Wednesday, June 3, 2026

 

                                     সহজ লোকের মত এই গহন আঁধারে

                                                মধুপর্ণা             

চেতনাপ্রবাহ, stream of consciousness. এইখানে তুমি ভাণ করতে পারবে না, অকপট, আনফিল্টার্ড একটা প্রবাহ। র। সেখানে চিন্তার স্রোত কিভাবে প্রবাহিত হয় মানুষ তা জানে, আর সেটাই ব্যক্তির ব্যক্তিগত অন্ধকার। আর আলোর উৎস। মাথার ভিতর, মনের ভিতর, চেতনার ভিতর নাকি কোথায়! লোকেশন জানি না কিন্তু পর পর পর পর ঘটনা সারি সারি দিয়ে আসে যায়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, ভান্তে বলেছিল, জায়গাটা চিনতে পেরে যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই। চিন্তাশূন্যতা একদিনে আসে না। বন্ধ করে লাভ নেই, আসতে দিতে হয়, তারপর একদিন আর আসে না। প্রবাহকে বইতে দাও। বুঝতে পারি, এই প্রবাহের সময়, স্থান, ধারাবাহিকতা, কান্ডজ্ঞান কিচ্ছু নেই, কেবল বয়ে চলে। এই প্রবাহ উর্বরা জমি জেনেছে অনেক লেখক। কাঁচামাল ঘুরে বেড়ায়, সেই রান্নাঘরে যে দক্ষ রাঁধুনি তার কেল্লাফতে। এইটা রিপ্রোগ্রামিং করা যায়। সেই প্রবাহটি বহমান, সেই বানরটি লাফিয়ে বেড়ায়। মাংকি মাইন্ড। বিদ্যুতের গতিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা, এক ঘটনা থেকে অন্য ঘটনা, এক কথা থেকে অন্য কথা। এক সুর থেকে অন্য গান, এক যুক্তি থেকে ভিন্ন অযুক্তি। কথার ভিতর কথার খেই, কথার ভিতর কথার সুতো, চেতনাপ্রবাহ সেই বিনিসুতার মালা। কথার বেসাতি। এই প্রবাহের সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ যত সহজ তুমি তত সহজে চলতে পারবে, সহজ লোকের মত এই গহন আঁধারে।

 চেতনাপ্রবাহ, একটা স্রোত, নদীর মত বহিয়া চলে, তাহার হিসাব নিকাশের খাতা নাই, একজন বলিয়াছিল, মানুষকে জানিতে হৈলে তাহার আলোর সহিত তাহার অন্ধকার জানিতে হয়। কার্ল ইয়ুং, ফ্রয়েড জানিতেন মানুষের অন্ধকার। চেতনাপ্রবাহ বলিলেই মনে পড়ে বাদল সরকার, তাঁর লেখা নাটক ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’। প্রটাগনিষ্ট চেতনপ্রবাহের গতি রোধ করিত না। যাহা বহিয়া যাইত তাহাই বলিত। তাহাই লিখিত। বহু বহু কাল পূর্বে প্লেটো বলিয়া গিয়াছেন, সকলই অনুকরণ, অনুকরণের অনুকরণ। মানুষেরা সৃষ্টি করিতে পারে না, অনুকরন করে কেবল। ইমিটেশন অব ইমিটেশন। শিল্প সাহিত্য সকলই হাতফেরতা অনুবাদ। তথাপি মানুষ ‘আইডেন্টিটি’ ভালবাসে। একটা একটা জামার মত। জামার ভিতরে থাকিতে মানুষ ভালোবাসে খুব। এক একটা পরিচিতি সে আঁকড়াইয়া ধরিয়া মনে করে আমি তাহা, আর তাহার সামান্য বিচ্যুতিতে হয় পাগলপারা। গেল গেল সব গেল গো, আমার অর্জন, নির্মাণ সকলই গেল ছাড়েখাড়ে। তুমি যাহা আত্ম ভাবিতেছ, আপনার ভাবিতেছ তাহার অস্তিত্ত্বই নাই, যদি বলি তুমি শুনবে না। তথাপি একথা সত্য ‘সেলফ ডাস নট এগজিস্ট!’। মানুষ একটি নদী, বহিয়া যায়, যদি বলি তুমি আমারে বলিবে, এ কেমন কথা! তথাপি এই বহমানতা ভিন্ন আর কিছু স্থির নাই। বিজ্ঞানী সকল বলিয়াছেন, পরিবর্তন একমাত্র সত্য। আর পরিবর্তন দেখিয়া মাথার চুল ছিঁড়িতে থাকো, মাথা ঠুকিতে থাকো দেয়ালে। ব্রুশ লি র একটি সাক্ষাতকার দেখিতেছিলাম, উফ! কি সাংঘাতিক ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং। দূর্ধর্ষ। চাবুকের মত একটা লোক। তোমাকে এখন যদি বলি, ঘুরিয়া মরিতেছ মায়ায়, এই গুলি প্রহেলিকা। তুমি মুখ ঘুরাইয়া চলিয়া যাইবে। সেদিন স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের লেকচার শুনিতেছিলাম ইউটিউবের ক্লাশ ঘরে। খাতায় আর কলমে যাহারা তোমার শিক্ষক তাহারা তোমাকে বাক্সে ভরিবে আর দিবে বিষ ঢালিয়া, কত শত শিক্ষক দেখো আরো চারিপাশে।

 দাদা সুযোগ পেলেই বলছে, ‘পাগলীনেস এভ্রিহ্যয়র’ তার কারন কয়েকদিন আগে দাদাকে বলেছিলাম, ‘আগলিনেস এভ্রিহ্যয়র’। যে ভাষিক সমুদ্রে আমাদের বেঁচে থাকা সেইসব অকপটে বলে যাবার ‘গাটস’ আছে তোমার?  ফিল্টার না করে বলে যেতে পারবে মুহুর্তের চিন্তা, মুহুর্তের অনুভব? এই প্রশ্নের উত্তরে বলি পারব, একই লেখার ভিতর চলিত বাংলা, সাধু বাংলা, স্ল্যাং, যুক্তি, অযুক্তি, ভাবালুতা মিশিয়ে দেব, যেভাবে চলছে মগ্ন চৈতন্য একেবারে সেইটাই হাজির করব এনে। দাদা বলেছিল, সহজ নয়, মাথা থেকে হাতে এসে কি বোর্ড থেকে স্ক্রীণে যেতে যেতে অনেকবার রিফাইন করবে, এত সহজ নয়।

হ্যাঁ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভব কি?

প্রায়। কারণ সহজ কথা যায় না বলা সহজে।

আচ্ছা, কেবল অনুবাদ, অনুকরণের অনুকরণ, চিন্তা অনুভব থেকে বলা আর লেখার মাঝখানে অনেক গুলো দরজা। আর মাঝাখানে যাত্রাপথটা আসলে ব্যক্তির অহং সত্ত্বা।

হ্যাঁ, ঐ খানে রঙ মেশায় আর ঐখানে ঢালে বিষ। ভেজালটা ঐ একটা করে দরজা পেরোয় যখন তখন হতে থাকে। আর তুমি ভাবছ শুধু জল মেশালেই সহজ হয়! পিওর ফর্মে যারা বলছে তারা বাকসিদ্ধ।

শব্দ আর ধ্বনির ক্ষমতা ভয়াবহ। যে জানে সে জানে আর যে জানে না তার না জানাই ভাল। তড়িতাহত হয়ে যাবে।

কারেন্টের শক বুঝলে! কিসের আঘাত, না শব্দের আঘাত। ধ্বনির আঘাত।

মন্ত্র তাহলে… সেই ব্যাকরণের আউটপুট?

সেসব অন্য, অনুশীলন করো, মুহুর্তেকে ফিল্টার ছাড়া লিখতে থাকো দেখবে সেখানে এথিক্স নেই, ক্রম নেই, ধারাবাহিকতা নেই।

সেই বানরকে শায়েস্তা করতে চাই, আর আপনি তাকে দিতে বলেন আস্কারা?

বানর টা আসলে খুব সত্যি একজন। যত বাঁধবে ততই লম্ফঝম্প বাড়বে, বয়ে যেতে দিতে হয়। বরং তাকে বলতে হয়, বলো কি বলতে চাও, শুনতে হবে তার কথা। তবেই বলা থামাবে।

 এই ভয়ঙ্কর গ্রীষ্মে শীতের কথা মনে পড়ে, বাবলা বনের কুয়াশায় মাকড়সা গুলো জাল বিছিয়েছিল ছোট ছোট করে তার ওপর শিশির। সারা মাঠ জুড়ে মনে হচ্ছিল তাবু খাটিয়েছে কেউ বা কারা। পৌষমেলায় নাগর দোলার উপর থেকে এইরকম লাগে মেলাটা। ছোট ছোট তাবু চারিদিকে। কোপাই পাড়ে, চায়ের দোকানে বাঁশের মাচা থেকে কোপাই এর জল দেখা যায়, তারপর পাশের শ্মশানে ভাঙা হাঁড়ি, পোড়া কাঠ। তারপর কংকালীতলায় রুরু ভৈরবের ধ্যানখানা। ছোট মন্দিরের মত। শিব মন্দিরের সামনে বসে আছে নন্দী। সেইসূত্রে মনে পড়ে,  বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ভিতর যে বৈদ্যনাথ মন্দির সেখানে শিবমন্দিরের সামনে নন্দীর বসে থাকা নিয়ে বলেছিল সেখানকার এক গবেষক বন্ধু। বলেছিল, নন্দীর কানে কানে বলে আয়, সে শিবকে পৌঁছে দেবে, জিজ্ঞেস করলাম, পার্সোনাল সেক্রেটারি? বলল, তার থেকে বেশি কিছু, মাধ্যম। ভায়া যেতে হবে, সরাসরি হবে না। সেইসূত্রে মনে পড়ে,  হাতের কাজ গুলো পড়িমড়ি করে শেষ করি পাহাড়ে যাবার তাগিদে। টাস্ক এন্ড রিওয়ার্ড।

    

Tuesday, June 2, 2026

 

