Monday, August 30, 2021

 ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস।

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস, অরন্ধন,  দ্বিতীয় বর্ষ ।। দশম ওয়েব সংস্করণ ।। ১৩ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ৩০ আগষ্ট ২০২১


মধুপর্ণা

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি একটি সূক্ষ্ম অথচ প্রভাবশালী ক্ষমতার বিন্যাস রচনা করে। প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ বৈষম্য জারিত হয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন কাজে কথায়, উচ্চারণে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। তার প্রতিনিয়ত চর্চা যে বাতাবরণ তৈরি করে তার মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক, উচ্চনীচের সমীকরণ রচিত হতে থাকে। তার ভিতরেই আমাদের যাবতীয় সম্পর্ক নির্মিত হয় বা বলা ভাল, সম্পর্ক এই ক্ষমতার সূক্ষ্ম রাজনীতির বুনোটের বাইরে কিছু নয়। যা কিছু আমাদের কাছে সাধারনভাবে অপাপবিদ্ধ, সরল, সহজ হিসাবে প্রতিভাত হয়, তার চলন এবং রেখা সমূহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে মানুষের ভিতরে পারস্পরিক এবং অন্তবর্তী রাজনীতি কতটা লিঙ্গ, উচ্চনীচের ক্ষমতা বিন্যাসের প্রতিফলন। পরিবারবদ্ধ, সমাজবদ্ধ, বিবাহে আবদ্ধ, সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষ এই সমীকরণের মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত চর্চা করে চলেছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সমীকরণ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোজাত বৈষম্যকে নিজের মধ্যে বহন করে চলে। প্রতিটি ঘটনা, কাজ, কথা, টানাপোড়েন একটি বৈষম্যপূর্ণ নারী বিদ্বেষী সমাজের প্রতিবিম্ব হাজির করে প্রতিনিয়ত। এই যে আমরা কিছু কথা প্রায়শই শুনে থাকি, "ঘরের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না", অথবা "সম্পর্কের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না” এখন কথা হল আমরা রাজনীতি বলতে ঠিক কি বুঝি। আমাদের কথা প্রতিটি বাক্য, শব্দ, শব্দের ব্যবহার সব কিছুর মধ্যেই একটি তরল ক্ষমতার প্রবাহ চলমান থাকে। এর ভিতরে নারীকে হেনস্থা করার জন্য আয়োজন সর্বত্র বিছিয়ে রয়েছে। এই কাঠামোগত বিষক্রিয়া যা জারিত করে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের জীবন আর মানুষের সম্পর্কের বয়ান, দু কলম লিখে তা বদলানো যায় না। কি করে বদলানো যায় ? কোনো ভাবেই কি যায় ?

যে প্রোগ্রামিং বা পদ্ধতিক্রম জারি রয়েছে তা মানুষকে সেভাবেই তৈরি করবে। জন্মদাগের মত রয়ে যাবে কাঠামোর অসুখ মানুষের মনে, ইচ্ছায়, অভ্যাসে, চাহিদায়। এখন আনলার্ন বা অর্জিত জ্ঞান বাতিল করে নিজেকে মুক্ত চিন্তক হিসাবে গড়ে তুলতে এবং নতুন অভ্যাস ও ইচ্ছাপরম্পরায় নিজেকে অন্বিত করতে যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার আয়োজন আমাদের কাছে নেই এবং তার যে কোনো সম্ভবনা সমূলে বিনাশ করে আমাদেরই কাঠামো। এই আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকের মত কেউ কেউ চিৎকার করে। ঐ যেমন মেহের আলি চিৎকার করত “ তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়!" তেমনি এই ক্ষমতার প্রবাহ থেকে এই কাঠামো উপজাত জটিল বিন্যাস থেকে আমাদের আশু মুক্তি নেই।

