নতুন
শৈল শহর আর বৃষ্টির দিন
মধুপর্ণা
ভরা
বৃষ্টির দিন সেদিন, যাকে বলে একেবারে ‘বাদলা করিয়াছে’, মেঘ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছে তুমুল।
ঝমঝম ঝমঝম একটা রিদমে বৃষ্টি পড়ছে, বৃষ্টির ধোঁয়ায় চারপাশ মুছে গেছে যেমন করে লেখা
শেষে শ্লেট মুছে দেয় বালিকা। সেই সর্বৈব নেই এর ভিতরে শৈল শহর পেলিং এ একটা বন্ধ দোকানের
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। একটা কুকুর নিশ্চিন্তে পাশে ঘুমোচ্ছে, একজন করমচার ঝুড়ি নিয়ে
বসে আছে, বৃষ্টি শেষে বিক্রি করবে বলে, ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে, যেন সিনেমার পর্দা উঠে
গেছে, এইবার সামনে দৃশ্য, শব্দ আর চলনশীল সবকিছু। গাছের পাতা গুলো বৃষ্টি ফোঁটায় তখনও
চমকে চমকে উঠছে। ভিজে রাস্তা বেয়ে হেঁটে যাওয়া নেশার মত, পথের পাশে ফার্ণ, নাম না জানা
গুল্মলতা, তাতে বেগনি রঙের ফুল। দুলে উঠছে বাতাসে। দোকানীরা দোকান পাতছেন ফের, ছাতার
তলায় উনোনে ভুট্টা পুড়ছে, চায়ের কেটলি দিয়ে সাপের জিভের মত ধোঁয়া, কুকুরগুলো উৎসাহ
পেয়ে কিছুটা হাঁটছে, তারপর ছুটছে অকারণে। হাওয়া দিচ্ছে খুব। গাছপালারা ভিজে গিয়ে বেশ
ফুর্তিতে রয়েছে তাদের দেখে বোঝা যায়। পাখিরা নেমে এসেছে মাটিতে কয়েকটা, কি যে ব্যস্ততা
তাদের, কিসের যে আনন্দ! ঘুরে ঘুরে এটা সেটা দেখছে, ঠোঁট দিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছে, আবার ঘুরে
আসছে এদিক সেদিক, শৈল শহরের অলি গলি হেঁটে বেড়ানোর ভিতর কি যে একটা সুখ আছে সে জানে
সে জানে, যে জানে না তার কাছে বৃথা, ব্যার্থ সময়, কেবল পরিশ্রম। জলের সরু ধারা তখনও
রাস্তা বেয়ে চলে যাচ্ছে। রঙিন ছাতা নিয়ে খোকা বেড়িয়েছে মার সঙ্গে। পায়ে তার নীল রঙের
জুতো। যে দৃষ্টিতে সে পৃথিবীকে দেখে কিছু না জেনে না বুঝে, ঐখানে ঈর্ষা আছে আমার। সাদা
পাতা খানি ভরে যাবার আগের দেখায়। শৈল শহর গুলিতে বৃষ্টি শেষে একটা ব্যস্ততা শুরু হয়,
চারিদিক ঝটপট করে কিছুক্ষনের জন্য। তারপর আবার একটা ছন্দ ফিরে আসে। হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর
চলে যাই, ঘরদোর, মানুষের মুখ, সারল্য, হাসি, আনন্দের ঝিলিক। শাক্য গুম্ফার তরুণ সন্ন্যাসী।
তার কাছে নিবিড় সময়। মনেস্ট্রি ঘুরে ঘুরে দেখান। প্রশান্ত তার উপস্থিতি। দেয়াল জুড়ে
ম্যুরাল, ভাষা জানা নাই, তংখা পেইন্টিং বিষয়ে এটা সেটা কথা। মনেস্ট্রির দেয়াল গুলো
একটা জগত, রঙের, দর্শনের, মনস্তত্ত্বের। অজানা ভাষার বই হাতে যেমন একলা হয়ে যায় পাঠক
তেমনি দেয়ালের সামনে একলা দাঁড়িয়ে থাকা। গত দেড় বছরে কুড়ি থেকে পঁচিশটি বৌদ্ধ গুম্ফা
ঘুরেছি। দেয়ালে কতশত ছবি, সন্ন্যাসীদের সমাহিত মুখ, বৌদ্ধ দেবী তারা উইশ পন্ডে কত শত
পতাকা, কিচিপিডি লেকে খেলে অসংখ্য মাগুর মাছ, বনঝাকরি ঝর্ণার জল, হাঁটতে হাঁটতে কুয়াশায়
কুয়াশায় দূর থেকে আরো দূর, তারপর বহুদূর, ছোট চায়ের দোকান, বিনুনি বাঁধা মেয়ের স্কুল যাবার দৃশ্য, অর্কিড কতরকমের, লোমশ কুকুর দুলে
দুলে হেঁটে যায়, দূরের নেশা বড় তীব্র, এক পাহাড় থেকে দূরে আরো পাহাড়, দিনের বহুভাগে
সবুজ পাহাড় হয়ে গেল, মেঘে মেঘে সাদা, তারপর রোদ এসে দিয়ে গেল ভিন্ন রং, তারপর বিকেলে