                                     নতুন শৈল শহর আর বৃষ্টির দিন

                                               মধুপর্ণা 

ভরা বৃষ্টির দিন সেদিন, যাকে বলে একেবারে ‘বাদলা করিয়াছে’, মেঘ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছে তুমুল। ঝমঝম ঝমঝম একটা রিদমে বৃষ্টি পড়ছে, বৃষ্টির ধোঁয়ায় চারপাশ মুছে গেছে যেমন করে লেখা শেষে শ্লেট মুছে দেয় বালিকা। সেই সর্বৈব নেই এর ভিতরে শৈল শহর পেলিং এ একটা বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। একটা কুকুর নিশ্চিন্তে পাশে ঘুমোচ্ছে, একজন করমচার ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে, বৃষ্টি শেষে বিক্রি করবে বলে, ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে, যেন সিনেমার পর্দা উঠে গেছে, এইবার সামনে দৃশ্য, শব্দ আর চলনশীল সবকিছু। গাছের পাতা গুলো বৃষ্টি ফোঁটায় তখনও চমকে চমকে উঠছে। ভিজে রাস্তা বেয়ে হেঁটে যাওয়া নেশার মত, পথের পাশে ফার্ণ, নাম না জানা গুল্মলতা, তাতে বেগনি রঙের ফুল। দুলে উঠছে বাতাসে। দোকানীরা দোকান পাতছেন ফের, ছাতার তলায় উনোনে ভুট্টা পুড়ছে, চায়ের কেটলি দিয়ে সাপের জিভের মত ধোঁয়া, কুকুরগুলো উৎসাহ পেয়ে কিছুটা হাঁটছে, তারপর ছুটছে অকারণে। হাওয়া দিচ্ছে খুব। গাছপালারা ভিজে গিয়ে বেশ ফুর্তিতে রয়েছে তাদের দেখে বোঝা যায়। পাখিরা নেমে এসেছে মাটিতে কয়েকটা, কি যে ব্যস্ততা তাদের, কিসের যে আনন্দ! ঘুরে ঘুরে এটা সেটা দেখছে, ঠোঁট দিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছে, আবার ঘুরে আসছে এদিক সেদিক, শৈল শহরের অলি গলি হেঁটে বেড়ানোর ভিতর কি যে একটা সুখ আছে সে জানে সে জানে, যে জানে না তার কাছে বৃথা, ব্যার্থ সময়, কেবল পরিশ্রম। জলের সরু ধারা তখনও রাস্তা বেয়ে চলে যাচ্ছে। রঙিন ছাতা নিয়ে খোকা বেড়িয়েছে মার সঙ্গে। পায়ে তার নীল রঙের জুতো। যে দৃষ্টিতে সে পৃথিবীকে দেখে কিছু না জেনে না বুঝে, ঐখানে ঈর্ষা আছে আমার। সাদা পাতা খানি ভরে যাবার আগের দেখায়। শৈল শহর গুলিতে বৃষ্টি শেষে একটা ব্যস্ততা শুরু হয়, চারিদিক ঝটপট করে কিছুক্ষনের জন্য। তারপর আবার একটা ছন্দ ফিরে আসে। হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে যাই, ঘরদোর, মানুষের মুখ, সারল্য, হাসি, আনন্দের ঝিলিক। শাক্য গুম্ফার তরুণ সন্ন্যাসী। তার কাছে নিবিড় সময়। মনেস্ট্রি ঘুরে ঘুরে দেখান। প্রশান্ত তার উপস্থিতি। দেয়াল জুড়ে ম্যুরাল, ভাষা জানা নাই, তংখা পেইন্টিং বিষয়ে এটা সেটা কথা। মনেস্ট্রির দেয়াল গুলো একটা জগত, রঙের, দর্শনের, মনস্তত্ত্বের। অজানা ভাষার বই হাতে যেমন একলা হয়ে যায় পাঠক তেমনি দেয়ালের সামনে একলা দাঁড়িয়ে থাকা। গত দেড় বছরে কুড়ি থেকে পঁচিশটি বৌদ্ধ গুম্ফা ঘুরেছি। দেয়ালে কতশত ছবি, সন্ন্যাসীদের সমাহিত মুখ, বৌদ্ধ দেবী তারা উইশ পন্ডে কত শত পতাকা, কিচিপিডি লেকে খেলে অসংখ্য মাগুর মাছ, বনঝাকরি ঝর্ণার জল, হাঁটতে হাঁটতে কুয়াশায় কুয়াশায় দূর থেকে আরো দূর, তারপর বহুদূর, ছোট চায়ের দোকান, বিনুনি বাঁধা মেয়ের  স্কুল যাবার দৃশ্য, অর্কিড কতরকমের, লোমশ কুকুর দুলে দুলে হেঁটে যায়, দূরের নেশা বড় তীব্র, এক পাহাড় থেকে দূরে আরো পাহাড়, দিনের বহুভাগে সবুজ পাহাড় হয়ে গেল, মেঘে মেঘে সাদা, তারপর রোদ এসে দিয়ে গেল ভিন্ন রং, তারপর বিকেলে সে পাহাড় হয়ে যায় নীল, তারপর সন্ধ্যায় কালো পাহাড়ের গায়ে জ্বলে ওঠে ছোট ছোট আলো। এক একদিন বসে থাকি চুপ করে, শৈল শহরের কোনো এক নির্জন কোনে, একেবারে চুপ। শুধু দৃশ্যের সঙ্গে লেনদেন। শব্দের সঙ্গে। আর নৈঃশব্দের সঙ্গে। প্রতিটা শহরের সাঊন্ডস্কেপ আলাদা, প্রতিটা শহরের সন্ধ্যা, সকাল আলাদা, মাঝে মধ্যে এক একটা মিছিল, শোভাযাত্রা পেরিয়ে যায়। স্যুভেনিরের দোকান গুলো ঘুরে আসি। বৃষ্টি শেষে রামধনু ওঠে, একেবারে শিশুদের কালারিং বুকে ছবির মত দুইপাহাড়ের মাঝাখানে রামধনু। লোকজনের দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে যায় তারপর আবার যে যার কাজে। কারো চোখে ফের আনন্দ, কারো চোখে দায়িত্ব, কারো চোখে মায়া। নতুন শহরে সবাই অচেনা, কি প্রকান্ড স্বস্তি। অচেনা পথের ধার, অচেনা গাছ, অচেনা পাথর, অচেনা পাহাড়ের ঢাল। নতুন বাতাস, নতুন নদীর জল, নতুন শান্তি। বাঁকা পথ চলে গেছে কতদূর পাহাড়ের গায়ে গায়ে, আকাশের ওপারে আকাশ, মেঘের ওপারে ঘন মেঘ। তার ওপারে অচেনা কারো ঘড় দোর, উঠোনে ফুলের গাছ, মৃদু ঠান্ডা হাওয়া। হা ঈশ্বর এই বার মরে গেলে বৌদ্ধবিহারে একটি অশ্বত্থের গাছ করিও। ‘স্থানমাহাত্ম্য’ বাস্তব, কল্পকাহিনী নয়। পাহড়ে, মনেস্ট্রিতে, সন্ন্যাসীতে মিলে গড়েছে কি এক আবহাওয়া, সেইখানে আনন্দ আছে উপশম আছে আর আছে বিস্মৃতিমুক্তি। আর আছে ইন্দ্রজাল। যোগাযোগ খুব সূক্ষ্ম, সুর কেটে গেলে নিভে যায়। সোশিও এস্থেটিক সেন্সিবিলিটি বিষয়ে মোহিত চক্রবর্তীর একটা আর্টিকেল পড়ে অবাক লাগছিল গতমাসে। এভাবেও ভাবা যায়। নেহাত যাকে রোমান্টিসিজম বলে তাচ্ছিল্য করে কেজো লোক, প্রফেশনালিজম। যা কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে, গন্ধে গানে… সেইখানে ফিরে আসে সহৃদয়-হৃদয়সংবাদী। সেইখানে ফিরে আসা যায়।  

   চশমা, চাবি, ছাতা, চার্জার যদি হারানোর ব্যারাম যদি না থাকে তাহলে ভাল। কারন এইসকল সরনশীল পদার্থ হারিয়ে হারিয়ে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে এখন এইসকল জড়দের মাঝে মধ্যে বলতে ইচ্ছা করে, সঙ্গে থাকাটা তোমাদেরও একটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, কেবল আমার একার দায়িত্ব নয়। অনিশ্চয়তা, আনসার্টনিটির আর ভয় দেখাতে পারে না, বলি রোসো বাছা, অনেক করেছ, এইবার তুমি আমার দাস, তোমাকে আর তোয়াক্কা পর্যন্ত করিনে। তারপর ফিরে আসার রিমাইন্ডার। ঢঙ ঢঙ করে ঘন্টা পড়ে যায়। হাওয়ায় হাওয়ায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসি। তারপর, সমতল। শিলিগুড়িতে চায়ের দোকান খুঁজে যথারীতি বসে আছি। দোকানী চা দিয়ে রিল দেখতে বসলেন, কয়েক সেকেন্ড পর পর আলাদা শব্দ, আলাদা গান, আলাদা হাসির আওয়াজ, নেতার হুমকি, চটুল গলার কথা, ভালগার এরস, মধ্যে মধ্যে ডিভাইন কথাবার্তা। অন্যদিকে জানলায় অর্কিড ঝোলানো, জানলার ওপারে, কে ওপারে? ওপারে বুদ্ধমূর্তি। বুদ্ধ কি অনুমান করতে পেরেছিলেন, আমাদের রিল আর ডিজে সভ্যতার কথা? জানতেন এই জাহান্নামের আগুন কতটা গরম! তাহলে তাঁর শান্তির সংজ্ঞা কেমন হত! এ যন্ত্রণা ট্রেনে, পথে, হাটে ও বাজারে। পালাবার পথ নাই।

Monday, June 1, 2026

 

                                        মংপু থেকে যোগীঘাট  

                                             মধুপর্ণা 

রবীন্দ্রভবন লাইব্রেরীর ধ্যানস্থ রিডিং রুমে মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটি ভিন্ন একটি সূত্রে উলটে পালটে দেখতে হচ্ছিল এপ্রিল মাসের শুরুতে। মনে হল আগে ঘুরে আসি তারপর বইটা পড়ব। মানুষে বাস্তবে ঠাসা আজগুবি দৈনন্দিন থেকে পালানোর একটা রাস্তা বছর দুই আগেই দেখে নিয়েছিলাম, নিউজলপাইগুড়ি গিয়ে হাজির হও, তারপর যে দিকে দুচোখ যায় চলে যাও। একে একে দার্জিলিং, কার্সিয়াং, কালিম্পং, ডেলো, গিড্ডে পাহাড়, মিরিক, গ্যাংটক, পেলিং … কোনো জায়গা পছন্দ হলে আবার সেইখানে যাও। সেন্স অব বিলংগিং এর বেখাপ্পা বোধ মানুষকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। ভুতগ্রস্থ কেউ তার ব্যক্তিসত্ত্বা নিয়ে রেখে আসে দূরে অনেক দূরে। পাহাড়ের বাতাস, তিস্তা, পাহাড়ের উঁচু চওড়া দেয়াল, পথের পাশে গোলাপ, সুদৃশ্য ফার্ন, ঘন সবুজের পাশে ফিকে সবুজ, তারপাশে নিবিড় সবুজ, তারপাশে গাঢ় সবুজ, তারপাশে উদাসীন সবুজ, তারপাশে ব্যাকুল সবুজ … এই রকমারী বুকের ভিতর সহ্য করতে হলে, পিছনের সবকিছু ভুলে যেতে হয়, একশ শতাংশ মনোযোগ দাবী করে পাহাড়, তুমি অর্ধেক হৃদয় নিয়ে পাহাড়ের কাছে যেতে পারবে না। তুমি যে পুকুরের মৎস সেই সব হযবরল তোমাকে ছেড়ে দিয়ে একক হয়ে যেতে হবে। তারপর পাহাড় তোমাকে নেবে, নচেৎ তুমি ছবি তুলে আর মোমো খেয়ে বাড়ি চলে আসবে। এইবার জলপাইগুড়ি থেকে মংপু্র পথ ধরি, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঐ পাহাড়ে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে। মংপু পাহাড় ছেয়ে আছে সিনকোনা গাছে আর এই ঔষধি থেকে কুইনাইন প্রস্তুত করার প্ল্যান্টেশন, পুরাতন কারখানার পরিত্যক্ত ঘর গুলো রয়েছে গায়ে লেখা সাল তারিখ। তার পাশে নতুন ঘর। ড শ্রীমনমোহন সেন ছিলেন সেখানকার কেমিষ্ট। তাঁর স্ত্রী মৈত্রেয়ী দেবী।  ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটির লেখক। বইটি পড়তে গিয়ে মনে হল, থাক, আগে ঘুরে আসি, তারপর। শৌখিনতা বলতে এইটুকুই। একটা বইকে যে সূত্রে জানি সেই সব ঘুরে এসে পড়ে একটা সামগ্রিকতা তৈরি করে সন্তুষ্টি নির্মাণ।  

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রাম্বি, রাম্বি থেকে মংপু। গুরুদেব গিয়েছেন সেই গ্রামে, থেকেছেন। ঠান্ডা হাওয়ায় বাঁকা রাস্তা বেয়ে যেতে যেতে শিহরণ হচ্ছিল। শান্তিনিকেতনে কৈশোর থেকে তাঁর নির্মিত আবহাওয়ায় থেকে যে রবীন্দ্রপক্ষপাত তৈরি হয়েছে, সেই পক্ষপাত উদযাপনের। তাই তিনি যেখানে গেছেন থেকেছেন, সেইসব জায়গায় যেতে যেতে যাবার রাস্তায় কিছু একটা কাঁপতে থেকে ভিতরে। রাম্বি থেকে যাবার পথে এক আর্কিটেকচারের ছাত্রের সঙ্গে দেখা, নেপালী ছাত্র কলকাতায় পড়াশোনা করে, বাড়ি ফিরছে সে। ‘ট্যাগোর’ এর মিউজিয়াম দেখতে যাচ্ছি কিনা জিজ্ঞেস করল তারপর গড়াতে গড়াতে কথা এগোয় সারা রাস্তা জুড়ে, স্থাপত্যের ছাত্র হিসাবে সে কলকাতায় ‘বিল্ডিং হপিং’ করেছে বিস্তর, সোলো ট্রাভলিং কেন করি তার এই প্রশ্নের সদুত্তর আমার কাছেও নেই। এটা সেটা বলে তাকে বোঝাচ্ছিলাম না নিজেকেই বোঝাচ্ছিলাম জানি না। ওখানে ট্রি হাউস রয়েছে ওখানে থাকতে পারো, হ্যাভ আ নাইস ট্রিপ বলে হেসে মাঝরাস্তায় গন্তব্যে নেমে গেল ছাত্রটি। নালিদাড়া তে নেমে দিঞ্চেন মনেস্ট্রি সেখানে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীর সংগে কথা হল কিছুক্ষণ, তিনি একটি ছবি দেখিয়ে বললেন ইনি এই বিহার প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি বলে গেছেন তাঁর পরবর্তী জন্ম কোথায় হবে, তিনি দেহত্যাগ করেছেন এরপর ভুটানে জন্মাবেন। তিনি বুদ্ধের প্রসাদ দিলেন একটা বিস্কুটের প্যাকেট। আমরা সমতলের বাঙালীরা এই ধরনের প্রসাদের সংগে পরিচিত না, কয়েকমাস আগে কার্সিয়াং এ এক মনেস্ট্রিতে সেদিন সুগন্ধ পূর্নিমার পুজো, সুগন্ধ দিয়ে উপচার দেওয়া হবে ভগবান বুদ্ধকে। চা বাগানের উপর চাঁদ উঠেছে, পাহাড়ের গা বেয়ে পিছলে পড়ছে জ্যোৎস্না, চাঁদ গলে গলে পড়ে যাচ্ছে সালভাদর দালির ছবির মত। আমার ঘরটি ভেসে যাচ্ছে আলোয়, যথারীতি নোটবুকটিতে লিখে যাচ্ছি কিছু। ‘সুগন্ধ পূর্নিমা’ সেদিন। চাঁদের আলোয় পাগল হয়ে গিয়েছিল একটি লোক – এইরকম একটা গল্প শুনেছিলাম শৈশবে, লুনাটিক , চন্দ্রাহত। সেদিন মধ্যরাতে চা বাগানে ঘুরে বেড়াতে পারলে আমিও বোধকরি হারিয়ে ফেলতাম সামাজিক পরিচিতি, আত্মবোধ। আত্মরক্ষা হয়েছিল হোমস্টের রুমে বসে লিখছিলাম বলে, জানলা খোলা, বাইরে মাতোয়ারা জ্যোৎস্না, পাহাড় গুলো আলোয় ভিজছিল চুপচাপ, পাহাড়ের গায়ে গায়ে গাছ গুলো আলোয় ভিজে একাকার। সেই নিস্তব্ধ আলোর মেহফিলে একটি মাত্র বার্তা ধ্বনিত হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে কে কাহার! আবিদা পারভিনের একটা গানে শুনেছিলাম একটা লাইন, ইয়ে হোশ কি দুনিয়া মে মুঝে তামাশা না বানা, তুনে দিবানা বানায়া তো মে দিবানা বানা।

