Monday, June 1, 2026

 

                                        মংপু থেকে যোগীঘাট  

                                             মধুপর্ণা 

রবীন্দ্রভবন লাইব্রেরীর ধ্যানস্থ রিডিং রুমে মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটি ভিন্ন একটি সূত্রে উলটে পালটে দেখতে হচ্ছিল এপ্রিল মাসের শুরুতে। মনে হল আগে ঘুরে আসি তারপর বইটা পড়ব। মানুষে বাস্তবে ঠাসা আজগুবি দৈনন্দিন থেকে পালানোর একটা রাস্তা বছর দুই আগেই দেখে নিয়েছিলাম, নিউজলপাইগুড়ি গিয়ে হাজির হও, তারপর যে দিকে দুচোখ যায় চলে যাও। একে একে দার্জিলিং, কার্সিয়াং, কালিম্পং, ডেলো, গিড্ডে পাহাড়, মিরিক, গ্যাংটক, পেলিং … কোনো জায়গা পছন্দ হলে আবার সেইখানে যাও। সেন্স অব বিলংগিং এর বেখাপ্পা বোধ মানুষকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। ভুতগ্রস্থ কেউ তার ব্যক্তিসত্ত্বা নিয়ে রেখে আসে দূরে অনেক দূরে। পাহাড়ের বাতাস, তিস্তা, পাহাড়ের উঁচু চওড়া দেয়াল, পথের পাশে গোলাপ, সুদৃশ্য ফার্ন, ঘন সবুজের পাশে ফিকে সবুজ, তারপাশে নিবিড় সবুজ, তারপাশে গাঢ় সবুজ, তারপাশে উদাসীন সবুজ, তারপাশে ব্যাকুল সবুজ … এই রকমারী বুকের ভিতর সহ্য করতে হলে, পিছনের সবকিছু ভুলে যেতে হয়, একশ শতাংশ মনোযোগ দাবী করে পাহাড়, তুমি অর্ধেক হৃদয় নিয়ে পাহাড়ের কাছে যেতে পারবে না। তুমি যে পুকুরের মৎস সেই সব হযবরল তোমাকে ছেড়ে দিয়ে একক হয়ে যেতে হবে। তারপর পাহাড় তোমাকে নেবে, নচেৎ তুমি ছবি তুলে আর মোমো খেয়ে বাড়ি চলে আসবে। এইবার জলপাইগুড়ি থেকে মংপু্র পথ ধরি, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঐ পাহাড়ে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে। মংপু পাহাড় ছেয়ে আছে সিনকোনা গাছে আর এই ঔষধি থেকে কুইনাইন প্রস্তুত করার প্ল্যান্টেশন, পুরাতন কারখানার পরিত্যক্ত ঘর গুলো রয়েছে গায়ে লেখা সাল তারিখ। তার পাশে নতুন ঘর। ড শ্রীমনমোহন সেন ছিলেন সেখানকার কেমিষ্ট। তাঁর স্ত্রী মৈত্রেয়ী দেবী।  ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটির লেখক। বইটি পড়তে গিয়ে মনে হল, থাক, আগে ঘুরে আসি, তারপর। শৌখিনতা বলতে এইটুকুই। একটা বইকে যে সূত্রে জানি সেই সব ঘুরে এসে পড়ে একটা সামগ্রিকতা তৈরি করে সন্তুষ্টি নির্মাণ।  

