যোগিনী
সংবাদ
মধুপর্ণা
তারপর একটা সময় আসে, যখন আকাশ পরিষ্কার আর
সূত্র গুলি চোখের সামনে সুবিন্যস্ত। যোগিনী বড় করিয়া একটা নিশ্বাস নেয় আর বলে, একটি
ভিত্তির উপর দাঁড়া। আমি বলি, তোমার কথার আগাপাশতলা বুঝি না। যোগিনীর ভাষা বুঝিতে প্রায়
বার বছর লাগিয়া গিয়াছে। সে বলিয়া যায়, শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়ায় আগে। তারপর শাখা প্রশাখা
ছড়ায় গাছ। দেখেছিস? বলি, শিকড় ছাড়া গাছ দাঁড়াবে কেমন করে, মাটিতে গাঁথা তাই তার বিস্তার
সুললিত, সুন্দর। যোগিনী মুখের কথা কাড়িয়া নেয়, বলে, গাছ যেমন শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়ায় আর
শাখা মেলে উপরে। আমি তাহাই বলিতেছি। পায়ের তলা হৈতে মাটি কাড়িয়া লৈতে দুনিয়ার বহু আয়োজন।
গাছ কাটিয়া ফেলিতেই পারে যে কেন যখন তখন কিন্তু উপরাইয়া ফেলিতে অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য
দিয়া যাইতে হয়। পূর্ণ বিকাশ শিকড় ছাড়া হৈবে না। আমি কিঞ্চিত অবিশ্বাস লৈয়া চুপ করিয়া
থাকি আর ঝগড়ার সুরে বলিতে চেষ্টা করি, তুমি সব জানো! তোমার এইসব মনগড়া কথা আমি বিশ্বাস
করি না। যোগিনী হাসে। অভিজ্ঞ মানুষ অনভিজ্ঞতা দেখিয়া যেমন সুন্দর করিয়া হাসে তেমনি
করিয়া হাসে। বলে, তুই আমাকে আগে শ্রদ্ধা ভক্তি করিতিস বিস্তর। ক্রমে তাহা প্রশ্নে অবিশ্বাসে
রূপান্তরিত। বলি, তুই কি চাস! আনুগত্য! প্রশ্নহীন আনুগত্য! যোগিনী বলে, না। তুই আমাকে
প্রশ্নে প্রতিযুক্তিতে ধ্বংস করিয়া দে তাহাই আমি আকাঙখা করি, কিন্তু অবিশ্বাস করিস
না। এইখানে বড় ব্যাথা আমার। সব জয় করিয়াছি, এইটি এখনও ব্যাথা দেয়। সুযোগ পাইয়া রসিকতা
করি! ব্যাথা আছে এখনও তোর! তুই যেমন পাষান,পিশাচী। তোকে কিছু ব্যাথা দেয় এখনও! যোগিনী
নরম হৈয়া আসে। নরম করিয়া পাশে বসে। উগ্রচন্ডা ভাব তাহার কোমল হৈয়া যায়। চোখে চোখ রাখিয়া
বলে, ভিত্তির উপর দাঁড়া। শিকড় বড় প্রয়োজন। শাখা মেলিতে শিকড় বড় প্রয়োজন। যোগিনীর সহিত
সম্বন্ধ অম্লমধুর। অধিকাংশ সময়ই বিবাদ বিসম্বাদ। পারিলে পরস্পরকে আঁচড়াইয়া খাইয়া ফেলি
আর কি। যোগিনী এই প্রথা চালু করিয়া রাখিয়াছে। আমিও তাহাতে সঙ্গত দিয়াছি। তর্ক বিতর্ক।
কিন্তু শ্রদ্ধা অটুট। তাহাকে এই প্রকারে নরম হৈতে দেখিয়া ছ্যাঁত করিয়া উঠে। তাহাকে
বলি, শোন তোকে উগ্রই মানায়। তোর নরম ব্যবহার দেখিতে পারি না। তুই ছাড় এইসব ভোলচাল।
স্বমহিমায় ফিরিয়া আয়। যোগিনী তাহার সেই রক্তপিপাসু হাসি আবার ভাসিয়া উঠে। বলি, তুই
বড় অসহ্য রে, তোকে না গিলিতে পারি, না ফেলিতে পারি। যোগিনী বলে, তোকে আমি মন্ত্র দিব।
বলি, থাক। আমার আর মন্ত্রে কাজ নাই। তুই রগড় করিয়া আমার মাথা নষ্ট করিস না। যোগিনী
তাহার স্বভাবে ফিরিয়া আসে, সেই রহস্যময়, সান্ধ্য আবছায়া ফিরিয়া আসে তাহার কথায়। বলে,
যন্ত্রখানা মন্ত্র ছাড়া চলিবে না। তাহার আগে ভব নদীতে স্নান করিতে হৈবে আর তাহার পর
একটি আয়না তোকে আমি দেখাইব। বলি, অবিশ্বাস আমি তোকে আর করিব না। তুই বলিলে অবলীলায়
আগুনে দিব ঝাঁপ। বল কোথায় কি করিতে হৈবে। তাহার অন্তর্দৃষ্টির সামনে আগে অস্বস্তি লাগিত।
এখন আর তাহা নাই। সে বলে, মন্ত্র লৈবি যদি তাহা হৈলে পুরাতন বসন ফেলিয়া আয়। অতীত একখানি
সময়ের সুতা দিয়া তৈরি বসন বৈ তো না। জীর্ণ বস্ত্র বহুবার ত্যাগ করে মানুষ। নতুন বসনে
স্নান করিয়া মন্ত্র লৈতে হয়। যোগিনী সেই নদীর কথা বলিতে শুরু করে, আর কি কি আচার আছে
একে একে বলিতে থাকে। আর একসময় বলে, দ্বন্ধে কি খুঁড়িয়া খায়? বলি, না। চল।
No comments:
Post a Comment