সে পাহাড় হয়ে যায় নীল, তারপর সন্ধ্যায় কালো পাহাড়ের গায়ে জ্বলে ওঠে ছোট ছোট আলো। এক
একদিন বসে থাকি চুপ করে, শৈল শহরের কোনো এক নির্জন কোনে, একেবারে চুপ। শুধু দৃশ্যের
সঙ্গে লেনদেন। শব্দের সঙ্গে। আর নৈঃশব্দের সঙ্গে। প্রতিটা শহরের সাঊন্ডস্কেপ আলাদা,
প্রতিটা শহরের সন্ধ্যা, সকাল আলাদা, মাঝে মধ্যে এক একটা মিছিল, শোভাযাত্রা পেরিয়ে যায়।
স্যুভেনিরের দোকান গুলো ঘুরে আসি। বৃষ্টি শেষে রামধনু ওঠে, একেবারে শিশুদের কালারিং
বুকে ছবির মত দুইপাহাড়ের মাঝাখানে রামধনু। লোকজনের দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে যায় তারপর আবার
যে যার কাজে। কারো চোখে ফের আনন্দ, কারো চোখে দায়িত্ব, কারো চোখে মায়া। নতুন শহরে সবাই
অচেনা, কি প্রকান্ড স্বস্তি। অচেনা পথের ধার, অচেনা গাছ, অচেনা পাথর, অচেনা পাহাড়ের
ঢাল। নতুন বাতাস, নতুন নদীর জল, নতুন শান্তি। বাঁকা পথ চলে গেছে কতদূর পাহাড়ের গায়ে গায়ে, আকাশের ওপারে আকাশ, মেঘের ওপারে
ঘন মেঘ। তার ওপারে অচেনা কারো ঘড় দোর, উঠোনে ফুলের গাছ, মৃদু ঠান্ডা হাওয়া। হা ঈশ্বর
এই বার মরে গেলে বৌদ্ধবিহারে একটি অশ্বত্থের গাছ করিও। ‘স্থানমাহাত্ম্য’ বাস্তব, কল্পকাহিনী
নয়। পাহড়ে, মনেস্ট্রিতে, সন্ন্যাসীতে মিলে গড়েছে কি এক আবহাওয়া, সেইখানে আনন্দ আছে
উপশম আছে আর আছে বিস্মৃতিমুক্তি। আর আছে ইন্দ্রজাল। যোগাযোগ খুব সূক্ষ্ম, সুর কেটে গেলে নিভে যায়। সোশিও
এস্থেটিক সেন্সিবিলিটি বিষয়ে মোহিত চক্রবর্তীর একটা আর্টিকেল পড়ে অবাক লাগছিল গতমাসে।
এভাবেও ভাবা যায়। নেহাত যাকে রোমান্টিসিজম বলে তাচ্ছিল্য করে কেজো লোক, প্রফেশনালিজম।
যা কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে, গন্ধে গানে… সেইখানে
ফিরে আসে সহৃদয়-হৃদয়সংবাদী। সেইখানে ফিরে আসা যায়।
চশমা, চাবি, ছাতা, চার্জার যদি হারানোর ব্যারাম যদি
না থাকে তাহলে ভাল। কারন এইসকল সরনশীল পদার্থ হারিয়ে হারিয়ে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে এখন
এইসকল জড়দের মাঝে মধ্যে বলতে ইচ্ছা করে, সঙ্গে থাকাটা তোমাদেরও একটা কর্তব্যের মধ্যে
পড়ে, কেবল আমার একার দায়িত্ব নয়। অনিশ্চয়তা, আনসার্টনিটির আর ভয় দেখাতে পারে না, বলি
রোসো বাছা, অনেক করেছ, এইবার তুমি আমার দাস, তোমাকে আর তোয়াক্কা পর্যন্ত করিনে। তারপর
ফিরে আসার রিমাইন্ডার। ঢঙ ঢঙ করে ঘন্টা পড়ে যায়। হাওয়ায় হাওয়ায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে
আসি। তারপর, সমতল। শিলিগুড়িতে চায়ের দোকান খুঁজে যথারীতি বসে আছি। দোকানী চা দিয়ে রিল
দেখতে বসলেন, কয়েক সেকেন্ড পর পর আলাদা শব্দ, আলাদা গান, আলাদা হাসির আওয়াজ, নেতার
হুমকি, চটুল গলার কথা, ভালগার এরস, মধ্যে মধ্যে ডিভাইন কথাবার্তা। অন্যদিকে জানলায়
অর্কিড ঝোলানো, জানলার ওপারে, কে ওপারে? ওপারে বুদ্ধমূর্তি। বুদ্ধ কি অনুমান করতে পেরেছিলেন,
আমাদের রিল আর ডিজে সভ্যতার কথা? জানতেন এই জাহান্নামের আগুন কতটা গরম! তাহলে তাঁর
শান্তির সংজ্ঞা কেমন হত! এ যন্ত্রণা ট্রেনে, পথে, হাটে ও বাজারে। পালাবার পথ নাই।
No comments:
Post a Comment