Tuesday, February 17, 2026

 

 

                                          যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে 

                                                 মধুপর্ণা

‘স্থানচ্যুত তুমি হও স্থানে উন্নীত’, ‘যখন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে’, ‘আপন সাধন কথা না কহিও যথা তথা’,  শব্দবন্ধ গুলো ঘুরপাক খায়। এইসব ফাল্গুনের নির্জন সন্ধ্যায় কতকগুলো বই পড়ে বিগড়ে যায় সামাজিক সত্তা। মস্তিস্ক ভরে যায় শতাব্দী প্রাচীন শ্লোকে, কথায়, শব্দের আঘাতে। কথা বেঁধে গেছে ফকির, দরবেশ, বাউল। সেই কথারা আছড়ে পড়ে, আচ্ছন্ন করে দেয়। ননীবালার কথা চিন্তা করি, মলিন তার বেশ, রুক্ষ অঙ্গে সাধনার নির্জনতা। গুরুকে পাড়ে পৌঁছে দিতে স্বয়ং নৌকা হয়ে সমাজ, সংসার ছেড়ে এসেছিলেন ননীবালা। বাউলসাধকটির শুদ্ধ মনন সে অনন্তলতার মত অবলম্বন করেছিল নিবিড় সংরাগে। ‘আনখা মেয়েছেলে’ থেকে অধিষ্ঠিত হয়েছিল আশ্রমজননীতে। মায়াকীর্ণ হট্টগোল থেকে ননীবালা, মিনতি,সাধনারা সমাজ থেকে চলে গেছে গভীর নির্জন পথে হেঁটে বহুদূর যাবে বলে। কতদূর তারা হেঁটেছিল আমি জানি না, মানুষ মনে মনে বহুদূর চলে যায়, বাইরে তাকে দেখে বোঝা যায় না। গভীর নির্জন পথ বেয়ে, নদী পেরিয়ে, সমাজ পেরিয়ে, দোকানপাট পেরিয়ে, নিয়ম পেরিয়ে, প্রত্যাশা আকাঙ্ক্ষা পেরিয়ে  চলে যায়। তাদের আর ফেরানো যায় না জনপদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। সমস্ত পরিচিতি ত্যাগ করে  সে গায়ে জড়ায় কথার বসন, নৈঃশব্দে রাঙা, অভিজ্ঞতার কারুকার্য তাতে। একান্ত অন্তর্লোকের সেই গুহ্য যাত্রায় ননীবালা্রা একাকী, নিঃসঙ্গ, পূর্ণ, একক। ঘুম পেয়ে যায়, বইপত্রের ভিতরে ঘুমিয়ে পড়ি, তারপর অস্পষ্ট ননীবালা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্বিকার মুখে তার যন্ত্রণার আবছা দাগ, ধুলোয় ধুলোময় তার মলিন অবয়ব, আর উজ্জ্বল তার চোখ, উজ্জ্বলতার ভয় আমার আজন্মের তাই তাকাতে পারি না। ননীবালার মুখে অনুভুতি ছটফট করে না, স্থির। লোকালয় ছেড়ে ঘর গৃহস্থালী ছেড়ে চলে গেলে মানুষ এইরকম স্থির হয়ে যায়। সমাহিত আর স্নিগ্ধ হয়ে যায়। স্থৈর্য এসে ঝাপটা মারে, বিক্ষত করে দেয় না, ধাক্কা দেয়। আকাশে মানানসই চাঁদের নীচে ধুলোর রাস্তায় ননীবালার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকি। ননীবালা অপেক্ষা করে না। চলে যায়। উধাও হয়ে যায়। হতবম্ব হয়ে বসে থাকি। ননীবালারা চলে গেছে রূপ নিয়ে বহুদূরে। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা্‌ কিছুই আটকাতে পারে নি। স্থানচ্যুত একটা সত্তা স্থানে উন্নীত হতে চলে গেছে। আপন সাধনার কথা গোপন রাখতে চলে গেছে মন নিয়ে অনেকদুর। দুনিয়ার কোনোকিছুই সে বাঁধতে পারে নি। তাই সে বেঁধেছে কয়েকটা গান। শব্দকে সে আয়ত্ত্বে এনে বেঁধে ফেলেছে পঙক্তিতে। আর এই বহু বহু বছর পর বেঁধেছে সে অন্য একজনের মনোযোগ।  ভাষার ভিতর গুপ্ত কুঠুরি তৈরি করে ভাব ভরে দরজা  আটকে দিয়ে  তুমি চলে যাচ্ছ ননীবালা? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না। নিঃশব্দ কিভাবে শব্দকে খায়? আপনারে আপনি তুমি কিভাবে হয় সাবধান? দৈব হাসিতে ভরে যায় তার মুখের প্রতিটি রেখা। তুমি যে গান গাও তাতে কে কার সিগনিফায়ার বলে যাও! মরিয়া চিৎকার করি। তার মুখে তাচ্ছিল্যের বিভ্রান্ত হাসি, রাখো তোমার কেতাবি বিদ্যে! তন্দ্রার ভিতর ধীরে ধীরে কাউকে চলে যেতে দেখি দূরে মাটির রাস্তায়, একাকী, সংযমী পদক্ষেপে, আত্মস্থ কারুণ্যে।

ননীবালার একান্তে চলে যাওয়ার দিকে চন্দ্রাহত আমি দাঁড়িয়ে থাকি, হাতে শুকনো বইয়ের পাতা খস খস করে। বুকের ভিতর শুকনো পাতা খস খস করে, মাথার ভিতর শুকনো পাতা উড়ে যায়। ননীবালা শব্দকে, ধ্বনিকে বাঁধার গুপ্ত বিদ্যা জানে। ননীবালা শব্দকে দেহ দিয়ে জেনেছে। দেহের ভিতরের শূন্যতা আর স্রোত দিয়ে জেনেছে, শব্দকে সে এমবডি করেছে। আর আমি করেছি মুখস্থ! তাকে আমি খুলে বলি মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা, কি কি সে অতিক্রম করতে পারে না, সেই সীমায় আটকে থাকায় চলচ্ছ্বক্তিহীন কারো নাগালে কিভাবে ধরা দেবে দুনিয়াদারীর গহন ঘনীভূত নৈঃশব্দ। তাই নদীর পাড়ে বসে জল পিপাসায় মরে যায় কত লোক। পান করার বিদ্যা রপ্ত নেই বলে, আরাধ্যকে ভোগরাগের তরিকা জানা নেই বলে। ননীবালা এইসব জেনে চলে গেছে  মায়ামৃগ হয়ে নির্বাণের সন্ধানে। পথবৈরাগী ননীবালার অজানিত নেই সামাজিক জীবনের নিস্ফলতা, নিরর্থকতা। মোহ কিম্বা আসক্তি তাকে আটকাতে পারে নি। তাই সে আপন রাস্তা দেখেছে। আর তাকে দেখেছে বহু লোক।

 

Sunday, June 22, 2025

 