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রাম্বি, রাম্বি থেকে মংপু। গুরুদেব গিয়েছেন সেই গ্রামে, থেকেছেন। ঠান্ডা হাওয়ায় বাঁকা রাস্তা বেয়ে যেতে যেতে শিহরণ হচ্ছিল। শান্তিনিকেতনে কৈশোর থেকে তাঁর নির্মিত আবহাওয়ায় থেকে যে রবীন্দ্রপক্ষপাত তৈরি হয়েছে, সেই পক্ষপাত উদযাপনের। তাই তিনি যেখানে গেছেন থেকেছেন, সেইসব জায়গায় যেতে যেতে যাবার রাস্তায় কিছু একটা কাঁপতে থেকে ভিতরে। রাম্বি থেকে যাবার পথে এক আর্কিটেকচারের ছাত্রের সঙ্গে দেখা, নেপালী ছাত্র কলকাতায় পড়াশোনা করে, বাড়ি ফিরছে সে। ‘ট্যাগোর’ এর মিউজিয়াম দেখতে যাচ্ছি কিনা জিজ্ঞেস করল তারপর গড়াতে গড়াতে কথা এগোয় সারা রাস্তা জুড়ে, স্থাপত্যের ছাত্র হিসাবে সে কলকাতায় ‘বিল্ডিং হপিং’ করেছে বিস্তর, সোলো ট্রাভলিং কেন করি তার এই প্রশ্নের সদুত্তর আমার কাছেও নেই। এটা সেটা বলে তাকে বোঝাচ্ছিলাম না নিজেকেই বোঝাচ্ছিলাম জানি না। ওখানে ট্রি হাউস রয়েছে ওখানে থাকতে পারো, হ্যাভ আ নাইস ট্রিপ বলে হেসে মাঝরাস্তায় গন্তব্যে নেমে গেল ছাত্রটি। নালিদাড়া তে নেমে দিঞ্চেন মনেস্ট্রি সেখানে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীর সংগে কথা হল কিছুক্ষণ, তিনি একটি ছবি দেখিয়ে বললেন ইনি এই বিহার প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি বলে গেছেন তাঁর পরবর্তী জন্ম কোথায় হবে, তিনি দেহত্যাগ করেছেন এরপর ভুটানে জন্মাবেন। তিনি বুদ্ধের প্রসাদ দিলেন একটা বিস্কুটের প্যাকেট। আমরা সমতলের বাঙালীরা এই ধরনের প্রসাদের সংগে পরিচিত না, কয়েকমাস আগে কার্সিয়াং এ এক মনেস্ট্রিতে সেদিন সুগন্ধ পূর্নিমার পুজো, সুগন্ধ দিয়ে উপচার দেওয়া হবে ভগবান বুদ্ধকে। চা বাগানের উপর চাঁদ উঠেছে, পাহাড়ের গা বেয়ে পিছলে পড়ছে জ্যোৎস্না, চাঁদ গলে গলে পড়ে যাচ্ছে সালভাদর দালির ছবির মত। আমার ঘরটি ভেসে যাচ্ছে আলোয়, যথারীতি নোটবুকটিতে লিখে যাচ্ছি কিছু। ‘সুগন্ধ পূর্নিমা’ সেদিন। চাঁদের আলোয় পাগল হয়ে গিয়েছিল একটি লোক – এইরকম একটা গল্প শুনেছিলাম শৈশবে, লুনাটিক , চন্দ্রাহত। সেদিন মধ্যরাতে চা বাগানে ঘুরে বেড়াতে পারলে আমিও বোধকরি হারিয়ে ফেলতাম সামাজিক পরিচিতি, আত্মবোধ। আত্মরক্ষা হয়েছিল হোমস্টের রুমে বসে লিখছিলাম বলে, জানলা খোলা, বাইরে মাতোয়ারা জ্যোৎস্না, পাহাড় গুলো আলোয় ভিজছিল চুপচাপ, পাহাড়ের গায়ে গায়ে গাছ গুলো আলোয় ভিজে একাকার। সেই নিস্তব্ধ আলোর মেহফিলে একটি মাত্র বার্তা ধ্বনিত হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে কে কাহার! আবিদা পারভিনের একটা গানে শুনেছিলাম একটা লাইন, ইয়ে হোশ কি দুনিয়া মে মুঝে তামাশা না বানা, তুনে দিবানা বানায়া তো মে দিবানা বানা।

