Monday, November 8, 2021

 নীরবতার পুরুষতান্ত্রিক (কদ) অর্থ।

দ্বিতীয় বর্ষ ।। ত্রয়োদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৪ আশ্বিন ১৪২৮ ।। ১১ অক্টোবর ২০২১

- অক্টোবর ১১, ২০২১



মধুপর্ণা

“নীরবতা সম্মতির লক্ষণ"

এই বাক্যটি একটি বিষাক্ত লিঙ্গ রাজনীতি বহন করে।

কনসেন্ট বা সম্মতির সম্বন্ধে কোনো শিক্ষা যে সমাজে নেই, সেখানে নীরবতার অর্থ বোঝার মত সংবেদনশীলতা আশা করা অলীক। এই তুমুল ক্যাকোফনির ভীড়ে কে কি বলছে, আর কে কি বলতে চাইছে অথবা কে মুখস্থ কথা অভ্যাসে বলে যাচ্ছে আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না। এই অদ্ভুত একটা বিকট পারস্পরিকতার মধ্যে নীরবতা বলে একটা বিষয় কর্পূরের মত উবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অথবা যারা নীরবে, নিভৃতে বাঁচতে চায় তারা পিছোতে পিছোতে ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে। অথবা অন্যদের উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে চাপা পড়ে যাচ্ছে তার স্বর। এই চাপা পড়া স্বরের একটি বড় অংশ নারী। বলা ভাল বেশ বড় অংশ। নানান নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে থাকতে থাকতে ক্রমে চাপা পড়ে যায় তার কথা, তার স্বর, তার ইচ্ছা, তার অনিচ্ছা, তার অসম্মতি।

সামাজিক ভাবে নারী এবং নীরবতার সম্বন্ধ অত্যন্ত জটিল। নীরব নারী সমাজে পরিবারে বিপুল সমাদৃত। "সাত চড়ে রা নেই" সেই মেয়ে বড়ো "ভালো"। এখানে কোনো থ্রেট নেই। বিষাক্ত পৌরুষ এবং তার অসুস্থ অহং এখানে ঝুঁকির মুখে পড়বে না। বরং ডালপালা সমেত বাড়বে দিনে দিনে। নীরব শান্ত মেয়ে, বেশী কথা না বলা মেয়ে, চিৎকার না করা মেয়ে, চুপ করে মেনে নেওয়া মেয়ে, অন্যের অসভ্যতা, সীমালঙ্ঘন মুখ নীচু করে মেনে নেওয়া মেয়ে আমাদের সমাজ লালন করে। এই গুণাবলিতে খাপ খাওয়া মেয়েরা বিবাহের উপযুক্ত, পরিবারে, সমাজে সমাদৃত। নারী যেখানে "অপর", "আংশিক মানুষ", "দ্বিতীয় লিঙ্গ" হিসাবে গণ্য সেখানে পুরুষের কথার উত্তরে নীরবতা একটি লিঙ্গ রাজনীতিকে নগ্ন করে তোলে। প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া হয় নীরবতা মানে সম্মতি। অসম্মতি হিসাবে কখনো নীরবতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় নীরব নারীটি মূলত দূর্বল। নীরবতার পিতৃতান্ত্রিক অনুবাদ হয় সম্মতি নয় দূর্বলতা।

আবার সাহিত্যে কল্পনার খাদ্য এই নীরব নারীদের নিয়ে রোমান্টিসিজমের চাষ। তার মুখে কোন কথা নেই, নিজস্ব কোন স্বর নেই। তাই পুরুষ সাহিত্যিক নিজের ইচ্ছায় তার মুখে কথা বসাতে পারে। কল্পনা খাদ্য হিসাবে গড়ে তুলতে সুবিধা হয়, নিজেদের আজন্মলালিত বিষাক্ত পৌরুষের আরকে চুবিয়ে পরিবেশন করতে পারেন। কিম্ভুতকিমাকার সেই নারী মূর্তি যার কোন মুখ নেই, কথা নেই, স্বর নেই, ইচ্ছা নেই সেই নারীর ইমেজ কি প্রচন্ড আবেগ নিয়ে মানুষজন আস্বাদন করে থাকেন। "আদর্শ নারী” রা বেশি কথা বলে না। চুপ থাকে। তাকে প্রয়োজনে, ইচ্ছায় ব্যবহার করা যায়।

