নীরবতার পুরুষতান্ত্রিক (কদ) অর্থ।
দ্বিতীয় বর্ষ ।। ত্রয়োদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৪ আশ্বিন ১৪২৮ ।। ১১
অক্টোবর ২০২১
নীরবতার পুরুষতান্ত্রিক (কদ) অর্থ।
দ্বিতীয় বর্ষ ।। ত্রয়োদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৪ আশ্বিন ১৪২৮ ।। ১১
অক্টোবর ২০২১
‘খুব বাড় বেড়েছে!' এই বেড়ে
যাওয়া "বাড়" নারী-স্বাধীনতার লক্ষ্যে জরুরি সোপান।
দ্বিতীয় বর্ষ ।। একাদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৭ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
মধুপর্ণা
"খুব বাড় বেড়েছে দেখছি!”
ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস।
শান্তিনিকেতনের মেয়েদের হস্টেলে বিনোদন; অবসর যাপনের একটি বিকল্প নির্মাণ। (১)
মধুপর্ণা
শান্তিনিকেতনে আবাসজীবনের শুরুর দিকে হস্টেলে আমরা একরকম প্রযুক্তি থেকে দূরেই ছিলাম। উত্তরশিক্ষায়
অর্থাৎ একাদশ দ্বাদশ শ্রেনীতে যখন পড়ি তখন
থাকতাম শান্তিনিকেতনের প্রথম মেয়েদের হস্টেল শ্রীসদনে (প্রতিষ্টা - ১৯০৯) মেনব্লকে দোতলায় ডর্মেটরিতে। তখন ফোন রাখা বারণ। হস্টেলের ওয়েটিং রুমে ফোন আসবে
বাড়ি থেকে তখন ডেকে দেওয়া হবে কথা বলার জন্য। কেউ কেউ লুকিয়ে ফোন রাখার চেষ্টা করত।
কিন্তু মাঝেমধ্যেই ধরা পড়লে হুলস্থুল কান্ড হত। টিভি রুমে টিভিতে শনি
রবিবার ডিডি বাংলায় সিনেমা। ব্যাস। তখন আমাদের বিনোদন গুলোর আদল ছিল সম্পূর্ণ
ভিন্ন, সময় উদযাপনের আয়োজন ছিল অন্যরকম। হস্টেলে অনেককেই দেখতাম নানা ধরনের হাতের
কাজ করতে। দেখতাম, যারা পাঠভবন থেকে পড়েছে
তারা বহুরকমের কাজ জানে। রাখী তৈরি করা, কার্ড বানানো, সরা আঁকা, সেলাই বহুকিছু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বা বিভাগীয়
অনুষ্ঠানের জন্য তারা বানাতো। আনন্দমেলায় বিক্রির জন্য সারা হস্টেল জুড়ে জিনিসপত্র
বানানোও চলত। উত্তরশিক্ষায় কুমকুমদি কাজ দিতেন। আনন্দমেলার জন্য রুমাল করতে গিয়ে
কুমকুমদির কাছ থেকে সেলাই শিখেছিলাম। এদিকে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় “ওয়ার্ক
এডুকেশন” সূত্রে আমাদের রাজনগর বালিকা বিদ্যালয়ে সেলাই শেখানো হয়েছিল। শান্তনিকেতনে
হস্টেলে গিয়ে কুমকুমদির কাছে থেকে শিখে আনন্দমেলার জন্য রুমাল বানাতে খুবই ভাল
লাগত তখন।
যাবতীয় বিনোদন আর বিনোদনের অভ্যাস
ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। হস্টেলে একে অন্যের কাছ থেকে বিভিন্ন দক্ষতা ছাত্রীরা শিখত তারপর নিজেরা
চেষ্টা করত। পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে উত্তরশিক্ষায় আসা “বহিরাগত” ছাত্রীরা
ধীরে ধীরে শিখে নিত নানা ধরনের কাজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর অন্যদের দেখতে দেখতে নিতান্ত আনাড়ী ছাত্রীটিও দক্ষ হয়ে উঠত নানাধরনের কাজে। সময়
যাপনের নিজস্ব প্রকরণ আর উপায়ের স্বতন্ত্র একটি আদল নির্মিত হয়ে উঠত এইভাবে।
বিনোদনের একটি নিভৃত বয়ান গড়ে উঠত প্রত্যেকের। কেউ সেলাই করে, কেউ পদ্য লেখে, কেউ সরা আঁকে অথবা পরিকল্পনা করে রাখে সামনের আনন্দবাজারে কি ধরনের কাজ সে করবে।
পরীক্ষা শেষ হবার পর অনেককেই দেখতাম কাপড়,
সুতো কিনে আনতে অথবা কার্ড আর রং কিনে আনতে। বাড়ি যাবার আগে যতটা সময় পাওয়া যাবে তখন নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অথবা
বাড়ি গিয়েও দীর্ঘ ছুটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা করে নিয়ে যাওয়া জরুরি ছিল অনেকের কাছেই। অবসর যাপনের এবং বিনোদনের একটি ভিন্ন মাত্রা ছিল যা কোনো সাপেক্ষতায় যুক্ত নয়,
