Saturday, July 4, 2026

 

                                    অসীম রহস্য মাঝে

                                         মধুপর্ণা

হীমবান পর্বতে ধ্যান করিয়াছিলেন দেবী কৈশিকী। আর জঙ্গলে ঘুরিয়া প্রকৃতি সাধনা করিত সাধুয়ান। আর তাহাদের উত্যক্ত করিত কয়েকটি অসুর, রাক্ষস, মানুষের পোশাকের আড়ালে কয়েকটি ইতর বিকার। ধ্যানমগ্না নারীর সৌন্দর্য্যে তাহারা মুগ্ধ আছিল না, তাহারা ছিল রিপু পরায়ন আর হিংস্র। তাহারা একক, একেলা নারী দেখিয়া প্রথমটায় ভাবিল কি আর এমন বেগ পাইতে হৈবে, এই নারীকে বাঁধিয়া লৈয়া যাইব আর তাহার সর্বস্ব কাড়িয়া মণ্ড করিয়া নদীতে ফেলিয়া দিব। আসিয়া তাহারা দেবীর নিকট জল চাহিল। বলিল আমরা বহুদুর হৈতে আসিয়াছি, কাতর, আমরা দরিদ্র। আমাদের কিছু নাই। দেবী দয়াপরবশ হৈয়া তাহাদের জল দিলেন আর দিলেন কিছু খাদ্য। আর বললেন, দুর্ভাগ্যের জন্য চিন্তা করিও না, সকলই শুভ হৈবে। অসুরেরা ভাবিল, এই দয়া মায়ার সূবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা যাইবে না। এই সুযোগটাই কাজে লাগাইতে হৈবে। দেবী ফিরিয়া গেলেন ধ্যানাসনে। কিছু সময় পর চোখ খুলিয়া দেখিলেন, তাহার যজ্ঞশালা হৈতে সকলই চুরি গিয়াছে। প্রথমটায় বিশ্বাস করিতে পারিলেন না যে এই লোকগুলি নিয়া গিয়াছে, পুনরায় যজ্ঞ সাজাইয়া পুজা করিতে বসিলেন। উঠিয়া ভাবিলেন, আহা, তাহাদের অভাব সেকারণে লৈয়া গিয়াছে। সে যাক। তাহার পর কিছুদিন কাটিল, রাক্ষসেরা চুপিসারে আসিয়া দেবীর বাসগৃহে সিঁধ কাটিতেছিল। দেবী পর্বত শিখরে অরণ্যের ভিতর শিশুকাল হৈতে থাকিয়াছে। ভয় কাহাকে বলে জানা হয় নাই, কূটচক্র কাহাকে বলে জানা হয় নাই, অসুস্থ বিকার কাহাকে বলে জানা হয় নাই, মুখের আড়ালের মুখোস কাহাকে বলে জানা হয় নাই। এই বহুবিধ না জানার ভিতর সরল শান্তিতে চারিপাশের সকলের স্নেহে, ভালোবাসায় সে বাড়িয়া উঠিয়াছিল আনন্দে, সৌন্দর্য্যে। সুন্দর গুনাবলী গুলি একত্রিত হৈয়া কৈশিকী অপার সৌন্দর্য্যের আধার হৈয়া উঠিয়াছিল। তিনি যখন ধ্যান করিতেন অরণ্যের চারিদিক আলোকিত হৈয়া উঠিত। চারিপাশের জীবজন্তু পশুপাখি সকলের ভিতর খুশির আদান প্রদানে সেই স্থল ঝলমল করিয়া উঠিত। কৈশিকী ধীরে ধীরে এক একটি করিয়া ধাপ উঠিয়া যাইতেছিল তাহার সাধন মার্গে। সূক্ষ্ম হৈতে সূক্ষ্মতর হৈতেছিল তাহার বোধ, প্রজ্ঞা। এমতাবস্থায় রাক্ষস তাহাদের পরিকল্পনা আর হিংস্রতা লৈয়া উপস্থিত হৈল। কৈশিকী নঞর্থকতা, হিংস্রতা কাহাকে বলে জানিত না – এই বিপুল অজ্ঞানতা লৈয়া কিরূপে তাহার সিদ্ধি হৈবে বলিতে পারো ? এই অজ্ঞানতার মূল্য তাহাকে চুকাইতে হৈবে না? এই করাল সত্য প্রকট হৈবার প্রস্তুতি লৈতে ছিল। কৈশিকীর কমন্ডলু হৈতে জল পড়িয়া গেল সেদিন, তাহার পুস্পপাত্র হৈতে আবিষ্কৃত হৈল সর্প। আর কৈশিকী মাটিতে পা দিয়া অনুভব করিল তাহার দেহ থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। কিসের অশনী সংকেত? কৈশিকীর কি যেন বেসুর ঠেকিল। কিসের যেন এক আশংকা আসিয়া উপস্থিত হৈল। সেদিন সে ধ্যানে মনস্থির করিতে পারিল না। কুডাক ডাকিতে লাগিল তাহার সমস্ত অন্তঃকরণ। তিনি ভাবিলেন, মনের ভ্রম। তিনি আবার নিজকাজে মন দিলেন। কিন্তু একটা সূক্ষ্ম এবং তীব্র কাঁটার মত কিছু বিঁধিয়া থাকে, কিছুতেই সরে না। রাক্ষসগুলি ওৎ পাতিয়া বসিয়া ছিল। আর ভাবিতেছিল কি কি প্রকারে কৈশিকীকে কব্জা করা যায়, অপদস্থ করা যায়। রাক্ষসেরা তাহার দয়ালু মনোভাব, স্বচ্ছ্বতা সুযোগ হিসাবে দেখিল। একে একে তাহাকে সুঁচ বিঁধিতে লাগিল, আঘাত করিতে