নীরবতাকে ভাবা হয় দূর্বলতা। অথবা অক্ষমতা। যে নারী ইতরামির সঙ্গে সম্মুখ সমরে না নিয়ে এড়িয়ে নিজের কাজে নিমগ্ন থাকতে চায়। সেই এড়িয়ে যাবার ভাষা অনূদিত হয় ভিন্ন ভাবে। মনে করা হয় তা দূর্বলতা। প্রতিরোধের একটি ভাষা নীরবতা। অবশ্য যদি প্রতিপক্ষের নূন্যতম শিক্ষা আর চক্ষুলজ্জা থাকে তবেই। পিতৃতন্ত্র এই নীরবতার ভাষা ভয় পায়। ক্ষমতার সূক্ষ্ম এবং নগ্ন রাজনীতি চালিয়ে যেতে অসুবিধা হয় বলে তা খানিকটা স্বেচ্ছায় এড়িয়ে চলে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আমাদের যাবতীয় কাঠামো বহির্মুখীদের জন্য তৈরি। অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বের জন্য এই পরিকাঠামো অনুপযুক্ত এবং ক্ষতিকারক। বেশ 'বলিয়ে কইয়ে' হলে সব জায়গায় সাফল্য পেতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু যারা অন্তর্মুখী তাদের পড়তে হয় সমস্যায়, অথবা তাদের সমস্যা অপ্রকাশিত থেকে যায়। পরিশেষে একটি কথা বলবার, নীরবতা একটি স্বতন্ত্র স্বর। স্বরহীনতা নয়।

Tuesday, September 21, 2021


‘খুব বাড় বেড়েছে!' এই বেড়ে যাওয়া "বাড়" নারী-স্বাধীনতার লক্ষ্যে জরুরি সোপান।

দ্বিতীয় বর্ষ ।। একাদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৭ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

মধুপর্ণা


"খুব বাড় বেড়েছে দেখছি!”

 এই বাক্যটা জীবনে সহস্রবার শোনেনি এমন মেয়ে আমাদের সমাজে খুঁজে পাওয়া মুসকিল। এমনকি যারা সমাজের, পিতৃতন্ত্রের বেঁধে দেওয়া নিয়মের পান থেকে চুন না খসিয়ে তথাকথিত 'সুশীলা' হিসাবে বিরাজ করেন তাঁরাও এই বাক্যবন্ধ শোনেন কখনও না কখনও। কারণ নিয়মের নিগড় বড় কড়া। এবং বিপজ্জনক কথা হল পিতৃতন্ত্রের সুবিধামত তা বদলায়। তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে সারাজীবন শিক্ষানবিশি চালিয়ে যেতে হয়। তারপরও অসম্পূর্ণ শিক্ষার অপমান নিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়। আর বাকি যারা 'বেয়াদপ', 'আংশিক বেয়াদপ" 'সহবতহীন', 'যাচ্ছেতাই' নারীরা রয়েছেন, প্রতিনিয়ত অথবা কখনও কখনও সীমা লঙ্ঘন করে পরিবার, সমাজ এবং ঘনিষ্ঠজনেদের বিরাগভাজন হয়ে থাকেন তাদের বাড় বেড়ে যাওয়া কেন এত গাত্রদাহের কারণ পিতৃতন্ত্রের? কেন এই বেড়ে যাওয়া বাড় হজম করতে পারা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়? কেন বাড় বেড়ে না যাওয়া "ভালো মেয়ে" আর গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠার শীলমোহর?