যাক গে, সেদিন বৌদ্ধবিহারটিতে সামনের চাতালে লোহার পাত্রে আগুন জ্বলছে তার উপর চওড়া একটা পাত্র থেকে ধোঁয়া আসছে, ঝাঁঝালো সুগন্ধ। পাহাড়ের নানা শিকড় পাতা দিয়ে প্রস্তুত এই সুগন্ধী দ্রব্য। পাশে রাখা আছে মন্ড, সবাই চামচ দিয়ে কিছু মন্ড নিয়ে আগুনের উপর রাখছে। সেদিনের নিবেদন সুগন্ধ। সেইখানে দেখেছিলাম বুদ্ধকে দেওয়া হয়েছে বিস্কুট, চিপস, এমনকি কোল্ড ড্রিংস। শান্তা নামের একজন বুদ্ধ ভক্তের সংগে কথা হয়েছিল সেদিন, প্রসাদ দেখে আমার অবাক হতে দেখে তিনি হাসলেন, বললাম, আমরা প্রসাদ বলতে ফল, মিস্টি ,চিড়ে, দুধ পায়েস এইসব জানতাম। তারপর এই নিয়ে কথা হল অনেকটা, তিনি বললেন আমরা প্যাকেট খুলে দিই না, ফল কাটিও না। সেইসবি মানুষজনকে দেওয়া হয়। শান্তিনিকেতনে ফিরে ভান্তেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই বিষয়ে, তিনি বললেন, মহাযান, হীনযানদের প্রথা ভিন্ন। ভান্তের কাছে বৌদ্ধ ধর্ম আর চর্চা সম্পর্কে বহুসময় আলোচনায় জেনেছি নানা কথা, দীপঙ্কর শমন, আগে দাদা বলে ডাকতাম, তারপর মনোরঞ্জনদা বলেছিলেন, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কেউ দাদা বলে ডাকে না, ‘ভান্তে’ বলে ডাকতে হয়। এতদিন ভান্তে কিচ্ছু বলেন নি, দাদা বলেছি উনি দিব্যি সাড়া দিয়েছেন। তারপর যেদিন ভান্তে বললুম, সেদিন হা হা করে হাসলেন। 

তারপর, যোগেন ছেত্রী যিনি মংপু মিউজিয়াম সংলগ্ন গেস্ট হাঊসের কর্মী তাঁর সহায়তায় দুদিনের জন্য মিলল গেস্ট হাউসের ক্ষণিকা ঘরটি। এই দুটো দিন মূলত ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটি পড়ার প্রস্তুতি। বয়স বাড়ার এই একটা সুবিধা, ইম্পালসিভ কিছুই আর ভাল লাগে না। কিছু গ্রহণ করতে গেলে প্রস্তুত হতে হয় সবদিক থেকে। মৈত্রেয়ী দেবী মূলত রবীন্দ্রনাথের ঘরোয়া আটপৌড়ে দিকটি নিয়ে লিখেছেন। যে উচ্চতা নাগাল যোগ্য নয় সেই কবি জীবন যাপনে কেমন ছিলেন সেইদিকটি ধরা পড়েছে। হেমলতা ঠাকুর এই বই সম্পর্কে লিখেছেন,

“জগতে পূজিত নিত্য বাণীর সাহিত্য

মংপুতে রবীন্দ্রনাথ অমর সাহিত্য”

এই পদ্যের শেষ দুটি লাইন, আহা ! অনন্য……।

বুদ্ধ-সুজাতা যেন খৃষ্ট-ম্যাগডলিন

রবীন্দ্র-মৈত্রেয়ী নাম যুক্ত চিরদিন।

 নন্দন আর্ট গ্যালারীতে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের একটা প্রদর্শনীতে পাহাড়ের কিছু ছবি চোখে আঁটকে গেছিল। একজন অন্ধ আর্টিস্ট কিভাবে পাহাড়কে অনুভব করেছেন, একজন কবি কিভাবে পাহাড়ে থাকলেন সেইসব দেখেশুনে পাহাড়ে গিয়ে গা ছমছম করে। সেই একই পাহাড় একশ বছর আগের, আশি বছর আগের আর আজ যাকে দেখতে ভূতগ্রস্থের মত ঘুরে বেড়াচ্ছি। খাড়া পাইন গাছ, গাছেরা অদ্ভুত শান্ত, পাহাড় যোগীর মত সুন্দর, মেঘ এসে ছেয়ে যাচ্ছে যেন ‘যোগীর গায়ে ভস্ম মাখা’ মানুষের জঙ্গলে নির্বাসিত আমি আর্তনাদ করি, আমাকে ফেরত নিয়ে নাও। যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিও না। আবার জন্ম দাও তোমার কন্যা করো। বন্ধু ভ্রাতা সুমন কল্যান বলত, যোগ বলতে কি বোঝো তুমি? বিচ্ছিন্ন হয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যানমুদ্রায় বসে থাকা? যোগ মানে যোগাযোগ দিদি। এই কথাটা বোধগম্য হয় যখন ভিতরে বাহিরে বহে বাতাস, পাহাড়িয়া বাতাস।