যাক গে, সেদিন বৌদ্ধবিহারটিতে সামনের চাতালে লোহার পাত্রে আগুন জ্বলছে তার উপর চওড়া একটা পাত্র থেকে ধোঁয়া আসছে, ঝাঁঝালো সুগন্ধ। পাহাড়ের নানা শিকড় পাতা দিয়ে প্রস্তুত এই সুগন্ধী দ্রব্য। পাশে রাখা আছে মন্ড, সবাই চামচ দিয়ে কিছু মন্ড নিয়ে আগুনের উপর রাখছে। সেদিনের নিবেদন সুগন্ধ। সেইখানে দেখেছিলাম বুদ্ধকে দেওয়া হয়েছে বিস্কুট, চিপস, এমনকি কোল্ড ড্রিংস। শান্তা নামের একজন বুদ্ধ ভক্তের সংগে কথা হয়েছিল সেদিন, প্রসাদ দেখে আমার অবাক হতে দেখে তিনি হাসলেন, বললাম, আমরা প্রসাদ বলতে ফল, মিস্টি ,চিড়ে, দুধ পায়েস এইসব জানতাম। তারপর এই নিয়ে কথা হল অনেকটা, তিনি বললেন আমরা প্যাকেট খুলে দিই না, ফল কাটিও না। সেইসবি মানুষজনকে দেওয়া হয়। শান্তিনিকেতনে ফিরে ভান্তেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই বিষয়ে, তিনি বললেন, মহাযান, হীনযানদের প্রথা ভিন্ন। ভান্তের কাছে বৌদ্ধ ধর্ম আর চর্চা সম্পর্কে বহুসময় আলোচনায় জেনেছি নানা কথা, দীপঙ্কর শমন, আগে দাদা বলে ডাকতাম, তারপর মনোরঞ্জনদা বলেছিলেন, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কেউ দাদা বলে ডাকে না, ‘ভান্তে’ বলে ডাকতে হয়। এতদিন ভান্তে কিচ্ছু বলেন নি, দাদা বলেছি উনি দিব্যি সাড়া দিয়েছেন। তারপর যেদিন ভান্তে বললুম, সেদিন হা হা করে হাসলেন। 

তারপর, যোগেন ছেত্রী যিনি মংপু মিউজিয়াম সংলগ্ন গেস্ট হাঊসের কর্মী তাঁর সহায়তায় দুদিনের জন্য মিলল গেস্ট হাউসের ক্ষণিকা ঘরটি। এই দুটো দিন মূলত ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইটি পড়ার প্রস্তুতি। বয়স বাড়ার এই একটা সুবিধা, ইম্পালসিভ কিছুই আর ভাল লাগে না। কিছু গ্রহণ করতে গেলে প্রস্তুত হতে হয় সবদিক থেকে। মৈত্রেয়ী দেবী মূলত রবীন্দ্রনাথের ঘরোয়া আটপৌড়ে দিকটি নিয়ে লিখেছেন। যে উচ্চতা নাগাল যোগ্য নয় সেই কবি জীবন যাপনে কেমন ছিলেন সেইদিকটি ধরা পড়েছে। হেমলতা ঠাকুর এই বই সম্পর্কে লিখেছেন,

“জগতে পূজিত নিত্য বাণীর সাহিত্য

মংপুতে রবীন্দ্রনাথ অমর সাহিত্য”

এই পদ্যের শেষ দুটি লাইন, আহা ! অনন্য……।

বুদ্ধ-সুজাতা যেন খৃষ্ট-ম্যাগডলিন

রবীন্দ্র-মৈত্রেয়ী নাম যুক্ত চিরদিন।

 নন্দন আর্ট গ্যালারীতে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের একটা প্রদর্শনীতে পাহাড়ের কিছু ছবি চোখে আঁটকে গেছিল। একজন অন্ধ আর্টিস্ট কিভাবে পাহাড়কে অনুভব করেছেন, একজন কবি কিভাবে পাহাড়ে থাকলেন সেইসব দেখেশুনে পাহাড়ে গিয়ে গা ছমছম করে। সেই একই পাহাড় একশ বছর আগের, আশি বছর আগের আর আজ যাকে দেখতে ভূতগ্রস্থের মত ঘুরে বেড়াচ্ছি। খাড়া পাইন গাছ, গাছেরা অদ্ভুত শান্ত, পাহাড় যোগীর মত সুন্দর, মেঘ এসে ছেয়ে যাচ্ছে যেন ‘যোগীর গায়ে ভস্ম মাখা’ মানুষের জঙ্গলে নির্বাসিত আমি আর্তনাদ করি, আমাকে ফেরত নিয়ে নাও। যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিও না। আবার জন্ম দাও তোমার কন্যা করো। বন্ধু ভ্রাতা সুমন কল্যান বলত, যোগ বলতে কি বোঝো তুমি? বিচ্ছিন্ন হয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যানমুদ্রায় বসে থাকা? যোগ মানে যোগাযোগ দিদি। এই কথাটা বোধগম্য হয় যখন ভিতরে বাহিরে বহে বাতাস, পাহাড়িয়া বাতাস।

 বৃষ্টি বাদলের জন্য ট্রী হাউস বন্ধ। সিঙ্কোনা গাছে ভর্তি মংপু গ্রামটিতে সারি সারি পাইনের পাশ দিয়ে যে বাঁকা পথ চলে গেছে সেইখানে রবিঠাকুরের মিউজিয়াম। মৈত্রেয়ী দেবীর যে বাংলোয় তিনি ছিলেন সেইটিই এখন সংগ্রহশালা। বাইরে একটি ভাস্কর্য, দূর থেকে দেখে মনে হয় কাঁচা মাটির, পালিশ নেই যেন, ইম্পার্ফেকশনের খর সৌন্দর্য্য। আবক্ষ রবিবাবু দাঁড়িয়ে আছেন, ধ্যানমগ্ন তার অবয়ব। তার সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলি, তোমার ইস্কুল থেকে এসেছি, চিনতে পারছো না আমায়! তুমি নারীশিক্ষার প্রথম যুগে মেয়েদের জন্য প্রদীপ জ্বেলে দিলে, হস্টেল গড়ে দিলে শ্রীসদন, সেই আলোয় সেইখানে পড়লুম সেই হস্টেলে থাকলুম, বড় হয়ে তোমার তৈরি মেয়েদের হস্টেল নিয়ে কত কি লিখলুম, বলে বেড়ালুম, আর তুমি চিনতেই পারছ না! ব্যবধানটা কিসের জানো? সময়ের। আমাদের টাইম মেশিন নেই, থাকলে তোমাকে বলে আসতুম অনেক কথা। তোমার ইউনিভার্সিটি টাউনে কতকত বছর কাটল, সেইখানেই স্থায়ী বাসিন্দা এখন, তোমাকে নতুন করে দেখবো বলে এতদূর আসা। নতুন জায়গায় চেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ ভিন্ন তাই না? … তারপর পাশে কাঠের বাংলো। কতকগুলি কক্ষ। কাঠের মেঝে সুসজ্জিত চারিদিক। অনেক ছবি, অনেক স্মৃতি। সামনে রবিঠাকুরের ছবি চেয়ারে সাদা কাপড়ের ওপর রাখা। তাঁর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বেশিক্ষন তাকানো যায় না। মনে হয় মন, মনন, চিন্তন সবই তিনি দেখতে পাচ্ছেন জলের মত স্বচ্ছ। একটা তামার পাতে তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা তিনটি ভাষায় লেখা, বাংলা, ইংরেজি, নেপালী। পাশের কক্ষে চেয়ার টেবিল আর ব্যবহৃত কিছু ওষুধের পাত্র। এই আসবাব গুলো বাবামশাই এর জন্য রথীন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন। পাশের ঘর গুলিতে অনেক ছবি, তথ্যসমেত। ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে থমকে যাই দরজার উপরে একটি লেখা দেখে, ‘প্রজাপতি সেতো বছর গোনে না/ নিমেষ গনিয়া বাঁচে’… অমলিন আনন্দ কাকে বলে তার সংজ্ঞা জানিনা, তবে কিছু মুহুর্তের অনুভব হৃদয়প্লাবী। আনন্দ হয়। জীবনানন্দ।  কলকাতার বাঙালী একটি পরিবার ও সেইসময় সেখানে ছিল, আলাপ হল, তারপর কথায় কথায় আলাপ এগোয়, রবিঠাকুর সেই সাধক যোগী পরশমনি, যা ছুঁয়ে দেন সোনা হয়ে যায়। ভদ্রমাহিলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সুবাদে সখ্য হয়ে যায়, তিনি কয়েকটা ছবি তুলে দেন একা ঘুরি ছবি তোলার কেউ নেই বলে। তারপর বাইরে বাগানে এসে বসি, একটা প্রার্থনা সর্বদাই মনের ভিতর চলতে থাকে, পাহাড় মূলত প্রার্থনার জন্য যাই, সদা সর্বদা মনের একটা অংশ কিছুর দিকে নিবিষ্টমনে চাহিয়া থাকে। স্থির অনিমেষ। মংপুতে রবিঠাকুরের মিউজিয়াম দেখা সেই প্রার্থনার একটি উদযাপন। দূরে পাহাড়, তারও দূরে মেঘ নীলাকাশ, কাছে কতগুলো ঘর, তারও কাছে কতগুলো গাছ, ভূতগ্রস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। অনন্তকাল পেরিয়ে যায়। সময় বয়ে যায় হু হু করে, যেন এই পৃথিবীর সঙ্গে আমার সকল সম্বন্ধ চুকে গেছে, এখন ভেসে যাচ্ছি দেহের নৌকা ছেড়ে হাওয়ার নৌকায়। মেঘ সরে সরে যায়, আকাশ ঢাকে আবছা আঁধারে, ধীরে ধীরে একটি দুটি আলো জ্বলে ওঠে পাহাড়ের গায়ে, শিহরণ হয়। গুটিশুটি  ক্ষণিকা ঘরে গিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। মনে হয় মায়ের গর্ভের ভিতর ঘুমাচ্ছি যেন। পাহাড় চারিদিকে, গায়ে গায়ে জোনাকীর মত আলো, মলয় বাতাস, রবিঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত পাহাড়, আনন্দ চাদরের মত জড়িয়ে থাকে। গেস্ট হাঊসের ঘর গুলোর নাম ক্ষণিকা, সোনার তরী, পুনশ্চ ইত্যাদি। বারান্দায়, ডাইনিং এ রবীন্দ্রনাথের সুদৃশ্য ছবি। কুইনাইন ফ্যাক্ট্রির পরিত্যক্ত ঘর, তার উল্টোদিকে নতুন ঘর, সিঙ্কোনা, কুইনাইন, মৈত্রেয়ী দেবী, ড মনমোহন, রবীন্দ্রনাথ, মংপু, শব্দ গুলো তন্দ্রার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিভাবে একটা পাহাড় মোহময় হয়ে উঠেছে বাঙালীর চেতনায় রবীন্দ্রনাথের স্পর্শে… সেইখানে গভীর নিদ্রাচ্ছন্নতা কতটা অতল আমার ভাষা নেই প্রকাশের। রবীন্দ্রনাথ এখনও ইন্দ্রজাল বিছিয়ে রেখেছে সারাবিশ্ব জুড়ে। অসুন্দর যাকে আক্রমণ করেছে তার যাবার জায়গা একটাই রবীন্দ্রনাথ, অন্তত যারা শান্তিনিকেতনে বড় হয়েছি, কেটেছে কৈশোর, তারুণ্যবেলা। তাদের উপশমের একটাই জায়গা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গান তাঁর কবিতা তাঁর কথা তাঁর ছুঁয়ে যাওয়া জায়গা মেখে নিতে হয়। অসৌন্দর্য্যের আঘাত বড় কঠিন, বড় ক্রুর। যে ভেঙেছে বাস্তবের আঘাতে তাকে জোড়া দেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর ফিরে এসে ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইতে পেয়ে যাই সেই কয়েকটা লাইন, যে গুলো খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম বহু বহু বছর ধরে …