নিজের ভিতর থেকে উৎসারিত। বাইরে থেকে তীব্র কোনো প্রভাবক ছাড়াই নিজের নিভৃতির মধ্যে
আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং বিভিন্ন কাজের ভিতরে নিজেকে প্রকাশ করার একটি নিবিড় প্রক্রিয়া
সেইসূত্রে তৈরি হতে থাকত। এর ভিতরেই গড়ে উঠত বিনোদনের বিকল্প পরিসর যা আত্মক্ষয়ী
নয়, আত্মনির্মাণে সহায়ক।যার যা তৈরি করতে ইচ্ছা করছে সে যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী না ও হয়, হস্টেল খুঁজে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য যে সেই বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। এইভাবে পারস্পরিক কাজ এবং দক্ষতা লেনদেনের একটি সাবলীল প্রক্রিয়া হস্টেলের
মধ্যে বহমান ছিল। সোসাল মিডিয়া আর তীব্র উত্তেজক বিনোদনের কোনো অভ্যাস তখন
শান্তিনিকেতনের ছাত্রমানসকে গ্রাস করে নি। নির্মাণের, সাধনার মধ্যে থেকে উঠে আসত
নিজের বিনোদিত হবার স্বতন্ত্র ধাঁচ, যা কাউকে ছাপিয়ে নিজেকে জাহির করে না অথচ
স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এই অনন্য ভাবে সাধারণ হবার তালিম শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দর্শনের মধ্যে
যেমন রয়েছে তেমনি তা হস্টেলে মেয়েদের বিনোদিত হবার, আনন্দিত হবার স্বতন্ত্র আদলটিও
গঠন করে দিত অজান্তেই।
দ্বাদশ শ্রেনীর প্রি ডিগ্রী পরীক্ষা হবার পর স্নাতকে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত যে সময় পাওয়া গেছিল তাতে আমিও তৈরি করেছি্লাম দুটো সালোয়ার। কুমকুমদি নকশা করে দিয়েছিলেন আর সেলাই গুলোও শিখিয়েছিলেন। আর আমি সেলাই গুলো করেছিলাম। প্রায় ষোল বছরের আবাসজীবনে এই লকডাউন সূত্রে দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার সুবাদে সেইসব খুঁজে পাওয়া গেল। মনে পড়ে গেল অজস্র কথা আর দৃশ্য পরম্পরা।
অরন্ধন - ছবি প্রদর্শ শালা - মধুপর্ণা কর্মকার। ২৩ শে কার্তিক ১৪২৭। নভেম্বার ৯ ,২০২০।
অরন্ধন - ছবি প্রদর্শশালা। - মধুপর্ণা কর্মকার। ৩ জানুয়ারী ২০২১ / ১৯ শে পৌষ ১৪২৭।
শান্তিনিকেতেন, ডিসেম্বার, ২০২০।
করোনা পরিস্থিতি ও নারী - অবস্থা ও অবস্থান।
( অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ, ২৩ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ৭ই জুন ২০২১ এ প্রকাশিত।) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।
বিশ্বজুড়ে গত দেড় বছর যাবত অতিমারী আমাদেরকে পর্যুদস্ত করে
রেখেছে, এ নিয়ে আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণও আমরা রোজ পড়ছি,
শুনছি। সমাজ জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন, ইত্যাদির প্রভাব সম্পর্কিত আলোচনায় আমাদের
মন আর মগজকে ক্রমাগত খাদ্য জুগিয়ে চলেছে সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক
মাধ্যম কখনও প্রয়োজনীয় ভাবে কখনও অপ্রয়োজনীয় ভাবে। বহুল আলোচিত এই বিষয়ের ভিতরে
নিজেদের ইচ্ছা ও চাহিদামত আমাদের খুঁজে নিতে হচ্ছে রসদ। করোনা পরিস্থিতিতে নারীরা
কেমন আছেন? সমাজের বিচিত্র স্তরের নারীরা ? “আমাদের সমাজের নারী" এই ভাবে এক গাত্রে ফেলা যায় নারীদের? যায় না। শ্রেনী, বর্ণ, জাতি,
ধর্ম ভেদে বদলে যায় নারীদের অবস্থা ও অবস্থান। বিভিন্ন অবস্থানের
নারী বিভিন্ন বিষয়ে আলাদা আলাদা ভাবে প্রভাবিত হন। এই সহজ সত্য বুঝতে আমাদের সময়
