোক, দুঃখ পাল্লা দিয়ে সমান্তরালে যেতে পারে না, এখানে খেয়াল রাখতে হয়, ‘অর্থের সঙ্গে রুচির প্রকাশ ও যেন হয়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে’।(পৃ -৪৪) ‘লটারীর টিকিট’ গল্পে যখন লেখক লেখেন, ‘সফল জীবনের তৃপ্তির স্বাদটাই আলাদা। ভরাট হয়ে যায় মন।যারা পেয়েছেন তাদের আর আলাদা করে বোঝাতে হয় না’ … এই সমাজবিক্ষণের সূক্ষ্মতা অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়কে ভিন্ন ভাবে চেনায়, তিনি দেখান জীবন আসলে একটা লটারীর টিকিট। জীবনে সাফল্যও একটা একটা লটারীর টিকিটের মত, বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে যাবার মত। বিদ্যমান ক্ষমতা সম্পর্কের এই পাশা খেলায় কেউ কেউ জেতে। ‘কোন আলোকে বাসস্থান’ গল্পে দেখা যাচ্ছে মেট্রোপলিটন সিটির যান্ত্রিক কংক্রীটের অরণ্যে আভিজাত্যের নিরাপদ মোড়কে জীবন-জীবন খেলা, যেখানে পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে সেটাও স্পষ্ট নয়। এই নাগরিক অ্যাননিমিটি, গাঢ অপরিচিতি, বিচ্ছিন্নতার মহামারী, ছিন্নমূল বাঁচার শ্লাঘা অথবা ক্লেদ, সোপিসের মত গোছানো- সাজানো অথচ প্রাণহীন জড়ত্বের নির্মম বিস্তার, অনির্দিষ্ট টানে, তাগিদে কর্পোরেট লাইফ স্টাইল -সেখানে লেখক ভাবেন –‘সত্যিই আমরা সমাজবদ্ধ জীব। আধুনিকতার ঘেরাটোপে নিজের কাছেই নিজে বন্দী হয়ে যাচ্ছি… এখানে আমি আর নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছি না”। ‘গনতন্ত্রের ওধারটাতে’ গল্পে তিনি লিখছেন, ‘গনতন্ত্র বজায় রাখতে গিয়ে অনেক সম্পর্কই নষ্ট হয়ে যায়… কদিনের জীবনে আত্মীয় আর বন্ধুর সংখ্যা বাড়িয়ে নাও’।

আমার সব থেকে পড়তে ভাল লেগেছে, বলা ভাল বারবার পড়েছি ‘শিশুমনের হদিশ’ অংশে যে গল্প গুলি রয়েছে।‘ছোটরাও যে শেখায়’ গল্পে দেখা যাচ্ছে এক সরলমতি শিশু পরীক্ষার খাতায় অঙ্ক কষার বদলে এঁকে এসেছে ফুল, বাড়ি, নদী, নদীতে নৌকো এঁকে আসে, কারণ গতরাত্রে মায়ের করানো অঙ্ক গুলোই পরীক্ষায় এসে যাওয়ায় একই অংক সে আবার করতে চায় নি। মা সংযুক্তা তাকে বকার বদলে বলেন, “ঠিক করেছিস। মন যা চাইবে তাই করবি জীবনে।সারাটা জীবন আমি যা পারিনি”। এই বড়রা বিশেষত মেয়েরা, গৃহিণীরা যা চান তা করার ইচ্ছা, পরিসর, সাহস হারিয়ে ফেলেন।তাদের চলতে হয় ‘নিয়ম মতে’। শিশুকন্যা সংযুক্তা বড়দের পৃথিবীর এইসব নিয়ম, বাধা বিপত্তিতে এখনও অভ্যস্ত হয়নি, সে নিজের খেয়ালে পরীক্ষার খাতায় যা ইচ্ছে এঁকে এসেছে। শিক্ষা, পরিবার, সমাজ আমাদের নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য একে একে মেরে ফেলে আমাদের বানিয়ে তোলে নিয়মনিষ্ঠ, ‘তাসের দেশ’ এর হরতন, চিড়েতন, ইস্কাবন।