 বৃষ্টি বাদলের জন্য ট্রী হাউস বন্ধ। সিঙ্কোনা গাছে ভর্তি মংপু গ্রামটিতে সারি সারি পাইনের পাশ দিয়ে যে বাঁকা পথ চলে গেছে সেইখানে রবিঠাকুরের মিউজিয়াম। মৈত্রেয়ী দেবীর যে বাংলোয় তিনি ছিলেন সেইটিই এখন সংগ্রহশালা। বাইরে একটি ভাস্কর্য, দূর থেকে দেখে মনে হয় কাঁচা মাটির, পালিশ নেই যেন, ইম্পার্ফেকশনের খর সৌন্দর্য্য। আবক্ষ রবিবাবু দাঁড়িয়ে আছেন, ধ্যানমগ্ন তার অবয়ব। তার সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলি, তোমার ইস্কুল থেকে এসেছি, চিনতে পারছো না আমায়! তুমি নারীশিক্ষার প্রথম যুগে মেয়েদের জন্য প্রদীপ জ্বেলে দিলে, হস্টেল গড়ে দিলে শ্রীসদন, সেই আলোয় সেইখানে পড়লুম সেই হস্টেলে থাকলুম, বড় হয়ে তোমার তৈরি মেয়েদের হস্টেল নিয়ে কত কি লিখলুম, বলে বেড়ালুম, আর তুমি চিনতেই পারছ না! ব্যবধানটা কিসের জানো? সময়ের। আমাদের টাইম মেশিন নেই, থাকলে তোমাকে বলে আসতুম অনেক কথা। তোমার ইউনিভার্সিটি টাউনে কতকত বছর কাটল, সেইখানেই স্থায়ী বাসিন্দা এখন, তোমাকে নতুন করে দেখবো বলে এতদূর আসা। নতুন জায়গায় চেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ ভিন্ন তাই না? … তারপর পাশে কাঠের বাংলো। কতকগুলি কক্ষ। কাঠের মেঝে সুসজ্জিত চারিদিক। অনেক ছবি, অনেক স্মৃতি। সামনে রবিঠাকুরের ছবি চেয়ারে সাদা কাপড়ের ওপর রাখা। তাঁর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বেশিক্ষন তাকানো যায় না। মনে হয় মন, মনন, চিন্তন সবই তিনি দেখতে পাচ্ছেন জলের মত স্বচ্ছ। একটা তামার পাতে তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা তিনটি ভাষায় লেখা, বাংলা, ইংরেজি, নেপালী। পাশের কক্ষে চেয়ার টেবিল আর ব্যবহৃত কিছু ওষুধের পাত্র। এই আসবাব গুলো বাবামশাই এর জন্য রথীন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন। পাশের ঘর গুলিতে অনেক ছবি, তথ্যসমেত। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে থমকে যাই দরজার উপরে একটি লেখা দেখে, ‘প্রজাপতি সেতো বছর গোনে না/ নিমেষ গনিয়া বাঁচে’… অমলিন আনন্দ কাকে বলে তার সংজ্ঞা জানিনা, তবে কিছু মুহুর্তের অনুভব হৃদয়প্লাবী। আনন্দ হয়। জীবনানন্দ।  