Friday, August 20, 2021

 

কথাবার্তা ২

ধুপর্ণা কর্মকার

( অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, দশম ওয়েব সংস্করণ, ৫ই পৌষ ১৪২৭, ডিসেম্বার ২০, ২০২০ এ প্রকাশিত। ) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 যা কিছু আমরা স্কুল কলেজে পড়ি না, প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃত নয় সেই সব দক্ষতা, জ্ঞান নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের তাচ্ছিল্য আছে।প্রতিষ্ঠানিক যা কিছু তার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা প্রবল। কিন্তু তার বাইরে যা কিছু চর্চিত হয় তার প্রতি আমাদের সমীহ তেমন নেই। তার একটা বিরাট অংশ দেখা যাচ্ছে নারীর বিভিন্ন দক্ষতা। পিছিয়ে রাখা (পিছিয়ে পড়া বলা যাবে না) মানুষের দক্ষতাকে ধর্তব্যে আনে না বিশেষ কেউ। তার মধ্যে আবার আছে আরাে অবদমিত কেউ। তিনি আর কেউ না। তিনি প্রান্তিক নারী। সার্বিক ভাবেই নারীর কাজ, নারীর অবদান অস্বীকৃত থেকে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। তার যে কাজ গুলো দৃশ্যমান সেখানে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। নারীর শ্রম আমাদের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে ভিতর থেকে। বিপুল কায়িক শ্রম ও সময়ের বিনিয়োগ দিয়ে নারী সভ্যতাকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু তার কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন অংসখ্য কাজ রয়েছে যা সমাজে প্রায় অদৃশ্য বা বলা ভাল আমাদের সমাজ যেন দেখেও দেখে না। কিন্তু তার সুফল ভোগ করে নির্বিকার চিত্তে। বলা বাহুল্য সেই সব তথাকথিত অদৃশ্য কাজ যা নারী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করে আসছে সেইসব কাজই আমাদের সমাজের চালিকা শক্তি। তাহলে সেইসব কাজ স্বীকৃত ও সমাদৃত নয় কেন? এখানেই পিতৃতন্ত্রের রাজনীতি।