 “বাড়" বলতে বোঝায় বৃদ্ধি, অগ্রগতি, বিস্তার। কিন্তু এই শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্র এবং ভঙ্গী শব্দটির ওপর একটি স্ল্যাং বা অশিষ্ট শব্দের অর্থ আরোপ করেছে, যা সীমা ছাড়ানোর জন্য নিন্দাসূচক ভাবে নঞর্থক একটি প্রতীতি তৈরি করে। খুব বাড় বেড়েছে", "এত বাড় ভাল না' এই বাক্যগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত।

 কেউ জোরে হাসলে বা কথা বললে বাড় বেড়ে যায়, কারো লিপস্টিক গাঢ় হলে বাড় বেড়ে যায়, কেউ অবদমন পছন্দ না হওয়ায় চিৎকার করলে বাড় বেড়ে যায়, কারো জামাকাপড় সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নর্ম ছাড়িয়ে গেলে বাড় বেড়ে যায়, কারো ইচ্ছা-আকাংখা একান্তই নিজের হলে তাতেও বাড় বেড়ে যায়, কারো বক্তব্য ধারালো হলে বাড় বেড়ে যায়, কারো নিজেকে উদযাপন করার ইচ্ছা হলে বাড় বেড়ে যায়, কেউ নিজের ব্যক্তিগত বন্ধু নিজে খুঁজে নিলে বাড় বেড়ে যায়, কারো কয়েকজন পুরুষবন্ধু থাকলে বাড় বেড়ে যায়, আমাদের সমাজে মেয়েদের নিজের মত কিছু ইচ্ছা হওয়াটাই মূলত বাড় বেড়ে যাওয়া।

 এই বাড় বা বৃদ্ধির সঙ্গে সীমার ধারণা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আমাদের সমাজ মেয়েদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে। যে সীমা গুলো লঙ্ঘন করে গেলেই সমাজের রোষের মুখে, হেনস্থার মুখে পড়তে হবে মেয়েদের। আর আমাদের সমাজে মেয়েদের হেনস্থার জন্য আয়োজিত আছে ভাষার বিস্তীর্ণ পরিসর। আপাতভাবে কিছু যৌণগন্ধী গালিগালাজকেই আমাদের মনে হয় নারীর বিরুদ্ধে তৈরি করা বিদ্বেষের একমাত্র বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু নারীবিদ্বেষের বীজ আরো গভীরে প্রথিত আছে। দৈনন্দিনের ভাষা ব্যবহারের মধ্যে, শব্দের মধ্যে, উচ্চারণের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। সীমার সামান্যতম বিচ্যুতিতে নারীকে শুনতে হয় যাবতীয় কুৎসিত আক্রমনাত্মক কথা। 'বাড় বেড়ে যাওয়া সেই সীমা নির্ধারণের সাবধান বাণী। সেই সীমা ছাড়ালে বা ছাড়ানোর চেষ্টা করলে আক্রমণ নেমে আসবে। বহু ব্যবহারে ক্লিশে একটি উদাহরণ আবারো উল্লেখ করি - সীতাকে গন্ডী কেটে দিয়ে রামের বিপদের আশঙ্কায় লক্ষণ মায়ামৃগের পিছু ধাওয়া করেছিল। এদিকে সীতা ছদ্মবেশী রাবণের ছলনায় তাড়িত হয়ে গন্ডী থেকে বেরিয়ে তাকে ভিক্ষা দেয়, তারপরের গল্প আমরা সবাই জানি। যুদ্ধ, লংকাদহন, সীতা উদ্ধার ইত্যাদি। রাময়ণের কেন্দ্রীয় সংকটের সূত্রপাত সেই সীতার নিরাপত্তার গন্ডী ছেড়ে বেরিয়ে আসা থেকে। “লোকশিক্ষার্থে" এই ঘটনা আপামর সাধারণের উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়েছিল কি? যে পুরুষের তৈরি করা নিরাপত্তার বলয় থেকে নারী বেরিয়ে গেলেই বিপদ। যে বিপদ শুধু তাকে নয়, সংকটে ফেলবে গোটা সমাজকে। এইরকম ছোট বড় ব্যাসার্ধের গন্ডী দৃশ্যমান ভাবে বা অদৃশ্যভাবে আমাদের সমাজে মেয়েদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা থেকে আরেকটা গণ্ডী বদলে যাচ্ছে কিন্তু সেখান থেকে বেরোতে পারছে না কেউ। যারা বেরোতে চেষ্টা করছে তাদের শুনতে হচ্ছে “খুব বাড় বেড়েছে" অথবা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ। বাড় বেড়ে যাওয়া আসলে স্পর্ধা বেড়ে যাওয়া। সমাজের নির্ধারিত ছাড়পত্রকে অস্বীকার করার একটা ক্ষমতা। বাড় বেড়ে যাওয়া নারীরা সমাজে নিন্দিতা। এবং নারী স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁরা অথবা তাঁদের নামগোত্রহীন সমষ্ঠিই হবে একদিন নন্দিত।