কলকাতার বাঙালী একটি পরিবার ও সেইসময় সেখানে ছিল, আলাপ হল, তারপর কথায় কথায় আলাপ এগোয়, রবিঠাকুর সেই সাধক যোগী পরশমনি, যা ছুঁয়ে দেন সোনা হয়ে যায়। ভদ্রমাহিলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সুবাদে সখ্য হয়ে যায়, তিনি কয়েকটা ছবি তুলে দেন একা ঘুরি ছবি তোলার কেউ নেই বলে। তারপর বাইরে বাগানে এসে বসি, একটা প্রার্থনা সর্বদাই মনের ভিতর চলতে থাকে, পাহাড় মূলত প্রার্থনার জন্য যাই, সদা সর্বদা মনের একটা অংশ কিছুর দিকে নিবিষ্টমনে চাহিয়া থাকে। স্থির অনিমেষ। মংপুতে রবিঠাকুরের মিউজিয়াম দেখা সেই প্রার্থনার একটি উদযাপন। দূরে পাহাড়, তারও দূরে মেঘ নীলাকাশ, কাছে কতগুলো ঘর, তারও কাছে কতগুলো গাছ, ভূতগ্রস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। অনন্তকাল পেরিয়ে যায়। সময় বয়ে যায় হু হু করে, যেন এই পৃথিবীর সঙ্গে আমার সকল সম্বন্ধ চুকে গেছে, এখন ভেসে যাচ্ছি দেহের নৌকা ছেড়ে হাওয়ার নৌকায়। মেঘ সরে সরে যায়, আকাশ ঢাকে আবছা আঁধারে, ধীরে ধীরে একটি দুটি আলো জ্বলে ওঠে পাহাড়ের গায়ে, শিহরণ হয়। গুটিশুটি  ক্ষণিকা ঘরে গিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। মনে হয় মায়ের গর্ভের ভিতর ঘুমাচ্ছি যেন। পাহাড় চারিদিকে, গায়ে গায়ে জোনাকীর মত আলো, মলয় বাতাস, রবিঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত পাহাড়, আনন্দ চাদরের মত জড়িয়ে থাকে। গেস্ট হাঊসের ঘর গুলোর নাম ক্ষণিকা, সোনার তরী, পুনশ্চ ইত্যাদি। বারান্দায়, ডাইনিং এ রবীন্দ্রনাথের সুদৃশ্য ছবি। কুইনাইন ফ্যাক্ট্রির পরিত্যক্ত ঘর, তার উল্টোদিকে নতুন ঘর, সিঙ্কোনা, কুইনাইন, মৈত্রেয়ী দেবী, ড মনমোহন, রবীন্দ্রনাথ, মংপু, শব্দ গুলো তন্দ্রার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিভাবে একটা পাহাড় মোহময় হয়ে উঠেছে বাঙালীর চেতনায় রবীন্দ্রনাথের স্পর্শে… সেইখানে গভীর নিদ্রাচ্ছন্নতা কতটা অতল আমার ভাষা নেই প্রকাশের। রবীন্দ্রনাথ এখনও ইন্দ্রজাল বিছিয়ে রেখেছে সারাবিশ্ব জুড়ে। অসুন্দর যাকে আক্রমণ করেছে তার যাবার জায়গা একটাই রবীন্দ্রনাথ, অন্তত যারা শান্তিনিকেতনে বড় হয়েছি, কেটেছে কৈশোর, তারুণ্যবেলা। তাদের উপশমের একটাই জায়গা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গান তাঁর কবিতা তাঁর কথা তাঁর ছুঁয়ে যাওয়া জায়গা মেখে নিতে হয়। অসৌন্দর্য্যের আঘাত বড় কঠিন, বড় ক্রুর। যে ভেঙেছে বাস্তবের আঘাতে তাকে জোড়া দেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর ফিরে এসে ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইতে পেয়ে যাই সেই কয়েকটা লাইন, যে গুলো খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম বহু বহু বছর ধরে …

