হাইপোথ্যাটিক্যাল
সখীরা
মধুপর্ণা
একেক
দিন কি হয়… যে নারীদের কথা, সারাদিন পড়ি, চর্চা করি তারা অবচেতনে ঘুরে বেড়ায়। ঘুমের
ভিতর, তন্দ্রার ভিতর? নাকী আচ্ছন্নতার ভিতর। একটা স্পেস যার সময়ের সীমা ভূখন্ডের সীমার
সঙ্গে লেনদেন নেই। সেখানে ননীবালার সঙ্গে দেখা
হয়ে যায় হাইপেসিয়ার। সেখানে বৌদ্ধ দেবী সবুজ তারার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় জার্মিয়ান গ্রীয়ারের।
স্থান, সময় ভেদ করে পাত্রীরা হাজির হয়। তাদের সময় আলাদা, কাজ আলাদা, চর্চা আলাদা, দূর্ভোগ
আলাদা।কিন্তু তারা প্রত্যেকে প্রতিভাময়ী, প্রজ্ঞাময়ী আর হ্যাঁ যেকথাটা গুরুত্বপূর্ণ,
তারা প্রতেকে কর্তৃত্ত্বশালীনী। বুদ্ধিমতী নারীরা যখন পরস্পরকে শ্রদ্ধা করে আর বন্ধু
ভাবে, তার সৌন্দর্য্য অন্তত আমার কাছে অমূল্য, অতুল। সেদিন দেখা হল, ননীবালার সংগে
হাইপেসিয়ার। আলেকজান্দ্রার দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। (৩৫৫-৪১৫) শুদ্ধ জীবনচারিনী এবং
ব্রহ্মচারিনী। সমস্ত ভোগবাসনা লালসা মুক্ত। ডাইনি বলে হত্যা করা হয় তাঁকে। ভোগে লিপ্ত
সমাজ বরাবর ভয় পেয়ে এসেছে সাধিকা, যোগিনী, ব্রহ্মচারিণীদের। অঙ্কশাস্ত্র আর জ্যোতির্বিজ্ঞান
চর্চা করেছিলেন তিনি। মুক্তমনা চিন্তার ধারক এবং বাহক হিসাবে হাইপেসিয়াকে স্মরণ করা
হয়। তিনি মনে করতেন দর্শন হল ধর্মীয় রহস্য এবং ধর্মের পথে অন্তরের মধ্যে যে যুক্তির
জ্যোতি রয়েছে, যে অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে তাকে আবিষ্কার ও উন্মোচন করা যায়। আর ননীবালা!
উনিশ শতকের শেষ পর্বে জন্মে বিশশতকের গোড়ায় দেহ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে ননীবালা। করেছে
যোগসাধনা আর বেঁধেছে গান। শব্দ আর ধ্বনির গূঢ় রহস্য জেনে যাবার অসীম শক্তি আর গাঢ় বেদনার
দাগ রেখে গেছে পঙতিতে পঙতিতে। সবুজ তারা তার ধ্বনি সাজিয়ে রেখেছে বিশ্বজুড়ে, ‘ওম তারে
তুত্তারে তারে সোহা’ তার সংগে সিমোন দ্য বভুয়ারের দেখা হয়ে যেতেই পারে। কি কথা হবে তাদের? তারা কি পিতৃতান্ত্রিক বিশ্বের
মত বলবে, আমাদের পথ আলাদা মত আলাদা আমাদের বিশ্বাস আলাদা দর্শন আলাদা তাই আমরা সবাই
শত্রু। আমরা সুযোগের অপেক্ষায় আছি পরস্পরকে ডুবিয়ে দেবার। অওকাত দেখিয়ে দেবার। এই বিশ্বটা
খুব মজার, দূর থেকে দেখতে মন্দ লাগে না। খুবই মুখোরোচক।
আমার
দৃঢ় বিশ্বাস এবং প্রত্যয়, প্রজ্ঞাশালীনী নারীদের বিশ্ব ভিন্ন ভাবে কাজ করে। তারা যতই
ভিন্ন হোক, তারা পরস্পরের জন্য একটা জায়গা রাখে সুরক্ষিত, একটা হাত বাড়িয়ে রাখে সহায়তার,
গ্রহণযোগ্যতার, সৌন্দর্য্যের। সবুজ তারা সামনের আসনটি যত্ন করে পেতে দেবেন ননীবালাকে
সমাদরে বসাবেন, হাইপেসিয়াকে উপহার দেবেন আনন্দ, সখীত্ব। সময় ভেদ করে তারা ভগিনী। সব
ভিন্নতার বাইরে, বৈচিত্র্যের বাইরে ভগ্নিত্বটি উজ্জ্বল। সমাজ তাদের কি কি দিন থেকে
ঘৃণা করেছে সেইসব নিয়ে হাসাহাসি হবে অনেক। মেল ইগো তারা কিভাবে কাঁচের গ্লাসের মত ঝনাৎ
শব্দে চুরমার করেছে সেইসব নিয়ে অট্টহাসিও হবে। আর হবে অনেক আনন্দ। আর কথা হবে ফাঁদ
নিয়ে, কিভাবে শিকারীরা ফাঁদ পেতেছিল এই নারীদের আত্মস্যাত করার জন্য, কিভাবে তারা সেইসব
তুচ্ছ করে বেরিয়ে এসেছে সেইসব অপূর্ব সুন্দর কথা। আর হবে ধ্যানস্থ সাধনার কথা, লড়াই
এর কথা। আর সচেতনতার কথা। আর অজস্র নারী যারা শৃঙ্খলা থেকে বেরোতে চাইছেন তাদের নিয়ে
কথা হবে। কথা হবে স্ট্র্যাটেজি নিয়ে। ভিন্ন সময় আর স্থানের নারীদের এই কল্পবিশ্বের
বাতাসে বড় করে প্রশ্বাস টেনে আবার পড়াশোনায় ডুবে যাওয়া যায়।
No comments:
Post a Comment