নারীকে আরোপিত জীবনের পাঠ ভুলে নিজের জীবন বেছে নিতে হবে, নির্মাণ করতে হবে স্বতন্ত্র জীবনচর্যা। নারীবাদ মানে স্বতন্ত্র জীবনবোধ। আরোপিত অবদমনের চক্রান্ত চিহ্নিত করা এবং সেই আগ্রাসনের আয়োজন অস্বীকার করার স্পর্ধা। এত সূক্ষ্ম ভাবে এই বহুস্তরিক লিঙ্গবৈষম্যের জাল বিছিয়ে রাখা আছে যে তাকে বিশ্লেষণ করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমরা নিজেদের অভ্যাস বদলাতে পারি মাত্র কাঠামো বদলাতে পারি না। এই এত চারিদিকে কথাবার্তা, সভা সমিতি, সাম্য সাম্য খেলা। ব্যক্তিমানুষের অভ্যাস আর তজ্জনিত ইচ্ছার বদল না হলে কিছুই বদলায় না। ওয়ান ফাইন মর্নিং লিঙ্গসাম্য দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকবে না জেনেও বিশ্লেষণ করে যেতে হয়, তার কারণ একটা ঘন্টা শতাব্দীর পর শতাব্দী পরম্পরাক্রমে বাজিয়ে যেতেই হয় কেউ না কেউ তার শব্দ কান পেতে একান্তে কখনো শুনবে বলে। তারপর থেকে আরো একটা প্রতিধ্বনি শুরু হয়ে আরো কিছুদূর যাবে বলে। অভ্যাস আর ইচ্ছা বদল করে লিঙ্গসাম্যের চর্চা কখনো শুরু হবে বলে।

Wednesday, August 25, 2021

 




                 শান্তিনিকেতনের মেয়েদের হস্টেলে বিনোদন; অবসর যাপনের একটি বিকল্প নির্মাণ। (১)

                                                                  মধুপর্ণা 

শান্তিনিকেতনে আবাসজীবনের শুরুর দিকে  হস্টেলে আমরা  একরকম প্রযুক্তি থেকে দূরেই ছিলাম। উত্তরশিক্ষায় অর্থাৎ একাদশ দ্বাদশ শ্রেনীতে যখন পড়ি  তখন থাকতাম শান্তিনিকেতনের প্রথম মেয়েদের হস্টেল শ্রীসদনে (প্রতিষ্টা - ১৯০৯)  মেনব্লকে দোতলায় ডর্মেটরিতে।  তখন ফোন রাখা বারণ। হস্টেলের ওয়েটিং রুমে ফোন আসবে বাড়ি থেকে তখন ডেকে দেওয়া হবে কথা বলার জন্য। কেউ কেউ লুকিয়ে ফোন রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু মাঝেমধ্যেই ধরা পড়লে হুলস্থুল কান্ড হত। টিভি রুমে টিভিতে শনি রবিবার ডিডি বাংলায় সিনেমা। ব্যাস। তখন আমাদের বিনোদন গুলোর আদল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, সময় উদযাপনের আয়োজন ছিল অন্যরকম। হস্টেলে অনেককেই দেখতাম নানা ধরনের হাতের কাজ করতে। দেখতাম,  যারা পাঠভবন থেকে পড়েছে তারা বহুরকমের কাজ জানে। রাখী তৈরি করা, কার্ড বানানো, সরা আঁকা, সেলাই  বহুকিছু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বা বিভাগীয় অনুষ্ঠানের জন্য তারা বানাতো। আনন্দমেলায় বিক্রির জন্য সারা হস্টেল জুড়ে জিনিসপত্র বানানোও চলত। উত্তরশিক্ষায় কুমকুমদি কাজ দিতেন। আনন্দমেলার জন্য রুমাল করতে গিয়ে কুমকুমদির কাছ থেকে সেলাই শিখেছিলাম। এদিকে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় “ওয়ার্ক এডুকেশন” সূত্রে আমাদের রাজনগর বালিকা বিদ্যালয়ে সেলাই শেখানো হয়েছিল। শান্তনিকেতনে হস্টেলে গিয়ে কুমকুমদির কাছে থেকে শিখে আনন্দমেলার জন্য রুমাল বানাতে খুবই ভাল লাগত তখন।