           অনুগল্প ডজন চারেক : প্রতিদিনের ঘটনার অন্তর্লগ্ন দর্শন থেকে সূক্ষ্মতার আঘাত

                                          মধুপর্ণা কর্মকার 


আমাদের হস্টেল শ্রীসদনে সহ-আবাসিকা ভূগোল বিভাগের ছাত্রীরা থাকতেন, স্নাতক স্তরে পড়ার সময় তাদের কাছে ভূগোল বিভাগের একটি পত্রিকায় ‘চীনের স্টোন ফরেস্ট’ বিষয়ে একটি লেখা পড়েছিলাম সঙ্গে ছবি, সেই প্রথম আমার অধ্যাপক মলয় মুখোপাধায়ের লেখার সঙ্গে পরিচয়। পরবর্তীতে ‘জীবন কথার নদী’ এবং ‘নৈঃশব্দের ভূগোল’ বই দুটি পড়েছি। আমি মলয়দার সরাসরি ছাত্র নই, বিশ্বভারতীর ভাষাভবনের ভাষা-সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু জ্ঞানচর্চার ইন্টারডিসিপ্লিনারী চরিত্র সমকালীন/পূর্ববর্তী চিন্তাবিদদের কাজের প্রতি আকর্ষণ অনিবার্য করে তোলে। সেইসুত্রে এখানে কয়েকটা কথা বলবার -

একজন বিজ্ঞানী, একজন ভূগোলবিদ যখন সাহিত্য তৈরি করেন, ন্যারেটিভ তৈরি করেন তার কিছু বৈশিষ্ট্য পাঠক হিসাবে লক্ষ্য করেছি। অভিজ্ঞতা যখন গল্প, ভ্রমণকথা, স্মৃতিকথায় উঠে আসে তখন অ্যাকাডেমিক সিটজেনশিপের ভিতরে একটি ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়। যখন একজন বিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ একজন গবেষক, যিনি পেশাসূত্রে নিস্পৃহ, উদাসীন থাকতে বাধ্য হন, তিনি যখন ক্রিয়েটরের ভুমিকায় আসে্ন, তিনি যখন গল্প বলেন আমাদের কাছে বহুমাত্রিক বাস্তব প্রকট হয়। জ্ঞান নির্মাণের স্বীকৃত এবং প্রচলিত নিয়মের বাইরে অভিজ্ঞতা আর পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা থেকে যে গল্প তৈরি হয়, আমাদের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, সাফারিং তার সংগে সেলফ এক্সপ্রেশন এবং সৃষ্টির আন্তঃসম্পর্ক, তার যে ব্যাতিক্রমী বৈশিষ্ট্য পাঠক হিসাবে আমাকে অভিভূত করে। ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা চিন্তাকে জটিলায়িত করার অদ্ভুত কিছু সূত্র অধ্যাপক মলয়দার লেখা থেকে আহরণ করতে পেরেছি -এইভাবে সংবেদনশীল লেখক, বিজ্ঞানীরা পরবর্তী প্রজন্মের মানসজগতকে আকার দেন, সমৃদ্ধ করেন, সময়ের সিঁড়িতে কয়েকধাপ এগিয়ে দেন।

বর্তমান পুঁজিকেন্দ্রিক বস্তুবিশ্বে এক প্রজন্মের গবেষক, লেখক, গল্পকার পরবর্তীর প্রজন্মের পাঠক গবেষকদের কি দিয়ে যাবেন? পূর্ববর্তী বিজ্ঞানী লেখক দিয়ে যান একটা দৃষ্টিভঙ্গি, একটি জানলা যেখান দিয়ে পরিচিত পৃথিবীকে ভিন্ন ভাবে দেখা যায়, দিয়ে যান একটি দাঁড়ানোর তাত্ত্বিক তল যাকে আমরা পারিভাষিক ভাবে বলি স্ট্যান্ড পয়েন্ট - পয়েন্ট অব ভিউ, দিয়ে যান কিছু লেন্স যা দিয়ে এই ভ্রান্ত পরিবেশচেতনা, সামাজিক- অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ দিয়ে তৈরি যে নিকট বাস্তব তার ভিতরের তন্তুবিন্যাস গুলো স্পষ্ট দেখা যায়। অন্দরের দর্শন স্পষ্ট হয়ে যায়। একবারে ভিন্ন বিষয়ের ছাত্র এবং গবেষক হওয়ার পরও অধ্যাপক মলয়দার বইগুলি থেকে আমি পেয়েছি একটি লেন্স, একটি আলাদা জানলা যেখান থেকে আমাদের পরিচিত ‘সাধারণ’ পৃথিবীকে অন্যরকম দেখায়। পার্সপেক্টিভ, দৃষ্টিভঙ্গি যা আমাদের পূর্ববর্তী চিন্তাবিদরা আমাদের দিয়ে যান, দৃষ্টিভঙ্গির উত্তরাধিকার আমাদের চিন্তন প্রক্রিয়ায় গাঢ় প্রভাব ফেলে।

‘জীবন কথার নদী’ উপন্যাসে লেখক নদী ও নারীকে সমান্তরালে রেখেছেন, উপরিতলে গল্প রয়েছে কিন্তু তার ভিতরে অন্তঃশীলা নদীর মত বয়ে যাচ্ছে আরেকটি ধারা সেটি ইকো ফেমিনিজম, প্রকৃতিকেন্দ্রিক নারীবাদ। আমার মনে হয় আমাদের আইডিয়া, সামষ্ঠিক চিন্তন প্রক্রিয়াটিও বহমান নদীর মত। হাত বদলে হাত বদলে এগিয়ে যায়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের লেখকদের, চিন্তাবিদদের একটি স্রোত বয়ে যায়। এই ডিজিটাল সভ্যতায় যেখানে আমাদের অনুভূতির স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড, সেখানে সাবেকি স্টোরি টেলিং, ন্যারেটিভ মেকিং, গল্প তৈরি, গল্প বলা এবং গল্প শোনার, গল্পের খাতিরে একত্রিত হবার এই ঐতিহ্য এই সময়ের বিচিত্র বিশৃঙ্খলার ভিতরে পাঠক হিসাবে আমার কাছে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

স্টোরি টেলিং এর আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মান কেউ কেউ সেখানে তার অনুভূতির জগৎ যতবেশি সূক্ষ্ম এবং তীব্র হতে থাকে তার গল্পের ধার ‘সহৃদয়হৃদয় সংবাদী’ পাঠকের অন্তঃস্থলকে আঘাত করে তত সূক্ষ্ম ভাবে। লেখা হচ্ছে, ‘Scientifically, the reason well-told stories are so impactful is that the act of listening lights up same parts of the brain that would activate if living the story in real time. Stories are also an unmatched learning tool’১. একজন স্টোরিটেলারের যে সৃষ্টিশীলতা তার মধ্যে রয়েছে unique perspective. গল্প শুধুমাত্র বিনোদন, আবেগ মোক্ষণ নয়, গল্প আসলে হতে পারে নলেজ এক্সচেঞ্জের একটা মুদ্রা বা কারেন্সি। পেশোয়ারের ‘কিসসাবাজার’কে মনে করা হয় সাউথ এশিয়ার সভ্যতার আদিতম গল্পের বাজার যেখানে মানুষেরা গল্প শুনতে যেতেন, সেখানে কিসসাবাজেরা  তাঁদের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং জীবনের যে সংকট গুলো,পাজল গুলো তারা সলভ করে ফেলেছেন তার গল্প শোনাতেন, গল্পের মধ্যে পুরে দিতেন এই জীবনের উত্তাল সমুদ্রকে কিভাবে নেভিগেট করতে হয়, বৈচিত্র্যকে কিভাবে অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত করতে হয় তার সুত্র। গল্পবাজেরা/ স্টোরিটেলাররা  এক একজন সান্তিয়াগো যারা পাঠককে তথ্য এবং উপলব্ধির নির্যাস দিয়ে জীবন শেখান, বাঁচতে শেখান। গল্প বলার, গল্প শোনার শৌখিনতার থেকেও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। গভীর জীবনবোধে অন্বিত হয়ে বাঁচার উপাদান সংগ্রহ করতে হয় আমাদের, দর্শনের হাত ধরতে হয়। পরিবারে বয়োঃজ্যেষ্ঠদের থেকে ছোটদের গল্প শোনার  অবকাশ নিউক্লিয়ার পরিবারে নেই, আমাদের কারোর জন্য কারো পর্যাপ্ত সময় নেই ব্যস্ততার নিদারুণ ক্রুর অজুহাতে, জীবন বিবিক্ত এই ‘নাগরিক, উন্নত’ বাঁচায় গল্প আমাদের একটা করে জানলা খুলে দেয়, কিছু খোলা হাওয়া ভিতরে আসে।