‘কি বলছো মা’, ‘চুপ থাকাতে’ গল্প গুলিতে রয়েছে কিভাবে শিক্ষার নামে মা বাবারা অসুস্থ প্রতিযোগীতা্র দিকে শিশুদের ঠেলে দিচ্ছেন, শিশুদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন একে অপরের বিরুদ্ধে। একে একে সভ্যতার বিষ শিক্ষার মোড়কে, ধর্মের মোড়কে শিশুদের ভিতরে অল্প অল্প করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা আমাদের ‘যোগ্য উত্তরসূরী’ হয়ে উঠে বিভেদে, প্রতিযোগীতায় আত্মহারা পৃথিবীকে সরগরম রাখতে পারে।

“ আর্থ-সামাজিক উঠোনে” অংশে ‘দখলদার’ গল্পে অনিমার সুটকেসে গ্রামের বাড়িতে ‘আমেরিকার গল্প বিক্রী করে’ ফিরে এলে গ্রাম বাস্তুভিটে থেকে একটি  সাপ তার সঙ্গে চলে আসে আমেরিকার বস্টনের ঝকঝকে সুখের সংসারে, যেন মুর্তমান ‘বিষয় বাসনা বিষ’। ‘সম্পর্ক হরেক’ গল্পে চ্যাটার্জিদের বড় পরিবারে আমন্ত্রিতদের ‘ওজন’ নির্ধারণ করেন নববধূ কে কত দামী গিফট দিয়েছে তার ভিত্তিতে। ‘বিয়ের কার্ডে পদবি যখন’ গল্পে দেখা যাচ্ছে হরিহর চ্যাটার্জী ব্রাহ্মণ্যবাদের বিষ থেকে নিজেকে আর  শিক্ষিতা মেয়ে শতরূপাকে মুক্ত করতে পেরেছেন, ‘চ্যাটার্জী’ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে যখন কুণাল ‘কর্মকার’এর বিয়ে নিয়ে এলাকায় যেসব কথা ওঠে তিনি সামলে নেন যদিও ‘আবছা করে রটিয়ে রাখা হ’ল কর্মকার হ’ল কুণালদের পাওয়া পদবী, আসলে কুণালরাও ব্রাহ্মণ’।

‘চলো নিয়ম মতে’ অংশের ‘লাফিং ক্লাবের সদস্যপদ’ গল্পে ক্লাবের  কর্ণধার দুই প্রাণবন্ত নারীকে বেখাপ্পা, বিশৃংখল হাসি পছন্দ করেন না, তিনি স্রেফ জানিয়ে দেন, “আপনাদের ফর্ম দেওয়া হবে না। সব কিছুর একটা ডিসিপ্লিন আছে। হাসিরও একটা নিয়ম আছে, একটা সিস্টেমে হাসতে হয়। তবে শরীর ভালো থাকে। হ্যা হ্যা করে যখন তখন হাসলেই তো হল না”। নারীদ্বয় ভাবতে থাকেন, “এই যে আমরা সকলকে নিয়ে এতো হাসুখুশি থাকি, সেটা কি তাহলে সিস্টেমের বাইরে”!

‘মোবাইলের হাত ধরে’ গল্পে দাম্পত্য কলহে অতিষ্ঠ দীপঙ্কর আর সুস্মিতা সঙ্গী বদলের অ্যাপে ‘অদ্ভুত স্বয়ম্বর সভায়’ রূপ, রুচি, আর্থিক সামর্থ্য মিলিয়ে সঙ্গী খুঁজতে গিয়ে দেখেন সবকিছু কিছুতেই মিলছে না, তাই সকালে ফের তাঁরা এক টেবিলে একসঙ্গে চায়ে চুমুক দিয়ে স্বস্তির নিস্বাস ফেলেন। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় সমাজ, পরিবার, দাম্পত্য, মানুষের অন্তর্জীবন দেখেছেন মমতায়, রসিকতায়। সামাজিক মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসহায়তা তাঁকে আন্দোলিত করেছে নানান তন্ত্রীতে যার ছাপ প্রতিটা গল্পে।

