যাত্রা
মধুপর্ণা
যোগিনী
বলিতে থাকে, বাধাবিপত্তি ঠেলিয়া হাঁটিতে হয়, ক্রমাগত হাঁটিয়া যাইতে হয়। যাহাই হৈয়া
যাক, ধীর পদে, দ্রুত পদে, হাঁটিতে থাক। থামিবার অবসর এইখানে নাই। তাহার কথা ঠিক, গঙ্গাসাগরের
এক বৃদ্ধার কথা মনে পড়ে, মাথায় লোটাকম্বল, হাতে পুটলি, সবল মানুষে এক দূর হাঁটিতে হিমশিম
খাইতেছে, বৃদ্ধা আপন মনে ধীরে ধীরে হাঁটিতেছে, তাহাকে দেখিয়া অবাক লাগিতেছে, এত ভারী
লৈয়া হাঁটিতেছে কি প্রকারে, এই দূর যাইবে কি
প্রকারে। কিন্তু দেখা গেল বাকীরা যখন নানা প্রকার চিৎকার করিয়া, নানা ক্লান্তি
প্রকাশ করিয়া শক্তি ক্ষয় করিতেছে, তখন বৃদ্ধা কোন
কথা না বলিয়া আপন মনে ধীর গতিতে হাঁটিয়া যাইতেছে নির্বিকার। ঠিক সময়ে পৌঁছাইয়া
গেল। গিয়া ঘুমাইল। ভোরে উঠিয়া করিল সাগরে স্নান। নির্বিকার চিত্ত। হৈ হল্লা করিল কম
বয়সীরা সুপ্রচুর। হাঁপাইল, বার বার বলিল, আর পারি না, আর পারা যায় না, সারাদিনে ৮-৯
ঘন্টা হাঁটিবার কথা কলরব করিয়া সকলকে নানা ভাবে বলিল যারা একই পথ অতিক্রম করিয়া আসিতেছে।
বৃদ্ধা চুপ, লোটাকম্বল লৈয়া ধীরে ধীরে হাঁটিয়া সাগরে স্নান করিয়া বাড়ি ফিরিয়া গেল।
তাহাকে দেখিয়া পরিষ্কার হৈয়া গেল, সে দেবতার কাছে আসিয়াছে, কলরব করিতে আসে নাই। সে
আসিয়াছে ধৈর্য্য, অধ্যবসায় আর তিতিক্ষা ছালাইয়া চকচকে করিতে, বার্তি কোন কিছুতেই তাহার
মনযোগ নাই। হরিদেবপুরের দিদিকে কথাটি জানাইতেই তিনি বলিলেন, সংসারে তিনি অনেককিছু দেখিয়াছেন,
এই সামান্যে তাহাকে কি বিচলিত করিবে! জনস্রোত চলিয়া যাইতেছে, ঈশ্বরের কাছে যাইতে যাইতে
মানুষে ঝগড়া করিতেছে, একে অপরকে দোষারোপ করিতেছে, ঠেলাঠালি করিতেছে, সেইখানেও নিজের
অধিকার স্থাপনের চেষ্টা করিতেছে। বৃদ্ধা তাহার জিনিসপত্র গুলি লৈয়া চুপচাপ চলিতেছে,
তাহার মন সে ঈশ্বর ভিন্ন আর কোনদিকে বিভক্ত করিতে রাজী নহে, সমস্ত মন একত্রিত করিয়া
সে একদিকে ধাবিত করিয়াছে, বাহ্যিক কিছুতে তাহার কিছু যাই আসিতেছে না তাহা পরিষ্কার।
ঘটনাটি যোগিনীকে খুলিয়া বলি, সে বলে, যাত্রাটির উদ্দেশ্যটিই তাই, যাত্রাটি সেই নিমিত্তই।
No comments:
Post a Comment