যোগিনী তোমাকে…২
মধুপর্ণা
দেখিতে পাই এক যোগিনী হাঁটিয়া যায় সময়ের আলপথ
ধরিয়া। কি এক মগ্নতায় আচ্ছন্ন তাহার অবয়ব। দৃঢ় পায়ে হাঁটিয়া যায়, তাহার দৃষ্টি নরম
অথচ অতলস্পর্শী। এক একটা মায়ার জালিকা সে দেখিতে পায়। তাহাকে জিজ্ঞাসিলাম, তুমি যাও
কোথায়? সে অদ্ভুত ভাবে হাসে, যাত্রা তাহার পথের অনুরাগে। সে পালটা জিজ্ঞাসে, তুমি দাঁড়িয়ে
কেন, হাঁটো। বলি, কোন দিকে? সে বলে, যে কোনো একদিকে। সবদিকে রাস্তা। যে কোনো একদিক
দিয়ে হাঁটিলেই এক গন্তব্যে পৌঁছায় সকলে। হাঁটিতে হাঁটিতে কথা হয়, যোগিনীর চারপাশে জ্যোতির্বলয়।
নষ্ট আত্মা সামনে আসিলে হয় তড়িতাহত হৈয়া ছিটকাইয়া পড়িবে নয় খোল নলচে বদলাইয়া শুদ্ধতার
পথ ধরিবে। বলি, কি প্রকারে সাধিলে এই অসম্ভব? উত্তর আসে, তুমি দেখিতেছি দুনিয়াদারীর
নিয়ম কানুন কিছুই শিখো নাই, ক্ষমতা নাশ করিতে ক্ষমতার বিন্যাস জানিতে হয় সূক্ষ্ম আকারে।
জানিয়া তাহার পর তাহাকে নস্যাত করিতে হয়। যোগিনীর রকম দেখিয়া আগ্রহ বাড়ে। কথার পিঠে
কথা বাড়ে না। একটি প্রবাহ বহিতে থাকে। সাবলীল, স্বচ্ছন্দ। যোগিনী বলে, চোখ কান নাক
কি শুধু ভোগ করিতে পাইয়াছো? গান শুনিতে আর আকাশ দেখিতে আর ফুলের সুগন্ধ পাইতে! এই গুলি
সজাগ করিয়া রাখিতে হয়। যাহাতে, আঁচ করিতে পার কোন বিষ কোন পথ দিয়া আসিতেছে, যাইতেছে
আর আসন পাতিতেছে। একদিকে চালিত করিয়া দিলে তোমার বিপদ তুমি আঁচ করিতে পারিবে না। যোগিনীর
ধনুকের ছিলার মত গড়ন আর তাহার বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি তাহাকে প্রায় মায়াহরিণী করিয়া তুলিয়াছে।
বলি, কত জন্ম ধরিয়া তুমি এই সূক্ষ্মতায় উপনীত? সে তাকায় এক প্রকারে, তাহার অন্তর্ভেদী
দৃষ্টি, যেন এক একটি স্তর ভেদ করিতে করিতে আগাইয়া চলে, সামনের দৃশ্য দেখে কেউ, কেউ
দেখে দৃশ্যের ভিতরের বিন্যাস, কেউ দেখে দৃশ্যের অতীত ভবিষ্যত, কেহ দেখে প্রেক্ষাপটে
দৃশ্যটির জটিল অবস্থান,কেহ দেখে দৃশ্যটির আশু প্রভাব, সূদুর প্রভাব। যোগিনীর দৃষ্টি
যেন সবকটি স্তর ভেদ করিয়া দৃশ্যটির সঙ্গে একটি সম্পর্ক স্থাপন ক্রিয়া ফেরত আসে, আর
দৃশ্যটি প্রভাবিত করিয়া রাখিয়া আসে। সাধারণে কেবল দৃশ্য দেখিয়া, শব্দ শুনিয়া প্রভাবিত
হয়, গ্রহণ করে। যোগিনীর শক্তি সেইখানে, যেখানে দৃশ্যের সহিত তাহার দৃষ্টির ধাক্কা লাগিয়া
তৃতীয় একটি মাত্রা নির্মিত হয়। দৃশ্যটি বদলাইয়া যায়। যোগিনী বদলায় না। স্থির প্রজ্ঞা
এইমত তুমি পাইলে কোথায়? যোগিনী বলে, মানুষের বিষ ধারণ করিয়া ছিলাম বহুপূর্বে।বিষে আমাকে
খাইবে কি তাহাকে খাইয়া হজম করিয়া ঔষধী বানাইয়াছি। সাপের বিষে কেহ মরে আর রকম জানিলে
সেই থেকে ঔষধ বানায় কেহ। তাহাকে করজোরে নমস্কার করি। যোগিনী হা হা হাসিয়া উঠে। তাহার
হাসিতে বোধ করি সামনে কাঁচ থাকিলে চুরমার হৈয়া ভাঙ্গিয়া যাইত। মানুষও খান খান হৈয়া
ভাঙিয়া যায় হয়তো। যোগিনীর এই বিদ্যা দেখিয়া মস্তিস্কে একটি প্রকষ্ঠ খুলিয়া যায়। যোগিনী
বলে, পা চালাও, ত্বরা করো, ধীরে চলিলে গন্তব্যের আগে সুর্য্য ডুবিবে। হাঁটিতে থাকি।
No comments:
Post a Comment