‘পর্যটনের এপাশ-ওপাশ’ পর্বের গল্পে বাঙালী ঘুরতে গিয়ে কি ধরনের বিড়ম্বনা বাঁধায় তার দুর্দান্ত প্রতিফলন। অনন্তবাবু পরিবার সমেত উত্তর ভারত ঘুরতে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ায় মত্ত থাকলেন, বিষয় – কার জন্য এতগুলো লাগেজ হল! তাঁরাও উত্তরভারতের ঐতিহাসিক জায়গা তার ইতিহাস প্রায় কিছুই দেখলেন না, তাঁদের সন্তানরাও কিছুই দেখতে পেল না। অন্য গল্পে প্রকাশক সংস্থার কর্ণধার বেড়াতে গিয়ে একটা কালো ট্রাঙ্ক নিয়ে যান কাজ গুলো হোটেলে সেরে রাখবেন বলে। আরেক গল্পে আন্দামান ঘুরতে গিয়ে দুটি মেয়ে শপিং করতে না পেরে মুষড়ে পড়ে, তারা মনে করে আন্দামান নিকোবর ঘোরার জন্য জায়গা সিলেকশেনটা ঠিক হয় নি। শেষ গল্প ‘পর্যটকের হরেক রং’ এ হুড্রু জলপ্রপাত দেখতে গিয়ে ‘তেলেভাজার দোকানে’ আটকে যায় পর্যটকদের মন, সময় তাদের আগ্রহের একেবারে বাইরে চলে যায় জলপ্রপাত আর তার সৌন্দর্য।

এই চার ডজন গল্পের মধ্যে রয়েছে গভীর সমাজ দর্শন, সূক্ষ্ম সমাজবীক্ষণ, অনুভুতির তীব্র স্ফূরণ। ছোট ছোট ঘটনা একটি তীব্র রেশ রেখে যায়। কয়েকটি গল্পের রম্য বৈশিষ্ট্য অভিভূত হবার মত। খুব স্বল্প পরিসরে পাঠককে চমকে দিয়ে যায় আর একটি বার্তা সামাজিক-মনকে ধাক্কা দিয়ে কোথাও একটা ফিরতে বলে, ফিরতে বলে মানবিক সত্ত্বায়, বোধে। এই নতুন বইটি আবশ্যিক ভাবে পাঠকের মননের খাদ্য জোগাবে। তবে কয়েকটি গল্পের আরো তীব্র হওয়ার, বুনন আরো জমাট হওযার সম্ভবনা ছিল বলে মনে হয়েছে।  মলয়দার ন্যারেটিভ মেকিং বা স্টোরি টেলিং এর নিপুণতার সংগে আমি পরিচিত উপন্যাস এবং ভ্রমণকথা পাঠের সূত্রে, যেখানে গদ্যের পরিধিটা বড় ছিল।  অনুগল্প খুব স্বল্প পরিসরে বিস্তৃতির দ্যোতনা দেয়, অনুগল্পে বিস্তৃতি কম, গভীরতা বেশি। একজন লেখকের ক্ষমতার, সূক্ষ্মতার প্রতিনিধিত্ব করে অনুগল্প, যেখানে এ্কটিও বার্তি শব্দ ব্যবহারের সুযোগ নেই, যতিচিহ্ন পর্যন্ত প্রকান্ড অর্থ বহন করে। এই বইটির মধ্যে প্রতিটা গল্প এক একটি বার্তা, একটি রেশ। একজন অনুগল্পকার বুননের সূক্ষ্মতা দিয়ে তীব্র ভাবে পাঠককে আঘাত করতে সক্ষম, এখন প্রশ্ন হচ্ছে পাঠক হিসাবে আমরা কি পর্যাপ্ত আহত হতে সক্ষম?

 

১। Learn the art of storytelling to tell stories that matter, Acuman Academy Blog. https://blog.acumenacademy.org/art-of-storytelling-tell-stories-that-matter?utm_source=bing&utm_medium=&utm_campaign=&utm_term=skills%20to%20improve%20storytelling&hsa


No comments:

Post a Comment

                                         নদীর পাড়ে  দেহঘর                                                মধুপর্ণা   একটা কোলাজ কে সাজায়,...