লাগিল, অপদস্থ করিতে লাগিল, অপমান করিতে লাগিল। দেবী স্থির অনড়, অবিচল, অটল। তাহার চতুর্দিকে জ্যোতির্বলয়। তাহার নৈঃশব্দ আর স্মিতহাস্য রাক্ষেসদের আরো উত্তেজিত করিয়া তুলিল। তাহাদের রোখ চাপিয়া গেল, দেবীর প্রতিক্রিয়া তাহাদের চাইই চাই। মহাদেব দেখিতে ছিলেন সমস্তই। দেখিয়া হাসিতেছিলেন। আর ভাবিতেছিলেন, কৈশিকী, তুমি সিদ্ধি চাহ আর তুমি দুনিয়ার ভয়ঙ্কর রূপ দেখিবে না তাহা হয় না, এইখানে তোমার পরীক্ষা, দেখি তুমি কি প্রকারে পার হও এই ভয়াল বিষের সমুদ্র। কৈশিকী বিষের বাস্পের ভিতর একান্তে নিজের সাধনা একমনে করিয়া যায়। কিন্তু সে বুঝিতে পারে, পূর্বের ন্যায় সেই আনন্দ, সেই বিস্ময়, সেই সমাবস্থা, সেই স্বাভাবিকতা আর নাই। যা কিছুই করিতেছে তাহাকে যেন জোর করিয়া করিতে হৈতেছে। তিনি তথাপি করিতে থাকিলেন। কিন্তু কি যেন বিস্বাদ ঠেকে। বেসুর থেকে। তাল কাটিয়া যায়। দেবী বুঝিতে পারিল,একটি অত্যন্ত নিম্নমানের আক্রমণ হৈয়াছে। খুব পরিকল্পিত একটি আবর্তের মধ্যে তিনি পড়িয়াছেন। একটি জাল যেন তাহাকে ধীরে ধীরে জড়াইয়া ফেলিবার জন্য আগাইয়া আসিতেছে। একটি ফাঁদ তিনি পুনরায় চেষ্টা করিতে থাকেন স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখিবার। কিন্তু বারংবার আক্রমণের মুখে পড়েন। তাহার শক্তি সামর্থ্য ভিন্ন পথে চালিত হৈয়া যাইতেছে তিনি বুঝিতে পারেন। বিভূতিভুষন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মেঘমল্লার’ যাহারা পড়িয়াছেন তাহারা জানেন, দেবী সরস্বতীকে বন্দী করিয়া তাহাকে মৃতপ্রায় করিয়া ফেলিয়াছিল অশুভ শক্তি।  তখন তিনি মহিমা ভুলিয়া গিয়াছিলেন তাহার আত্মবিস্মরণ হৈয়াছিল। তিনি ভয় পাইতেন। ধীরে ধীরে বিবর্ণ হৈয়া গিয়াছিলেন। তিনি অনন্যা হৈতে ধীরে ধীরে সাধারণে রূপান্তরিত হৈয়া গিয়াছিলেন। সেই বিবর্ণ রূপ দেখিতে পাইয়াছিল প্রদ্যুম্ন। সুন্দর কিছু দেখিলে কেহ মুগ্ধ হয়, কেহ তাহা নষ্ট করিতে চায়। কারণ তাহাতে নিজের ভিতরের কদর্য রূপটি স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়া উঠে, সুন্দর কিছু দেখিলে নষ্ট করিতে না পাইলে অসুস্থ লোকের অস্তিত্ত্বটিই বিফল হৈয়া যায়। হয় দখল করিব নয় নষ্ট করিব – এই বিদ্বেষের উপর ভিত্তি করিয়া বহু বিশ্বাস কাঠামো তৈরি করিয়া অনুশীলন করে। কিন্তু ইহাই শেষ কথা নহে। সরস্বতী যেমন আছেন, কালী, চামুন্ডাও প্রকট হন সময় উপস্থিত হৈলে। কৈশিকীর ধ্যানভঙ্গ করিয়াছিল যাহারা, দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তাহাকে ভাঙিয়া দিতে চাহিয়াছিল যাহারা তাহারা জানিত না, এইগুলি মোকাবিলা করিতে যুগে যুগে ভিন্ন রূপ ধরিতে হয় নারীদের। ঔদ্ধত্ব, অন্যায়, আর বিকার বাড়িয়া গেলে তাহাকে দমন করিতে ধীরে ধীরে অন্য রূপে প্রকট হন তাঁরা। তাহার দৃষ্টান্ত নিতান্ত কম নহে। কৈশিকীও বিরক্ত হৈয়াছিল। একসময় দেখিল এই উপদ্রব বন্ধ না করিলে সাধনার ব্যাঘাত ঘটিতেছে। তখন তিনি চামুন্ডা রূপ ধরিলেন এবং অসুর দমন করিয়া পুনরায় ধ্যানে বসিলেন। মহাদেব স্মিত হাসিলেন। এবং আসিয়া বলিলেন, ফসল ফলাইতে ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতে হয়। তোমার ক্ষেত্র প্রস্তুত হৈয়াছে, তুমি এখন যাহা করিবে তাহাতেই সোনা ফলিবে। যাহা জানিতে না তাহা জানিয়াছ – এখন তুমি মুক্ত।

 

No comments:

Post a Comment

                                         নদীর পাড়ে  দেহঘর                                                মধুপর্ণা   একটা কোলাজ কে সাজায়,...