Tuesday, October 27, 2026

 

                                         দূর হতে

                                         মধুপর্ণা

                                      

তারপর একদিন সকালের বাতাস একটা সময়ের সাথে আরেকটা সময়কে সেলাই করে দেয়, মাঝখানের বিষাক্ত সময় মিলিয়ে যায় হাওয়ায়, তার প্রভাব, কার্যকারণ সমস্তই একটা সিনেমার মত স্কিপ করে চলে যাওয়া যায় সবথেকে ভাল গানটায়, অথবা সুন্দর সীনটায়। কাপটা ভর্তি হয়ে যায় স্বচ্ছ জলে, যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো তারা বর্জনযোগ্য, ক্ষমাযোগ্য নয়। নির্মমতা একটা কাটারীর মত। পচনশীল যা কিছু কেটে ফেলে দিতে হয়, যাহা কিছু রহিল তাহা লৈয়া আবার সামনে যাত্রা। অযুক্তির মত বিষাক্ত, অসৌন্দর্য্যের মত অসুস্থ কিছু নাই – যোগিনী এই কথা বলিয়া একটা বইয়ের পাতা খুলিয়া চুপচাপ পড়িতে থাকে। অপরিমিতি অশালীন – এই কথা যোগ করে শেষে। ডিজায়ার টু বি সীন – দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠার বাসনা – একটা প্যাটার্ন- এই মর্মে কিছু লিখিতেছি- বলিয়া সে পুনরায় নীরব হৈয়া যায়। তাহার কথা শুনিতে শুনিতে এক একটা ধারণা ছুঁইয়া যায়। সূত্র গুলি সে ধরাইয়া দেয়, আর তাহা হৈতে ধীরে ধীরে সুতা খুলিতে থাকে। তাহার সাদা শাড়ি বাতাসের ধুলায় মলিন হৈয়া গিয়াছে, তাহার চুল পরিচর্যার অভাবে হৈয়াছে রুক্ষ, তাহার ত্বক পালিশের অনুপস্থিতিতে হৈয়াছে খসখসে, তাহার চোখ দুইটি কেবল পড়াশোনা করিয়া আর বিশ্বভুবন দেখিয়া উজ্জ্বল হৈয়া উঠিয়াছে। তাহার অন্তকরণ চকচক করিতেছে। বাহ্যিক কিছুতে তাহার মনোযোগ নাই। সমস্ত মন সে ধাবিত করিয়াছে, একযোগে, তড়িৎ গতিতে। ছুটিয়া চলিয়াছে তাহার একটি অংশ তাহার নিকট বাস্তব ছাড়িয়া, দেহ ছাড়িয়া, পার্থিব আশা আকাঙ্ক্ষা ছাড়িয়া, প্রাপ্তি ছাড়িয়া। বহুদুর চলিয়া গিয়াছে। দূরে দাঁড়াইয়া সে তাহার ছায়াকে কাজ করিতে দেখে, বিরক্ত হৈতে দেখে, ঘুমাইতে দেখে। যোগিনীকে প্রতিদিন যত দেখি ততই আগ্রহ বাড়িতে থাকে।

Friday, October 23, 2026

 

                                        আকাশের গল্প

                                          মধুপর্ণা

 