দুঃখ পেয়েছি দৈন্য ঘিরেছে অশ্লীল দিনে রাতে

দেখেছি কুশ্রীতারে,

মানুষের প্রাণে বিষ মিশায়েছে মানুষ আপন হাতে

ঘটেছে তা বারে বারে।

তবু তো বধির করেনি শ্রবণ কভু,

বেসুর ছাপায়ে কে দিয়েছে সুর আনি,

পরুষ কলুষ ঝঞ্ঝায় শুনি তবু

চির দিবসের শান্ত শিবের বাণী।

এক একটা শৈল শহরকে ব্যক্তির মত মনে হয়। চলে আসার দিন এক বিমূর্ত সত্ত্বাকে বলে আসি, এবারের মত আসি। যদি জিজ্ঞেস করো, কে আমার বন্ধু? বলব, কার্শিয়াং শহরটি, পেলিং এর নীল পাহাড়, ছোট মেয়েটির লাল ছাতা, বলব জোনাকীর মত জ্বলে থাকা আলো পাহাড়ের গায়ে গায়ে, বলব রিয়াং নদীর জল। বলব মংপুতে কাকভোরে পাইনের নিস্তব্ধতা। মংপু থেকে পনের কিলোমিটার দূরে যোগীঘাট। নেপালী এক দাদার গাড়িতে রওনা হই, দাদা রাস্তায় গাছ চেনালেন বিস্তর, অধিকাংশই ঔষধী। কুইনাইনের সারি, অকছর গাছটি দেখে দাদাকে দাঁড়াতে বলি অদ্ভুত সুন্দর, গাঢ় সবুজ ছোঁচালো তার ঝাঁক ঝাঁক পাতা, আর সাদা ফুলে সারা গাছ মাতোয়ারা। ‘ফলিয়েজ’ শব্দটা ঘন হয়ে বসেছে সেখানে। গাছটি বেশ ব্যক্তিত্বময়। পাতায় ফুলে বলিষ্ঠ শাখা প্রশাখায় তার প্রেসেন্স বেশ দৃঢ। নেপালী দাদা বলেন, খুবসুরত লেকিন কুছ কাম পে নেহি আতা হ্যায়। একচোট হাসি হয়। তারপর যোগীঘাট। শিবের এক উপাসক এই রিয়াং নদীর তীরে সাধনা করেছিলেন, সেই থেকে নাম তার যোগীঘাট। স্থানমাহাত্ম্য কিভাবে তৈরি হয়। ঘটনা, ব্যক্তি আরো কতকি এক একটা জায়গাকে বিশেষ করে তোলে। গতমাসে গেছিলাম রাঢ উৎসবে জয়দেব কেন্দুলি। একজন কবি জয়দেব, একটি বই গীতগোবিন্দম। একটা বই একজন কবি কিভাবে একটা জায়গাকে বিশেষ করে তুলেছেন, যেখানে লক্ষ লক্ষ লোক সমাগম পৌষ সংক্রান্তিতে। সুধীর চক্রবর্তী এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন যে একটা জায়গার নাম কিভাবে একজন কবির নামে বদলে যায় যেখানে বাসওয়ালা, কেন্দুলি বাদ দিয়ে জয়দেব বলে হাঁকতে থাকেন যাত্রী টানার উদ্দেশ্যে। মংপুতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাই ব্যক্তিগত ভাবে  জায়গাটি বিশেষ, হয়তো বাঙালীর কাছেও তাই, মৈত্রেয়ী দেবীর বইটিও তার একটি বড় কারন। সেই সময়, সেই দৃষ্টিকে ছুঁয়ে দেখতে হাজির হন পর্যটক। যোগীঘাটে গিয়ে পুরোনো অভ্যাসে যোগীর নাম ধাম ঠিকানা গল্প জানতে চেষ্টা করি, এইটুকু শুধু জানতে পারি, শিবের উপাসক একজন এই রিয়াং নদীর তীরে পাহাড় ঘেরা  সুনিবিড় জায়গায় সাধনা করেছিলেন সেই থেকে তারা নাম হয়েছে যোগীঘাট। আর কোনো তথ্য পাই নি নানাজনকে জিজ্ঞেস করেও। সেই অজানা অচেনা কোনো যোগীর উদ্দেশ্যে মন ছুটে চলে যায়। তিনি পরিচিতির ভার রাখতে চান নি হয়তো, যে পরিচিতি যিনি জীর্ণ বস্ত্রের মত ত্যাগ করে, সামাজ সংসার ছেড়ে একান্তে যোগ সাধনা করেছেন তার পরিচিতি কেনই বা বৃথা খুঁজতে যাওয়া ! কিন্তু তাকে ভোলে নি রিয়াং নদী, ভোলেনি পাহাড়, ভোলেনি রিয়াং নদীর পাথর আর জল। ভোলে নি জনমানস, জায়গার নাম রেখেছে যোগীঘাট। যে ব্যক্তিসত্ত্বা তিনি মুছে দিয়ে হয়েছিলেন যোগী, জায়গার নামটিও ব্যক্তি সাপেক্ষ নয়। বৃহৎ ব্রীজের পাশে একটি পুরোনো পরিত্যক্ত কাঠের ব্রীজ। সময়ের ব্রীজ হয় না? দুটো জায়গা যেমন জুড়ে দেয় ব্রীজ তেমনি দুটো সময় জুড়ে দিতে পারে না কোনো সাঁকো? যদি যোগীঘাটে গিয়ে দেখতে পেতাম কোনো এক যোগী সেখানে ধ্যানমগ্ন। তাঁর আত্মার সুগন্ধে মৌ মৌ করছে চারিদিক। তখন রাত নটা, শুনশান চারিদিক। ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, একদিকে পাহাড়ের আঁধার দেয়ালে মিটমিট করে জোনাকির মত আলো জ্বলছে, আরেকদিকে পাহাড়ের বৃহৎ অবয়ব দেখা যায় আলো নেই একটাও, নীচে জল বয়ে যাবার আদিম শব্দ, গাছগুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত মগ্নতায়। একটা দুটো কুকুর ঘোরাঘুরি করছে, যে গুটিকয় দোকান তাদের পাল্লা বন্ধ হয়েছে ইতিমধ্যে। মনে হল এই অন্ধকার ব্রীজটা হেঁটে পেরিয়ে গেলে শুধু নদীর ওপারে নয়, পৌঁছে যাব ভিন্ন একটা সময়ে। হঠাৎ দেখা হবে সেই যোগীর সঙ্গে যিনি নাম ধাম মুছে দিয়ে, জাগতিক বিন্যাস ডিঙিয়ে চলে গেছেন অন্যপারে। মানুষেরা বানিয়েছে সাঁকো, তুমি বানিয়ে যেতে পারতে সময়ের সাঁকো যাতে তোমার কাছে পৌঁছে যাওয়া যায় – এই কথা তাকে বলতাম। স্থান আর সময়ের বাঁধনে আটকে থাকা মানুষকে দিতে একটা পাখনা যাতে সে সীমা পেরিয়ে যেতে পারত যেখানে তার খুশি। যোগী নেই, তার না থাকাটা বড় প্রকট সেই নদীর স্বচ্ছ্ব জলে, পাথরে আর নিস্তব্ধতায়। অনুপস্থিতিকে প্রকান্ড করে দিয়ে গেছে যোগী মুছে দিয়ে ঠাঁই ঠিকানা তার। সেই অনুপস্থিতিই যেন একটা সাঁকো, থাকা না থাকার মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটুকুই সাঁকো। পাথরের ওপর বসে আছি লিখছি রোজের মত - ‘কুশ্রীতার’ বিপরীতে কেমন জেগে থাকে ‘শান্ত শিবের বাণী’ কেমন সাধারন দৈনন্দিনের  হয়ে ওঠে ‘চির দিবস’। কেমন করে ‘দুঃখ’, ‘অশ্লীলতা’র বিপরীতে সৌন্দর্য্য আছে, কেমন করে পৃথিবীর রণরক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়। মনে হল মিশে আছে যোগী সর্বত্র আর তার ধ্যানের ফলাফল। অন্বেষনের অমূল্যরতন রেখে দিয়েছেন তিনি বাতাসে হীমে, আকাশের নীলে, গাছের সবুজে, জলের স্বচ্ছ্বতায়, রাত্রির নিস্তব্ধতায়, পাহাড়ের প্রশান্তিতে, সকালের নৈঃশব্দে। একদিন থাকার কথা, তিনদিন থেকে গেছি স্রেফ কিছু  না করে, হোমস্টে তে গিয়ে ঘুমিয়ে আসছি, খেয়ে আসছি এসে বসে থাকছি নদীর পাথরে, জলে ঘুরে বেড়াচ্ছি, ব্রীজে হেঁটে বেড়াচ্ছি। ভূতগ্রস্থ অবস্থা। একটা জায়গা এইভাবে প্রভাবিত করবে ভাবিনি। একটা পদ্যের লাইন আছে জানো!

“ছাই হয়ে গিয়ে তবু বাকি যাহা রহিবে

আপনার কথা সে তো কহিবেই কহিবে”

একটা সুফিগানে শুনেছিলাম, আপনি জ্বলতি চিতা মে হাত ডালা, খুদকো নিকাল লিয়া… মাটি তন সে ঝারি… বড়া বাওয়াল কিয়া…। চিতা থেকে উঠে আসার শক্তি যার আছে, ছাই ভস্ম থেকে যা বাকী থাকবে সে নিজের কথা বলবেই।

  মুখিয়া হোমস্টের মালিক অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি, বললেন, আপ বেটি জ্যায়সি রহিয়ে, তারপর নীচের তলার দোকানের একজনের কাছে শুনলাম, তাঁর কন্যা ইস্রায়েলে পড়তে গিয়ে গাড়ি দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। শোকে তিনি স্থাপন করেছেন এক শিব মন্দির। স্ত্রী পুত্র পুত্রবধূ নিয়ে হোমস্টে চালান। তারপর, আলাপ হল এক নেপালী দাদার সঙ্গে। উইমেন্স স্টাডিজ পড়েছি শুনে আলোচনা গড়াল কিছুদুর, পাহাড়ের মেয়েদের অবস্থা, অবস্থান, সরকারী উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয়ে বলছিলেন তিনি। হিঊম্যান স্টাডিজ নাকি ওম্যান স্টাডিজ জিজ্ঞেস করলেন এইভাবে… এইচ না ডাব্লিঊ? আমি বললাম ডাব্লিঊ। তারপর থেকে নারীর প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহার করলেন ডাব্লিঊ। হামলোগ লছমি কি তরা ট্রিট করতে হ্যায় বেটিলোগোকো, লেকিন সাদিকে বাদ উন লোগোকো আচ্ছা লাইফ নেহি মিলতা - তিনি বারবার উল্লেখ করছিলেন মেয়েদের মানসিক সমস্যার কথা। কিভাবে বিবাহের পর, সংসারের চাপে, প্রসূতি অবস্থায় তাঁরা মানসিক অবসাদে ভোগেন। কিভাবে সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে মর্যাদার চাপে থাকতে হয়, কিভাবে সেজে গুজে ফিট থাকতে হয় স্বামীর মনোযোগ পেতে। কিভাবে সমাজের চোখ তাদের তাড়া করে ফেরে। সবশেষে বললেন, তাঁর স্ত্রী ছেড়ে গেছেন তাকে মাস দুয়েক আগে অন্য কারোর সংগে ঘর বেঁধেছেন,  আর তিনি পাঁচ বছরের মেয়ে নিয়ে দোকান সামলাচ্ছেন। সবশেষে উপসংহার হিসাবে বললেন, ‘নারী চরিত্র দৈব না জানে’। বললেন, ইয়ে এড কিজিয়ে আপকে স্টাডি মে। আমিও হাসতে হাসতে বললাম, জী দাদা। সকালে ফেরার সময় বিদায় জানাতে তিনি আবারো বললেন, ইয়াদ রাখিয়েগা, নারী চরিত্র দৈব না জানে!

যদি পাহাড় জিজ্ঞেস করে, কন্যা তুমি কি আশায়?

যদি পাহাড় জিজ্ঞেস করে, কারণ কি?