লেগেছে বহুদিন কিন্তু সমাজে - নারীর সমস্যা" আসলে বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়,
সমাজের স্তর বিভাজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্যার সঙ্গে পাল্টায়,
ভোল বদল করে , মাত্রায় হয় তারতম্য। সমাজের
ভিন্ন অবস্থানের নারী ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত হয়, বিভিন্ন
ঘটনার সংঘাতে ভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়।
এই
করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক বিভিন্ন স্তরে মানুষের বিচিত্র সমস্যা ইত্যাদির আড়ালে
ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অবস্থানের মেয়েরা কেমন আছেন তার খোঁজ।
তথাকথিত “বড় আর গুরুত্বপূর্ণ" ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেয়েদের
সমস্যা। এই চাপা পড়ে যাবার গল্প নেহাত পুরোনো নয়, এই ধারা বহমান। পিতৃতান্ত্রিক মানস গঠন ঠিক করে দেয় কোনটা বড় ইস্যু ,
কোনটা প্রাসঙ্গিক আর কোনটা নয়। কি নিয়ে আলোচনা হবে, কোন বিষয় প্রচার করা হবে, কোন কোন বিষয় পুনঃ পুনঃ
প্রচার করে মানুষের মস্তিষ্কের কোণায় কোণায় পৌঁছে দেওয়া হবে, কোন ঘটনার কোন বিশেষ ব্যখ্যাটি মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তােলা হবে তা
খুব সূক্ষ্ম ভাবে নির্ধারণ করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। এই নির্বাচনে অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে নারীদের সমস্যা। কারন তা ব্যবস্থার কাছে অস্বস্তিকর।
করোনাকালে
লকডাউন হবার পর সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সবাই যখন গৃহবন্দী হল তারপর মেয়েদের সমস্যা
শুরু হল তুমুল ভাবে। প্রথমত আমাদের কাছে একটা মিথ্যা ভীতি তৈরি করা হল যে বাড়ি হল
সব থেকে সুরক্ষিত জায়গা। এখানে মেয়েরা সব থেকে নিরাপদ। কিন্তু বাইরের মত ঘরের
মধ্যেও পিতৃতন্ত্রের থাবা জাল বিস্তার করে আছে। এখানেও রয়েছে পুরুষতন্ত্রের দাঁত,
নখ। পরিবারের কাঠামো আর সামাজিক স্তর ভেদে পরিবারের মেয়েরা শােষিত
বা নিপীড়িত। নিরাপত্তার নামে, সুরক্ষার নামে কখনো কোন
ছদ্মবেশ ছাড়াই পরিবার মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে
বেঁধে রাখতে চায়। সেই সময় থেকে নানা সূত্রে বাড়ির বাইরে যেতে পারলে কিছুক্ষনের
জন্য হলেও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে তারা। বাইরে কাজের সূত্রে বা বন্ধু বান্ধবীর কাছে
গিয়ে নিজেদের কথা বলার অবকাশ বা নিজের মনের শুশ্রষা করার সুযোগ পায়। লকডাউনে সে
সব সুযোগ বন্ধ। তার ফলে মানসিক ভাবে তারা গেঁজিয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রেই। অন্যদিকে
গার্হস্থ্য হিংসা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবেই। বাড়ির ছেলের বাইরে কাজ বন্ধ তাই
বাড়িতে রয়েছে কিন্তু তারা কত অংশে পরিবারের কাজে সাহায্য করেন সে কথা আমরা
কিছুটা অনুমান করতে পারি। নিজের হেনস্থাকারীর সঙ্গে বিরতি ছাড়াই অনেক নারী থাকতে
বাধ্য হচ্ছেন। অনেক নারী কাজ হারিয়েছেন তার ফলে অনটন উঠেছে চরমে। একটি সামাজিক
সত্য নগ্নভাবে উঠে এসেছে পরিবার নারীদের জন্য প্রশ্নাতীত নিরাপদ জায়গা নয়। এবং
যাবতীয় সামাজিক বা জাতীয় সমস্যার একটি স্বতন্ত্র মুখ রয়েছে। সব সমসার
সাধারণীকরন নারীর সমস্যাকে তুলে আনতে পারে না তা এই মহামারীর পরিস্থতি আরও
আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
উৎসবের মরসুম মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...