একটা সাদা পাখি উড়ে যায়, শারদ আকাশ বেয়ে মেঘের উপরে মেঘ, আকাশের উপরে আকাশ। উড়ে যায়, নাগালের বাইরে। সীমানার বাইরে। মহাজাগতিক সুর ভেসে আসে, পাখির মাথার ভিতর সোমরসের ফোয়ারা। বিনা চেষ্টায় মাতাল, মাতোয়ারা। উড়ে বেড়ায় সীমানা থেকে অনেক উঁচুতে। উড়তে উড়তে ক্লান্তি জমে, সেই ক্লান্তি আবার এনার্জিতে রূপান্তরিত করে আরো পরিধি বেড়ে যায়। সংকীর্তনের খোলের বোল ভেসে এলে তার গতিতে ছন্দ এসে লাগে, সাদা ডানা থেকে গান ভেসে আসে লালনের গান, তিন পোড়াতেও খাঁটি হলে না। যোগিনী পাখিটিকে পাশে বসিয়েছিল খাঁচার প্রতারণায় নয়, ছোলার লোভ দেখিয়েও নয়, বলেছিল, আকাশের উপরে আকাশ, আকাশের উপরে আরো বড় আকাশ। ছোট আকাশ থেকে আরো বড় আকাশের দিয়েছিল সন্ধান। যোগিনী আকাশবিহারিনী, গগনচারিনী। তাহার আকাশের গল্প শুনিয়া সাদা পাখি হৈল মাতোয়ারা। দিল উড়াল। যোগিনী বলিয়াছিল, শুধু ডানা থাকিলেই ওড়া যায় একটা সীমায়, সীমার উপরে উড়িতে গেলে আরো কিছু প্রয়োজন। সেই গুপ্ত বিদ্যা যোগিনী শিখিয়াছে, কোথায় শিখিয়াছে বলিতে পারিনা, কিন্তু শিখিয়া আসিয়াছে। আর শিখাইয়াছে যাহাদের তেমন আধার রহিয়াছে, আধার গভীর হৈলে তাহা ধারণ করে বহু কিছু। যোগিনীর আকাশবিদ্যা পাখিটি শিখিয়াছিল যত্ন করিয়া। তাহার পর উড়িয়া গেল সর্বজনসমক্ষ হৈতে।

Friday, October 16, 2026

 

                                                 ছায়া

                                            মধুপর্ণা কর্মকার

 

যোগিনী খোলোস ছাড়িয়া আসে, ছায়া ছাড়িয়া আসে, কোথায় রাখিয়া আসে? কোথায়? বনে। রাখিয়া আসিয়া ভুলিয়া যাইতে হয় বলে। তাহাকে বিদ্ধ করিয়া বলি, মানুষ কি সাপ নাকি? খোলোস ছাড়িয়া আসিবার কথা বলিস! সে হাসিয়া একপ্রকার পাগল হৈয়া যায়। বলে, কার্ল ইয়ুং কে জিজ্ঞাসা করিয়া আয়। উনি জানেন মানুষে কতবার খোলোস ছাড়িয়া আসে, ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া কত সময় কাটায়। যা গিয়া জিগা। ছায়া গুলি একে একে পুড়াইয়া তাহার পর একজন আবিস্কৃত হয়। যোগিনী বলিতে থাকে, ছায়া গুলি যেদিন সরিয়া যাইবে সব সেইদিন মুক্ত হৈয়া যাইবি, ততদিন চেষ্টা চালাইয়া যা। এইভাবে একটা একটা খোলস ছাড়িয়া একদিন দেখবি আর একটিও স্তর নাই খুলিয়া ফেলিবার। বলি, তুমি কি কথা বলো! তুমি তো দেখিতেছি অন্ধকারের জালিকা গুলি স্পষ্ট দেখিতে পাও। যোগিনী বলে, আমি শুধু না অনেকেই পায়। আত্ম প্রতিফলন যাহাদের রহিয়াছে তাহারা দেখিতে পায় ভিতর বাহির। সামনে তুমি কথা বলিলে তাহাতে তাহারা বিশ্বাস করে না। কথার ভিতর আর সামনে যে বা যাহারা দাঁড়াইয়া আছে তাহার উদ্দেশ্য বিধেয়, হিডেন ইন্টেনশন সকলই দেখিতে পায়। তাহাদের যাহারা বোকা ভাবিয়া নিজের উদ্দেশ্য চালনা করিতে চাহে তাহাদের মত নির্বোধ আর নাই, শক্ত যদি হৈতে পারো তাহা হৈলে দেখিতে পাইবে তোমাকে যাহারা বোকা ভাবিয়া নানা প্রকার খেলা দেখাইতে ছিল, তাহারা খেলিয়া যাইবে, কিছুদিন পর তাহাদের জোকারের মত দেখাইবে। শুধু বিচ্ছিন্ন হৈয়া দেখিয়া যাও, মাঝখানে একটি স্বচ্ছ দেওয়াল রাখিয়া দাও যাহাতে দেখিতে পাও কিন্তু আঁচ না লাগে। তোমাকে যাহারা বোকা বানাইয়া উদ্দেশ্য সিদ্ধি করিতে চাহিবে তাহাদের নাচিতে দেখিয়া দূর হৈতে আনন্দ পাও। বলি, জানি না যে এই কথা তাহা নহে। দেখিয়াছি। কৌশল খুব উপাদেয় বিষয় যতক্ষণ সামনের জন কৌশল না বুঝে। লার্নড এমপ্যাথের সামনে কৌশল করিয়া, নাচিয়া শেষ অবধি লাভ নাই। নাচিয়া ক্লান্ত হৈয়া থামিয়া যাইবে একদিন। আর সাপ নিজের বিষ অন্যের উপর ঢালিতে না পারিলে শেষ অবধি নিজের লেজ কামরাইবে। নিজের বিষে নিজে মরিবে। যোগিনী আবার বলে, কাইন্ডনেস ডাস নট ওয়ার্ক সিস্টার। নলেজ ইজ পাওয়ার। জানিয়া শিখিয়া রাখো সব। উত্তরে বলি, মাইন্ড ইজ আ লোডেড গান। যোগিনী হাসিয়া উঠে, লোড করিয়া রাখিতে হয়, একজন দক্ষ যোদ্ধা জানে কখন ব্যবহার করিতে হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ অস্ত্রহীন থাকা উচিত নয়, নারীদের তো নয়ই। অস্ত্র থাকিল, ব্যবহার করিলে না, কিন্তু সময় যখন আসিল তখন সামনের জনকে উড়াইয়া দাও। দ্বিতীয়বার আক্রমণের অবসর রাখিয়ো না। দয়া পরবশ হৈয়া, অন্যে কেহ কোন আচরণ করিতেছে বুঝিতে পারিতেছ, উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিতেছ বলিয়া উপেক্ষা করিয়া গেলে চলিবে না। কেহ কেহ এই ভাষা বুঝে, অধিকাংশই বুঝে না। তাহাদের ঐখানেই ধুলিস্যাত করিয়া দিতে হয়। যাহারা বুঝিতে পারে তাহারা সীমা লঙ্ঘন করে না, যাহাদের বুঝিবার ক্ষমতা নাই তাহার বারংবার সীমা লঙ্ঘন করিয়া আত্ম প্রতিস্থাপন করিতে চায় আর মরিয়া হৈয়া উঠে সীমা নষ্ট করিতে। সুতরাং মনে রাখিও, মাইন্ড ইজ আ লোডেড গান।