নতজানু আমার একটিমাত্র উত্তর

দৃশ্য নয়, বস্তু নয়

অনুভব খুঁজিয়া বেড়াই

পৃথিবী হাতড়ে এখন ঈশ্বর খুঁজিয়া বেড়াই।

Sunday, March 15, 2026

 

                                               এইসব দিনগুলো

                                                  মধুপর্ণা

এইসব বইপড়া দিন গুলি অপূর্ব। সামঞ্জস্যপূর্ণ অতিরেকবিহীন। বিস্মৃতি থেকে বহুদূরে প্রতিস্থাপন করে আনন্দ ভিতরে বাহিরে। অবাঞ্ছিত কোলাহল ধীরে ধীরে চলে যায় ত্রিসীমানা থেকে। সেইসব দিন ফিরে আসে। মা নতুন শাড়ী পড়লে যেমন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম শৈশবে তেমনি আনন্দে ভরে যায় অন্তরাত্মা। বিস্ময় অদ্যাবধি একমাত্র মুলধন। একটি করে দিন চলে যায় এক একটি পাতার মত, একটি দিনের ডালে জন্মায় আরো একটি দিন। নিরবিচ্ছিন্ন সময়ের স্রোত। বাহ্যিক আওয়াজ  আর উপাদেয় লাগে না। যারা যে খেলা খেলতে চায়, খেলতে দাও। নিজেদের তৈরি করা ব্যুহে নিজেরাই ডুবে যায় মানুষ – এমনই নিয়তি। ভারতবর্ষ সাধনার দেশ আর প্রকৃতি জাগ্রত সত্তা। এই কথা যে জেনেছে তার কাছে বৃথা হয়ে গেছে অনেককিছুই। ননীবালার জীবনের প্রতি অবশেসন ক্রমে বাড়তে থাকে। ভণিতাহীন একজন যোগারূঢা পথবৈরাগী, অভাববোধহীন পূর্ণ সত্তা। পথ খুঁজছে সবাই আর সে পথে এসে দাঁড়িয়েছে তাই পথ আপন গতি পেয়েছে।

পরিসর এক অদ্ভুত মাত্রা। বাহ্যিক অথবা নিজস্ব একান্ত ব্যক্তিগত পরিসর এইসব চর্চার পর, ভার্জিনিয়া উলফ থেকে পিঞ্জড়া তোড়, ইউটোপিয়া কিম্বা ডিসটোপিয়া নানা কথকথার পর …বেগম রোকেয়া কোনো এক কল্পলোকের কথা চিন্তা করেছিলেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’এ। তারপর যখন নিগূঢ় অন্তর্লোক, সাধনার তটভূমির কথা শুনি হতবাক লাগে। আরশিনগর, বারামখানা কোনো ফিজিক্যাল স্পেস নয়। অথচ বহু মানুষের সেখানে যাতয়াত। মনস্তত্ত্বের এক একটা দরজা অথবা বেড়া অতিক্রম করে তারা পৌঁছে গেছে গন্তব্যে। তূরীয় আনন্দলোক। রিপুর সীমা আর পার্থিব সীমা পেরিয়ে অন্য এক স্তর, যা সাধনালব্ধ। টিকিট কেটে যাওয়া যায় না। নেই কোনো যানবাহন। সেই ৯/৩৪ স্টেশন ও নয়। অথচ বারবার মানুষেরা অন্য এক পরিসরে যেতে চায়। কল্পনা করে। আর সাধকেরা  চলে যায় ভিতরে রাস্তা কেটে। নেহাত কল্পনায় তারা অপেক্ষা করে না, আকাঙ্ক্ষা করে না। চলে যায়। রাস্তা খুঁজে বের করে নেয়। তারপর এইসব থেকে সুতো কেটে যায় চিরকালের মত। কিছুই আর স্পর্শ করে না তাদের। সংযোগ আর যোগের দুনিয়ায় যোগাযোগের পদ্ধতি ভিন্ন। সেখানে জলের ধর্ম আর বাতাসের ধর্ম আর আকাশের ধর্ম ক্রিয়াশীল। হাতফেরতা কোনো কিছুই আসে যায় না।



Thursday, March 12, 2026

 

 

                                      
                                             
হলুদ আলোর বিকেলে

                                                     মধুপর্ণা 

তারপর শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি শেষে অদ্ভুত হলুদ আলো এসে ছড়িয়ে পড়ে। অলৌকিক এই সব বিকেল বহুযুগের ওপার থেকে উড়ে এসে এই মার্চ মাসের দ্বিতীয় হপ্তায় হঠাৎ ভন্ডুল করে দেয় সব। এই গোধুলি আলোয় পার্থিব জগত অপার্থিব মনে হয়। পরিচিত গাছ, পরিচিত কোপাই নদী, পরিচিত ঝোপঝাড়, পরিচিত রাস্তা, পরিচিত সব কিছুর উপর থেকে বাস্তবের রূঢ়তা সরিয়ে লেপে দেয় মমতার প্রলেপ। সাধারণ চারপাশ মায়াময়, নিবিঢ়, অনন্য। অজান্তেই এই হলুদ আলোর প্রতি গেয়ে উঠি – এলে কি দুকূল হতে কূল মেলাতে এই অকূলে! ভাল লাগে, এই কথাটার থেকে বড় সত্য আর কিছুই নয়। বৃহৎ আকাশের নীচে ধূসর মাটির পৃথিবীতে বেঁচে থাকার ঘটনাটি ঘটতে দেখে আনন্দ হয়। একমাত্র এই সত্যকে সত্য বলে মনে হয়। জাগতিক হযবরল , বিড়াল অথবা রুমালের বাইরে এই আলো আশ্চর্য সুন্দর। নতুন গান শুনলে ভাল লাগে, নতুন বই পড়লে ভাল লাগে  -সুধীর চক্রবর্তীর বই পড়ে মাতোয়ারা লেগেছিল বহুদিন পর। সূক্ষ্ম তীব্র ভাবে যারা ঘটনাকে, মানুষকে, চারপাশকে দেখে এবং অনুভূতিকে ভাষায় অনুবাদ করে  -সেইসব বই পড়তে গিয়ে অদ্ভুত আনন্দ হয়। এই সব হলুদ আলোর বিকেলে মস্তিষ্ককে চালনা করা বন্ধ করে দি। যে দিকে ইচ্ছে হয় যেতে দিই।ঘটনা, কথা, ছবি পর পর আসে। বাধা দিই না। বৌদ্ধ একটা গুম্ফায় মুর‍্যালে একটি অদ্ভুতদর্শন প্রাণী দেখে সন্ন্যাসীকে জিগ্যেস করেছিলাম, এর অর্থ কি? উনি যা বলেছিলেন তার মর্মবস্তু এই যে, আমাদের মন বানরের মত অস্থির। এ ডাল সে ডাল করে লাফিয়ে বেড়ায়। তাকে ধ্যান দিয়ে সিধা করতে হয়। বসাতে হয় একক মগ্নতায়। চেতনপ্রবাহ তাহলে এই বানরের বিচরণ ক্ষেত্র! মগ্নচৈতন্য লাগাম রেখে চলে না, তার গতি সাবলীল। এই সব হলুদ আলোর বিকেলে আস্কারা দিতে হয় চেতনার প্রবাহকে। পর পর মনে পড়ে বেনারসে শরবতের দোকান, জানকী ঘাটে এক দেয়ালে কৃষ্ণের অপটু ম্যুরাল, তারপর মনে পড়ে কার্শিয়াং এর এক হোমস্টের মালিক কিভাবে বলেছিল, আমাদের এখানে কোনো ঘরে ঘোড়া ভিউ নেই, সব ঘর থেকে চারপাশ দেখা যায়। অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিলাম, ঘোড়া ভিউ মানে কি ? তিনি বলেছিলেন ঘোড়া কেবল সামনে দেখে, চারপাশ দেখে না, তাই আমরা তাই পর্যটকদের বলি এমন ঘর নিন যাতে সবদিক দেখা যায়, ঘোড়ার মত নয় মানুষের মত দেখুন! তারপর মনে পড়ে উড়িষ্যায় পিপিলি গ্রাম যেখানে জগন্নাথদেবের চাঁদোয়া তৈরি হয়, গরমে হতোদ্যম হয়ে বসে আছি, এক দোকানী বললেন, আপনি কি আসাম থেকে? না, আপনাকে দেখে মনে হয় অসমীয়া। বললাম, না বাঙালী। দার্জিলিং এ মধুরিমাদিও বলেছিল, তুই এখানে আর কিছুদিন থাকলে তোকে পাহাড়ী মনে হবে। যাক, মনে পড়ে গিড্ডে পাহাড়ে সেই মোমো দোকানের আন্টির কথা, সাংঘাতিক ভাল মোমো বানান। কুয়াশার ভিতর ঠান্ডার ভিতর সকালে কেঁপে কেঁপে মোমো খেতে যেতাম। নেতাজী ঐ পাহাড়ে ছিলেন কিছুদিন, একটা মিউজিয়াম রয়েছে। সেখানে তাঁর বান্ধবী এমিলির ব্যবহৃত পিয়ানো রয়েছে আরও ছবি, আসবাব ইত্যাদি। পিয়ানোর ছবি দেখে আমার এক বন্ধু বলেছিল, সব বিখ্যাত লোকেরা পিয়ানো কেন বাজায় ! এই সব ‘লুজ টক’ বন্ধুদের মধ্যে খুবই স্বাভাবিক।  সেই সূত্রে মনে পড়ে, ‘পিয়ানো’ নামে একটা সিনেমা রয়েছে, এক বোবা মেয়ের গল্প। পিয়ানো টীচারের সঙ্গে প্রণয় হয়ে পড়ায় মেয়েটির স্বামী তার আঙুল কেটে দিয়েছিল পাথরের ওপর থেঁতলে। তারপর তার পিয়ানো সমুদ্রে ফেলে দিতে গিয়েছিল। মেয়েটি একটা দড়ি দিয়ে পিয়ানোর সঙ্গে নিজের পা বেঁধে নিয়েছিল, ফলে পিয়ানো ফেলে  দেবার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিও সমুদ্রে তলিয়ে যায়। সেই অবর্ণনীয় দৃশ্য মেয়েটি সমেত পিয়ানো সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই বিকেলে হলুদ আলোর মত আলো ছিল ঐ দৃশ্যে। বোবা মেয়েটি কাল গাঊন পরে ডুবে যাচ্ছে তার একমাত্র আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, অবলম্বন পিয়ানোর সঙ্গে, তার  নির্বাক ভাষা একমাত্র বুঝতে পারত তার শিক্ষক, তার পাষন্ড স্বামী তাই পিয়ানো সমেত স্ত্রীকে নির্মম শাস্তি দেয়। তারপর মনে পড়ে কিভাবে একটি ইংলিশ মিডিয়ামের বাচ্চা ছাত্র কবিগুরু অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতা শুনিয়েছিল। তাকে শুধরে দিতে গিয়ে থমকে গেছিলাম, কে কবিগুরু আর কে নয় এই বাচ্চাটিকে বলে লাভ কি ! তার মনে হয়েছে অন্নদাশঙ্কর কবিগুরু, ঠিক আছে, তার ওটা মনে হওয়া। তারপর মনে পড়ে ডাবলিনে লিফি নদীর পাড়ে একটা বিকেল, সীগালের ডাক, হু হু করে উঠছিল সেই বিকেল। মনে পড়ে আমাদের গ্রামে ভদ্রকালীর থান, বৃদ্ধ বটের কথা। এইভাবে অসংলগ্ন কথার প্রবাহ চলতে থাকে, ঠাহর হয় হলুদ আলো পেরিয়ে কখন সন্ধে হয়ে গেছে। উঠে গিয়ে  চা বসাই। পাহাড়ে একটি গেরুয়া বসনের সন্ন্যাসীকে লটারীর টিকিট কাটতে দেখেছিলাম, পার্থিব সব মোহ মায়া কাটিয়ে তিনি কেন এই কাজ করলেন তার ব্যাখ্যা সচেতন ভাবে এড়িয়ে গেছি। হনুমান টকের সেই পাইন গাছ যাকে বলে এসেছিলাম যা মানুষকে বলিনি কোনদিন। মিরিকের সেই ব্রীজ, ঘন বৃষ্টির ভিতর ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি বৃষ্টির ফোঁটা শুভেন্দু লেকের জলে কিভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে দেখার নেশা ছাড়তে পারিনি বলে। সেই ছাতার দোকানীর কথা মনে পড়ে, কেমন ছাতা চান? প্রশ্নের উত্তরে বলে বসি, যে ছাতা হারায় না তেমন ছাতা দাও, যদিও সেটা হারিয়ে গেছে পেলিং এ। থেকে থুকপার দোকানটা, পাহাড়ী রেল স্টেশন বোঝাতে এক বন্ধু বলেছিল, ছিমছাম! তারপর সেই মেয়েটি দিল্লী থেকে চাকরি ছেড়ে পাহাড়ে হীল করতে এসেছে, প্রচুর কথা হয়েছিল তার সঙ্গে, কিভাবে কর্পোরেট জীবনে সে হাঁপিয়ে উঠেছে এবার সে ডান্সার হতে চায়। কার্শিয়াং এ চা বাগানের সেই গাছটার কথা মনে পড়ে যাকে বলে এসেছিলাম, আবার আসিব ফিরে, এসে বলব, সুধা তোমাকে ভোলেনি!  