 এই সীমা আবার শ্রেণী, জাতি, বর্ণ, ধর্ম, বয়স, লিঙ্গ, এলাকা এবং অবস্থান ভেদে ভিন্ন। একজন শ্রমজীবি নারী, একজন গৃহবধূ, একজন ছাত্রী, একজন আবাসিকা, একজন গণিকা, একজন বালিকা, একজন তরুণী সবার আলাদাভাবে সীমার বন্দোবস্ত আছে। তাদের সীমা ছাড়ানোয়, বাড় বেড়ে যাওয়ার মাত্রা ভিন্ন। সামাজিক স্তরভেদে সীমা লঙ্ঘনের মাত্রায় হয় তারতম্য। প্রতিটি সামাজিক স্তরের নিজস্ব তন্তুবিন্যাস অনুযায়ী পিতৃতন্ত্র বহাল রাখার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সীমা নির্ধারণ করে। এই বিভিন্ন স্তরের ভিন্ন অবস্থানের বাড় বেড়ে যাওয়া" মেয়েগুলো একদিন একযোগে চিৎকার করবে। সেদিন তাদের বাড় শুধু বেড়ে যাবে না, সব সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাবে পিতৃতন্ত্রের নাগালের বাইরে। এতটাই দূরে যেখান থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসে না, কেবল অট্টহাসির প্রতিধ্বনি শোনা যায়।


Monday, August 30, 2021

 ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস।

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস, অরন্ধন,  দ্বিতীয় বর্ষ ।। দশম ওয়েব সংস্করণ ।। ১৩ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ৩০ আগষ্ট ২০২১


মধুপর্ণা

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি একটি সূক্ষ্ম অথচ প্রভাবশালী ক্ষমতার বিন্যাস রচনা করে। প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ বৈষম্য জারিত হয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন কাজে কথায়, উচ্চারণে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। তার প্রতিনিয়ত চর্চা যে বাতাবরণ তৈরি করে তার মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক, উচ্চনীচের সমীকরণ রচিত হতে থাকে। তার ভিতরেই আমাদের যাবতীয় সম্পর্ক নির্মিত হয় বা বলা ভাল, সম্পর্ক এই ক্ষমতার সূক্ষ্ম রাজনীতির বুনোটের বাইরে কিছু নয়। যা কিছু আমাদের কাছে সাধারনভাবে অপাপবিদ্ধ, সরল, সহজ হিসাবে প্রতিভাত হয়, তার চলন এবং রেখা সমূহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে মানুষের ভিতরে পারস্পরিক এবং অন্তবর্তী রাজনীতি কতটা লিঙ্গ, উচ্চনীচের ক্ষমতা বিন্যাসের প্রতিফলন। পরিবারবদ্ধ, সমাজবদ্ধ, বিবাহে আবদ্ধ, সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষ এই সমীকরণের মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত চর্চা করে চলেছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সমীকরণ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোজাত বৈষম্যকে নিজের মধ্যে বহন করে চলে। প্রতিটি ঘটনা, কাজ, কথা, টানাপোড়েন একটি বৈষম্যপূর্ণ নারী বিদ্বেষী সমাজের প্রতিবিম্ব হাজির করে প্রতিনিয়ত। এই যে আমরা কিছু কথা প্রায়শই শুনে থাকি, "ঘরের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না", অথবা "সম্পর্কের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না” এখন কথা হল আমরা রাজনীতি বলতে ঠিক কি বুঝি। আমাদের কথা প্রতিটি বাক্য, শব্দ, শব্দের ব্যবহার সব কিছুর মধ্যেই একটি তরল ক্ষমতার প্রবাহ চলমান থাকে। এর ভিতরে নারীকে হেনস্থা করার জন্য আয়োজন সর্বত্র বিছিয়ে রয়েছে। এই কাঠামোগত বিষক্রিয়া যা জারিত করে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের জীবন আর মানুষের সম্পর্কের বয়ান, দু কলম লিখে তা বদলানো যায় না। কি করে বদলানো যায় ? কোনো ভাবেই কি যায় ?