যাবতীয় বিনোদন আর বিনোদনের অভ্যাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। হস্টেলে একে অন্যের কাছ থেকে বিভিন্ন দক্ষতা  ছাত্রীরা শিখত তারপর  নিজেরা চেষ্টা করত। পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে উত্তরশিক্ষায় আসা “বহিরাগত” ছাত্রীরা ধীরে ধীরে শিখে নিত নানা ধরনের কাজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর অন্যদের দেখতে দেখতে নিতান্ত আনাড়ী ছাত্রীটিও দক্ষ হয়ে উঠত নানাধরনের কাজে। সময় যাপনের নিজস্ব প্রকরণ আর উপায়ের স্বতন্ত্র একটি আদল নির্মিত হয়ে উঠত এইভাবে। বিনোদনের একটি নিভৃত বয়ান গড়ে উঠত প্রত্যেকের। কেউ সেলাই করে, কেউ পদ্য লেখে, কেউ সরা আঁকে অথবা পরিকল্পনা করে রাখে সামনের আনন্দবাজারে কি ধরনের কাজ সে করবে। পরীক্ষা শেষ হবার পর অনেককেই দেখতাম  কাপড়, সুতো কিনে আনতে অথবা কার্ড আর রং কিনে আনতে। বাড়ি যাবার আগে যতটা সময় পাওয়া যাবে তখন নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অথবা বাড়ি গিয়েও দীর্ঘ ছুটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা করে নিয়ে যাওয়া জরুরি ছিল অনেকের কাছেই। অবসর যাপনের এবং বিনোদনের একটি ভিন্ন মাত্রা ছিল যা কোনো সাপেক্ষতায় যুক্ত নয়, নিজের ভিতর থেকে উৎসারিত। বাইরে থেকে তীব্র কোনো প্রভাবক ছাড়াই নিজের নিভৃতির মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং বিভিন্ন কাজের ভিতরে নিজেকে প্রকাশ করার একটি নিবিড় প্রক্রিয়া সেইসূত্রে তৈরি হতে থাকত। এর ভিতরেই গড়ে উঠত বিনোদনের বিকল্প পরিসর যা আত্মক্ষয়ী নয়, আত্মনির্মাণে সহায়ক।যার যা তৈরি করতে ইচ্ছা করছে সে যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী না ও হয়, হস্টেল খুঁজে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য যে সেই বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। এইভাবে পারস্পরিক কাজ এবং দক্ষতা লেনদেনের একটি সাবলীল প্রক্রিয়া হস্টেলের মধ্যে বহমান ছিল। সোসাল মিডিয়া আর তীব্র উত্তেজক বিনোদনের কোনো অভ্যাস তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রমানসকে গ্রাস করে নি। নির্মাণের, সাধনার মধ্যে থেকে উঠে আসত নিজের বিনোদিত হবার স্বতন্ত্র ধাঁচ, যা কাউকে ছাপিয়ে নিজেকে জাহির করে না অথচ স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এই অনন্য ভাবে সাধারণ  হবার তালিম শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দর্শনের মধ্যে যেমন রয়েছে তেমনি তা হস্টেলে মেয়েদের বিনোদিত হবার, আনন্দিত হবার স্বতন্ত্র আদলটিও গঠন করে দিত অজান্তেই।

দ্বাদশ শ্রেনীর প্রি ডিগ্রী পরীক্ষা হবার পর স্নাতকে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত যে সময় পাওয়া গেছিল তাতে আমিও তৈরি করেছি্লাম দুটো সালোয়ার। কুমকুমদি নকশা করে দিয়েছিলেন আর সেলাই গুলোও শিখিয়েছিলেন। আর আমি সেলাই গুলো করেছিলাম। প্রায় ষোল বছরের আবাসজীবনে এই লকডাউন সূত্রে দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার সুবাদে সেইসব খুঁজে পাওয়া গেল। মনে পড়ে গেল অজস্র কথা আর দৃশ্য পরম্পরা। 





Friday, August 20, 2021

 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শ শালা -  মধুপর্ণা কর্মকার। ২৩ শে কার্তিক ১৪২৭।  নভেম্বার ৯ ,২০২০। 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শশালা।  - মধুপর্ণা কর্মকার।  ৩ জানুয়ারী ২০২১ / ১৯ শে পৌষ ১৪২৭। 


শান্তিনিকেতেন, ডিসেম্বার,  ২০২০। 





বিষণ্ণ কুয়াশার অলৌকিক সকাল, কোপাই এর পাড়। 

শান্তিনিকেতন, ডিসেম্বার ,২০২0।

১। 
২। 


 

 

করোনা পরিস্থিতি ও নারী - অবস্থা ও অবস্থান।

 মধুপর্ণা কর্মকার। 

( অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ, ২৩ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ৭ই জুন ২০২১ এ প্রকাশিত।) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 