‘অনুগল্প ডজন চারেক’ প্রকাশিত হয় ২১ শে মে, ২০২৫। বই ঘর পাবলিশার্শ শান্তিনিকেতন, প্রকাশক জয়ন্ত চক্রবর্তী। প্রচ্ছদ করেছেন অরুনেন্দু মুখোপাধ্যায়। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁদের ‘যাঁরা আশেপাশের নানান ঘটনা থেকে জীবন দর্শন তৈরির রসদ খোঁজেন’। এখানে উল্লেখ্য বইটির প্রতিটা গল্পে রয়েছে আমাদের সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসা দর্শন। প্রতিদিনের ‘তুচ্ছ’ ঘটনা, আমাদের দৈনন্দিনের কথা, সংলাপ যা আপাতদৃষ্টিতে খুব ‘সাধারণ’ মনে হয়, কিন্তু লেখক এই সবকিছুকে দেখেন কিছুটা দূর থেকে যেমন একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টিকে দূর থেকে দেখে বুঝতে পারেন পারিপার্শ্বের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য। এই বৃহৎ আকাশের নীচে মানুষের পৃথিবীতে ঘটে চলা কোনো ঘটনাই তুচ্ছ নয়, উচ্চারিত কোনো কথাই আকস্মিক নয়। প্রতিটি ঘটনার পটভূমি আছে, প্রতিটি কথা একটি ভাষিক মহাস্রোতের অংশ। লেখক তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে, গভীরতা দিয়ে দেখতে পান সেই যবনিকার ভিতরের কাহিনী গুলো তাতে ‘তুচ্ছ’, ‘সাধারণ’ ঘটনা, কথা ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠে। যাঁরা বাঁচেন প্রচলিত আত্মহারা স্রোতের অনেকটা গভীরে তাঁদের কাছে মানুষের পৃথিবী ধরা দেয় ভিন্ন মাত্রায়, যেখানে “অনুভূতির ঢেউরা অতি আধুনিক জীবনচর্চায় ধাক্কায় ভেঙ্গে না গিয়ে আরো নরম ঢেউ তৈরি’ হয় (সূচনাংশ – মলয় মুখোপাধ্যায়) তিনি আরো লিখছেন, ‘ইদানীংকালের সংখ্যা সাজানো জীবনচর্চাতে অনুভুতিরা পিছনের সারিতে গিয়ে বসেছে।… গতিময় জীবনবোধ নরম মনের আবদারদের ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয় না” প্রতিদিনের ঘটনা আর কথার সমুদ্র থেকে লেখক খুঁজে নেন সূত্র যা একটা দর্শন দিয়ে একটা সময়কে অতীত আর ভবিষ্যতের সঙ্গে বেঁধে দেয়। তিনি  চেয়ছেন গল্পগুলির মধ্যে ‘অনুচ্চারিত জীবনদর্শনের’ অনুরণনে অনুরণিত হোক পাঠক।

 তিনি গল্পগুলি আটটি সাবথিমে ভাগ করেছেন, মানবিকতার মোড়কে, বোধ কাজ করে, জীবন জীবিকা, সমাজ চিত্রের ক্যানভাসে, শিশুমনের হদিশ, আর্থ-সামাজিক উঠোনে, চলো নিয়ম মতে, পর্যটনের এপাশ-ওপাশ।  মোট ৪৮ টি অনুগল্প এখানে সংকলিত হয়েছে। প্রতিদিনের যাপিত জীবনের মলিনতার ভিতর, দৈনন্দিনের দৈন্যের ভিতর, মানুষের রিপু তাড়িত জীবনের ভিতর, চালাকিতে শঠতায় বস্তুবিশ্বে জিতে যাবার চূড়ান্ত পরাজয়ের ভিতর লেখক দেখেছেন কিভাবে সামাজিক সত্তার বাইরে এখনও মানুষ মহাকালের সন্তান, দেখেছেন অস্তিত্ত্ববোধের ভঙ্গুর ভয়াবহতা। সামাজিক- অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বুনটে গাঁথা আমাদের বাস্তবতা কিভাবে আমাদের মানবিক অবস্থান থেকে পদস্খালন ঘটায়, কিভাবে ধূর্ততায়, ক্রুরতায় পলায়নবাদী সামাজিক মানুষ খোঁজে আশ্রয়, কিভাবে প্রকৃতি বিযুক্ত মানুষ, বিষাক্ত সভ্যতায় নিজেকে অন্বিত করে উত্তরণের ভাণ করে প্রতিদিনের রমরমা বজায় রাখে যেখানে “অনুভূতিরা গিয়ে বসে পিছনের সারিতে” লেখক জানেন পালিয়ে যাবার কোনো জায়গা নেই, সভ্যতার অসুখ তার জন্য কোনো নিরাপদ মানবিক আশ্রয় মজুদ রাখেনি। ব্যক্তিকে ফিরতে হবে অনুভূতির সূক্ষ্মতায়, ফিরতে হবে আত্মশুদ্ধিতে, প্রতিদিনের মমত্বের অনুশীলনে, ভিতরের মনুষ্যরাক্ষসকে আহুতি দিয়ে ফিরতে হবে আনন্দে, পারস্পরিক ভালোবাসায়, ফিরতে হবে প্রকৃতির ভিতর সম্পূর্ণ সমর্পণে, ফিরতে হবে অনন্তের সন্তানদের অনন্তের কাছে।

প্রতিটি অনুগল্প এক একটা বিদ্যুতের ঝলকের মত। স্বল্প পরিসরে ক্ষণিকের তীব্র দ্যোতনা দিয়ে যায়। মূলত সমাজ জিজ্ঞাসা প্রাধান্য পেয়েছে গল্পগুলিতে। প্রথম গল্প ‘সৌজন্যতায় আছি’তে রয়েছে প্রৌঢ পুরুষের একাকিত্ব আর সৌজন্যের অন্তঃসারশূন্যতা, সামাজিকতার আলগা বাঁধন যেখানে সৌজন্যের বাইরে কেউ কাউকে নিয়ে ভাবিত নয়। অথচ বাইরে একটি প্রলেপ ভিতরে সহমর্মিতার তুমুল অনটন। ‘যাচাইটুকু’ গল্পে দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসের দৈন্য যেখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিতে হয় অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য হবার জন্য। ‘মানবিকতার মোড়কে’ – এই বিষয়ের গল্প গুলির মধ্যে মূলত স্থান পেয়েছে সামাজিকতার ভিতরে ঘূণ ধরে যাওয়া আন্তঃসম্পর্ক যেখানে বাহ্যিক মুখোসের ভিতর ব্যক্তির রিপুতাড়িত, আত্মরতিময়, বিকৃত এবং বিক্রীত সত্ত্বা খুব সহজে বেরিয়ে আসে – গৃহকর্তা সন্দেহ করে কাজের মাসিকে, প্রতিষ্ঠিত বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানের মালিক বন্ধুর অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্বন্ধ পাঠককে বিচলিত করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের শীতলতা জানে ঘরের সিলিং ফ্যানটি, আজীবন স্ত্রীর কাছে অপঠিত থেকে যাবার আক্ষেপে চোখ জলে ভরে যায় সুবলবাবুর। একমাত্র একাকীত্বের যন্ত্রণার ভিতর তিনি নিজেকে খুঁজে পান।