 

 

 

Tuesday, February 17, 2026

 

 

                                          যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে 

                                                 মধুপর্ণা

‘স্থানচ্যুত তুমি হও স্থানে উন্নীত’, ‘যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে’, ‘আপন সাধন কথা না কহিও যথা তথা’,  শব্দবন্ধ গুলো ঘুরপাক খায়। এইসব ফাল্গুনের নির্জন সন্ধ্যায় কতকগুলো বই পড়ে বিগড়ে যায় সামাজিক সত্তা। মস্তিস্ক ভরে যায় শতাব্দী প্রাচীন শ্লোকে, কথায়, শব্দের আঘাতে। কথা বেঁধে গেছে ফকির, দরবেশ, বাউল। সেই কথারা আছড়ে পড়ে, আচ্ছন্ন করে দেয়। ননীবালার কথা চিন্তা করি, মলিন তার বেশ, রুক্ষ অঙ্গে সাধনার নির্জনতা। গুরুকে পাড়ে পৌঁছে দিতে স্বয়ং নৌকা হয়ে সমাজ, সংসার ছেড়ে এসেছিলেন ননীবালা। বাউলসাধকটির শুদ্ধ মনন সে অনন্তলতার মত অবলম্বন করেছিল নিবিড় সংরাগে। ‘আনখা মেয়েছেলে’ থেকে অধিষ্ঠিত হয়েছিল আশ্রমজননীতে। মায়াকীর্ণ হট্টগোল থেকে ননীবালা, মিনতি,সাধনারা সমাজ থেকে চলে গেছে গভীর নির্জন পথে হেঁটে বহুদূর যাবে বলে। কতদূর তারা হেঁটেছিল আমি জানি না, মানুষ মনে মনে বহুদূর চলে যায়, বাইরে তাকে দেখে বোঝা যায় না। গভীর নির্জন পথ বেয়ে, নদী পেরিয়ে, সমাজ পেরিয়ে, দোকানপাট পেরিয়ে, নিয়ম পেরিয়ে, প্রত্যাশা আকাঙ্ক্ষা পেরিয়ে  চলে যায়। তাদের আর ফেরানো যায় না জনপদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। সমস্ত পরিচিতি ত্যাগ করে  সে গায়ে জড়ায় কথার বসন, নৈঃশব্দে রাঙা, অভিজ্ঞতার কারুকার্য তাতে। একান্ত অন্তর্লোকের সেই গুহ্য যাত্রায় ননীবালা্রা একাকী, নিঃসঙ্গ, পূর্ণ, একক। ঘুম পেয়ে যায়, বইপত্রের ভিতরে ঘুমিয়ে পড়ি, তারপর অস্পষ্ট ননীবালা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্বিকার মুখে তার যন্ত্রণার আবছা দাগ, ধুলোয় ধুলোময় তার মলিন অবয়ব, আর উজ্জ্বল তার চোখ, উজ্জ্বলতার ভয় আমার আজন্মের তাই তাকাতে পারি না। ননীবালার মুখে অনুভুতি ছটফট করে না, স্থির। লোকালয় ছেড়ে ঘর গৃহস্থালী ছেড়ে চলে গেলে মানুষ এইরকম স্থির হয়ে যায়। সমাহিত আর স্নিগ্ধ হয়ে যায়। স্থৈর্য এসে ঝাপটা মারে, বিক্ষত করে দেয় না, ধাক্কা দেয়। আকাশে মানানসই চাঁদের নীচে ধুলোর রাস্তায় ননীবালার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকি। ননীবালা অপেক্ষা করে না। চলে যায়। উধাও হয়ে যায়। হতবম্ব হয়ে বসে থাকি। ননীবালারা চলে গেছে রূপ নিয়ে বহুদূরে। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা্‌ কিছুই আটকাতে পারে নি। স্থানচ্যুত একটা সত্তা স্থানে উন্নীত হতে চলে গেছে। আপন সাধনার কথা গোপন রাখতে চলে গেছে মন নিয়ে অনেকদুর। দুনিয়ার কোনোকিছুই সে বাঁধতে পারে নি। তাই সে বেঁধেছে কয়েকটা গান। শব্দকে সে আয়ত্ত্বে এনে বেঁধে ফেলেছে পঙক্তিতে। আর এই বহু বহু বছর পর বেঁধেছে সে অন্য একজনের মনোযোগ।  ভাষার ভিতর গুপ্ত কুঠুরি তৈরি করে ভাব ভরে দরজা  আটকে দিয়ে  তুমি চলে যাচ্ছ ননীবালা? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না। নিঃশব্দ কিভাবে শব্দকে খায়? আপনারে আপনি তুমি কিভাবে হয় সাবধান? দৈব হাসিতে ভরে যায় তার মুখের প্রতিটি রেখা। তুমি যে গান গাও তাতে কে কার সিগনিফায়ার বলে যাও! মরিয়া চিৎকার করি। তার মুখে তাচ্ছিল্যের বিভ্রান্ত হাসি, রাখো তোমার কেতাবি বিদ্যে! তন্দ্রার ভিতর ধীরে ধীরে কাউকে চলে যেতে দেখি দূরে মাটির রাস্তায়, একাকী, সংযমী পদক্ষেপে, আত্মস্থ কারুণ্যে।

ননীবালার একান্তে চলে যাওয়ার দিকে চন্দ্রাহত আমি দাঁড়িয়ে থাকি, হাতে শুকনো বইয়ের পাতা খস খস করে। বুকের ভিতর শুকনো পাতা খস খস করে, মাথার ভিতর শুকনো পাতা উড়ে যায়। ননীবালা শব্দকে, ধ্বনিকে বাঁধার গুপ্ত বিদ্যা জানে। ননীবালা শব্দকে দেহ দিয়ে জেনেছে। দেহের ভিতরের শূন্যতা আর স্রোত দিয়ে জেনেছে, শব্দকে সে এমবডি করেছে। আর আমি করেছি মুখস্থ! তাকে আমি খুলে বলি মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা, কি কি সে অতিক্রম করতে পারে না, সেই সীমায় আটকে থাকায় চলচ্ছ্বক্তিহীন কারো নাগালে কিভাবে ধরা দেবে দুনিয়াদারীর গহন ঘনীভূত নৈঃশব্দ। তাই নদীর পাড়ে বসে জল পিপাসায় মরে যায় কত লোক। পান করার বিদ্যা রপ্ত নেই বলে, আরাধ্যকে ভোগরাগের তরিকা জানা নেই বলে। ননীবালা এইসব জেনে চলে গেছে  মায়ামৃগ হয়ে নির্বাণের সন্ধানে। পথবৈরাগী ননীবালার অজানিত নেই সামাজিক জীবনের নিস্ফলতা, নিরর্থকতা। মোহ কিম্বা আসক্তি তাকে আটকাতে পারে নি। তাই সে আপন রাস্তা দেখেছে। আর তাকে দেখেছে বহু লোক।

 

Sunday, June 22, 2025

 

           অনুগল্প ডজন চারেক : প্রতিদিনের ঘটনার অন্তর্লগ্ন দর্শন থেকে সূক্ষ্মতার আঘাত

                                          মধুপর্ণা কর্মকার 


আমাদের হস্টেল শ্রীসদনে সহ-আবাসিকা ভূগোল বিভাগের ছাত্রীরা থাকতেন, স্নাতক স্তরে পড়ার সময় তাদের কাছে ভূগোল বিভাগের একটি পত্রিকায় ‘চীনের স্টোন ফরেস্ট’ বিষয়ে একটি লেখা পড়েছিলাম সঙ্গে ছবি, সেই প্রথম আমার অধ্যাপক মলয় মুখোপাধায়ের লেখার সঙ্গে পরিচয়। পরবর্তীতে ‘জীবন কথার নদী’ এবং ‘নৈঃশব্দের ভূগোল’ বই দুটি পড়েছি। আমি মলয়দার সরাসরি ছাত্র নই, বিশ্বভারতীর ভাষাভবনের ভাষা-সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু জ্ঞানচর্চার ইন্টারডিসিপ্লিনারী চরিত্র সমকালীন/পূর্ববর্তী চিন্তাবিদদের কাজের প্রতি আকর্ষণ অনিবার্য করে তোলে। সেইসুত্রে এখানে কয়েকটা কথা বলবার -

একজন বিজ্ঞানী, একজন ভূগোলবিদ যখন সাহিত্য তৈরি করেন, ন্যারেটিভ তৈরি করেন তার কিছু বৈশিষ্ট্য পাঠক হিসাবে লক্ষ্য করেছি। অভিজ্ঞতা যখন গল্প, ভ্রমণকথা, স্মৃতিকথায় উঠে আসে তখন অ্যাকাডেমিক সিটজেনশিপের ভিতরে একটি ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়। যখন একজন বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ একজন গবেষক, যিনি পেশাসূত্রে নিস্পৃহ, উদাসীন থাকতে বাধ্য হন, তিনি যখন ক্রিয়েটরের ভুমিকায় আসে্ন, তিনি যখন গল্প বলেন আমাদের কাছে বহুমাত্রিক বাস্তব প্রকট হয়। জ্ঞান নির্মাণের স্বীকৃত এবং প্রচলিত নিয়মের বাইরে অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা থেকে যে গল্প তৈরি হয়, আমাদের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, সাফারিং তার সংগে সেলফ এক্সপ্রেশন এবং সৃষ্টির আন্তঃসম্পর্ক, তার যে ব্যাতিক্রমী বৈশিষ্ট্য পাঠক হিসাবে আমাকে অভিভূত করে। ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা চিন্তাকে জটিলায়িত করার অদ্ভুত কিছু সূত্র অধ্যাপক মলয়দার লেখা থেকে আহরণ করতে পেরেছি -এইভাবে সংবেদনশীল লেখক, বিজ্ঞানীরা পরবর্তী প্রজন্মের মানসজগতকে আকার দেন, সমৃদ্ধ করেন, সময়ের সিঁড়িতে কয়েকধাপ এগিয়ে দেন।

বর্তমান পুঁজিকেন্দ্রিক বস্তুবিশ্বে এক প্রজন্মের গবেষক, লেখক, গল্পকার পরবর্তীর প্রজন্মের পাঠক গবেষকদের কি দিয়ে যাবেন? পূর্ববর্তী বিজ্ঞানী লেখক দিয়ে যান একটা দৃষ্টিভঙ্গি, একটি জানলা যেখান দিয়ে পরিচিত পৃথিবীকে ভিন্ন ভাবে দেখা যায়, দিয়ে যান একটি দাঁড়ানোর তাত্ত্বিক তল যাকে আমরা পারিভাষিক ভাবে বলি স্ট্যান্ড পয়েন্ট - পয়েন্ট অব ভিউ, দিয়ে যান কিছু লেন্স যা দিয়ে এই ভ্রান্ত পরিবেশচেতনা, সামাজিক- অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ দিয়ে তৈরি যে নিকট বাস্তব তার ভিতরের তন্তুবিন্যাস গুলো স্পষ্ট দেখা যায়। অন্দরের দর্শন স্পষ্ট হয়ে যায়। একবারে ভিন্ন বিষয়ের ছাত্র এবং গবেষক হওয়ার পরও অধ্যাপক মলয়দার বইগুলি থেকে আমি পেয়েছি একটি লেন্স, একটি আলাদা জানলা যেখান থেকে আমাদের পরিচিত ‘সাধারণ’ পৃথিবীকে অন্যরকম দেখায়। পার্সপেক্টিভ, দৃষ্টিভঙ্গি যা আমাদের পূর্ববর্তী চিন্তাবিদরা আমাদের দিয়ে যান, দৃষ্টিভঙ্গির উত্তরাধিকার আমাদের চিন্তন প্রক্রিয়ায় গাঢ় প্রভাব ফেলে।

‘জীবন কথার নদী’ উপন্যাসে লেখক নদী ও নারীকে সমান্তরালে রেখেছেন, উপরিতলে গল্প রয়েছে কিন্তু তার ভিতরে অন্তঃশীলা নদীর মত বয়ে যাচ্ছে আরেকটি ধারা সেটি ইকো ফেমিনিজম, প্রকৃতিকেন্দ্রিক নারীবাদ। আমার মনে হয় আমাদের আইডিয়া, সামষ্ঠিক চিন্তন প্রক্রিয়াটিও বহমান নদীর মত। হাত বদলে হাত বদলে এগিয়ে যায়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের লেখকদের, চিন্তাবিদদের একটি স্রোত বয়ে যায়। এই ডিজিটাল সভ্যতায় যেখানে আমাদের অনুভূতির স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড, সেখানে সাবেকি স্টোরি টেলিং, ন্যারেটিভ মেকিং, গল্প তৈরি, গল্প বলা এবং গল্প শোনার, গল্পের খাতিরে একত্রিত হবার এই ঐতিহ্য এই সময়ের বিচিত্র বিশৃঙ্খলার ভিতরে পাঠক হিসাবে আমার কাছে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