যে প্রোগ্রামিং বা পদ্ধতিক্রম জারি রয়েছে তা মানুষকে সেভাবেই তৈরি করবে। জন্মদাগের মত রয়ে যাবে কাঠামোর অসুখ মানুষের মনে, ইচ্ছায়, অভ্যাসে, চাহিদায়। এখন আনলার্ন বা অর্জিত জ্ঞান বাতিল করে নিজেকে মুক্ত চিন্তক হিসাবে গড়ে তুলতে এবং নতুন অভ্যাস ও ইচ্ছাপরম্পরায় নিজেকে অন্বিত করতে যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার আয়োজন আমাদের কাছে নেই এবং তার যে কোনো সম্ভবনা সমূলে বিনাশ করে আমাদেরই কাঠামো। এই আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকের মত কেউ কেউ চিৎকার করে। ঐ যেমন মেহের আলি চিৎকার করত “ তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়!" তেমনি এই ক্ষমতার প্রবাহ থেকে এই কাঠামো উপজাত জটিল বিন্যাস থেকে আমাদের আশু মুক্তি নেই।

নারীকে আরোপিত জীবনের পাঠ ভুলে নিজের জীবন বেছে নিতে হবে, নির্মাণ করতে হবে স্বতন্ত্র জীবনচর্যা। নারীবাদ মানে স্বতন্ত্র জীবনবোধ। আরোপিত অবদমনের চক্রান্ত চিহ্নিত করা এবং সেই আগ্রাসনের আয়োজন অস্বীকার করার স্পর্ধা। এত সূক্ষ্ম ভাবে এই বহুস্তরিক লিঙ্গবৈষম্যের জাল বিছিয়ে রাখা আছে যে তাকে বিশ্লেষণ করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমরা নিজেদের অভ্যাস বদলাতে পারি মাত্র কাঠামো বদলাতে পারি না। এই এত চারিদিকে কথাবার্তা, সভা সমিতি, সাম্য সাম্য খেলা। ব্যক্তিমানুষের অভ্যাস আর তজ্জনিত ইচ্ছার বদল না হলে কিছুই বদলায় না। ওয়ান ফাইন মর্নিং লিঙ্গসাম্য দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকবে না জেনেও বিশ্লেষণ করে যেতে হয়, তার কারণ একটা ঘন্টা শতাব্দীর পর শতাব্দী পরম্পরাক্রমে বাজিয়ে যেতেই হয় কেউ না কেউ তার শব্দ কান পেতে একান্তে কখনো শুনবে বলে। তারপর থেকে আরো একটা প্রতিধ্বনি শুরু হয়ে আরো কিছুদূর যাবে বলে। অভ্যাস আর ইচ্ছা বদল করে লিঙ্গসাম্যের চর্চা কখনো শুরু হবে বলে।

Wednesday, August 25, 2021

 




                 শান্তিনিকেতনের মেয়েদের হস্টেলে বিনোদন; অবসর যাপনের একটি বিকল্প নির্মাণ। (১)