বিশ্বজুড়ে গত দেড় বছর যাবত অতিমারী আমাদেরকে পর্যুদস্ত করে রেখেছে, এ নিয়ে আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণও আমরা রোজ পড়ছি, শুনছি। সমাজ জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন, ইত্যাদির প্রভাব সম্পর্কিত আলোচনায় আমাদের মন আর মগজকে ক্রমাগত খাদ্য জুগিয়ে চলেছে সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম কখনও প্রয়োজনীয় ভাবে কখনও অপ্রয়োজনীয় ভাবে। বহুল আলোচিত এই বিষয়ের ভিতরে নিজেদের ইচ্ছা ও চাহিদামত আমাদের খুঁজে নিতে হচ্ছে রসদ। করোনা পরিস্থিতিতে নারীরা কেমন আছেন? সমাজের বিচিত্র স্তরের নারীরা ? “আমাদের সমাজের নারী" এই ভাবে এক গাত্রে ফেলা যায় নারীদের? যায় না। শ্রেনী, বর্ণ, জাতি, ধর্ম ভেদে বদলে যায় নারীদের অবস্থা ও অবস্থান। বিভিন্ন অবস্থানের নারী বিভিন্ন বিষয়ে আলাদা আলাদা ভাবে প্রভাবিত হন। এই সহজ সত্য বুঝতে আমাদের সময় লেগেছে বহুদিন কিন্তু সমাজে - নারীর সমস্যা" আসলে বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, সমাজের স্তর বিভাজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্যার সঙ্গে পাল্টায়, ভোল বদল করে , মাত্রায় হয় তারতম্য। সমাজের ভিন্ন অবস্থানের নারী ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত হয়, বিভিন্ন ঘটনার সংঘাতে ভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়।

   এই করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক বিভিন্ন স্তরে মানুষের বিচিত্র সমস্যা ইত্যাদির আড়ালে ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অবস্থানের মেয়েরা কেমন আছেন তার খোঁজ। তথাকথিত “বড় আর গুরুত্বপূর্ণ" ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেয়েদের সমস্যা। এই চাপা পড়ে যাবার গল্প নেহাত পুরোনো নয়, এই ধারা বহমান। পিতৃতান্ত্রিক মানস গঠন ঠিক করে দেয় কোনটা বড় ইস্যু , কোনটা প্রাসঙ্গিক আর কোনটা নয়। কি নিয়ে আলোচনা হবে, কোন বিষয় প্রচার করা হবে, কোন কোন বিষয় পুনঃ পুনঃ প্রচার করে মানুষের মস্তিষ্কের কোণায় কোণায় পৌঁছে দেওয়া হবে, কোন ঘটনার কোন বিশেষ ব্যখ্যাটি মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তােলা হবে তা খুব সূক্ষ্ম ভাবে নির্ধারণ করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। এই নির্বাচনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে নারীদের সমস্যা। কারন তা ব্যবস্থার কাছে অস্বস্তিকর। 

   করোনাকালে লকডাউন হবার পর সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সবাই যখন গৃহবন্দী হল তারপর মেয়েদের সমস্যা শুরু হল তুমুল ভাবে। প্রথমত আমাদের কাছে একটা মিথ্যা ভীতি তৈরি করা হল যে বাড়ি হল সব থেকে সুরক্ষিত জায়গা। এখানে মেয়েরা সব থেকে নিরাপদ। কিন্তু বাইরের মত ঘরের মধ্যেও পিতৃতন্ত্রের থাবা জাল বিস্তার করে আছে। এখানেও রয়েছে পুরুষতন্ত্রের দাঁত, নখ। পরিবারের কাঠামো আর সামাজিক স্তর ভেদে পরিবারের মেয়েরা শােষিত বা নিপীড়িত। নিরাপত্তার নামে, সুরক্ষার নামে কখনো কোন ছদ্মবেশ ছাড়াই পরিবার মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে রাখতে চায়। সেই সময় থেকে নানা সূত্রে বাড়ির বাইরে যেতে পারলে কিছুক্ষনের জন্য হলেও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে তারা। বাইরে কাজের সূত্রে বা বন্ধু বান্ধবীর কাছে গিয়ে নিজেদের কথা বলার অবকাশ বা নিজের মনের শুশ্রষা করার সুযোগ পায়। লকডাউনে সে সব সুযোগ বন্ধ। তার ফলে মানসিক ভাবে তারা গেঁজিয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রেই। অন্যদিকে গার্হস্থ্য হিংসা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবেই। বাড়ির ছেলের বাইরে কাজ বন্ধ তাই বাড়িতে রয়েছে কিন্তু তারা কত অংশে পরিবারের কাজে সাহায্য করেন সে কথা আমরা কিছুটা অনুমান করতে পারি। নিজের হেনস্থাকারীর সঙ্গে বিরতি ছাড়াই অনেক নারী থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক নারী কাজ হারিয়েছেন তার ফলে অনটন উঠেছে চরমে। একটি সামাজিক সত্য নগ্নভাবে উঠে এসেছে পরিবার নারীদের জন্য প্রশ্নাতীত নিরাপদ জায়গা নয়। এবং যাবতীয় সামাজিক বা জাতীয় সমস্যার একটি স্বতন্ত্র মুখ রয়েছে। সব সমসার সাধারণীকরন নারীর সমস্যাকে তুলে আনতে পারে না তা এই মহামারীর পরিস্থতি আরও আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। 