দুঃখ পেয়েছি দৈন্য ঘিরেছে অশ্লীল দিনে রাতে

দেখেছি কুশ্রীতারে,

মানুষের প্রাণে বিষ মিশায়েছে মানুষ আপন হাতে

ঘটেছে তা বারে বারে।

তবু তো বধির করেনি শ্রবণ কভু,

বেসুর ছাপায়ে কে দিয়েছে সুর আনি,

পরুষ কলুষ ঝঞ্ঝায় শুনি তবু

চির দিবসের শান্ত শিবের বাণী।

এক একটা শৈল শহরকে ব্যক্তির মত মনে হয়। চলে আসার দিন এক বিমূর্ত সত্ত্বাকে বলে আসি, এবারের মত আসি। যদি জিজ্ঞেস করো, কে আমার বন্ধু? বলব, কার্শিয়াং শহরটি, পেলিং এর নীল পাহাড়, ছোট মেয়েটির লাল ছাতা, বলব জোনাকীর মত জ্বলে থাকা আলো পাহাড়ের গায়ে গায়ে, বলব রিয়াং নদীর জল। বলব মংপুতে কাকভোরে পাইনের নিস্তব্ধতা। মংপু থেকে পনের কিলোমিটার দূরে যোগীঘাট। নেপালী এক দাদার গাড়িতে রওনা হই, দাদা রাস্তায় গাছ চেনালেন বিস্তর, অধিকাংশই ঔষধী। কুইনাইনের সারি, অকছর গাছটি দেখে দাদাকে দাঁড়াতে বলি অদ্ভুত সুন্দর, গাঢ় সবুজ ছোঁচালো তার ঝাঁক ঝাঁক পাতা, আর সাদা ফুলে সারা গাছ মাতোয়ারা। ‘ফলিয়েজ’ শব্দটা ঘন হয়ে বসেছে সেখানে। গাছটি বেশ ব্যক্তিত্বময়। পাতায় ফুলে বলিষ্ঠ শাখা প্রশাখায় তার প্রেসেন্স বেশ দৃঢ। নেপালী দাদা বলেন, খুবসুরত লেকিন কুছ কাম পে নেহি আতা হ্যায়। একচোট হাসি হয়। তারপর যোগীঘাট। শিবের এক উপাসক এই রিয়াং নদীর তীরে সাধনা করেছিলেন, সেই থেকে নাম তার যোগীঘাট। স্থানমাহাত্ম্য কিভাবে তৈরি হয়। ঘটনা, ব্যক্তি আরো কতকি এক একটা জায়গাকে বিশেষ করে তোলে। গতমাসে গেছিলাম রাঢ উৎসবে জয়দেব কেন্দুলি। একজন কবি জয়দেব, একটি বই গীতগোবিন্দম। একটা বই একজন কবি কিভাবে একটা জায়গাকে বিশেষ করে তুলেছেন, যেখানে লক্ষ লক্ষ লোক সমাগম পৌষ সংক্রান্তিতে। সুধীর চক্রবর্তী এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন যে একটা জায়গার নাম কিভাবে একজন কবির নামে বদলে যায় যেখানে বাসওয়ালা, কেন্দুলি বাদ দিয়ে জয়দেব বলে হাঁকতে থাকেন যাত্রী টানার উদ্দেশ্যে। মংপুতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাই ব্যক্তিগত ভাবে  জায়গাটি বিশেষ, হয়তো বাঙালীর কাছেও তাই, মৈত্রেয়ী দেবীর বইটিও তার একটি বড় কারন। সেই সময়, সেই দৃষ্টিকে ছুঁয়ে দেখতে হাজির হন পর্যটক। যোগীঘাটে গিয়ে পুরোনো অভ্যাসে যোগীর নাম ধাম ঠিকানা গল্প জানতে চেষ্টা করি, এইটুকু শুধু জানতে পারি, শিবের উপাসক একজন এই রিয়াং নদীর তীরে পাহাড় ঘেরা  সুনিবিড় জায়গায় সাধনা করেছিলেন সেই থেকে তারা নাম হয়েছে যোগীঘাট। আর কোনো তথ্য পাই নি নানাজনকে জিজ্ঞেস করেও। সেই অজানা অচেনা কোনো যোগীর উদ্দেশ্যে মন ছুটে চলে যায়। তিনি পরিচিতির ভার রাখতে চান নি হয়তো, যে পরিচিতি যিনি জীর্ণ বস্ত্রের মত ত্যাগ করে, সামাজ সংসার ছেড়ে একান্তে যোগ সাধনা করেছেন তার পরিচিতি কেনই বা বৃথা খুঁজতে