Wednesday, October 7, 2026

 

 

                                            যাত্রা

                                           মধুপর্ণা

 

যোগিনী বলিতে থাকে, বাধাবিপত্তি ঠেলিয়া হাঁটিতে হয়, ক্রমাগত হাঁটিয়া যাইতে হয়। যাহাই হৈয়া যাক, ধীর পদে, দ্রুত পদে, হাঁটিতে থাক। থামিবার অবসর এইখানে নাই। তাহার কথা ঠিক, গঙ্গাসাগরের এক বৃদ্ধার কথা মনে পড়ে, মাথায় লোটাকম্বল, হাতে পুটলি, সবল মানুষে এক দূর হাঁটিতে হিমশিম খাইতেছে, বৃদ্ধা আপন মনে ধীরে ধীরে হাঁটিতেছে, তাহাকে দেখিয়া অবাক লাগিতেছে, এত ভারী লৈয়া হাঁটিতেছে কি প্রকারে, এই দূর যাইবে কি  প্রকারে। কিন্তু দেখা গেল বাকীরা যখন নানা প্রকার চিৎকার করিয়া, নানা ক্লান্তি প্রকাশ করিয়া শক্তি ক্ষয় করিতেছে, তখন বৃদ্ধা কোন  কথা না বলিয়া আপন মনে ধীর গতিতে হাঁটিয়া যাইতেছে নির্বিকার। ঠিক সময়ে পৌঁছাইয়া গেল। গিয়া ঘুমাইল। ভোরে উঠিয়া করিল সাগরে স্নান। নির্বিকার চিত্ত। হৈ হল্লা করিল কম বয়সীরা সুপ্রচুর। হাঁপাইল, বার বার বলিল, আর পারি না, আর পারা যায় না, সারাদিনে ৮-৯ ঘন্টা হাঁটিবার কথা কলরব করিয়া সকলকে নানা ভাবে বলিল যারা একই পথ অতিক্রম করিয়া আসিতেছে। বৃদ্ধা চুপ, লোটাকম্বল লৈয়া ধীরে ধীরে হাঁটিয়া সাগরে স্নান করিয়া বাড়ি ফিরিয়া গেল। তাহাকে দেখিয়া পরিষ্কার হৈয়া গেল, সে দেবতার কাছে আসিয়াছে, কলরব করিতে আসে নাই। সে আসিয়াছে ধৈর্য্য, অধ্যবসায় আর তিতিক্ষা ছালাইয়া চকচকে করিতে, বার্তি কোন কিছুতেই তাহার মনযোগ নাই। হরিদেবপুরের দিদিকে কথাটি জানাইতেই তিনি বলিলেন, সংসারে তিনি অনেককিছু দেখিয়াছেন, এই সামান্যে তাহাকে কি বিচলিত করিবে! জনস্রোত চলিয়া যাইতেছে, ঈশ্বরের কাছে যাইতে যাইতে মানুষে ঝগড়া করিতেছে, একে অপরকে দোষারোপ করিতেছে, ঠেলাঠালি করিতেছে, সেইখানেও নিজের অধিকার স্থাপনের চেষ্টা করিতেছে। বৃদ্ধা তাহার জিনিসপত্র গুলি লৈয়া চুপচাপ চলিতেছে, তাহার মন সে ঈশ্বর ভিন্ন আর কোনদিকে বিভক্ত করিতে রাজী নহে, সমস্ত মন একত্রিত করিয়া সে একদিকে ধাবিত করিয়াছে, বাহ্যিক কিছুতে তাহার কিছু যাই আসিতেছে না তাহা পরিষ্কার। ঘটনাটি যোগিনীকে খুলিয়া বলি, সে বলে, যাত্রাটির উদ্দেশ্যটিই তাই, যাত্রাটি সেই নিমিত্তই।

