লোকবিশ্বাসে গাছেরা কথা শোনে
মধুপর্ণা
ভয়াবহ
বৃষ্টির দিন আজ। রাজনগর, বীরভূম। উঠোনের গাছেরা কার্নিভাল করছে যেন। দুলে দুলে ভিজে
যাচ্ছে। প্রতিটা গাছে সবুজের শেড আলাদা। দেবদারুর সবুজ আর নিমের সবুজ, পেয়ারা গাছের
সবুজ আর আতার সবুজ, খিন্নি পাতার সবুজ আর টগর পাতার সবুজ ভিন্ন কিন্তু আলাদা নয়, সদৃশ
কিন্তু এক নয়। আগাছা আর লেবু পাতার সবুজ এক কিন্তু সমান নয়। হিন্দুস্থানী ক্লাসিক্যাল
চলছে ভিতরে। ম্যায়নে উম্র লাগাদি সারি… । কয়েকদিন আগে এক দাদা বলছিলেন, শান্তনিকেতনের
গাছ গুলোর সৌষ্টব আলাদা, মজা করে বলি, রবীন্দ্রনাথের গান শুনে গাছ গুলো সুললিত সুন্দর।
দাদা বলে, বোলপুরের গাছ গুলো দেখেছো? হ্যাঁ, আনহীলড। দেখে মনে হয় মহা ঝামেলার মধ্যে
আছে। গাছেরা অনুভূতি বুঝতে পারে দাদা? তিনি এবার মজা শুরু করেন, হ্যাঁ, মনের কথা লিখে
অথবা বলে গাছে ঢিল বেঁধে আসে অনেকে! বুঝতে পারে বৈকি! মানসিক কথার কথা বলছেন! সে তো
লোকবিশ্বাস। দাদা হাসেন। মানুষের ভাষা তারা শুনতে পায় বা বুঝতে পারে কিনা জানিনা। কিন্তু
যারা গাছের ভাষা জানে তাদের ভাষা গাছেরা বুঝতে পারে। বলি, বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের তলে বসলেন,
বৃক্ষটি কি জানত বুদ্ধের কথা! দাদা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান, বলেন, বনের গাছ আর জঙ্গলের গাছের
রকম আলাদা জানো! লোকালয়ের গাছ অন্য। লোককথায় আছে কোনো গাছ মেরে ফেলতে হলে তার সামনে
গিয়ে গালিগালাজ করে আসত অনেকে, গাছটা এমনি মরে যেত আর যত্নে ভালোবাসায় গাছের বিস্তার
অন্যরকম হয়! মনে পড়ে যায় আরো একটা লোকবিশ্বাস অথবা কিংবদন্তী অথবা মিথ অথবা প্রত্নপ্রতিমা…
রাজনগরে যখন বিধর্মীদের আক্রমণ হয়েছিল, সব লুঠপাঠ করে দখল করার জান্তব প্রক্রিয়া তখন
চলছে, সম্পদ এবং নারী – এই দুইয়ের প্রতি বিধর্মীদের লোভ, দখল আর লুঠপাঠ তাদের রক্তে,
আর স্বচ্ছতা নয়, কৌশল একমাত্র হাতিয়ার। তখন রাজাকে মেরে ফেলে এবার তারা অন্দরমহলের
দিকে ধাবিত। রানী তখন ছুটে গিয়েছিল রাজবাড়ির নিকটস্থ গাব গাছটির কাছে। গিয়ে বলে, আমাকে
রক্ষা করো, বিধর্মীদের অসুস্থ বিকার আর রিরংসার হাত থেকে, রাজা মৃত। কথিত আছে, গাব
গাছটি তার কথা শোনে আর তার কান্ড দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, রানী ভিতরে প্রবেশ করেন গাছের।
বিধর্মী আক্রমণ কারীরা রানীকে খুঁজে হন্যে।
তারপর বাকী সবাই রানীকে খুঁজে পায় না। তারপর দেখা যায় গাছের কান্ডে রানীর কিছু চুল আটকে থেকে গেছে, রানীকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে গাছ তার দরজা বন্ধ করতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় কিছু চুল
বাইরে থেকে যায়। রাজনগরের প্রতিটা শিশু কিশোর এই লোককথা শুনে বড় হয়। আমিও শুনেছি খুব
ছোটবেলায়, ওয়ানে পড়ার সময়, রানীর স্নানঘর হামাম তখনও সংস্কার হয় নি, ঝোঁপঝাড়ে পুর্ণ
তখন, কালীদহের জল নাকি সেই হামামে উঠে এলে রানী স্নান করতেন, আবার সেই জল দহে ফিরে
যেত। কালীদহের মাঝে মা কালীর মন্দির সুড়ঙ্গ পথে ডাঙ্গা থেকে কালী মন্দিরে যাওয়া যেত।
উল্টোদিকে হাওয়ামহলের সিঁড়ি, খিলান গম্বুজ সব খসে পড়েছে। আর তার পাশে গাব গাছটি এখনও
দাঁড়িয়ে। একটি জীবন্ত লোককথা এখনো লোকমুখে ঘুরে ফেরে, গাছটি রানীর কথা শুনেছিল। রানীকে
রক্ষা করেছিল। সামনে রাজার দালান নামে পরিচিত কাছারী বাড়ি, পাশে হাটতলা তারপাশে বারুদখানা। মোট কথা হল, লোকবিশ্বাসের
ভিতরে গাছেরা কথা বলে, মানুষের কথা শোনে। গাছে ঢিল বেঁধে এলে শোনে কিনা জানি না, কঙ্কালীতলায়
পাকুর গাছে অনেক ঢিল বাঁধা রং বেরঙ্গের সুতো দিয়ে। তাদের আর্জি গাছ শুনবে কি না জানিনা,
কিন্তু যাদের বলার ছিল তাদের বলা তো হল। লোকবিশ্বাসে গাছেরা কথা শোনে। দাদা বলেন, শুধু লোককথায় নয়, এমনিও শোনে, পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ, বলে দেখো, শুনবে। কার্শিয়াং এর চা বাগানে একটা বড় গাছের কথা মনে পড়ে। শুনতে পায় কিনা না জেনেও বলে এসেছিলাম কিছুকথা। তারপর পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল কিছুদিনের মধ্যে আমূল।
No comments:
Post a Comment