Wednesday, June 3, 2026

 

                                     সহজ লোকের মত এই গহন আঁধারে

                                                মধুপর্ণা             

চেতনাপ্রবাহ, stream of consciousness. এইখানে তুমি ভাণ করতে পারবে না, অকপট, আনফিল্টার্ড একটা প্রবাহ। র। সেখানে চিন্তার স্রোত কিভাবে প্রবাহিত হয় মানুষ তা জানে, আর সেটাই ব্যক্তির ব্যক্তিগত অন্ধকার। আর আলোর উৎস। মাথার ভিতর, মনের ভিতর, চেতনার ভিতর নাকি কোথায়! লোকেশন জানি না কিন্তু পর পর পর পর ঘটনা সারি সারি দিয়ে আসে যায়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, ভান্তে বলেছিল, জায়গাটা চিনতে পেরে যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই। চিন্তাশূন্যতা একদিনে আসে না। বন্ধ করে লাভ নেই, আসতে দিতে হয়, তারপর একদিন আর আসে না। প্রবাহকে বইতে দাও। বুঝতে পারি, এই প্রবাহের সময়, স্থান, ধারাবাহিকতা, কান্ডজ্ঞান কিচ্ছু নেই, কেবল বয়ে চলে। এই প্রবাহ উর্বরা জমি জেনেছে অনেক লেখক। কাঁচামাল ঘুরে বেড়ায়, সেই রান্নাঘরে যে দক্ষ রাঁধুনি তার কেল্লাফতে। এইটা রিপ্রোগ্রামিং করা যায়। সেই প্রবাহটি বহমান, সেই বানরটি লাফিয়ে বেড়ায়। মাংকি মাইন্ড। বিদ্যুতের গতিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা, এক ঘটনা থেকে অন্য ঘটনা, এক কথা থেকে অন্য কথা। এক সুর থেকে অন্য গান, এক যুক্তি থেকে ভিন্ন অযুক্তি। কথার ভিতর কথার খেই, কথার ভিতর কথার সুতো, চেতনাপ্রবাহ সেই বিনিসুতার মালা। কথার বেসাতি। এই প্রবাহের সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ যত সহজ তুমি তত সহজে চলতে পারবে, সহজ লোকের মত এই গহন আঁধারে।

 চেতনাপ্রবাহ, একটা স্রোত, নদীর মত বহিয়া চলে, তাহার হিসাব নিকাশের খাতা নাই, একজন বলিয়াছিল, মানুষকে জানিতে হৈলে তাহার আলোর সহিত তাহার অন্ধকার জানিতে হয়। কার্ল ইয়ুং, ফ্রয়েড জানিতেন মানুষের অন্ধকার। চেতনাপ্রবাহ বলিলেই মনে পড়ে বাদল সরকার, তাঁর লেখা নাটক ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’। প্রটাগনিষ্ট চেতনপ্রবাহের গতি রোধ করিত না। যাহা বহিয়া যাইত তাহাই বলিত। তাহাই লিখিত। বহু বহু কাল পূর্বে প্লেটো বলিয়া গিয়াছেন, সকলই অনুকরণ, অনুকরণের অনুকরণ। মানুষেরা সৃষ্টি করিতে পারে না, অনুকরন করে কেবল। ইমিটেশন অব ইমিটেশন। শিল্প সাহিত্য সকলই হাতফেরতা অনুবাদ। তথাপি মানুষ ‘আইডেন্টিটি’ ভালবাসে। একটা একটা জামার মত। জামার ভিতরে থাকিতে মানুষ ভালোবাসে খুব। এক একটা পরিচিতি সে আঁকড়াইয়া ধরিয়া মনে করে আমি তাহা, আর তাহার সামান্য বিচ্যুতিতে হয় পাগলপারা। গেল গেল সব গেল গো, আমার অর্জন, নির্মাণ সকলই গেল ছাড়েখাড়ে। তুমি যাহা আত্ম ভাবিতেছ, আপনার ভাবিতেছ তাহার অস্তিত্ত্বই নাই, যদি বলি তুমি শুনবে না। তথাপি একথা সত্য ‘সেলফ ডাস নট এগজিস্ট!’। মানুষ একটি নদী, বহিয়া যায়, যদি বলি তুমি আমারে বলিবে, এ কেমন কথা! তথাপি এই বহমানতা ভিন্ন আর কিছু স্থির নাই। বিজ্ঞানী সকল বলিয়াছেন, পরিবর্তন একমাত্র সত্য। আর পরিবর্তন দেখিয়া মাথার চুল ছিঁড়িতে থাকো, মাথা ঠুকিতে থাকো দেয়ালে। ব্রুশ লি র একটি সাক্ষাতকার দেখিতেছিলাম, উফ! কি সাংঘাতিক ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং। দূর্ধর্ষ। চাবুকের মত একটা লোক। তোমাকে এখন যদি বলি, ঘুরিয়া মরিতেছ মায়ায়, এই গুলি প্রহেলিকা। তুমি মুখ ঘুরাইয়া চলিয়া যাইবে। সেদিন স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের লেকচার শুনিতেছিলাম ইউটিউবের ক্লাশ ঘরে। খাতায় আর কলমে যাহারা তোমার শিক্ষক তাহারা তোমাকে বাক্সে ভরিবে আর দিবে বিষ ঢালিয়া, কত শত শিক্ষক দেখো আরো চারিপাশে।