‘বিপদতারণের মা’ গল্পে মাকালীর গয়না হারিয়ে যাওয়ায় সকলের আত্মম্ভরী শোক, দুঃখের ভিতর বিপদতারণের মা বুঝতে পারে ‘সোনার ফাঁস’ থেকে মার মুক্তি পাবার কথা। ‘অন্য কারো মতো’ গল্পে প্রেমিক প্রবীর প্রমিকা সেবন্তীকে তুলনা করে ‘সানলাইট’ বিজ্ঞাপনের মেয়েটির সঙ্গে। ‘শেষ পোড়ানোটা’ গল্পে দেখা যায় তিরিশ বছর আগে ডিভোর্স হয়ে যাওয়া স্ত্রী  মৃত স্বামীকে পোড়ানোর খরচ স্বামীর নতুন স্ত্রীর হাতে দিতে রাজী নন যদিও মৃত স্বামীকে দেখার ইচ্ছে তার আজীবনের মত মরে গেছে। ‘জীবন জীবিকা’ অংশে ‘জীবিকা যখন’ গল্পে দেখা যায় ট্রেনের হকার শঙ্করের ‘কমপ্লিট থ্রোট রেস্ট’ প্রেসক্রাইব করে ডাক্তার কিন্তু ইশারায় তো জীবিকা তার চলবে না। ‘আলাপচারিতার ওপাশটাতে’ গল্পে লেখকের শান্তিনিকেতনের ‘ছাউনি’ বাড়িতে টোটো করে অনুষ্ঠানের চেয়ার দিতে এসে কেতাবুদ্দিন মিঞা বলে যান স্কুলে তিনি যান নি কিন্তু ‘জীবনটাতো  নকল করার ইস্কুল বটে’।

‘জীবন দেখতে’ গল্পে একজন রিকশাওয়ালা আব-দা বলে যান ‘স্যার, পৃথিবীতে সব মানুষই তার চেনাজানার গন্ডীকে বাড়তে চায়। সকলের মধ্যে নিজেকে আলাদা ভাবতে মানুষ ভালবাসে… আমাদের এই মস্ত পৃথিবীটাতে মাত্র কয়েক বছরের জন্য আসা… সবটাই তো মনের সঙ্গে লড়াই’।

‘সমাজচিত্রের ক্যানভাসে’ পর্বের গল্প ‘হ্যালোজেনের আলোটার বাইরে’ গল্পটি পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। এখানে নারায়ণ সর্দারের নাতি পাড়ার বৃন্দাবন মন্ডলের মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রিত নয়, সে ফেলে দেওয়া পাতা থেকে খাবার কুড়িয়ে নেবার জন্য দাদুর হাত ধরে বিয়ে বাড়ির দিকে দ্রুত যেতে চায় কারণ কুকুরদের সঙ্গে লড়াই করে তাক খাবার সংগ্রহ করতে হবে, এই লড়াই সহজ নয়। সামাজিক মর্যাদা, সম্পদের সুষম বন্টনের লড়াই কত যোজন দূর? যেখানে একটি বাচ্চাকে এঁটো খাবারের জন্য লড়াই করতে হয় রাস্তার কুকুরের সঙ্গে!

‘ভাসিয়ে দিয়ে গেলে’ গল্পে দেখা যাচ্ছে স্বামী মারা যাবার পর শোক সভায় কে কোন শাড়ি পড়বে, কোন শাড়ির সাথে কোন ব্লাউজ ম্যাচ করবে এই নিয়ে ‘সুপ্ত আলোচনা’। ‘মায়ের শাড়ি হবে শোক মানানসই জরি পাড়। সাদাটে হালকা রঙের প্যাণ্ডেল’। এই শ্লেষ মানুষের সম্পর্ক আর তার তলানিতে চলে যাওয়ার দৈন্যকে নগ্ন করে দেয়। আভিজাত্য, অর্থসংগতির সঙ্গে শোক, দুঃখ পাল্লা দিয়ে সমান্তরালে যেতে পারে না, এখানে খেয়াল রাখতে হয়, ‘অর্থের সঙ্গে রুচির প্রকাশ ও যেন হয়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে’।(পৃ -৪৪) ‘লটারীর টিকিট’ গল্পে যখন লেখক লেখেন, ‘সফল জীবনের তৃপ্তির স্বাদটাই আলাদা। ভরাট হয়ে যায় মন।যারা পেয়েছেন তাদের আর আলাদা করে বোঝাতে হয় না’ … এই সমাজবিক্ষণের সূক্ষ্মতা অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়কে ভিন্ন ভাবে চেনায়, তিনি দেখান জীবন আসলে একটা লটারীর টিকিট। জীবনে সাফল্যও একটা একটা লটারীর টিকিটের মত, বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে যাবার মত। বিদ্যমান ক্ষমতা সম্পর্কের এই পাশা খেলায় কেউ কেউ জেতে। ‘কোন আলোকে বাসস্থান’ গল্পে দেখা যাচ্ছে মেট্রোপলিটন সিটির যান্ত্রিক কংক্রীটের অরণ্যে আভিজাত্যের নিরাপদ মোড়কে জীবন-জীবন খেলা, যেখানে পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে সেটাও স্পষ্ট নয়। এই নাগরিক অ্যাননিমিটি, গাঢ অপরিচিতি, বিচ্ছিন্নতার মহামারী, ছিন্নমূল বাঁচার শ্লাঘা অথবা ক্লেদ, সোপিসের মত গোছানো- সাজানো অথচ প্রাণহীন জড়ত্বের নির্মম বিস্তার, অনির্দিষ্ট টানে, তাগিদে কর্পোরেট লাইফ স্টাইল -সেখানে লেখক ভাবেন –‘সত্যিই আমরা সমাজবদ্ধ জীব। আধুনিকতার ঘেরাটোপে নিজের কাছেই নিজে বন্দী হয়ে যাচ্ছি… এখানে আমি আর নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছি না”। ‘গনতন্ত্রের ওধারটাতে’ গল্পে তিনি লিখছেন, ‘গনতন্ত্র বজায় রাখতে গিয়ে অনেক সম্পর্কই নষ্ট হয়ে যায়… কদিনের জীবনে আত্মীয় আর বন্ধুর সংখ্যা বাড়িয়ে নাও’।

