Tuesday, June 30, 2026

 

                    সঠিক ভাবনার খোঁজে: মানুষের চাহিদার দাবানলে এথিক্সের লাগাম

                                         মধুপর্ণা কর্মকার

ভিন্নধারার ভূগোলবিদ এবং চিন্তক অধ্যাপক মলয় মুখোপাধ্যায়ের নতুন বই ‘সঠিক ভাবনার খোঁজে’। বইওয়ালা বুক ক্যাফে প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২৫ শে বৈশাখ ১৪৩৩ এ। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাদের ‘যাঁরা পৃথিবীকে আত্মীয়সম মনে করেন’। যখন ভোগবাদী ব্যবস্থায় পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের একমাত্র সম্বন্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভোগ্য আর ভোক্তার, ইকোফেমিনিজম যেখানে চিহ্নিত করেছে মানুষের সভ্যতা পৃথিবীকে, প্রকৃতিকে ‘ভোগ’ করে এক পাক্ষিক ভাবে, ‘এক্সপ্লয়টেশন’ একমাত্র সম্বন্ধ যেখানে, সেখানে সেই মানুষেরা উন্নয়নের যে ধরণ তৈরি করবে, যে পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে আবশ্যিক ভাবেই সেখানে ‘স্বার্থ’ কেবল ভোগের উপর ন্যস্ত থাকবে তা বলা বাহুল্য। এইখানে লেখকের প্রশ্ন, ভোগে অন্ধ সভ্যতা যে কাজ গুলি করে চলেছে সেগুলি কি ‘ঠিক’? উচিত কাজ ? ‘সঠিক’ শব্দটি যখন বইয়ের না্মের মধ্যে রয়েছে তখন একটা এথিক্সের প্রশ্ন এসে যায়,  কিসের এথিক্স ? উন্নয়নের নৈতিকতা, দৃষ্টিভঙ্গির নৈতিকতা। যা কিছু ঘটছে তার ভিতরে কি হওয়া দরকার বা কি হওয়া উচিত ছিল এবং বর্তমান পদক্ষেপ গুলি কি কি ভাবে সেখান থেকে বিচ্যুত - এই প্রশ্ন গুলো প্রাসংগিক হয়ে দাঁড়ায়। এখন ন্যারেটিভ মেকিং এর যুগ, যারা দলে ভারি এবং একটা মত, একটা মডেল যা বহুলোকে মেনে নেবে সেটাই প্রামান্য হয়ে ওঠে। কিন্তু তার প্রয়োগ আদৌ জরুরি কিনা, সেখান থেকে পৃথিবীর সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে কিনা তা বিবেচ্য নয়। এই খানেই আসে সেই ‘খোঁজ’। যা কিছু ঘটছে সেসব কতটা এথিক্যাল।

নারীবাদের ছাত্র হিসাবে ‘সঠিক ভাবনার খোঁজে’ বইটিকে আমি দেখতে চাইব দুটি দিক থেকে, প্রথমত, ইকোফেমিনিজমের প্রেক্ষাপট দিয়ে, দ্বিতীয়ত, নৈতিকতার দর্শন দিয়ে। বইটির গভীরতলের কাঠামো (deep structure) এই দুই অক্ষের ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করেছি। যে কোনো দুটি সত্ত্বার পারস্পরিক সম্বন্ধ নির্ধারণ করে মধ্যবর্তী ক্ষমতার বিন্যাস। মানুষেরা পৃথিবীকে মনে করে ‘ভোগের বাগান’, ‘আত্মীয়সম’ নয়। এইখানে মধ্যবর্তী ডায়নামিক্স থেকে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় আর তা প্রতিফলিত হয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এইখানে প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর দীর্ঘ গবেষণা -অধ্যাপনা-ক্ষেত্রসমীক্ষা -ভ্রমণের ভিতর থেকে বইটির প্রতিটি প্রবন্ধ গুলি একটি ভিন্ন দৃষ্টি বহন করে।

