Sunday, October 4, 2026

 

                                           শান্ত বিকেলে

                                            মধুপর্ণা

 

শান্ত একটা নদীর পাড়ে অলৌকিক বিকেলে সে বসিয়া আছে একক, একাকী। ডাক পাঠায় সে বিনাতারে, বাতাসের সুতায়। গিয়া জিজ্ঞাসি, তুমি এইখানে বসিয়া আছ! সে বলে, একটি অঙ্ক করিতেছি মনে মনে। মিলিয়া যাইতেছে আবার কিছুক্ষন পর মিলিতেছে না। বলি কি অঙ্ক? উত্তর দেয়, কত দাগ পড়িল, কতগুলি মুছিলাম আর কতগুলি রহিল আর কতগুলি আরো দাগ সৃষ্টি করিল, কি করিলে সব দাগ মুছিবে আর পাতা হৈবে মহাশূন্য। এই জটিল অঙ্ক মিলিতে মিলিতে মিলাইয়া যায়। কিছুতেই শেষ করিবার তৃপ্তিখানি পাইতেছি না। কয়েকটি সমীকরণ বলিয়া বুঝাইতে হয় না, না বলিয়াও জানা যায়, যোগাযোগ শুধুমাত্র ভাষিক নহে, অন্তত ধ্যানস্থ স্থানে তো নহেই। ধ্যানস্থ স্থান গুলির যোগাযোগের পন্থা ভিন্ন, যোগের তরিকা আলাদা, যোগ আর বিয়োগের প্রক্রিয়া অন্যতর। যে জানে সে জানে, যে জানে না সে জানে না। একটি শাখা কিম্বা একটি পাতা যেমন বৃহত গাছে ঝুলিয়া আছে, তাহার কিছু হৈলে সমস্ত গাছ তাহা টের পায় তেমনি একজনের স্নায়ুতন্ত্রে কিছু ঘটিলে সামহিক চৈতন্য তাহা জানিতে পারে। সামান্যতম চ্যুতি বা বিচ্যুতিতে সমস্ত তন্ত্রের ভিতর খবর যায়। আর সমস্তটি আন্দোলিত হৈতে থাকে। প্রভাবিত হয়। যোগিনী বলে, দাগ গুলি মিলাইব কি করিয়া বলিতে পারিস? আছে কোনো পন্থা?  বলি, বিন্যাস বদল এত সহজ নহে, বিন্যাসের সুতা গুলি জট পাকাইয়াছে ধীরে ধীরে, একদিনে নহে, সেই অবিন্যস্ত সুতা আরো অনেক জায়গায় গিয়া জুড়িয়াছে, সেইখানে হৈয়াছে আরো তালগোল। এখন কোন খানে কাটিয়া কোন খানে জুড়িলে সুবিন্যস্ত হৈবে এ বড় জটিল অঙ্ক। যোগিনী বলে, অন্তত বুঝিতে পারিলি কি আঁক কষিতেছি। অনেককে বুঝাইতেই পারি না। উত্তরে বলি, না বোঝার কিছুই নাই, অভিজ্ঞতায়, অনুভবে যাহা থাকিবে তাহা বুঝিতে সময় লাগে না, যোগাযোগ সেইখানে ঘটে, না হৈলে একই ভাষায় কথা কিন্তু কেহ কিছু বুঝিতে পারিবে না। সংযোগ ভিন্ন তারে বাঁধা। যোগিনী গান গাহিয়া উঠে, আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে…।“ সুরের সঙ্গে সুর মেলানোটাই একটা সাধনা জানিস? “ তোমার যে তার বাঁধা কাছের সুরে, সেই বাঁশি যে বাজে দূরে…” কাছের সঙ্গে দূরের সুর মেলাতে পারাটাই একটা বিরাট যোগ। “ গানের লীলার সেই কিনারে, যোগ দিতে কি সবাই পারে… এই সামঞ্জস্যটাই, পরিমিতিটাই সাধনা। অন্যের ভাষা তুমি বুঝতেই পারো, কিন্তু তার যোগের ভাষা যদি তুমি না জানো সংযোগ সাধন হবে না। যা হবে তা একটা বিশাল দূর্ঘটনা। তার চোট সামলাইয়া ওঠা খুব জটিল। খুব বেদনাদায়ক। তুমি যে তারে বাঁধা সেই তারে যদি অন্যে বাঁধা না থাকে তাহা হৈলে অনুভুতি ক্ষত বিক্ষত হৈয়া যাইবে। রক্তাক্ত হৈয়া ঘুরিতে হৈবে। তেলে তুমি জল মেশাইতে পারিবে না। কিছুতেই না।

No comments:

Post a Comment

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...