আমার সব থেকে পড়তে ভাল লেগেছে, বলা ভাল বারবার পড়েছি ‘শিশুমনের হদিশ’ অংশে যে গল্প গুলি রয়েছে।‘ছোটরাও যে শেখায়’ গল্পে দেখা যাচ্ছে এক সরলমতি শিশু পরীক্ষার খাতায় অঙ্ক কষার বদলে এঁকে এসেছে ফুল, বাড়ি, নদী, নদীতে নৌকো এঁকে আসে, কারণ গতরাত্রে মায়ের করানো অঙ্ক গুলোই পরীক্ষায় এসে যাওয়ায় একই অংক সে আবার করতে চায় নি। মা সংযুক্তা তাকে বকার বদলে বলেন, “ঠিক করেছিস। মন যা চাইবে তাই করবি জীবনে।সারাটা জীবন আমি যা পারিনি”। এই বড়রা বিশেষত মেয়েরা, গৃহিণীরা যা চান তা করার ইচ্ছা, পরিসর, সাহস হারিয়ে ফেলেন।তাদের চলতে হয় ‘নিয়ম মতে’। শিশুকন্যা সংযুক্তা বড়দের পৃথিবীর এইসব নিয়ম, বাধা বিপত্তিতে এখনও অভ্যস্ত হয়নি, সে নিজের খেয়ালে পরীক্ষার খাতায় যা ইচ্ছে এঁকে এসেছে। শিক্ষা, পরিবার, সমাজ আমাদের নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য একে একে মেরে ফেলে আমাদের বানিয়ে তোলে নিয়মনিষ্ঠ, ‘তাসের দেশ’ এর হরতন, চিড়েতন, ইস্কাবন।

‘কি বলছো মা’, ‘চুপ থাকাতে’ গল্প গুলিতে রয়েছে কিভাবে শিক্ষার নামে মা বাবারা অসুস্থ প্রতিযোগীতা্র দিকে শিশুদের ঠেলে দিচ্ছেন, শিশুদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন একে অপরের বিরুদ্ধে। একে একে সভ্যতার বিষ শিক্ষার মোড়কে, ধর্মের মোড়কে শিশুদের ভিতরে অল্প অল্প করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে তারা আমাদের ‘যোগ্য উত্তরসূরী’ হয়ে উঠে বিভেদে, প্রতিযোগীতায় আত্মহারা পৃথিবীকে সরগরম রাখতে পারে।

“ আর্থ-সামাজিক উঠোনে” অংশে ‘দখলদার’ গল্পে অনিমার সুটকেসে গ্রামের বাড়িতে ‘আমেরিকার গল্প বিক্রী করে’ ফিরে এলে গ্রাম বাস্তুভিটে থেকে একটি  সাপ তার সঙ্গে চলে আসে আমেরিকার বস্টনের ঝকঝকে সুখের সংসারে, যেন মুর্তমান ‘বিষয় বাসনা বিষ’। ‘সম্পর্ক হরেক’ গল্পে চ্যাটার্জিদের বড় পরিবারে আমন্ত্রিতদের ‘ওজন’ নির্ধারণ করেন নববধূ কে কত দামী গিফট দিয়েছে তার ভিত্তিতে। ‘বিয়ের কার্ডে পদবি যখন’ গল্পে দেখা যাচ্ছে হরিহর চ্যাটার্জী ব্রাহ্মণ্যবাদের বিষ থেকে নিজেকে আর  শিক্ষিতা মেয়ে শতরূপাকে মুক্ত করতে পেরেছেন, ‘চ্যাটার্জী’ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে যখন কুণাল ‘কর্মকার’এর বিয়ে নিয়ে এলাকায় যেসব কথা ওঠে তিনি সামলে নেন যদিও ‘আবছা করে রটিয়ে রাখা হ’ল কর্মকার হ’ল কুণালদের পাওয়া পদবী, আসলে কুণালরাও ব্রাহ্মণ’।

‘চলো নিয়ম মতে’ অংশের ‘লাফিং ক্লাবের সদস্যপদ’ গল্পে ক্লাবের  কর্ণধার দুই প্রাণবন্ত নারীকে বেখাপ্পা, বিশৃংখল হাসি পছন্দ করেন না, তিনি স্রেফ জানিয়ে দেন, “আপনাদের ফর্ম দেওয়া হবে না। সব কিছুর একটা ডিসিপ্লিন আছে। হাসিরও একটা নিয়ম আছে, একটা সিস্টেমে হাসতে হয়। তবে শরীর ভালো থাকে। হ্যা হ্যা করে যখন তখন হাসলেই তো হল না”। নারীদ্বয় ভাবতে থাকেন, “এই যে আমরা সকলকে নিয়ে এতো হাসুখুশি থাকি, সেটা কি তাহলে সিস্টেমের বাইরে”!

‘মোবাইলের হাত ধরে’ গল্পে দাম্পত্য কলহে অতিষ্ঠ দীপঙ্কর আর সুস্মিতা সঙ্গী বদলের অ্যাপে ‘অদ্ভুত স্বয়ম্বর সভায়’ রূপ, রুচি, আর্থিক সামর্থ্য মিলিয়ে সঙ্গী খুঁজতে গিয়ে দেখেন সবকিছু কিছুতেই মিলছে না, তাই সকালে ফের তাঁরা এক টেবিলে একসঙ্গে চায়ে চুমুক দিয়ে স্বস্তির নিস্বাস ফেলেন। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় সমাজ, পরিবার, দাম্পত্য, মানুষের অন্তর্জীবন দেখেছেন মমতায়, রসিকতায়। সামাজিক মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসহায়তা তাঁকে আন্দোলিত করেছে নানান তন্ত্রীতে যার ছাপ প্রতিটা গল্পে।

‘পর্যটনের এপাশ-ওপাশ’ পর্বের গল্পে বাঙালী ঘুরতে গিয়ে কি ধরনের বিড়ম্বনা বাঁধায় তার দুর্দান্ত প্রতিফলন। অনন্তবাবু পরিবার সমেত উত্তর ভারত ঘুরতে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ায় মত্ত থাকলেন, বিষয় – কার জন্য এতগুলো লাগেজ হল! তাঁরাও উত্তরভারতের ঐতিহাসিক জায়গা তার ইতিহাস প্রায় কিছুই দেখলেন না, তাঁদের সন্তানরাও কিছুই দেখতে পেল না। অন্য গল্পে প্রকাশক সংস্থার কর্ণধার বেড়াতে গিয়ে একটা কালো ট্রাঙ্ক নিয়ে যান কাজ গুলো হোটেলে সেরে রাখবেন বলে। আরেক গল্পে আন্দামান ঘুরতে গিয়ে দুটি মেয়ে শপিং করতে না পেরে মুষড়ে পড়ে, তারা মনে করে আন্দামান নিকোবর ঘোরার জন্য জায়গা সিলেকশেনটা ঠিক হয় নি। শেষ গল্প ‘পর্যটকের হরেক রং’ এ হুড্রু জলপ্রপাত দেখতে গিয়ে ‘তেলেভাজার দোকানে’ আটকে যায় পর্যটকদের মন, সময় তাদের আগ্রহের একেবারে বাইরে চলে যায় জলপ্রপাত আর তার সৌন্দর্য।