 

সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা"?

মধুপর্ণা কর্মকার 

( অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, ত্রয়োদশ সংস্করণ, ১৮ ই মাঘ ১৪২৭, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২১ এ প্রকাশিত) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 

   উত্তমদা সেদিন বললেন সমাজ জীবনে মেয়েদের ভুমিকা নিয়ে কিছু লিখতে। তারপর সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখলুম যেদিকেই তাকাই সব দিকেই বৈষম্য। অন্তত যে লেন্স থেকে সমাজকে দেখার চেষ্টা করছি, গবেষণা সূত্রে। সেদিক থেকে দেখলে আরো নানা বৈষম্যের মধ্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লিঙ্গ বৈষম্য। এখানে বলে নেওয়া ভাল সব বৈষম্যই আসলে পরস্পর সম্পর্কিত। আরো নানা বৈষম্যের সংগে লিঙ্গ বৈষম্যের সম্বন্ধ অতি ঘনিষ্ঠ । বিশেষ একটি লিঙ্গের মানুষকে কারন ছাড়াই সমস্যার মধ্যে দূর্গতির মধ্যে হেনস্থার মধ্যে ফেলে রাখে আমাদের সমাজ। এখন কোন দিকটা নিয়ে লিখি। আসলে বিষয় হল কাঠামো। একটা কাঠামোর মধ্যে যখন সমস্যাটা থাকে তখন সেখান থেকে যা যা উৎপন্ন হবে সব কিছুর মধ্যেই থাকবে সেই কাঠামোর গুণ। তাই সমাজের অভ্যন্তরে যে বৈষম্যের বীজ রোপিত হয়ে আছে তাই আসলে ডালপালা মেলে আমাদের সমাজের সর্বত্র ছড়িয়েছে। এখন যদি সমাজের দিকে তাকাই তাহলে সবদিকেই সেই বিষবৃক্ষের ফল দেখতে পাব। ভাষায়, শিল্পে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, পোশাকে, পেশায়, সিনেমায়, বিজ্ঞাপনে, শিক্ষায়, ধর্মে। এই এক একটি বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা আলোচনা করে কি লাভ, কতদূর তার প্রভাব আমি জানি না। মূল কাঠামোটাকে আঘাত করতে পারলে তবেই লিঙ্গ বৈষম্যপূর্ণ সমাজের ডালপালা আর উৎপাদিত ফলের চরিত্র গুনাবলী আপনিই বদলে যাবে হয়তো।

   তারপরেও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ছোট ছোট বিষয় গুলো তুলে ধরে আলোচনা করার দরকার আছে। কেন আছে? তার কারন আমরা নিমজ্জিত হয়ে আছি বৈষম্যের ভয়াল নাগপাশে। সেখানে ভ্রম ও বিভ্রম বিস্তর। যা কিছু প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান ধ্যান ধারনা সেই সব থেকে নিজেকে মানসিক ভাবে বের না করতে পারলে আমাদের কাছে লিঙ্গ বৈষম্যের চেহারাটা ধরা পড়ে না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে না কার্য কারন। তাই ছোট ছোট বিষয় গুলােকে সন্দেহ করতে শিখলে, সমালোচনা করতে শিখলে তবেই মূল জায়গায় নজর পড়বে। কাঠামোকে প্রশ্ন করার কথা আমাদের মনে আসবে । তাই উত্তমদা যেভাবে বললেন, সমাজ জীবনে মেয়েদের ভূমিকা বা অবস্থান নিয়ে লেখার কথা তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আর তাৎপর্যপূর্ণ। সেই ভাবে সমাজের নানা ক্ষেত্রকে পর্যবেক্ষন করে সেই পটভুমিতে আলোচনা করাটাও জরুরি।