Sunday, October 4, 2026

 

                                           শান্ত বিকেলে

                                            মধুপর্ণা

 

শান্ত একটা নদীর পাড়ে অলৌকিক বিকেলে সে বসিয়া আছে একক, একাকী। ডাক পাঠায় সে বিনাতারে, বাতাসের সুতায়। গিয়া জিজ্ঞাসি, তুমি এইখানে বসিয়া আছ! সে বলে, একটি অঙ্ক করিতেছি মনে মনে। মিলিয়া যাইতেছে আবার কিছুক্ষন পর মিলিতেছে না। বলি কি অঙ্ক? উত্তর দেয়, কত দাগ পড়িল, কতগুলি মুছিলাম আর কতগুলি রহিল আর কতগুলি আরো দাগ সৃষ্টি করিল, কি করিলে সব দাগ মুছিবে আর পাতা হৈবে মহাশূন্য। এই জটিল অঙ্ক মিলিতে মিলিতে মিলাইয়া যায়। কিছুতেই শেষ করিবার তৃপ্তিখানি পাইতেছি না। কয়েকটি সমীকরণ বলিয়া বুঝাইতে হয় না, না বলিয়াও জানা যায়, যোগাযোগ শুধুমাত্র ভাষিক নহে, অন্তত ধ্যানস্থ স্থানে তো নহেই। ধ্যানস্থ স্থান গুলির যোগাযোগের পন্থা ভিন্ন, যোগের তরিকা আলাদা, যোগ আর বিয়োগের প্রক্রিয়া অন্যতর। যে জানে সে জানে, যে জানে না সে জানে না। একটি শাখা কিম্বা একটি পাতা যেমন বৃহত গাছে ঝুলিয়া আছে, তাহার কিছু হৈলে সমস্ত গাছ তাহা টের পায় তেমনি একজনের স্নায়ুতন্ত্রে কিছু ঘটিলে সামহিক চৈতন্য তাহা জানিতে পারে। সামান্যতম চ্যুতি বা বিচ্যুতিতে সমস্ত তন্ত্রের ভিতর খবর যায়। আর সমস্তটি আন্দোলিত হৈতে থাকে। প্রভাবিত হয়। যোগিনী বলে, দাগ গুলি মিলাইব কি করিয়া বলিতে পারিস? আছে কোনো পন্থা?  বলি, বিন্যাস বদল এত সহজ নহে, বিন্যাসের সুতা গুলি জট পাকাইয়াছে ধীরে ধীরে, একদিনে নহে, সেই অবিন্যস্ত সুতা আরো অনেক জায়গায় গিয়া জুড়িয়াছে, সেইখানে হৈয়াছে আরো তালগোল। এখন কোন খানে কাটিয়া কোন খানে জুড়িলে সুবিন্যস্ত হৈবে এ বড় জটিল অঙ্ক। যোগিনী বলে, অন্তত বুঝিতে পারিলি কি আঁক কষিতেছি। অনেককে বুঝাইতেই পারি না। উত্তরে বলি, না বোঝার কিছুই নাই, অভিজ্ঞতায়, অনুভবে যাহা থাকিবে তাহা বুঝিতে সময় লাগে না, যোগাযোগ সেইখানে ঘটে, না হৈলে একই ভাষায় কথা কিন্তু কেহ কিছু বুঝিতে পারিবে না। সংযোগ ভিন্ন তারে বাঁধা। যোগিনী গান গাহিয়া উঠে, আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে…।“ সুরের সঙ্গে সুর মেলানোটাই একটা সাধনা জানিস? “ তোমার যে তার বাঁধা কাছের সুরে, সেই বাঁশি যে বাজে দূরে…” কাছের সঙ্গে দূরের সুর মেলাতে পারাটাই একটা বিরাট যোগ। “ গানের লীলার সেই কিনারে, যোগ দিতে কি সবাই পারে… এই সামঞ্জস্যটাই, পরিমিতিটাই সাধনা। অন্যের ভাষা তুমি বুঝতেই পারো, কিন্তু তার যোগের ভাষা যদি তুমি না জানো সংযোগ সাধন হবে না। যা হবে তা একটা বিশাল দূর্ঘটনা। তার চোট সামলাইয়া ওঠা খুব জটিল। খুব বেদনাদায়ক। তুমি যে তারে বাঁধা সেই তারে যদি অন্যে বাঁধা না থাকে তাহা হৈলে অনুভুতি ক্ষত বিক্ষত হৈয়া যাইবে। রক্তাক্ত হৈয়া ঘুরিতে হৈবে। তেলে তুমি জল মেশাইতে পারিবে না। কিছুতেই না।