স্টোরি টেলিং এর আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মান কেউ কেউ সেখানে তার অনুভূতির জগৎ যতবেশি সূক্ষ্ম এবং তীব্র হতে থাকে তার গল্পের ধার ‘সহৃদয়হৃদয় সংবাদী’ পাঠকের অন্তঃস্থলকে আঘাত করে তত সূক্ষ্ম ভাবে। লেখা হচ্ছে, ‘Scientifically, the reason well-told stories are so impactful is that the act of listening lights up same parts of the brain that would activate if living the story in real time. Stories are also an unmatched learning tool’১. একজন স্টোরিটেলারের যে সৃষ্টিশীলতা তার মধ্যে রয়েছে unique perspective. গল্প শুধুমাত্র বিনোদন, আবেগ মোক্ষণ নয়, গল্প আসলে হতে পারে নলেজ এক্সচেঞ্জের একটা মুদ্রা বা কারেন্সি। পেশোয়ারের ‘কিসসাবাজার’কে মনে করা হয় সাউথ এশিয়ার সভ্যতার আদিতম গল্পের বাজার যেখানে মানুষেরা গল্প শুনতে যেতেন, সেখানে কিসসাবাজেরা  তাঁদের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং জীবনের যে সংকট গুলো,পাজল গুলো তারা সলভ করে ফেলেছেন তার গল্প শোনাতেন, গল্পের মধ্যে পুরে দিতেন এই জীবনের উত্তাল সমুদ্রকে কিভাবে নেভিগেট করতে হয়, বৈচিত্র্যকে কিভাবে অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত করতে হয় তার সুত্র। গল্পবাজেরা/ স্টোরিটেলাররা  এক একজন সান্তিয়াগো যারা পাঠককে তথ্য এবং উপলব্ধির নির্যাস দিয়ে জীবন শেখান, বাঁচতে শেখান। গল্প বলার, গল্প শোনার শৌখিনতার থেকেও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। গভীর জীবনবোধে অন্বিত হয়ে বাঁচার উপাদান সংগ্রহ করতে হয় আমাদের, দর্শনের হাত ধরতে হয়। পরিবারে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের থেকে ছোটদের গল্প শোনার  অবকাশ নিউক্লিয়ার পরিবারে নেই, আমাদের কারোর জন্য কারো পর্যাপ্ত সময় নেই ব্যস্ততার নিদারুণ ক্রুর অজুহাতে, জীবন বিবিক্ত এই ‘নাগরিক, উন্নত’ বাঁচায় গল্প আমাদের একটা করে জানলা খুলে দেয়, কিছু খোলা হাওয়া ভিতরে আসে।

‘অনুগল্প ডজন চারেক’ প্রকাশিত হয় ২১ শে মে, ২০২৫। বই ঘর পাবলিশার্শ শান্তিনিকেতন, প্রকাশক জয়ন্ত চক্রবর্তী। প্রচ্ছদ করেছেন অরুনেন্দু মুখোপাধ্যায়। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁদের ‘যাঁরা আশেপাশের নানান ঘটনা থেকে জীবন দর্শন তৈরির রসদ খোঁজেন’। এখানে উল্লেখ্য বইটির প্রতিটা গল্পে রয়েছে আমাদের সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসা দর্শন। প্রতিদিনের ‘তুচ্ছ’ ঘটনা, আমাদের দৈনন্দিনের কথা, সংলাপ যা আপাতদৃষ্টিতে খুব ‘সাধারণ’ মনে হয়, কিন্তু লেখক এই সবকিছুকে দেখেন কিছুটা দূর থেকে যেমন একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টিকে দূর থেকে দেখে বুঝতে পারেন পারিপার্শ্বের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য। এই বৃহৎ আকাশের নীচে মানুষের পৃথিবীতে ঘটে চলা কোনো ঘটনাই তুচ্ছ নয়, উচ্চারিত কোনো কথাই আকস্মিক নয়। প্রতিটি ঘটনার পটভূমি আছে, প্রতিটি কথা একটি ভাষিক মহাস্রোতের অংশ। লেখক তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে, গভীরতা দিয়ে দেখতে পান সেই যবনিকার ভিতরের কাহিনী গুলো তাতে ‘তুচ্ছ’, ‘সাধারণ’ ঘটনা, কথা ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠে। যাঁরা বাঁচেন প্রচলিত আত্মহারা স্রোতের অনেকটা গভীরে তাঁদের কাছে মানুষের পৃথিবী ধরা দেয় ভিন্ন মাত্রায়, যেখানে “অনুভূতির ঢেউরা অতি আধুনিক জীবনচর্চায় ধাক্কায় ভেঙ্গে না গিয়ে আরো নরম ঢেউ তৈরি’ হয় (সূচনাংশ – মলয় মুখোপাধ্যায়) তিনি আরো লিখছেন, ‘ইদানীংকালের সংখ্যা সাজানো জীবনচর্চাতে অনুভুতিরা পিছনের সারিতে গিয়ে বসেছে।… গতিময় জীবনবোধ নরম মনের আবদারদের ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয় না” প্রতিদিনের ঘটনা আর কথার সমুদ্র থেকে লেখক খুঁজে নেন সূত্র যা একটা দর্শন দিয়ে একটা সময়কে অতীত আর ভবিষ্যতের সঙ্গে বেঁধে দেয়। তিনি  চেয়ছেন গল্পগুলির মধ্যে ‘অনুচ্চারিত জীবনদর্শনের’ অনুরণনে অনুরণিত হোক পাঠক।

 তিনি গল্পগুলি আটটি সাবথিমে ভাগ করেছেন, মানবিকতার মোড়কে, বোধ কাজ করে, জীবন জীবিকা, সমাজ চিত্রের ক্যানভাসে, শিশুমনের হদিশ, আর্থ-সামাজিক উঠোনে, চলো নিয়ম মতে, পর্যটনের এপাশ-ওপাশ।  মোট ৪৮ টি অনুগল্প এখানে সংকলিত হয়েছে। প্রতিদিনের যাপিত জীবনের মলিনতার ভিতর, দৈনন্দিনের দৈন্যের ভিতর, মানুষের রিপু তাড়িত জীবনের ভিতর, চালাকিতে শঠতায় বস্তুবিশ্বে জিতে যাবার চূড়ান্ত পরাজয়ের ভিতর লেখক দেখেছেন কিভাবে সামাজিক সত্তার বাইরে এখনও মানুষ মহাকালের সন্তান, দেখেছেন অস্তিত্ত্ববোধের ভঙ্গুর ভয়াবহতা। সামাজিক- অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বুনটে গাঁথা আমাদের বাস্তবতা কিভাবে আমাদের মানবিক অবস্থান থেকে পদস্খালন ঘটায়, কিভাবে ধূর্ততায়, ক্রুরতায় পলায়নবাদী সামাজিক মানুষ খোঁজে আশ্রয়, কিভাবে প্রকৃতি বিযুক্ত মানুষ, বিষাক্ত সভ্যতায় নিজেকে অন্বিত করে উত্তরণের ভাণ করে প্রতিদিনের রমরমা বজায় রাখে যেখানে “অনুভূতিরা গিয়ে বসে পিছনের সারিতে” লেখক জানেন পালিয়ে যাবার কোনো জায়গা নেই, সভ্যতার অসুখ তার জন্য কোনো নিরাপদ মানবিক আশ্রয় মজুদ রাখেনি। ব্যক্তিকে ফিরতে হবে অনুভূতির সূক্ষ্মতায়, ফিরতে হবে আত্মশুদ্ধিতে, প্রতিদিনের মমত্বের অনুশীলনে, ভিতরের মনুষ্যরাক্ষসকে আহুতি দিয়ে ফিরতে হবে আনন্দে, পারস্পরিক ভালোবাসায়, ফিরতে হবে প্রকৃতির ভিতর সম্পূর্ণ সমর্পণে, ফিরতে হবে অনন্তের সন্তানদের অনন্তের কাছে।

প্রতিটি অনুগল্প এক একটা বিদ্যুতের ঝলকের মত। স্বল্প পরিসরে ক্ষণিকের তীব্র দ্যোতনা দিয়ে যায়। মূলত সমাজ জিজ্ঞাসা প্রাধান্য পেয়েছে গল্পগুলিতে। প্রথম গল্প ‘সৌজন্যতায় আছি’তে রয়েছে প্রৌঢ পুরুষের একাকিত্ব আর সৌজন্যের অন্তঃসারশূন্যতা, সামাজিকতার আলগা বাঁধন যেখানে সৌজন্যের বাইরে কেউ কাউকে নিয়ে ভাবিত নয়। অথচ বাইরে একটি প্রলেপ ভিতরে সহমর্মিতার তুমুল অনটন। ‘যাচাইটুকু’ গল্পে দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসের দৈন্য যেখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিতে হয় অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য হবার জন্য। ‘মানবিকতার মোড়কে’ – এই বিষয়ের গল্প গুলির মধ্যে মূলত স্থান পেয়েছে সামাজিকতার ভিতরে ঘূণ ধরে যাওয়া আন্তঃসম্পর্ক যেখানে বাহ্যিক মুখোসের ভিতর ব্যক্তির রিপুতাড়িত, আত্মরতিময়, বিকৃত এবং বিক্রীত সত্ত্বা খুব সহজে বেরিয়ে আসে – গৃহকর্তা সন্দেহ করে কাজের মাসিকে, প্রতিষ্ঠিত বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানের মালিক বন্ধুর অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্বন্ধ পাঠককে বিচলিত করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের শীতলতা জানে ঘরের সিলিং ফ্যানটি, আজীবন স্ত্রীর কাছে অপঠিত থেকে যাবার আক্ষেপে চোখ জলে ভরে যায় সুবলবাবুর। একমাত্র একাকীত্বের যন্ত্রণার ভিতর তিনি নিজেকে খুঁজে পান।

‘বিপদতারণের মা’ গল্পে মাকালীর গয়না হারিয়ে যাওয়ায় সকলের আত্মম্ভরী শোক, দুঃখের ভিতর বিপদতারণের মা বুঝতে পারে ‘সোনার ফাঁস’ থেকে মার মুক্তি পাবার কথা। ‘অন্য কারো মতো’ গল্পে প্রেমিক প্রবীর প্রমিকা সেবন্তীকে তুলনা করে ‘সানলাইট’ বিজ্ঞাপনের মেয়েটির সঙ্গে। ‘শেষ পোড়ানোটা’ গল্পে দেখা যায় তিরিশ বছর আগে ডিভোর্স হয়ে যাওয়া স্ত্রী  মৃত স্বামীকে পোড়ানোর খরচ স্বামীর নতুন স্ত্রীর হাতে দিতে রাজী নন যদিও মৃত স্বামীকে দেখার ইচ্ছে তার আজীবনের মত মরে গেছে। ‘জীবন জীবিকা’ অংশে ‘জীবিকা যখন’ গল্পে দেখা যায় ট্রেনের হকার শঙ্করের ‘কমপ্লিট থ্রোট রেস্ট’ প্রেসক্রাইব করে ডাক্তার কিন্তু ইশারায় তো জীবিকা তার চলবে না। ‘আলাপচারিতার ওপাশটাতে’ গল্পে লেখকের শান্তিনিকেতনের ‘ছাউনি’ বাড়িতে টোটো করে অনুষ্ঠানের চেয়ার দিতে এসে কেতাবুদ্দিন মিঞা বলে যান স্কুলে তিনি যান নি কিন্তু ‘জীবনটাতো  নকল করার ইস্কুল বটে’।

‘জীবন দেখতে’ গল্পে একজন রিকশাওয়ালা আব-দা বলে যান ‘স্যার, পৃথিবীতে সব মানুষই তার চেনাজানার গন্ডীকে বাড়তে চায়। সকলের মধ্যে নিজেকে আলাদা ভাবতে মানুষ ভালবাসে… আমাদের এই মস্ত পৃথিবীটাতে মাত্র কয়েক বছরের জন্য আসা… সবটাই তো মনের সঙ্গে লড়াই’।

‘সমাজচিত্রের ক্যানভাসে’ পর্বের গল্প ‘হ্যালোজেনের আলোটার বাইরে’ গল্পটি পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। এখানে নারায়ণ সর্দারের নাতি পাড়ার বৃন্দাবন মন্ডলের মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রিত নয়, সে ফেলে দেওয়া পাতা থেকে খাবার কুড়িয়ে নেবার জন্য দাদুর হাত ধরে বিয়ে বাড়ির দিকে দ্রুত যেতে চায় কারণ কুকুরদের সঙ্গে লড়াই করে তাক খাবার সংগ্রহ করতে হবে, এই লড়াই সহজ নয়। সামাজিক মর্যাদা, সম্পদের সুষম বন্টনের লড়াই কত যোজন দূর? যেখানে একটি বাচ্চাকে এঁটো খাবারের জন্য লড়াই করতে হয় রাস্তার কুকুরের সঙ্গে!

