Monday, November 8, 2021

 নীরবতার পুরুষতান্ত্রিক (কদ) অর্থ।

দ্বিতীয় বর্ষ ।। ত্রয়োদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৪ আশ্বিন ১৪২৮ ।। ১১ অক্টোবর ২০২১

- অক্টোবর ১১, ২০২১



মধুপর্ণা

“নীরবতা সম্মতির লক্ষণ"

এই বাক্যটি একটি বিষাক্ত লিঙ্গ রাজনীতি বহন করে।

কনসেন্ট বা সম্মতির সম্বন্ধে কোনো শিক্ষা যে সমাজে নেই, সেখানে নীরবতার অর্থ বোঝার মত সংবেদনশীলতা আশা করা অলীক। এই তুমুল ক্যাকোফনির ভীড়ে কে কি বলছে, আর কে কি বলতে চাইছে অথবা কে মুখস্থ কথা অভ্যাসে বলে যাচ্ছে আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না। এই অদ্ভুত একটা বিকট পারস্পরিকতার মধ্যে নীরবতা বলে একটা বিষয় কর্পূরের মত উবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অথবা যারা নীরবে, নিভৃতে বাঁচতে চায় তারা পিছোতে পিছোতে ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে। অথবা অন্যদের উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে চাপা পড়ে যাচ্ছে তার স্বর। এই চাপা পড়া স্বরের একটি বড় অংশ নারী। বলা ভাল বেশ বড় অংশ। নানান নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে থাকতে থাকতে ক্রমে চাপা পড়ে যায় তার কথা, তার স্বর, তার ইচ্ছা, তার অনিচ্ছা, তার অসম্মতি।

সামাজিক ভাবে নারী এবং নীরবতার সম্বন্ধ অত্যন্ত জটিল। নীরব নারী সমাজে পরিবারে বিপুল সমাদৃত। "সাত চড়ে রা নেই" সেই মেয়ে বড়ো "ভালো"। এখানে কোনো থ্রেট নেই। বিষাক্ত পৌরুষ এবং তার অসুস্থ অহং এখানে ঝুঁকির মুখে পড়বে না। বরং ডালপালা সমেত বাড়বে দিনে দিনে। নীরব শান্ত মেয়ে, বেশী কথা না বলা মেয়ে, চিৎকার না করা মেয়ে, চুপ করে মেনে নেওয়া মেয়ে, অন্যের অসভ্যতা, সীমালঙ্ঘন মুখ নীচু করে মেনে নেওয়া মেয়ে আমাদের সমাজ লালন করে। এই গুণাবলিতে খাপ খাওয়া মেয়েরা বিবাহের উপযুক্ত, পরিবারে, সমাজে সমাদৃত। নারী যেখানে "অপর", "আংশিক মানুষ", "দ্বিতীয় লিঙ্গ" হিসাবে গণ্য সেখানে পুরুষের কথার উত্তরে নীরবতা একটি লিঙ্গ রাজনীতিকে নগ্ন করে তোলে। প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া হয় নীরবতা মানে সম্মতি। অসম্মতি হিসাবে কখনো নীরবতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় নীরব নারীটি মূলত দূর্বল। নীরবতার পিতৃতান্ত্রিক অনুবাদ হয় সম্মতি নয় দূর্বলতা।

আবার সাহিত্যে কল্পনার খাদ্য এই নীরব নারীদের নিয়ে রোমান্টিসিজমের চাষ। তার মুখে কোন কথা নেই, নিজস্ব কোন স্বর নেই। তাই পুরুষ সাহিত্যিক নিজের ইচ্ছায় তার মুখে কথা বসাতে পারে। কল্পনা খাদ্য হিসাবে গড়ে তুলতে সুবিধা হয়, নিজেদের আজন্মলালিত বিষাক্ত পৌরুষের আরকে চুবিয়ে পরিবেশন করতে পারেন। কিম্ভুতকিমাকার সেই নারী মূর্তি যার কোন মুখ নেই, কথা নেই, স্বর নেই, ইচ্ছা নেই সেই নারীর ইমেজ কি প্রচন্ড আবেগ নিয়ে মানুষজন আস্বাদন করে থাকেন। "আদর্শ নারী” রা বেশি কথা বলে না। চুপ থাকে। তাকে প্রয়োজনে, ইচ্ছায় ব্যবহার করা যায়।

নীরবতাকে ভাবা হয় দূর্বলতা। অথবা অক্ষমতা। যে নারী ইতরামির সঙ্গে সম্মুখ সমরে না নিয়ে এড়িয়ে নিজের কাজে নিমগ্ন থাকতে চায়। সেই এড়িয়ে যাবার ভাষা অনূদিত হয় ভিন্ন ভাবে। মনে করা হয় তা দূর্বলতা। প্রতিরোধের একটি ভাষা নীরবতা। অবশ্য যদি প্রতিপক্ষের নূন্যতম শিক্ষা আর চক্ষুলজ্জা থাকে তবেই। পিতৃতন্ত্র এই নীরবতার ভাষা ভয় পায়। ক্ষমতার সূক্ষ্ম এবং নগ্ন রাজনীতি চালিয়ে যেতে অসুবিধা হয় বলে তা খানিকটা স্বেচ্ছায় এড়িয়ে চলে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আমাদের যাবতীয় কাঠামো বহির্মুখীদের জন্য তৈরি। অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বের জন্য এই পরিকাঠামো অনুপযুক্ত এবং ক্ষতিকারক। বেশ 'বলিয়ে কইয়ে' হলে সব জায়গায় সাফল্য পেতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু যারা অন্তর্মুখী তাদের পড়তে হয় সমস্যায়, অথবা তাদের সমস্যা অপ্রকাশিত থেকে যায়। পরিশেষে একটি কথা বলবার, নীরবতা একটি স্বতন্ত্র স্বর। স্বরহীনতা নয়।

No comments:

Post a Comment

                                         নদীর পাড়ে  দেহঘর                                                মধুপর্ণা   একটা কোলাজ কে সাজায়,...