এই চার ডজন গল্পের মধ্যে রয়েছে গভীর সমাজ দর্শন, সূক্ষ্ম সমাজবীক্ষণ, অনুভুতির তীব্র স্ফূরণ। ছোট ছোট ঘটনা একটি তীব্র রেশ রেখে যায়। কয়েকটি গল্পের রম্য বৈশিষ্ট্য অভিভূত হবার মত। খুব স্বল্প পরিসরে পাঠককে চমকে দিয়ে যায় আর একটি বার্তা সামাজিক-মনকে ধাক্কা দিয়ে কোথাও একটা ফিরতে বলে, ফিরতে বলে মানবিক সত্ত্বায়, বোধে। এই নতুন বইটি আবশ্যিক ভাবে পাঠকের মননের খাদ্য জোগাবে। তবে কয়েকটি গল্পের আরো তীব্র হওয়ার, বুনন আরো জমাট হওযার সম্ভবনা ছিল বলে মনে হয়েছে।  মলয়দার ন্যারেটিভ মেকিং বা স্টোরি টেলিং এর নিপুণতার সংগে আমি পরিচিত উপন্যাস এবং ভ্রমণকথা পাঠের সূত্রে, যেখানে গদ্যের পরিধিটা বড় ছিল।  অনুগল্প খুব স্বল্প পরিসরে বিস্তৃতির দ্যোতনা দেয়, অনুগল্পে বিস্তৃতি কম, গভীরতা বেশি। একজন লেখকের ক্ষমতার, সূক্ষ্মতার প্রতিনিধিত্ব করে অনুগল্প, যেখানে এ্কটিও বার্তি শব্দ ব্যবহারের সুযোগ নেই, যতিচিহ্ন পর্যন্ত প্রকান্ড অর্থ বহন করে। এই বইটির মধ্যে প্রতিটা গল্প এক একটি বার্তা, একটি রেশ। একজন অনুগল্পকার বুননের সূক্ষ্মতা দিয়ে তীব্র ভাবে পাঠককে আঘাত করতে সক্ষম, এখন প্রশ্ন হচ্ছে পাঠক হিসাবে আমরা কি পর্যাপ্ত আহত হতে সক্ষম?

 

১। Learn the art of storytelling to tell stories that matter, Acuman Academy Blog. https://blog.acumenacademy.org/art-of-storytelling-tell-stories-that-matter?utm_source=bing&utm_medium=&utm_campaign=&utm_term=skills%20to%20improve%20storytelling&hsa


Monday, November 8, 2021

 নীরবতার পুরুষতান্ত্রিক (কদ) অর্থ।

দ্বিতীয় বর্ষ ।। ত্রয়োদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৪ আশ্বিন ১৪২৮ ।। ১১ অক্টোবর ২০২১

- অক্টোবর ১১, ২০২১



মধুপর্ণা

“নীরবতা সম্মতির লক্ষণ"

এই বাক্যটি একটি বিষাক্ত লিঙ্গ রাজনীতি বহন করে।

কনসেন্ট বা সম্মতির সম্বন্ধে কোনো শিক্ষা যে সমাজে নেই, সেখানে নীরবতার অর্থ বোঝার মত সংবেদনশীলতা আশা করা অলীক। এই তুমুল ক্যাকোফনির ভীড়ে কে কি বলছে, আর কে কি বলতে চাইছে অথবা কে মুখস্থ কথা অভ্যাসে বলে যাচ্ছে আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না। এই অদ্ভুত একটা বিকট পারস্পরিকতার মধ্যে নীরবতা বলে একটা বিষয় কর্পূরের মত উবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অথবা যারা নীরবে, নিভৃতে বাঁচতে চায় তারা পিছোতে পিছোতে ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে। অথবা অন্যদের উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে চাপা পড়ে যাচ্ছে তার স্বর। এই চাপা পড়া স্বরের একটি বড় অংশ নারী। বলা ভাল বেশ বড় অংশ। নানান নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে থাকতে থাকতে ক্রমে চাপা পড়ে যায় তার কথা, তার স্বর, তার ইচ্ছা, তার অনিচ্ছা, তার অসম্মতি।

সামাজিক ভাবে নারী এবং নীরবতার সম্বন্ধ অত্যন্ত জটিল। নীরব নারী সমাজে পরিবারে বিপুল সমাদৃত। "সাত চড়ে রা নেই" সেই মেয়ে বড়ো "ভালো"। এখানে কোনো থ্রেট নেই। বিষাক্ত পৌরুষ এবং তার অসুস্থ অহং এখানে ঝুঁকির মুখে পড়বে না। বরং ডালপালা সমেত বাড়বে দিনে দিনে। নীরব শান্ত মেয়ে, বেশী কথা না বলা মেয়ে, চিৎকার না করা মেয়ে, চুপ করে মেনে নেওয়া মেয়ে, অন্যের অসভ্যতা, সীমালঙ্ঘন মুখ নীচু করে মেনে নেওয়া মেয়ে আমাদের সমাজ লালন করে। এই গুণাবলিতে খাপ খাওয়া মেয়েরা বিবাহের উপযুক্ত, পরিবারে, সমাজে সমাদৃত। নারী যেখানে "অপর", "আংশিক মানুষ", "দ্বিতীয় লিঙ্গ" হিসাবে গণ্য সেখানে পুরুষের কথার উত্তরে নীরবতা একটি লিঙ্গ রাজনীতিকে নগ্ন করে তোলে। প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া হয় নীরবতা মানে সম্মতি। অসম্মতি হিসাবে কখনো নীরবতা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় নীরব নারীটি মূলত দূর্বল। নীরবতার পিতৃতান্ত্রিক অনুবাদ হয় সম্মতি নয় দূর্বলতা।

আবার সাহিত্যে কল্পনার খাদ্য এই নীরব নারীদের নিয়ে রোমান্টিসিজমের চাষ। তার মুখে কোন কথা নেই, নিজস্ব কোন স্বর নেই। তাই পুরুষ সাহিত্যিক নিজের ইচ্ছায় তার মুখে কথা বসাতে পারে। কল্পনা খাদ্য হিসাবে গড়ে তুলতে সুবিধা হয়, নিজেদের আজন্মলালিত বিষাক্ত পৌরুষের আরকে চুবিয়ে পরিবেশন করতে পারেন। কিম্ভুতকিমাকার সেই নারী মূর্তি যার কোন মুখ নেই, কথা নেই, স্বর নেই, ইচ্ছা নেই সেই নারীর ইমেজ কি প্রচন্ড আবেগ নিয়ে মানুষজন আস্বাদন করে থাকেন। "আদর্শ নারী” রা বেশি কথা বলে না। চুপ থাকে। তাকে প্রয়োজনে, ইচ্ছায় ব্যবহার করা যায়।

নীরবতাকে ভাবা হয় দূর্বলতা। অথবা অক্ষমতা। যে নারী ইতরামির সঙ্গে সম্মুখ সমরে না নিয়ে এড়িয়ে নিজের কাজে নিমগ্ন থাকতে চায়। সেই এড়িয়ে যাবার ভাষা অনূদিত হয় ভিন্ন ভাবে। মনে করা হয় তা দূর্বলতা। প্রতিরোধের একটি ভাষা নীরবতা। অবশ্য যদি প্রতিপক্ষের নূন্যতম শিক্ষা আর চক্ষুলজ্জা থাকে তবেই। পিতৃতন্ত্র এই নীরবতার ভাষা ভয় পায়। ক্ষমতার সূক্ষ্ম এবং নগ্ন রাজনীতি চালিয়ে যেতে অসুবিধা হয় বলে তা খানিকটা স্বেচ্ছায় এড়িয়ে চলে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আমাদের যাবতীয় কাঠামো বহির্মুখীদের জন্য তৈরি। অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বের জন্য এই পরিকাঠামো অনুপযুক্ত এবং ক্ষতিকারক। বেশ 'বলিয়ে কইয়ে' হলে সব জায়গায় সাফল্য পেতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু যারা অন্তর্মুখী তাদের পড়তে হয় সমস্যায়, অথবা তাদের সমস্যা অপ্রকাশিত থেকে যায়। পরিশেষে একটি কথা বলবার, নীরবতা একটি স্বতন্ত্র স্বর। স্বরহীনতা নয়।

Tuesday, September 21, 2021


‘খুব বাড় বেড়েছে!' এই বেড়ে যাওয়া "বাড়" নারী-স্বাধীনতার লক্ষ্যে জরুরি সোপান।

দ্বিতীয় বর্ষ ।। একাদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২৭ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

মধুপর্ণা


"খুব বাড় বেড়েছে দেখছি!”