‘ভাসিয়ে দিয়ে গেলে’ গল্পে দেখা যাচ্ছে স্বামী মারা যাবার পর শোক সভায় কে কোন শাড়ি পড়বে, কোন শাড়ির সাথে কোন ব্লাউজ ম্যাচ করবে এই নিয়ে ‘সুপ্ত আলোচনা’। ‘মায়ের শাড়ি হবে শোক মানানসই জরি পাড়। সাদাটে হালকা রঙের প্যাণ্ডেল’। এই শ্লেষ মানুষের সম্পর্ক আর তার তলানিতে চলে যাওয়ার দৈন্যকে নগ্ন করে দেয়। আভিজাত্য, অর্থসংগতির সঙ্গে শোক, দুঃখ পাল্লা দিয়ে সমান্তরালে যেতে পারে না, এখানে খেয়াল রাখতে হয়, ‘অর্থের সঙ্গে রুচির প্রকাশ ও যেন হয়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে’।(পৃ -৪৪) ‘লটারীর টিকিট’ গল্পে যখন লেখক লেখেন, ‘সফল জীবনের তৃপ্তির স্বাদটাই আলাদা। ভরাট হয়ে যায় মন।যারা পেয়েছেন তাদের আর আলাদা করে বোঝাতে হয় না’ … এই সমাজবিক্ষণের সূক্ষ্মতা অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়কে ভিন্ন ভাবে চেনায়, তিনি দেখান জীবন আসলে একটা লটারীর টিকিট। জীবনে সাফল্যও একটা একটা লটারীর টিকিটের মত, বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে যাবার মত। বিদ্যমান ক্ষমতা সম্পর্কের এই পাশা খেলায় কেউ কেউ জেতে। ‘কোন আলোকে বাসস্থান’ গল্পে দেখা যাচ্ছে মেট্রোপলিটন সিটির যান্ত্রিক কংক্রীটের অরণ্যে আভিজাত্যের নিরাপদ মোড়কে জীবন-জীবন খেলা, যেখানে পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে সেটাও স্পষ্ট নয়। এই নাগরিক অ্যাননিমিটি, গাঢ অপরিচিতি, বিচ্ছিন্নতার মহামারী, ছিন্নমূল বাঁচার শ্লাঘা অথবা ক্লেদ, সোপিসের মত গোছানো- সাজানো অথচ প্রাণহীন জড়ত্বের নির্মম বিস্তার, অনির্দিষ্ট টানে, তাগিদে কর্পোরেট লাইফ স্টাইল -সেখানে লেখক ভাবেন –‘সত্যিই আমরা সমাজবদ্ধ জীব। আধুনিকতার ঘেরাটোপে নিজের কাছেই নিজে বন্দী হয়ে যাচ্ছি… এখানে আমি আর নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছি না”। ‘গনতন্ত্রের ওধারটাতে’ গল্পে তিনি লিখছেন, ‘গনতন্ত্র বজায় রাখতে গিয়ে অনেক সম্পর্কই নষ্ট হয়ে যায়… কদিনের জীবনে আত্মীয় আর বন্ধুর সংখ্যা বাড়িয়ে নাও’।

আমার সব থেকে পড়তে ভাল লেগেছে, বলা ভাল বারবার পড়েছি ‘শিশুমনের হদিশ’ অংশে যে গল্প গুলি রয়েছে।‘ছোটরাও যে শেখায়’ গল্পে দেখা যাচ্ছে এক সরলমতি শিশু পরীক্ষার খাতায় অঙ্ক কষার বদলে এঁকে এসেছে ফুল, বাড়ি, নদী, নদীতে নৌকো এঁকে আসে, কারণ গতরাত্রে মায়ের করানো অঙ্ক গুলোই পরীক্ষায় এসে যাওয়ায় একই অংক সে আবার করতে চায় নি। মা সংযুক্তা তাকে বকার বদলে বলেন, “ঠিক করেছিস। মন যা চাইবে তাই করবি জীবনে।সারাটা জীবন আমি যা পারিনি”। এই বড়রা বিশেষত মেয়েরা, গৃহিণীরা যা চান তা করার ইচ্ছা, পরিসর, সাহস হারিয়ে ফেলেন।তাদের চলতে হয় ‘নিয়ম মতে’। শিশুকন্যা সংযুক্তা বড়দের পৃথিবীর এইসব নিয়ম, বাধা বিপত্তিতে এখনও অভ্যস্ত হয়নি, সে নিজের খেয়ালে পরীক্ষার খাতায় যা ইচ্ছে এঁকে এসেছে। শিক্ষা, পরিবার, সমাজ আমাদের নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য একে একে মেরে ফেলে আমাদের বানিয়ে তোলে নিয়মনিষ্ঠ, ‘তাসের দেশ’ এর হরতন, চিড়েতন, ইস্কাবন।

‘কি বলছো মা’, ‘চুপ থাকাতে’ গল্প গুলিতে রয়েছে কিভাবে শিক্ষার নামে মা বাবারা অসুস্থ প্রতিযোগীতা্র দিকে শিশুদের ঠেলে দিচ্ছেন, শিশুদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন একে অপরের বিরুদ্ধে। একে একে সভ্যতার বিষ শিক্ষার মোড়কে, ধর্মের মোড়কে শিশুদের ভিতরে অল্প অল্প করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা আমাদের ‘যোগ্য উত্তরসূরী’ হয়ে উঠে বিভেদে, প্রতিযোগীতায় আত্মহারা পৃথিবীকে সরগরম রাখতে পারে।

“ আর্থ-সামাজিক উঠোনে” অংশে ‘দখলদার’ গল্পে অনিমার সুটকেসে গ্রামের বাড়িতে ‘আমেরিকার গল্প বিক্রী করে’ ফিরে এলে গ্রাম বাস্তুভিটে থেকে একটি  সাপ তার সঙ্গে চলে আসে আমেরিকার বস্টনের ঝকঝকে সুখের সংসারে, যেন মুর্তমান ‘বিষয় বাসনা বিষ’। ‘সম্পর্ক হরেক’ গল্পে চ্যাটার্জিদের বড় পরিবারে আমন্ত্রিতদের ‘ওজন’ নির্ধারণ করেন নববধূ কে কত দামী গিফট দিয়েছে তার ভিত্তিতে। ‘বিয়ের কার্ডে পদবি যখন’ গল্পে দেখা যাচ্ছে হরিহর চ্যাটার্জী ব্রাহ্মণ্যবাদের বিষ থেকে নিজেকে আর  শিক্ষিতা মেয়ে শতরূপাকে মুক্ত করতে পেরেছেন, ‘চ্যাটার্জী’ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে যখন কুণাল ‘কর্মকার’এর বিয়ে নিয়ে এলাকায় যেসব কথা ওঠে তিনি সামলে নেন যদিও ‘আবছা করে রটিয়ে রাখা হ’ল কর্মকার হ’ল কুণালদের পাওয়া পদবী, আসলে কুণালরাও ব্রাহ্মণ’।

‘চলো নিয়ম মতে’ অংশের ‘লাফিং ক্লাবের সদস্যপদ’ গল্পে ক্লাবের  কর্ণধার দুই প্রাণবন্ত নারীকে বেখাপ্পা, বিশৃংখল হাসি পছন্দ করেন না, তিনি স্রেফ জানিয়ে দেন, “আপনাদের ফর্ম দেওয়া হবে না। সব কিছুর একটা ডিসিপ্লিন আছে। হাসিরও একটা নিয়ম আছে, একটা সিস্টেমে হাসতে হয়। তবে শরীর ভালো থাকে। হ্যা হ্যা করে যখন তখন হাসলেই তো হল না”। নারীদ্বয় ভাবতে থাকেন, “এই যে আমরা সকলকে নিয়ে এতো হাসুখুশি থাকি, সেটা কি তাহলে সিস্টেমের বাইরে”!

‘মোবাইলের হাত ধরে’ গল্পে দাম্পত্য কলহে অতিষ্ঠ দীপঙ্কর আর সুস্মিতা সঙ্গী বদলের অ্যাপে ‘অদ্ভুত স্বয়ম্বর সভায়’ রূপ, রুচি, আর্থিক সামর্থ্য মিলিয়ে সঙ্গী খুঁজতে গিয়ে দেখেন সবকিছু কিছুতেই মিলছে না, তাই সকালে ফের তাঁরা এক টেবিলে একসঙ্গে চায়ে চুমুক দিয়ে স্বস্তির নিস্বাস ফেলেন। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় সমাজ, পরিবার, দাম্পত্য, মানুষের অন্তর্জীবন দেখেছেন মমতায়, রসিকতায়। সামাজিক মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসহায়তা তাঁকে আন্দোলিত করেছে নানান তন্ত্রীতে যার ছাপ প্রতিটা গল্পে।

‘পর্যটনের এপাশ-ওপাশ’ পর্বের গল্পে বাঙালী ঘুরতে গিয়ে কি ধরনের বিড়ম্বনা বাঁধায় তার দুর্দান্ত প্রতিফলন। অনন্তবাবু পরিবার সমেত উত্তর ভারত ঘুরতে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ায় মত্ত থাকলেন, বিষয় – কার জন্য এতগুলো লাগেজ হল! তাঁরাও উত্তরভারতের ঐতিহাসিক জায়গা তার ইতিহাস প্রায় কিছুই দেখলেন না, তাঁদের সন্তানরাও কিছুই দেখতে পেল না। অন্য গল্পে প্রকাশক সংস্থার কর্ণধার বেড়াতে গিয়ে একটা কালো ট্রাঙ্ক নিয়ে যান কাজ গুলো হোটেলে সেরে রাখবেন বলে। আরেক গল্পে আন্দামান ঘুরতে গিয়ে দুটি মেয়ে শপিং করতে না পেরে মুষড়ে পড়ে, তারা মনে করে আন্দামান নিকোবর ঘোরার জন্য জায়গা সিলেকশেনটা ঠিক হয় নি। শেষ গল্প ‘পর্যটকের হরেক রং’ এ হুড্রু জলপ্রপাত দেখতে গিয়ে ‘তেলেভাজার দোকানে’ আটকে যায় পর্যটকদের মন, সময় তাদের আগ্রহের একেবারে বাইরে চলে যায় জলপ্রপাত আর তার সৌন্দর্য।

এই চার ডজন গল্পের মধ্যে রয়েছে গভীর সমাজ দর্শন, সূক্ষ্ম সমাজবীক্ষণ, অনুভুতির তীব্র স্ফূরণ। ছোট ছোট ঘটনা একটি তীব্র রেশ রেখে যায়। কয়েকটি গল্পের রম্য বৈশিষ্ট্য অভিভূত হবার মত। খুব স্বল্প পরিসরে পাঠককে চমকে দিয়ে যায় আর একটি বার্তা সামাজিক-মনকে ধাক্কা দিয়ে কোথাও একটা ফিরতে বলে, ফিরতে বলে মানবিক সত্ত্বায়, বোধে। এই নতুন বইটি আবশ্যিক ভাবে পাঠকের মননের খাদ্য জোগাবে। তবে কয়েকটি গল্পের আরো তীব্র হওয়ার, বুনন আরো জমাট হওযার সম্ভবনা ছিল বলে মনে হয়েছে।  মলয়দার ন্যারেটিভ মেকিং বা স্টোরি টেলিং এর নিপুণতার সংগে আমি পরিচিত উপন্যাস এবং ভ্রমণকথা পাঠের সূত্রে, যেখানে গদ্যের পরিধিটা বড় ছিল।  অনুগল্প খুব স্বল্প পরিসরে বিস্তৃতির দ্যোতনা দেয়, অনুগল্পে বিস্তৃতি কম, গভীরতা বেশি। একজন লেখকের ক্ষমতার, সূক্ষ্মতার প্রতিনিধিত্ব করে অনুগল্প, যেখানে এ্কটিও বার্তি শব্দ ব্যবহারের সুযোগ নেই, যতিচিহ্ন পর্যন্ত প্রকান্ড অর্থ বহন করে। এই বইটির মধ্যে প্রতিটা গল্প এক একটি বার্তা, একটি রেশ। একজন অনুগল্পকার বুননের সূক্ষ্মতা দিয়ে তীব্র ভাবে পাঠককে আঘাত করতে সক্ষম, এখন প্রশ্ন হচ্ছে পাঠক হিসাবে আমরা কি পর্যাপ্ত আহত হতে সক্ষম?

 

১। Learn the art of storytelling to tell stories that matter, Acuman Academy Blog. https://blog.acumenacademy.org/art-of-storytelling-tell-stories-that-matter?utm_source=bing&utm_medium=&utm_campaign=&utm_term=skills%20to%20improve%20storytelling&hsa


                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...