 দাদা সুযোগ পেলেই বলছে, ‘পাগলীনেস এভ্রিহ্যয়র’ তার কারন কয়েকদিন আগে দাদাকে বলেছিলাম, ‘আগলিনেস এভ্রিহ্যয়র’। যে ভাষিক সমুদ্রে আমাদের বেঁচে থাকা সেইসব অকপটে বলে যাবার ‘গাটস’ আছে তোমার?  ফিল্টার না করে বলে যেতে পারবে মুহুর্তের চিন্তা, মুহুর্তের অনুভব? এই প্রশ্নের উত্তরে বলি পারব, একই লেখার ভিতর চলিত বাংলা, সাধু বাংলা, স্ল্যাং, যুক্তি, অযুক্তি, ভাবালুতা মিশিয়ে দেব, যেভাবে চলছে মগ্ন চৈতন্য একেবারে সেইটাই হাজির করব এনে। দাদা বলেছিল, সহজ নয়, মাথা থেকে হাতে এসে কি বোর্ড থেকে স্ক্রীণে যেতে যেতে অনেকবার রিফাইন করবে, এত সহজ নয়।

হ্যাঁ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভব কি?

প্রায়। কারণ সহজ কথা যায় না বলা সহজে।

আচ্ছা, কেবল অনুবাদ, অনুকরণের অনুকরণ, চিন্তা অনুভব থেকে বলা আর লেখার মাঝখানে অনেক গুলো দরজা। আর মাঝাখানে যাত্রাপথটা আসলে ব্যক্তির অহং সত্ত্বা।

হ্যাঁ, ঐ খানে রঙ মেশায় আর ঐখানে ঢালে বিষ। ভেজালটা ঐ একটা করে দরজা পেরোয় যখন তখন হতে থাকে। আর তুমি ভাবছ শুধু জল মেশালেই সহজ হয়! পিওর ফর্মে যারা বলছে তারা বাকসিদ্ধ।

শব্দ আর ধ্বনির ক্ষমতা ভয়াবহ। যে জানে সে জানে আর যে জানে না তার না জানাই ভাল। তড়িতাহত হয়ে যাবে।

কারেন্টের শক বুঝলে! কিসের আঘাত, না শব্দের আঘাত। ধ্বনির আঘাত।

মন্ত্র তাহলে… সেই ব্যাকরণের আউটপুট?

সেসব অন্য, অনুশীলন করো, মুহুর্তেকে ফিল্টার ছাড়া লিখতে থাকো দেখবে সেখানে এথিক্স নেই, ক্রম নেই, ধারাবাহিকতা নেই।

সেই বানরকে শায়েস্তা করতে চাই, আর আপনি তাকে দিতে বলেন আস্কারা?

বানর টা আসলে খুব সত্যি একজন। যত বাঁধবে ততই লম্ফঝম্প বাড়বে, বয়ে যেতে দিতে হয়। বরং তাকে বলতে হয়, বলো কি বলতে চাও, শুনতে হবে তার কথা। তবেই বলা থামাবে।

 এই ভয়ঙ্কর গ্রীষ্মে শীতের কথা মনে পড়ে, বাবলা বনের কুয়াশায় মাকড়সা গুলো জাল বিছিয়েছিল ছোট ছোট করে তার ওপর শিশির। সারা মাঠ জুড়ে মনে হচ্ছিল তাবু খাটিয়েছে কেউ বা কারা। পৌষমেলায় নাগর দোলার উপর থেকে এইরকম লাগে মেলাটা। ছোট ছোট তাবু চারিদিকে। কোপাই পাড়ে, চায়ের দোকানে বাঁশের মাচা থেকে কোপাই এর জল দেখা যায়, তারপর পাশের শ্মশানে ভাঙা হাঁড়ি, পোড়া কাঠ। তারপর কংকালীতলায় রুরু ভৈরবের ধ্যানখানা। ছোট মন্দিরের মত। শিব মন্দিরের সামনে বসে আছে নন্দী। সেইসূত্রে মনে পড়ে,  বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ভিতর যে বৈদ্যনাথ মন্দির সেখানে শিবমন্দিরের সামনে নন্দীর বসে থাকা নিয়ে বলেছিল সেখানকার এক গবেষক বন্ধু। বলেছিল, নন্দীর কানে কানে বলে আয়, সে শিবকে পৌঁছে দেবে, জিজ্ঞেস করলাম, পার্সোনাল সেক্রেটারি? বলল, তার থেকে বেশি কিছু, মাধ্যম। ভায়া যেতে হবে, সরাসরি হবে না। সেইসূত্রে মনে পড়ে,  হাতের কাজ গুলো পড়িমড়ি করে শেষ করি পাহাড়ে যাবার তাগিদে। টাস্ক এন্ড রিওয়ার্ড।

    

No comments:

Post a Comment

                                            বাদল দিনের ছবি ও গান                                              মধুপর্ণা তারপর পরিচিত বর্ষ...