 বইটি তিনটি পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। ‘ভাবনার ওপাশটাতে’ পর্বে রয়েছে এগারোটি রচনা, ‘সদর্থক ভাবনার এপাশটাতে’ পর্বে রয়েছে তিনটি রচনা এবং ‘ভাবনার ঘরে প্রস্তাব’ অংশে একটি লেখা। ‘ওপাশে’ এবং ‘এপাশে’ এই শব্দ গুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ, একটি বিষয়ের বা সিদ্ধান্তের সবদিক বিবেচনার একটি ইংগিত এই শব্দচয়ন থেকে উঠে আসে। একপাক্ষিকতা থেকেই বর্বরতার জন্ম হয়, অন্যের দূর্ভোগের জন্ম হয়। আমাদের যে কোনো বিষয়ে পূর্নাঙ্গ ধারনা পেতে হবে যদি ‘সঠিক’ ভাবে ভাবতে চাই। ভায়োলেন্সের সূক্ষ্ম চেহারা দেখতে পাওয়া যায় সভ্যতা, আধুনিকতা, উন্নয়নের ভিতর আর তা যাচাই করার জন্য সংবেদনশীলতা নৈতিকতার মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে। এই বইতে একই ছাঁদে উন্নয়নের ব্যর্থতা এবং তার অসংবেদনশীলতার কথা উঠে এসেছে বারবার। কিভাবে পটভূমি, প্রেক্ষাপট বিযুক্ত উন্নয়ন আদিবাসীদের ‘নিজস্বতা’ আহত করেছে কিভাবে আপাতানিদের আত্মমর্যাদায় হস্তক্ষেপ করেছে। যেখানে উন্নয়নের নিশানা, আপাতানিদের মর্যাদাবোধের প্রতীকের থেকে উঁচু হয়ে যায়। কিভাবে ওঙ্গে জনজাতি পরিকল্পনায় উপকৃত হয় না বরং “কবল’ এ পড়ে। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ যেন মানুষের একার ভোগের বিষয়, সেখানে পৃথবীকে সচেতন সত্ত্বা হিসাবে অস্বীকার করার যে সংস্কার লেখক এইদিকটি বারবার উল্লেখ করেছেন। জীবনযাপনের প্রামাণ্য স্বরূপ কি এখনও ‘সভ্য’ মানুষেরা স্থির করতে পারে নি, তার পরও তারা পৃথিবীর অপাপবিদ্ধ সন্তান, আদিবাসীদের উন্নয়ন করে এবং তাদের বিনষ্টের দিকে নিয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ অর্থকরী করে তোলার নেশায় সেই উন্নতি আর অর্থবহ হয়ে ওঠে না। জল,জঙ্গল, জমির উপর মানুষের চাহিদার দাবানল আর তার ভয়াবহ দিকটি লেখক প্রথম পর্যায়ের প্রবন্ধ গুলিতে দেখেছেন। এখন এই বিনষ্টি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি। একেবারে শেষ প্রবন্ধে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলেছেন চাহিদায় লাগাম দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ১৯ নাম্বার পৃষ্টায় রয়েছে, “আসলে আমরা উন্নয়নের ছবি তৈরি করি একই ধাঁচে। স্থান কাল বিচার করি না। স্থানীয় মানুষদের মানসিকতা, সংস্কৃতি বা গ্রহনযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিই না। ভুলে যাই যে একই উন্নয়নের ভাবধারা সব জায়গার জন্য এক নয়”। মানুষের চাহিদার ওপর সীমারেখা টানার কথা বলেছেন লেখক, তিনি লিখছেন, “এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষের চাহিদার উপর সীমারেখা টানা যাবে কোন উপায়ে পার্থিব চাহিদাকে স্তিমিত করানোর জন্য মানসিকতার উত্তোলন দরকার”। প্রকাণ্ড রাক্ষুসে চাহিদার কাছে পৃথিবীর প্রতি আচরণে, ব্যবহারে সংযম নেই, মমত্বহীন যেকোনো ব্যবহার সদর্থক পরিণতি তৈরি করে না -বইটির প্রবন্ধ গুলি পাঠে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়ের আগের বই গুলির মতই ‘সঠিক ভাবনার খোঁজে’ চিন্তার খাদ্য জোগায় এবং ‘সুখপাঠ্য’ শব্দটি এখানে ব্যবহার করব না, কারণ যে প্রশ্ন এবং ভয়াল বাস্তবতার কথা তিনি বলেছেন, চিন্তাশীল পাঠককে আঘাত দেবে, প্রকাণ্ড ভন্ডুলের ভিতর নৈতিকতার আঘাত।

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment

                                         নদীর পাড়ে  দেহঘর                                                মধুপর্ণা   একটা কোলাজ কে সাজায়,...