                                                                  মধুপর্ণা 

শান্তিনিকেতনে আবাসজীবনের শুরুর দিকে  হস্টেলে আমরা  একরকম প্রযুক্তি থেকে দূরেই ছিলাম। উত্তরশিক্ষায় অর্থাৎ একাদশ দ্বাদশ শ্রেনীতে যখন পড়ি  তখন থাকতাম শান্তিনিকেতনের প্রথম মেয়েদের হস্টেল শ্রীসদনে (প্রতিষ্টা - ১৯০৯)  মেনব্লকে দোতলায় ডর্মেটরিতে।  তখন ফোন রাখা বারণ। হস্টেলের ওয়েটিং রুমে ফোন আসবে বাড়ি থেকে তখন ডেকে দেওয়া হবে কথা বলার জন্য। কেউ কেউ লুকিয়ে ফোন রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু মাঝেমধ্যেই ধরা পড়লে হুলস্থুল কান্ড হত। টিভি রুমে টিভিতে শনি রবিবার ডিডি বাংলায় সিনেমা। ব্যাস। তখন আমাদের বিনোদন গুলোর আদল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, সময় উদযাপনের আয়োজন ছিল অন্যরকম। হস্টেলে অনেককেই দেখতাম নানা ধরনের হাতের কাজ করতে। দেখতাম,  যারা পাঠভবন থেকে পড়েছে তারা বহুরকমের কাজ জানে। রাখী তৈরি করা, কার্ড বানানো, সরা আঁকা, সেলাই  বহুকিছু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বা বিভাগীয় অনুষ্ঠানের জন্য তারা বানাতো। আনন্দমেলায় বিক্রির জন্য সারা হস্টেল জুড়ে জিনিসপত্র বানানোও চলত। উত্তরশিক্ষায় কুমকুমদি কাজ দিতেন। আনন্দমেলার জন্য রুমাল করতে গিয়ে কুমকুমদির কাছ থেকে সেলাই শিখেছিলাম। এদিকে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় “ওয়ার্ক এডুকেশন” সূত্রে আমাদের রাজনগর বালিকা বিদ্যালয়ে সেলাই শেখানো হয়েছিল। শান্তনিকেতনে হস্টেলে গিয়ে কুমকুমদির কাছে থেকে শিখে আনন্দমেলার জন্য রুমাল বানাতে খুবই ভাল লাগত তখন।

যাবতীয় বিনোদন আর বিনোদনের অভ্যাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। হস্টেলে একে অন্যের কাছ থেকে বিভিন্ন দক্ষতা  ছাত্রীরা শিখত তারপর  নিজেরা চেষ্টা করত। পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে উত্তরশিক্ষায় আসা “বহিরাগত” ছাত্রীরা ধীরে ধীরে শিখে নিত নানা ধরনের কাজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর অন্যদের দেখতে দেখতে নিতান্ত আনাড়ী ছাত্রীটিও দক্ষ হয়ে উঠত নানাধরনের কাজে। সময় যাপনের নিজস্ব প্রকরণ আর উপায়ের স্বতন্ত্র একটি আদল নির্মিত হয়ে উঠত এইভাবে। বিনোদনের একটি নিভৃত বয়ান গড়ে উঠত প্রত্যেকের। কেউ সেলাই করে, কেউ পদ্য লেখে, কেউ সরা আঁকে অথবা পরিকল্পনা করে রাখে সামনের আনন্দবাজারে কি ধরনের কাজ সে করবে। পরীক্ষা শেষ হবার পর অনেককেই দেখতাম  কাপড়, সুতো কিনে আনতে অথবা কার্ড আর রং কিনে আনতে। বাড়ি যাবার আগে যতটা সময় পাওয়া যাবে তখন নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অথবা বাড়ি গিয়েও দীর্ঘ ছুটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা করে নিয়ে যাওয়া জরুরি ছিল অনেকের কাছেই। অবসর যাপনের এবং বিনোদনের একটি ভিন্ন মাত্রা ছিল যা কোনো সাপেক্ষতায় যুক্ত নয়, নিজের ভিতর থেকে উৎসারিত। বাইরে থেকে তীব্র কোনো প্রভাবক ছাড়াই নিজের নিভৃতির মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং বিভিন্ন কাজের ভিতরে নিজেকে প্রকাশ করার একটি নিবিড় প্রক্রিয়া সেইসূত্রে তৈরি হতে থাকত। এর ভিতরেই গড়ে উঠত বিনোদনের বিকল্প পরিসর যা আত্মক্ষয়ী নয়, আত্মনির্মাণে সহায়ক।যার যা তৈরি করতে ইচ্ছা করছে সে যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী না ও হয়, হস্টেল খুঁজে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য যে সেই বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। এইভাবে পারস্পরিক কাজ এবং দক্ষতা লেনদেনের একটি সাবলীল প্রক্রিয়া হস্টেলের মধ্যে বহমান ছিল। সোসাল মিডিয়া আর তীব্র উত্তেজক বিনোদনের কোনো অভ্যাস তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রমানসকে গ্রাস করে নি। নির্মাণের, সাধনার মধ্যে থেকে উঠে আসত নিজের বিনোদিত হবার স্বতন্ত্র ধাঁচ, যা কাউকে ছাপিয়ে নিজেকে জাহির করে না অথচ স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এই অনন্য ভাবে সাধারণ  হবার তালিম শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দর্শনের মধ্যে যেমন রয়েছে তেমনি তা হস্টেলে মেয়েদের বিনোদিত হবার, আনন্দিত হবার স্বতন্ত্র আদলটিও গঠন করে দিত অজান্তেই।

