সেপ্টেম্বরের সকাল
মধুপর্ণা
মোহন সিং এর গানের মত একটা সকাল হয়। ‘দৈনন্দিন’
নামের একটা নিত্যনৈমিত্তিক বাতাস এসে জানান দেয় দিনের উপস্থিতি। সকালের আলো, সূর্যোদয়, সকালের
শীতল বাতাস, দুলে ওঠা বারান্দার গাছ, খোলা বই, খোলা স্ক্রীন, তানপুরার নরম আওয়াজ, দিন
শুরুর প্রশান্তি। মার নীরব উপস্থিতি। এইরকম নরম দিনগুলি পদ্মাসনে বসে থাকে, ভিতর থেকে
কেউ বলে ‘ফুলের মত সহজ সুরে, প্রভাত মম উঠিবে পুরে’ এই সকাল বহুকাল লালিত অর্জন। পাহাড়ের
সেই দার্শনিক দোকানীর কথা মনে পড়ে, কয়েক ঘন্টা ঘুরে অভ্যেস মত চায়ের দোকান খুঁজছি সেদিনও।
মনেস্ট্রির ধাতস্থ শান্তির ঘোর তখনও কাটে নি। চা মিলেগা? মিলেগা। দোকানী দিলেন চা,
তারপর এটা সেটা কথা, তারপর বেরোনোর আগে জিজ্ঞেস করি, কিতনা হুয়া? উত্তর আসে, চায়ে ইঁহা
মিলতা হ্যা লেকিন বিকতা নেহি। ঘোরের ভিতর এই সব কথা শুনে অদ্ভুত লাগে, দোকান খুলে বসে
আছেন, চা মিলেগা বললে বলছেন, মিলেগা তাহলে, চায়ে ইহা মিলতা হ্যা লেকিন বিকতা নেহি
- এই কথার অর্থ কি? লোকটি অপ্রস্তুত, বলে, মাম্মিনে বানায়া, সল্ট টি। আপনি বললেন চা
পাওয়া যায় কিনা তাই আমি বললাম পাওয়া যায়। আপনি তো জিজ্ঞেস করেন নি বিক্রি হয় কিনা।
বলি, পাহাড়ের লোকজন অদ্ভুত তো, যাই হোক ভাল থাকবেন। চলে যাই দূরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তা
ধরে হাঁটতে হাঁটতে। ঘন্টা দুয়েক পর ঐ রাস্তা ধরে ফিরছি আবার। নানা ভোগান্তির পূর্বস্মৃতি
আচ্ছন্ন করে রেখেছে যথারীতি। চুপচাপ ধীরে ধীরে হেঁটে যাওয়া নেশার মত। দূর থেকে কেউ
জিজ্ঞেস করছে, আর ইউ ক্রাইং? না তো। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার পাড়ে। তারপর এটা সেটা
কথার পর জানা গেল, ভদ্রলোক কালিম্পং কোর্টের আইনজীবি, শৈশব থেকে বৌদ্ধগুম্ফায় থেকে
পড়াশোনা করেছেন, পরবর্তীতে সামাজিক জীবন স্রোতে ফিরেছেন, ছুটিতে মায়ের দোকানে সাহায্য
করতে বসে আছেন, দোকানদারীর কিছুই জানেন না। অসংখ্য গল্প কথা, বৌদ্ধ গুম্ফায় সন্নাসীদের
জীবন সম্পর্ক যত কৌতুহল ছিল জানা গেল, প্রশ্ন কথা পল্লবিত হয়ে গেল বহুদূর। বৌদ্ধ পার্ক
থেকে বৌদ্ধ গুম্ফায় যাবার দীর্ঘ ছায়াচ্ছন্ন পথ, রোজ একবার হেঁটে আসা যায়। পরদিন বিকেলে
হাঁটতে বেরিয়ে আবার গল্প হল অনেক, পূর্বের সন্নাসীজীবন, পড়াশোনা, বৌদ্ধদর্শন নিয়ে সাধনা
আর চর্চা। এইরকম ছদ্মবেশী দার্শনিক দোকানী আমি দেখিনি কোনদিন। ভদ্রলোকের মা এলেন কিছু
পর। পাহাড়ে গত দুই বছরে অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে এই বার লাভার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত।
No comments:
Post a Comment