যাওয়া ! কিন্তু তাকে ভোলে নি রিয়াং নদী, ভোলেনি পাহাড়, ভোলেনি রিয়াং নদীর পাথর আর জল। ভোলে নি জনমানস, জায়গার নাম রেখেছে যোগীঘাট। যে ব্যক্তিসত্ত্বা তিনি মুছে দিয়ে হয়েছিলেন যোগী, জায়গার নামটিও ব্যক্তি সাপেক্ষ নয়। বৃহৎ ব্রীজের পাশে একটি পুরোনো পরিত্যক্ত কাঠের ব্রীজ। সময়ের ব্রীজ হয় না? দুটো জায়গা যেমন জুড়ে দেয় ব্রীজ তেমনি দুটো সময় জুড়ে দিতে পারে না কোনো সাঁকো? যদি যোগীঘাটে গিয়ে দেখতে পেতাম কোনো এক যোগী সেখানে ধ্যানমগ্ন। তাঁর আত্মার সুগন্ধে মৌ মৌ করছে চারিদিক। তখন রাত নটা, শুনশান চারিদিক। ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, একদিকে পাহাড়ের আঁধার দেয়ালে মিটমিট করে জোনাকির মত আলো জ্বলছে, আরেকদিকে পাহাড়ের বৃহৎ অবয়ব দেখা যায় আলো নেই একটাও, নীচে জল বয়ে যাবার আদিম শব্দ, গাছগুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত মগ্নতায়। একটা দুটো কুকুর ঘোরাঘুরি করছে, যে গুটিকয় দোকান তাদের পাল্লা বন্ধ হয়েছে ইতিমধ্যে। মনে হল এই অন্ধকার ব্রীজটা হেঁটে পেরিয়ে গেলে শুধু নদীর ওপারে নয়, পৌঁছে যাব ভিন্ন একটা সময়ে। হঠাৎ দেখা হবে সেই যোগীর সঙ্গে যিনি নাম ধাম মুছে দিয়ে, জাগতিক বিন্যাস ডিঙিয়ে চলে গেছেন অন্যপারে। মানুষেরা বানিয়েছে সাঁকো, তুমি বানিয়ে যেতে পারতে সময়ের সাঁকো যাতে তোমার কাছে পৌঁছে যাওয়া যায় – এই কথা তাকে বলতাম। স্থান আর সময়ের বাঁধনে আটকে থাকা মানুষকে দিতে একটা পাখনা যাতে সে সীমা পেরিয়ে যেতে পারত যেখানে তার খুশি। যোগী নেই, তার না থাকাটা বড় প্রকট সেই নদীর স্বচ্ছ্ব জলে, পাথরে আর নিস্তব্ধতায়। অনুপস্থিতিকে প্রকান্ড করে দিয়ে গেছে যোগী মুছে দিয়ে ঠাঁই ঠিকানা তার। সেই অনুপস্থিতিই যেন একটা সাঁকো, থাকা না থাকার মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটুকুই সাঁকো। পাথরের ওপর বসে আছি লিখছি রোজের মত - ‘কুশ্রীতার’ বিপরীতে কেমন জেগে থাকে ‘শান্ত শিবের বাণী’ কেমন সাধারন দৈনন্দিনের  হয়ে ওঠে ‘চির দিবস’। কেমন করে ‘দুঃখ’, ‘অশ্লীলতা’র বিপরীতে সৌন্দর্য্য আছে, কেমন করে পৃথিবীর রণরক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়। মনে হল মিশে আছে যোগী সর্বত্র আর তার ধ্যানের ফলাফল। অন্বেষনের অমূল্যরতন রেখে দিয়েছেন তিনি বাতাসে হীমে, আকাশের নীলে, গাছের সবুজে, জলের স্বচ্ছ্বতায়, রাত্রির নিস্তব্ধতায়, পাহাড়ের প্রশান্তিতে, সকালের নৈঃশব্দে। একদিন থাকার কথা, তিনদিন থেকে গেছি স্রেফ কিছু  না করে, হোমস্টে তে গিয়ে ঘুমিয়ে আসছি, খেয়ে আসছি এসে বসে থাকছি নদীর পাথরে, জলে ঘুরে বেড়াচ্ছি, ব্রীজে হেঁটে বেড়াচ্ছি। ভূতগ্রস্থ অবস্থা। একটা জায়গা এইভাবে প্রভাবিত করবে ভাবিনি। একটা পদ্যের লাইন আছে জানো!