দ্বাদশ শ্রেনীর প্রি ডিগ্রী পরীক্ষা হবার পর স্নাতকে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত যে সময় পাওয়া গেছিল তাতে আমিও তৈরি করেছি্লাম দুটো সালোয়ার। কুমকুমদি নকশা করে দিয়েছিলেন আর সেলাই গুলোও শিখিয়েছিলেন। আর আমি সেলাই গুলো করেছিলাম। প্রায় ষোল বছরের আবাসজীবনে এই লকডাউন সূত্রে দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার সুবাদে সেইসব খুঁজে পাওয়া গেল। মনে পড়ে গেল অজস্র কথা আর দৃশ্য পরম্পরা। 





Friday, August 20, 2021

 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শ শালা -  মধুপর্ণা কর্মকার। ২৩ শে কার্তিক ১৪২৭।  নভেম্বার ৯ ,২০২০। 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শশালা।  - মধুপর্ণা কর্মকার।  ৩ জানুয়ারী ২০২১ / ১৯ শে পৌষ ১৪২৭। 


শান্তিনিকেতেন, ডিসেম্বার,  ২০২০। 





বিষণ্ণ কুয়াশার অলৌকিক সকাল, কোপাই এর পাড়। 

শান্তিনিকেতন, ডিসেম্বার ,২০২0।

১। 
২। 


 

 

করোনা পরিস্থিতি ও নারী - অবস্থা ও অবস্থান।

 মধুপর্ণা কর্মকার। 

( অরন্ধন, দ্বিতীয় বর্ষ, চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ, ২৩ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ৭ই জুন ২০২১ এ প্রকাশিত।) সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটির লিঙ্ক।

 

বিশ্বজুড়ে গত দেড় বছর যাবত অতিমারী আমাদেরকে পর্যুদস্ত করে রেখেছে, এ নিয়ে আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণও আমরা রোজ পড়ছি, শুনছি। সমাজ জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন, ইত্যাদির প্রভাব সম্পর্কিত আলোচনায় আমাদের মন আর মগজকে ক্রমাগত খাদ্য জুগিয়ে চলেছে সংবাদ মাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম কখনও প্রয়োজনীয় ভাবে কখনও অপ্রয়োজনীয় ভাবে। বহুল আলোচিত এই বিষয়ের ভিতরে নিজেদের ইচ্ছা ও চাহিদামত আমাদের খুঁজে নিতে হচ্ছে রসদ। করোনা পরিস্থিতিতে নারীরা কেমন আছেন? সমাজের বিচিত্র স্তরের নারীরা ? “আমাদের সমাজের নারী" এই ভাবে এক গাত্রে ফেলা যায় নারীদের? যায় না। শ্রেনী, বর্ণ, জাতি, ধর্ম ভেদে বদলে যায় নারীদের অবস্থা ও অবস্থান। বিভিন্ন অবস্থানের নারী বিভিন্ন বিষয়ে আলাদা আলাদা ভাবে প্রভাবিত হন। এই সহজ সত্য বুঝতে আমাদের সময় লেগেছে বহুদিন কিন্তু সমাজে - নারীর সমস্যা" আসলে বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, সমাজের স্তর বিভাজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সমস্যার সঙ্গে পাল্টায়, ভোল বদল করে , মাত্রায় হয় তারতম্য। সমাজের ভিন্ন অবস্থানের নারী ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত হয়, বিভিন্ন ঘটনার সংঘাতে ভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেয়।