  লিঙ্গ অসাম্য যেভাবে আমাদের সমাজের মজ্জার মধ্যে ঢুকে আছে সেখান থেকে আমাদের মন ও মনন বের করে আনতে হলে লিঙ্গ বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি এবং সেই সচেতনতার প্রতিনিয়ত চর্চা জরুরি। যখন আমরা সামাজিক নানা বিষয়ের সংগে সংগে নিজেদের প্রতিটা কাজ, প্রতিটি কথার আত্মসমালোচনানা করতে করতে নিজেদের জীবনচর্যার খোলনলচে বদলাতে বদলাতে এগিয়ে যেতে পারব তখন এই তথাকথিত সচেতনতার একটা অর্থ দাঁড়াবে। অন্যথায় এই সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা" ও "অবস্থান" একটা বিষয় মাত্র হয়ে থেকে যাবে। তা নিয়ে লেখা হবে দিস্তা দিস্তা ছাপাও হবে বিস্তর। কিন্তু জগদ্দলের মত চেপে থাকা লিঙ্গ বৈষম্যের এই ভার নামবে না আমাদের সমাজের ভিত্তি থেকে। নারীরা বহন করে যাবেন এই দূর্বিষহ বোঝা, তাদের ক্ষমতার বুদ্ধির অপচয় হবে সর্বত্র। এবং আমরা "নারীকেন্দ্রিক" লেখা লিখে নিজেদের ইগো সেঁকে নিতে থাকব ক্রমাগত।

  সমাজ জীবনে "নারীর" ভুমিকা যখনই বলছি তখনই একটা "আদারিং" করছি অর্থাৎ একটা নারীকে "অপর" ভাবার একটা সূক্ষ্ম বিষয় এখানে কাজ করছে। যেন নারী সমাজের মূল উপাদান নয়, বিচ্ছিন্ন কিছু। "সমাজ জীবনে পুরুষের অবস্থান ও ভুমিকা" বিষয়ে কেউ প্রবন্ধ পৃথিবীর কোন প্রান্তে আদৌ লিখবে না। কয়েকটা শিরোনাম যদি ভাবার চেষ্টা করি, অমুক সাহিত্যে পুরুষের অবস্থান আলোচনা, তমুক শিল্পে সংস্কৃতিতে পুরুষের অবদান, হ্যান সিনেমায় পুরুষের চিত্রায়ন বিষয়ে মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ, ত্যান শিক্ষায় অথবা ধর্মে পুরুষের অবস্থান ও ভূমিকা আলোচনা । কেমন হাস্যকর শােনাচ্ছে না ? তার কারন সমাজটা যেন তাদেরই। যার মালিকানা স্বীকৃত, তার আবার ভূমিকা কিসের ? একাধিপত্যের এটাই ভাষা। "অপর" বানানো। তারপর সেই "অপর"কে ছেলে ভুলানাের মত ভুলিয়ে রাখা। সক্ষমতা সম্পর্কে, অবস্থান সম্পর্কে বিস্মৃত করে রাখা যাতে নিজেদের ক্ষমতা কায়েম রাখা যায়। এইবার “পুরুষ"এর জায়গায় "নারী" বসিয়ে শিরোনাম গুলো আরেকবার পড়ুন। এইবার খুব চেনা লাগছে নিশ্চয়। কারন আমরা শিরোনাম গুলো আখছার শুনছি সমাজের সর্বত্র, দেখছি পত্র পত্রিকায়, অ্যাকাডেমিক লেখায়, সেমিনারে, বিজ্ঞজনদের আড্ডায়। শুনে আমাদের আস্বাভাবিক কিছু মনে হচ্ছে না। এক ধরনের অস্বীকৃতি থেকে এই "ভুমিকা"র বিষয়টা আসে। তার মূল অংশকে লঘু করে তাকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ভূমিকা আলোচনা করা হয়। আলোচনার বিষয় নির্বাচন ও আ্লোচনার ভাষা আসলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা বৈষম্যের বিষাক্ত ঘন অন্ধকারের রাজনীতির বাইরে নয়। এ নিয়ে নারীবাদী ভাষাতাত্ত্বিকগণ তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। আপাতত সেদিকে আর যাচ্ছি না। তবে শেষে এইটুকু বলি, প্রচলিত আলোচনার বিষয়, তার বয়ান, ভাষার সংগে লিঙ্গরাজনীতি প্রসূত ক্ষমতার সম্পর্ক - বিষয় গুলো শুনতে জটিল মনে হলেও আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত তার চর্চা করছি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে।

  - গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

কথাবার্তা ২

মধুপর্ণা কর্মকার

( অরন্ধন, প্রথম বর্ষ, দশম ওয়েব সংস্করণ, ৫ই পৌষ ১৪২৭, ডিসেম্বার ২০, ২০২০ এ প্রকাশিত। ) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 যা কিছু আমরা স্কুল কলেজে পড়ি না, প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃত নয় সেই সব দক্ষতা, জ্ঞান নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের তাচ্ছিল্য আছে।প্রতিষ্ঠানিক যা কিছু তার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা প্রবল। কিন্তু তার বাইরে যা কিছু চর্চিত হয় তার প্রতি আমাদের সমীহ তেমন নেই। তার একটা বিরাট অংশ দেখা যাচ্ছে নারীর বিভিন্ন দক্ষতা। পিছিয়ে রাখা (পিছিয়ে পড়া বলা যাবে না।) মানুষের দক্ষতাকে ধর্তব্যে আনে না বিশেষ কেউ। তার মধ্যে আবার আছে আরাে অবদমিত কেউ। তিনি আর কেউ না। তিনি প্রান্তিক নারী। সার্বিক ভাবেই নারীর কাজ, নারীর অবদান অস্বীকৃত থেকে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। তার যে কাজ গুলো দৃশ্যমান সেখানে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। নারীর শ্রম আমাদের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে ভিতর থেকে। বিপুল কায়িক শ্রম ও সময়ের বিনিয়োগ দিয়ে নারী সভ্যতাকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু তার কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন অংসখ্য কাজ রয়েছে যা সমাজে প্রায় অদৃশ্য বা বলা ভাল আমাদের সমাজ যেন দেখেও দেখে না। কিন্তু তার সুফল ভোগ করে নির্বিকার চিত্তে। বলা বাহুল্য সেই সব তথাকথিত অদৃশ্য কাজ যা নারী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করে আসছে সেইসব কাজই আমাদের সমাজের চালিকা শক্তি। তাহলে সেইসব কাজ স্বীকৃত ও সমাদৃত নয় কেন? এখানেই পিতৃতন্ত্রের রাজনীতি।