 এই বাক্যটা জীবনে সহস্রবার শোনেনি এমন মেয়ে আমাদের সমাজে খুঁজে পাওয়া মুসকিল। এমনকি যারা সমাজের, পিতৃতন্ত্রের বেঁধে দেওয়া নিয়মের পান থেকে চুন না খসিয়ে তথাকথিত 'সুশীলা' হিসাবে বিরাজ করেন তাঁরাও এই বাক্যবন্ধ শোনেন কখনও না কখনও। কারণ নিয়মের নিগড় বড় কড়া। এবং বিপজ্জনক কথা হল পিতৃতন্ত্রের সুবিধামত তা বদলায়। তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে সারাজীবন শিক্ষানবিশি চালিয়ে যেতে হয়। তারপরও অসম্পূর্ণ শিক্ষার অপমান নিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়। আর বাকি যারা 'বেয়াদপ', 'আংশিক বেয়াদপ" 'সহবতহীন', 'যাচ্ছেতাই' নারীরা রয়েছেন, প্রতিনিয়ত অথবা কখনও কখনও সীমা লঙ্ঘন করে পরিবার, সমাজ এবং ঘনিষ্ঠজনেদের বিরাগভাজন হয়ে থাকেন তাদের বাড় বেড়ে যাওয়া কেন এত গাত্রদাহের কারণ পিতৃতন্ত্রের? কেন এই বেড়ে যাওয়া বাড় হজম করতে পারা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়? কেন বাড় বেড়ে না যাওয়া "ভালো মেয়ে" আর গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠার শীলমোহর?

 “বাড়" বলতে বোঝায় বৃদ্ধি, অগ্রগতি, বিস্তার। কিন্তু এই শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্র এবং ভঙ্গী শব্দটির ওপর একটি স্ল্যাং বা অশিষ্ট শব্দের অর্থ আরোপ করেছে, যা সীমা ছাড়ানোর জন্য নিন্দাসূচক ভাবে নঞর্থক একটি প্রতীতি তৈরি করে। খুব বাড় বেড়েছে", "এত বাড় ভাল না' এই বাক্যগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুল ব্যবহৃত।

 কেউ জোরে হাসলে বা কথা বললে বাড় বেড়ে যায়, কারো লিপস্টিক গাঢ় হলে বাড় বেড়ে যায়, কেউ অবদমন পছন্দ না হওয়ায় চিৎকার করলে বাড় বেড়ে যায়, কারো জামাকাপড় সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নর্ম ছাড়িয়ে গেলে বাড় বেড়ে যায়, কারো ইচ্ছা-আকাংখা একান্তই নিজের হলে তাতেও বাড় বেড়ে যায়, কারো বক্তব্য ধারালো হলে বাড় বেড়ে যায়, কারো নিজেকে উদযাপন করার ইচ্ছা হলে বাড় বেড়ে যায়, কেউ নিজের ব্যক্তিগত বন্ধু নিজে খুঁজে নিলে বাড় বেড়ে যায়, কারো কয়েকজন পুরুষবন্ধু থাকলে বাড় বেড়ে যায়, আমাদের সমাজে মেয়েদের নিজের মত কিছু ইচ্ছা হওয়াটাই মূলত বাড় বেড়ে যাওয়া।

 এই বাড় বা বৃদ্ধির সঙ্গে সীমার ধারণা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আমাদের সমাজ মেয়েদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে। যে সীমা গুলো লঙ্ঘন করে গেলেই সমাজের রোষের মুখে, হেনস্থার মুখে পড়তে হবে মেয়েদের। আর আমাদের সমাজে মেয়েদের হেনস্থার জন্য আয়োজিত আছে ভাষার বিস্তীর্ণ পরিসর। আপাতভাবে কিছু যৌণগন্ধী গালিগালাজকেই আমাদের মনে হয় নারীর বিরুদ্ধে তৈরি করা বিদ্বেষের একমাত্র বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু নারীবিদ্বেষের বীজ আরো গভীরে প্রথিত আছে। দৈনন্দিনের ভাষা ব্যবহারের মধ্যে, শব্দের মধ্যে, উচ্চারণের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। সীমার সামান্যতম বিচ্যুতিতে নারীকে শুনতে হয় যাবতীয় কুৎসিত আক্রমনাত্মক কথা। 'বাড় বেড়ে যাওয়া সেই সীমা নির্ধারণের সাবধান বাণী। সেই সীমা ছাড়ালে বা ছাড়ানোর চেষ্টা করলে আক্রমণ নেমে আসবে। বহু ব্যবহারে ক্লিশে একটি উদাহরণ আবারো উল্লেখ করি - সীতাকে গন্ডী কেটে দিয়ে রামের বিপদের আশঙ্কায় লক্ষণ মায়ামৃগের পিছু ধাওয়া করেছিল। এদিকে সীতা ছদ্মবেশী রাবণের ছলনায় তাড়িত হয়ে গন্ডী থেকে বেরিয়ে তাকে ভিক্ষা দেয়, তারপরের গল্প আমরা সবাই জানি। যুদ্ধ, লংকাদহন, সীতা উদ্ধার ইত্যাদি। রাময়ণের কেন্দ্রীয় সংকটের সূত্রপাত সেই সীতার নিরাপত্তার গন্ডী ছেড়ে বেরিয়ে আসা থেকে। “লোকশিক্ষার্থে" এই ঘটনা আপামর সাধারণের উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়েছিল কি? যে পুরুষের তৈরি করা নিরাপত্তার বলয় থেকে নারী বেরিয়ে গেলেই বিপদ। যে বিপদ শুধু তাকে নয়, সংকটে ফেলবে গোটা সমাজকে। এইরকম ছোট বড় ব্যাসার্ধের গন্ডী দৃশ্যমান ভাবে বা অদৃশ্যভাবে আমাদের সমাজে মেয়েদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা থেকে আরেকটা গণ্ডী বদলে যাচ্ছে কিন্তু সেখান থেকে বেরোতে পারছে না কেউ। যারা বেরোতে চেষ্টা করছে তাদের শুনতে হচ্ছে “খুব বাড় বেড়েছে" অথবা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ। বাড় বেড়ে যাওয়া আসলে স্পর্ধা বেড়ে যাওয়া। সমাজের নির্ধারিত ছাড়পত্রকে অস্বীকার করার একটা ক্ষমতা। বাড় বেড়ে যাওয়া নারীরা সমাজে নিন্দিতা। এবং নারী স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁরা অথবা তাঁদের নামগোত্রহীন সমষ্ঠিই হবে একদিন নন্দিত।

 এই সীমা আবার শ্রেণী, জাতি, বর্ণ, ধর্ম, বয়স, লিঙ্গ, এলাকা এবং অবস্থান ভেদে ভিন্ন। একজন শ্রমজীবি নারী, একজন গৃহবধূ, একজন ছাত্রী, একজন আবাসিকা, একজন গণিকা, একজন বালিকা, একজন তরুণী সবার আলাদাভাবে সীমার বন্দোবস্ত আছে। তাদের সীমা ছাড়ানোয়, বাড় বেড়ে যাওয়ার মাত্রা ভিন্ন। সামাজিক স্তরভেদে সীমা লঙ্ঘনের মাত্রায় হয় তারতম্য। প্রতিটি সামাজিক স্তরের নিজস্ব তন্তুবিন্যাস অনুযায়ী পিতৃতন্ত্র বহাল রাখার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সীমা নির্ধারণ করে। এই বিভিন্ন স্তরের ভিন্ন অবস্থানের বাড় বেড়ে যাওয়া" মেয়েগুলো একদিন একযোগে চিৎকার করবে। সেদিন তাদের বাড় শুধু বেড়ে যাবে না, সব সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাবে পিতৃতন্ত্রের নাগালের বাইরে। এতটাই দূরে যেখান থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসে না, কেবল অট্টহাসির প্রতিধ্বনি শোনা যায়।