   এই করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক বিভিন্ন স্তরে মানুষের বিচিত্র সমস্যা ইত্যাদির আড়ালে ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অবস্থানের মেয়েরা কেমন আছেন তার খোঁজ। তথাকথিত “বড় আর গুরুত্বপূর্ণ" ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে মেয়েদের সমস্যা। এই চাপা পড়ে যাবার গল্প নেহাত পুরোনো নয়, এই ধারা বহমান। পিতৃতান্ত্রিক মানস গঠন ঠিক করে দেয় কোনটা বড় ইস্যু , কোনটা প্রাসঙ্গিক আর কোনটা নয়। কি নিয়ে আলোচনা হবে, কোন বিষয় প্রচার করা হবে, কোন কোন বিষয় পুনঃ পুনঃ প্রচার করে মানুষের মস্তিষ্কের কোণায় কোণায় পৌঁছে দেওয়া হবে, কোন ঘটনার কোন বিশেষ ব্যখ্যাটি মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তােলা হবে তা খুব সূক্ষ্ম ভাবে নির্ধারণ করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। এই নির্বাচনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে নারীদের সমস্যা। কারন তা ব্যবস্থার কাছে অস্বস্তিকর। 

   করোনাকালে লকডাউন হবার পর সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সবাই যখন গৃহবন্দী হল তারপর মেয়েদের সমস্যা শুরু হল তুমুল ভাবে। প্রথমত আমাদের কাছে একটা মিথ্যা ভীতি তৈরি করা হল যে বাড়ি হল সব থেকে সুরক্ষিত জায়গা। এখানে মেয়েরা সব থেকে নিরাপদ। কিন্তু বাইরের মত ঘরের মধ্যেও পিতৃতন্ত্রের থাবা জাল বিস্তার করে আছে। এখানেও রয়েছে পুরুষতন্ত্রের দাঁত, নখ। পরিবারের কাঠামো আর সামাজিক স্তর ভেদে পরিবারের মেয়েরা শােষিত বা নিপীড়িত। নিরাপত্তার নামে, সুরক্ষার নামে কখনো কোন ছদ্মবেশ ছাড়াই পরিবার মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে রাখতে চায়। সেই সময় থেকে নানা সূত্রে বাড়ির বাইরে যেতে পারলে কিছুক্ষনের জন্য হলেও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে তারা। বাইরে কাজের সূত্রে বা বন্ধু বান্ধবীর কাছে গিয়ে নিজেদের কথা বলার অবকাশ বা নিজের মনের শুশ্রষা করার সুযোগ পায়। লকডাউনে সে সব সুযোগ বন্ধ। তার ফলে মানসিক ভাবে তারা গেঁজিয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রেই। অন্যদিকে গার্হস্থ্য হিংসা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবেই। বাড়ির ছেলের বাইরে কাজ বন্ধ তাই বাড়িতে রয়েছে কিন্তু তারা কত অংশে পরিবারের কাজে সাহায্য করেন সে কথা আমরা কিছুটা অনুমান করতে পারি। নিজের হেনস্থাকারীর সঙ্গে বিরতি ছাড়াই অনেক নারী থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক নারী কাজ হারিয়েছেন তার ফলে অনটন উঠেছে চরমে। একটি সামাজিক সত্য নগ্নভাবে উঠে এসেছে পরিবার নারীদের জন্য প্রশ্নাতীত নিরাপদ জায়গা নয়। এবং যাবতীয় সামাজিক বা জাতীয় সমস্যার একটি স্বতন্ত্র মুখ রয়েছে। সব সমসার সাধারণীকরন নারীর সমস্যাকে তুলে আনতে পারে না তা এই মহামারীর পরিস্থতি আরও আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

গবেষক, মানবীবিদ্যাচর্চাকেন্দ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। 


                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...