 প্রান্তিক নারীর দৈনন্দিন শ্রমের কথা যদি ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে সে যেকাজ গুলো মূলত করে সেগুলো নিয়ে সমাজ বিশেষ ভাবে উপকৃত হয়। সে রান্না করে। প্রতিদিনের খাবার যেমন সে বানাতে জানে তেমনি বছরের নানা সময়ের নানা অনুষ্ঠানের সময় সে হতে পারে পুজোপাৰ্বন বা হতে পারে ঋতু উৎসব তখন আরো নানা বিচিত্র খাবার সে বানায়। পিঠে পুলি, নবান্ন, নাকু , খই মুড়ি । সে জানে ধান থেকে কি কি পদ্ধতিতে নানা ধরনের খাবার বানানাে যায়। ধান বিশেষ পদ্ধতিতে সেদ্ধ হলে তারপর সেই চাল থেকে ভাত হবে। তার পরিবার সন্তান সন্ততিরা তাই খেয়ে রোজ দিনযাপন করবে। ধান থেকে আবার ভিন্ন পদ্ধতিতে চাল হলে তা থেকে মুড়ি হবে। আরো ভিন্ন ভাবে হবে চিড়ে, খই। আতপ থেকে হবে পায়েস। আরো কত কি সে জানে। যা থেকে যুগ যুগ ধরে মানুষেরা, নারীর পরিবার তার সন্ততিরা টিকে আছে। সে সন্তান পালন করে। নানা পরিচর্যায় লালন পালন করে সে গড়ে তােলে , বড় করে তার সন্তান। এই লালন পালনকে “মেয়েলি" কাজ নাম দিয়ে হেয় করে আসছে। কিন্তু এই লালন পালনের দক্ষতার মাঝেই টিকে আছে আমাদের চলমান সমাজ। সে ঘরদোর সাফসুতরো করে, নিকোয়, ঝাঁট দেয়। সচল রাখে গৃহস্থালী। এই অত্যন্ত সহজ, স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া কাজ গুলো গুরুত্বহীন ভাবে দেখা হয় তার কারন এগুলো করে একজন নারী। নারী সম্পর্কিত যা কিছু সবকিছু হেয় করে দেখলে পিতৃতন্ত্রের অসুস্থ অহং তৃপ্ত হয়। নারীর ওপর আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষায় পিতৃতন্ত্র অযুক্তির পরম্পরা নির্মাণ করে আর তা সমাজে লাগু করে। সে সময় পেলে ছবি আঁকে ঘরের দেয়ালে। তাকে যথাযথ শিল্প হিসাবে স্বীকার করা হয় না। যেন নিতান্ত সময় কাটানোর জন্য কিছু গুরুত্বহীন কাজ। সেলাইকে শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি পেতে অনেক সময় লেগেছে। তার একটাই কারন সেলাই এর মাধ্যমে শিল্প তৈরি করে মূলত মেয়েরা। এইভাবে দেখা যাবে যা কিছু কাজ নারী করে ও যা কিছু কাজ নারী সম্পর্কিত সেইসব নিয়ে এক ধরনের তুচ্ছ তাচ্ছিল আছে। সেই কাজগুলাে যা মূলত চালিকা শক্তি। তাকে গুরুত্ব দেওয়া না হোক স্বীকার করলেও নারীকে শক্তিশালী করে তােলা হবে, তাকে তার উপযুক্ত জায়গা দেওয়া হবে যাতে সে নিজেকে চিনবে। সেই আতঙ্কে তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়। যেন এই কাজ গুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে কেউ চাইলেই পারে। এ জন্য দক্ষতার দরকার হয় না। আর এই সব কাজ নিতান্ত মেয়েলি। এই মেয়েলি' তকমার মধ্যেই রয়েছে লিঙ্গবৈষমের রাজনীতি। যেন এই কাজ গুলো স্বীকারের অযোগ্য। তা স্বীকার করে গুরুত্ব দেওয়া যায় না। কিন্তু তা অবলীলায় ভোগ করা যায়। তার দক্ষতা নকল করে বাজারে বেচেছে কেউ কেউ। কিন্তু কোনোভাবেই নারীকে তার কাজের জন্য তার দক্ষতার জন্য প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এইভাবেই পিতৃতন্ত্র তার বিষাক্ত ও ভয়ংকর বিন্যাস বহাল রাখে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যস্থাও যেহেতু পিতৃন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত এবং পিতৃতন্ত্র বহাল রাখার একটি হাতিয়ারও বটে। সেখানেও দেখা যাবে একই বিষয়ের প্রতিফলন। নারীর অসামন্য কিছু দক্ষতা যা খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না যেন, বা দেখলেও তা ভুলে যেতে হয় তৎক্ষনাৎ সেইসব অতিপ্রয়োজনীয় অথচ প্রকট দৃশ্যমান নয় যা কিছু তা দিয়ে টিকে আছে আমাদের মনুষ্য সভ্যতার রেশ।

  ঠিক এই ব্যবহার মানুষেরা প্রকৃতির সংগে করে থাকে। পিতৃতন্ত্রে জারিত সভ্যতা নারী ও প্রকৃতিকে একই মনোভাব থেকে ব্যবহার করে ও শােষণ করে। নিজের প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছায়। যথাযথ সংবেদনশীলতা ও স্বীকৃতি ছাড়াই। আর এই যে পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতি তাতে দেখা যাচ্ছে সব থেকে বেশি প্রভাবিত হন ও ক্ষতির সম্মুখীণ হন প্রান্তিক নারী। যাদের জীবন প্রকৃতি সংলগ্ন ও যাদের জীবন অনেকাংশে প্রকৃতিনির্ভর । পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি মনোভংগী যার বৈশিষ্ট্য হল দমন ও অপব্যবহার। এই মনোভাব একদিকে নারীর ক্ষতি করছে অন্যদিকে প্রকৃতির।

 - গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।


                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...