“ছাই হয়ে গিয়ে তবু বাকি যাহা রহিবে

আপনার কথা সে তো কহিবেই কহিবে”

একটা সুফিগানে শুনেছিলাম, আপনি জ্বলতি চিতা মে হাত ডালা, খুদকো নিকাল লিয়া… মাটি তন সে ঝারি… বড়া বাওয়াল কিয়া…। চিতা থেকে উঠে আসার শক্তি যার আছে, ছাই ভস্ম থেকে যা বাকী থাকবে সে নিজের কথা বলবেই।

  মুখিয়া হোমস্টের মালিক অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি, বললেন, আপ বেটি জ্যায়সি রহিয়ে, তারপর নীচের তলার দোকানের একজনের কাছে শুনলাম, তাঁর কন্যা ইস্রায়েলে পড়তে গিয়ে গাড়ি দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। শোকে তিনি স্থাপন করেছেন এক শিব মন্দির। স্ত্রী পুত্র পুত্রবধূ নিয়ে হোমস্টে চালান। তারপর, আলাপ হল এক নেপালী দাদার সঙ্গে। উইমেন্স স্টাডিজ পড়েছি শুনে আলোচনা গড়াল কিছুদুর, পাহাড়ের মেয়েদের অবস্থা, অবস্থান, সরকারী উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয়ে বলছিলেন তিনি। হিঊম্যান স্টাডিজ নাকি ওম্যান স্টাডিজ জিজ্ঞেস করলেন এইভাবে… এইচ না ডাব্লিঊ? আমি বললাম ডাব্লিঊ। তারপর থেকে নারীর প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহার করলেন ডাব্লিঊ। হামলোগ লছমি কি তরা ট্রিট করতে হ্যায় বেটিলোগোকো, লেকিন সাদিকে বাদ উন লোগোকো আচ্ছা লাইফ নেহি মিলতা - তিনি বারবার উল্লেখ করছিলেন মেয়েদের মানসিক সমস্যার কথা। কিভাবে বিবাহের পর, সংসারের চাপে, প্রসূতি অবস্থায় তাঁরা মানসিক অবসাদে ভোগেন। কিভাবে সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে মর্যাদার চাপে থাকতে হয়, কিভাবে সেজে গুজে ফিট থাকতে হয় স্বামীর মনোযোগ পেতে। কিভাবে সমাজের চোখ তাদের তাড়া করে ফেরে। সবশেষে বললেন, তাঁর স্ত্রী ছেড়ে গেছেন তাকে মাস দুয়েক আগে অন্য কারোর সংগে ঘর বেঁধেছেন,  আর তিনি পাঁচ বছরের মেয়ে নিয়ে দোকান সামলাচ্ছেন। সবশেষে উপসংহার হিসাবে বললেন, ‘নারী চরিত্র দৈব না জানে’। বললেন, ইয়ে এড কিজিয়ে আপকে স্টাডি মে। আমিও হাসতে হাসতে বললাম, জী দাদা। সকালে ফেরার সময় বিদায় জানাতে তিনি আবারো বললেন, ইয়াদ রাখিয়েগা, নারী চরিত্র দৈব না জানে!

যদি পাহাড় জিজ্ঞেস করে, কন্যা তুমি কি আশায়?

যদি পাহাড় জিজ্ঞেস করে, কারণ কি?

নতজানু আমার একটিমাত্র উত্তর

দৃশ্য নয়, বস্তু নয়

অনুভব খুঁজিয়া বেড়াই

পৃথিবী হাতড়ে এখন ঈশ্বর খুঁজিয়া বেড়াই।

No comments:

Post a Comment

                                         নদীর পাড়ে  দেহঘর                                                মধুপর্ণা   একটা কোলাজ কে সাজায়,...