 প্রান্তিক নারীর দৈনন্দিন শ্রমের কথা যদি ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে সে যেকাজ গুলো মূলত করে সেগুলো নিয়ে সমাজ বিশেষ ভাবে উপকৃত হয়। সে রান্না করে। প্রতিদিনের খাবার যেমন সে বানাতে জানে তেমনি বছরের নানা সময়ের নানা অনুষ্ঠানের সময় সে হতে পারে পুজোপাৰ্বন বা হতে পারে ঋতু উৎসব তখন আরো নানা বিচিত্র খাবার সে বানায়। পিঠে পুলি, নবান্ন, নাকু , খই মুড়ি । সে জানে ধান থেকে কি কি পদ্ধতিতে নানা ধরনের খাবার বানানাে যায়। ধান বিশেষ পদ্ধতিতে সেদ্ধ হলে তারপর সেই চাল থেকে ভাত হবে। তার পরিবার সন্তান সন্ততিরা তাই খেয়ে রোজ দিনযাপন করবে। ধান থেকে আবার ভিন্ন পদ্ধতিতে চাল হলে তা থেকে মুড়ি হবে। আরো ভিন্ন ভাবে হবে চিড়ে, খই। আতপ থেকে হবে পায়েস। আরো কত কি সে জানে। যা থেকে যুগ যুগ ধরে মানুষেরা, নারীর পরিবার তার সন্ততিরা টিকে আছে। সে সন্তান পালন করে। নানা পরিচর্যায় লালন পালন করে সে গড়ে তােলে , বড় করে তার সন্তান। এই লালন পালনকে “মেয়েলি" কাজ নাম দিয়ে হেয় করে আসছে। কিন্তু এই লালন পালনের দক্ষতার মাঝেই টিকে আছে আমাদের চলমান সমাজ। সে ঘরদোর সাফসুতরো করে, নিকোয়, ঝাঁট দেয়। সচল রাখে গৃহস্থালী। এই অত্যন্ত সহজ, স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া কাজ গুলো গুরুত্বহীন ভাবে দেখা হয় তার কারন এগুলো করে একজন নারী। নারী সম্পর্কিত যা কিছু সবকিছু হেয় করে দেখলে পিতৃতন্ত্রের অসুস্থ অহং তৃপ্ত হয়। নারীর ওপর আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষায় পিতৃতন্ত্র অযুক্তির পরম্পরা নির্মাণ করে আর তা সমাজে লাগু করে। সে সময় পেলে ছবি আঁকে ঘরের দেয়ালে। তাকে যথাযথ শিল্প হিসাবে স্বীকার করা হয় না। যেন নিতান্ত সময় কাটানোর জন্য কিছু গুরুত্বহীন কাজ। সেলাইকে শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি পেতে অনেক সময় লেগেছে। তার একটাই কারন সেলাই এর মাধ্যমে শিল্প তৈরি করে মূলত মেয়েরা। এইভাবে দেখা যাবে যা কিছু কাজ নারী করে ও যা কিছু কাজ নারী সম্পর্কিত সেইসব নিয়ে এক ধরনের তুচ্ছ তাচ্ছিল আছে। সেই কাজগুলাে যা মূলত চালিকা শক্তি। তাকে গুরুত্ব দেওয়া না হোক স্বীকার করলেও নারীকে শক্তিশালী করে তােলা হবে, তাকে তার উপযুক্ত জায়গা দেওয়া হবে যাতে সে নিজেকে চিনবে। সেই আতঙ্কে তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়। যেন এই কাজ গুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে কেউ চাইলেই পারে। এ জন্য দক্ষতার দরকার হয় না। আর এই সব কাজ নিতান্ত মেয়েলি। এই মেয়েলি' তকমার মধ্যেই রয়েছে লিঙ্গবৈষমের রাজনীতি। যেন এই কাজ গুলো স্বীকারের অযোগ্য। তা স্বীকার করে গুরুত্ব দেওয়া যায় না। কিন্তু তা অবলীলায় ভোগ করা যায়। তার দক্ষতা নকল করে বাজারে বেচেছে কেউ কেউ। কিন্তু কোনোভাবেই নারীকে তার কাজের জন্য তার দক্ষতার জন্য প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এইভাবেই পিতৃতন্ত্র তার বিষাক্ত ও ভয়ংকর বিন্যাস বহাল রাখে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যস্থাও যেহেতু পিতৃন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত এবং পিতৃতন্ত্র বহাল রাখার একটি হাতিয়ারও বটে। সেখানেও দেখা যাবে একই বিষয়ের প্রতিফলন। নারীর অসামন্য কিছু দক্ষতা যা খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না যেন, বা দেখলেও তা ভুলে যেতে হয় তৎক্ষনাৎ সেইসব অতিপ্রয়োজনীয় অথচ প্রকট দৃশ্যমান নয় যা কিছু তা দিয়ে টিকে আছে আমাদের মনুষ্য সভ্যতার রেশ।

  ঠিক এই ব্যবহার মানুষেরা প্রকৃতির সংগে করে থাকে। পিতৃতন্ত্রে জারিত সভ্যতা নারী ও প্রকৃতিকে একই মনোভাব থেকে ব্যবহার করে ও শােষণ করে। নিজের প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছায়। যথাযথ সংবেদনশীলতা ও স্বীকৃতি ছাড়াই। আর এই যে পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতি তাতে দেখা যাচ্ছে সব থেকে বেশি প্রভাবিত হন ও ক্ষতির সম্মুখীণ হন প্রান্তিক নারী। যাদের জীবন প্রকৃতি সংলগ্ন ও যাদের জীবন অনেকাংশে প্রকৃতিনির্ভর । পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি মনোভংগী যার বৈশিষ্ট্য হল দমন ও অপব্যবহার। এই মনোভাব একদিকে নারীর ক্ষতি করছে অন্যদিকে প্রকৃতির।

 - গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।


No comments:

Post a Comment

                                         নদীর পাড়ে  দেহঘর                                                মধুপর্ণা   একটা কোলাজ কে সাজায়,...