Wednesday, September 30, 2026

 

                                           দণ্ড

                                          মধুপর্ণা

 

যোগিনীর সঙ্গে সকালে দেখা আচমকা। প্রাতঃকালীন সাক্ষাৎ। নির্দেশ বা আদেশের মত করিয়া বলে, চুপচাপ নীরবে কাজ গুলি করিয়া যা। করিয়া যা। সাধনা বিচ্যুতি সমস্ত সমস্যার কারন। দ্বিমত করিবার কোনো কারণ না দেখিয়া চুপ করিয়া যাই। তাহাকে অতি পুরাতন একটি পরিপক্ক আত্মা বলিয়া ভ্রম হয়, এই ভিন্ন দেশ কালে, এই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সে কি করিতেছে! কেনই বা সে এই বিন্যাসের ভিতর জন্মাইল। রা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে! উত্তর আসিয়া যায়, বোধ করি ঋণ রাখিয়াছি কিছু তাহাই শোধ করিতে আসিয়া পড়িয়াছি এইখানে। প্রশ্ন করি, তুই আছিলি কোথায়?  সে চুপ করিয়া যায় আর তাহার চোখের কোনা ছলছল করিয়া উঠে। বুঝিতে পারি সে আছিল কোনো উদ্যানে, অভয়ারন্যে। তাহার পর তাহার এইখানে আগমন। আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বিবেচনা দিয়া সে দেখিতে পায় শুনিতে পায় আর বুঝিতে পারে। সেই কথা সে বলিয়া বেড়ায়। কতদিনের জন্য আগমন, ফিরিবি কবে? সে প্রায় কাঁদিয়া ফেলে, আমার হাতে নাই সেই হিসাব, আমি জানি নে, কবে ফিরিব। আমার ঋণশোধ হৈলে আমি ফিরিব। কি আছ্র ররণ তোর বল আমায়, আমি শোধ দিয়া দিই, তুই ফিরিয়া যা। যোগিনী বলে, ঋণ   মকুব হয় না। অনেক সাধনার ফিরিয়া যাইতে পারিব। বলি, তোর দণ্ড তো বেশ জটিল। সে বলে, জটিল না, শিক্ষার জন্য মূল্য চুকাইতে হয়, আমি মূল্য দিয়া ফিরিব।  

Tuesday, September 29, 2026

 

                                                 ছাপ

                                                 মধুপর্ণা

 

যোগিনী আসিয়া হাসিয়া বসে। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলিতে থাকে, দেখা কি কি সঞ্চয় করিলি আর কি কি বর্জন করিলি, আমি সরোজমিনে তদন্ত করি ! বলি, থাক, দুইয়ের পাল্লা সমান। বর্জনের পাল্লা কিঞ্চিত ভারী। অনেক ভাবিয়া সে বলে, কি সবচেয়ে ভয়ংকর ক্রুরতা জানিস ? বলি, জানি না। তুমি রাখো তোমার যাবতীয় আবোলতাবোল কথা। যোগিনী দমিয়া যায় না, আবার বলে, সবচেয়ে সূক্ষতর ভায়োলেন্স হচ্ছে, অন্যের মানসিক গঠনকে নষ্ট করা এবং ভিন্ন মানসিক গঠনে অনুবাদ করা। যখন এই আঁচ পাবি তখন হয় প্রতিরোধ করিবি নয় পলায়ন করিবি। বলি, ছাপের কথা বলিতেছ ? হ্যাঁ, তাহাই, মনকে অক্ষত রাখিতে হইবেই, এই খানে কোপ বসাইতে দেওয়া যাইবে না। বলি, আর যে ছাপ রাঙাইয়া তোলে অন্তর বাহির! সেই ছাপ? যোগিনী একপ্রকার নাচিয়া উঠে, সেই ছাপ খানি পাইতে সাধকচিত্ত পাগলপারা। সেই রং সে দনিয়া জুড়িয়া খুঁজিয়া বেড়ায়। সেই ছাপ একবার যে পাইয়াছে তাহাকে আর রাখে কে, আর মারে কে?  বলি, সেই ছাপ পাইলে মানুষে হয় দিব্যোন্মাদ! পথবৈরাগী। বুদ্ধে দিয়াছে সেই ছাপ, চৈতন্যে দিয়াছে আর দিয়াছে রবীন্দ্রনাথ।  যোগিনী বলে, আমি ভিন্ন ছাপের কথা বলিতেছি, ছাপের পাপের কথা। অন্যকে প্রভাবিত করিয়া, তাহার মানসভূমিতে বিষের গাছ পোঁতার কথা বলিতেছি। নারীদের মানসভূমি উচ্চফলনশীল। সেই ভূমিতে গাছ পুঁতিতে চায় বিষাক্ত আত্মারা। এইটা  হৈল নরকের রাস্তা। নীচে নামতে নামতে একেবারে তলিয়ে যাবার দরজা এইখানে শুরু হয়। প্রশ্ন করি, তুই জানিলি কি প্রকারে! এইসব প্রশ্নে সে চটিয়া যায়। সাবধান করিতে নানা কথা বলি, শুনিলে শোন, না শুনিলে দুর হৈয়া যা। বলি, শুনিতেই তো আসিয়াছি। তুমি যাহা বলিতেছ, তাহা শুধু শুনিতেছি তাহা নহে, জানিয়াছি এইসব অভিজ্ঞতা দিয়া। যোগিনী বলে, তুই কি ভাবিস, মানুষের কেবল বদন দেখিয়া ক্ষান্ত দিই সামনে এলে কেউ। তাহার ভিতর বাহির, মনোভাব, অতীত পড়িয়া ফেলিতে পারি। প্রবনতা, সম্ববনা,উদ্দেশ্য বিধেয় মুখ দেখিয়া বলিয়া দিতে পারি। তোকে দেখিয়া বুঝিয়াছিলাম সূক্ষতর ভায়োলেন্স অভিজ্ঞতার ভিতর আছে তোর।বলি, শুধু অভিজ্ঞতা নয়, প্রতিরোধ ও আছে। সূক্ষতর ভায়োলেন্স আরো সূক্ষ করাত দিয়া কাটিয়াছি। যোগিনী বলে, খুব সাবধান, মানসিক গড়ন আগলাইয়া রাখিতে হৈবে যে কোনো মূল্যে। কোনো কোনো সম্প্রদায় এই ভায়লেন্স খুব উদ্দেশ্য নিয়া, ছক কষিয়া করিতেছে। খুব সাবধান। বলি, উদ্দেশ্য বুঝিয়া তাহাদের পালটা দিবার ক্ষমতা বহুদিন আগে জোগাড় করিয়া লৈয়াছি। ভাবিও না, এখন নিজে বাঁচিব, অন্যদের বাঁচাইব। 

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...