Monday, August 30, 2021

 ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস।

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার বিন্যাস, অরন্ধন,  দ্বিতীয় বর্ষ ।। দশম ওয়েব সংস্করণ ।। ১৩ ভাদ্র ১৪২৮ ।। ৩০ আগষ্ট ২০২১


মধুপর্ণা

ব্যক্তিগত পরিসরে লিঙ্গ রাজনীতি একটি সূক্ষ্ম অথচ প্রভাবশালী ক্ষমতার বিন্যাস রচনা করে। প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ বৈষম্য জারিত হয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন কাজে কথায়, উচ্চারণে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। তার প্রতিনিয়ত চর্চা যে বাতাবরণ তৈরি করে তার মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক, উচ্চনীচের সমীকরণ রচিত হতে থাকে। তার ভিতরেই আমাদের যাবতীয় সম্পর্ক নির্মিত হয় বা বলা ভাল, সম্পর্ক এই ক্ষমতার সূক্ষ্ম রাজনীতির বুনোটের বাইরে কিছু নয়। যা কিছু আমাদের কাছে সাধারনভাবে অপাপবিদ্ধ, সরল, সহজ হিসাবে প্রতিভাত হয়, তার চলন এবং রেখা সমূহ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে মানুষের ভিতরে পারস্পরিক এবং অন্তবর্তী রাজনীতি কতটা লিঙ্গ, উচ্চনীচের ক্ষমতা বিন্যাসের প্রতিফলন। পরিবারবদ্ধ, সমাজবদ্ধ, বিবাহে আবদ্ধ, সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষ এই সমীকরণের মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত চর্চা করে চলেছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সমীকরণ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোজাত বৈষম্যকে নিজের মধ্যে বহন করে চলে। প্রতিটি ঘটনা, কাজ, কথা, টানাপোড়েন একটি বৈষম্যপূর্ণ নারী বিদ্বেষী সমাজের প্রতিবিম্ব হাজির করে প্রতিনিয়ত। এই যে আমরা কিছু কথা প্রায়শই শুনে থাকি, "ঘরের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না", অথবা "সম্পর্কের মধ্যে রাজনীতি আনবেন না” এখন কথা হল আমরা রাজনীতি বলতে ঠিক কি বুঝি। আমাদের কথা প্রতিটি বাক্য, শব্দ, শব্দের ব্যবহার সব কিছুর মধ্যেই একটি তরল ক্ষমতার প্রবাহ চলমান থাকে। এর ভিতরে নারীকে হেনস্থা করার জন্য আয়োজন সর্বত্র বিছিয়ে রয়েছে। এই কাঠামোগত বিষক্রিয়া যা জারিত করে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের জীবন আর মানুষের সম্পর্কের বয়ান, দু কলম লিখে তা বদলানো যায় না। কি করে বদলানো যায় ? কোনো ভাবেই কি যায় ?

যে প্রোগ্রামিং বা পদ্ধতিক্রম জারি রয়েছে তা মানুষকে সেভাবেই তৈরি করবে। জন্মদাগের মত রয়ে যাবে কাঠামোর অসুখ মানুষের মনে, ইচ্ছায়, অভ্যাসে, চাহিদায়। এখন আনলার্ন বা অর্জিত জ্ঞান বাতিল করে নিজেকে মুক্ত চিন্তক হিসাবে গড়ে তুলতে এবং নতুন অভ্যাস ও ইচ্ছাপরম্পরায় নিজেকে অন্বিত করতে যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার আয়োজন আমাদের কাছে নেই এবং তার যে কোনো সম্ভবনা সমূলে বিনাশ করে আমাদেরই কাঠামো। এই আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকের মত কেউ কেউ চিৎকার করে। ঐ যেমন মেহের আলি চিৎকার করত “ তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়!" তেমনি এই ক্ষমতার প্রবাহ থেকে এই কাঠামো উপজাত জটিল বিন্যাস থেকে আমাদের আশু মুক্তি নেই।

নারীকে আরোপিত জীবনের পাঠ ভুলে নিজের জীবন বেছে নিতে হবে, নির্মাণ করতে হবে স্বতন্ত্র জীবনচর্যা। নারীবাদ মানে স্বতন্ত্র জীবনবোধ। আরোপিত অবদমনের চক্রান্ত চিহ্নিত করা এবং সেই আগ্রাসনের আয়োজন অস্বীকার করার স্পর্ধা। এত সূক্ষ্ম ভাবে এই বহুস্তরিক লিঙ্গবৈষম্যের জাল বিছিয়ে রাখা আছে যে তাকে বিশ্লেষণ করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমরা নিজেদের অভ্যাস বদলাতে পারি মাত্র কাঠামো বদলাতে পারি না। এই এত চারিদিকে কথাবার্তা, সভা সমিতি, সাম্য সাম্য খেলা। ব্যক্তিমানুষের অভ্যাস আর তজ্জনিত ইচ্ছার বদল না হলে কিছুই বদলায় না। ওয়ান ফাইন মর্নিং লিঙ্গসাম্য দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকবে না জেনেও বিশ্লেষণ করে যেতে হয়, তার কারণ একটা ঘন্টা শতাব্দীর পর শতাব্দী পরম্পরাক্রমে বাজিয়ে যেতেই হয় কেউ না কেউ তার শব্দ কান পেতে একান্তে কখনো শুনবে বলে। তারপর থেকে আরো একটা প্রতিধ্বনি শুরু হয়ে আরো কিছুদূর যাবে বলে। অভ্যাস আর ইচ্ছা বদল করে লিঙ্গসাম্যের চর্চা কখনো শুরু হবে বলে।

Wednesday, August 25, 2021

 




                 শান্তিনিকেতনের মেয়েদের হস্টেলে বিনোদন; অবসর যাপনের একটি বিকল্প নির্মাণ। (১)

                                                                  মধুপর্ণা 

শান্তিনিকেতনে আবাসজীবনের শুরুর দিকে  হস্টেলে আমরা  একরকম প্রযুক্তি থেকে দূরেই ছিলাম। উত্তরশিক্ষায় অর্থাৎ একাদশ দ্বাদশ শ্রেনীতে যখন পড়ি  তখন থাকতাম শান্তিনিকেতনের প্রথম মেয়েদের হস্টেল শ্রীসদনে (প্রতিষ্টা - ১৯০৯)  মেনব্লকে দোতলায় ডর্মেটরিতে।  তখন ফোন রাখা বারণ। হস্টেলের ওয়েটিং রুমে ফোন আসবে বাড়ি থেকে তখন ডেকে দেওয়া হবে কথা বলার জন্য। কেউ কেউ লুকিয়ে ফোন রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু মাঝেমধ্যেই ধরা পড়লে হুলস্থুল কান্ড হত। টিভি রুমে টিভিতে শনি রবিবার ডিডি বাংলায় সিনেমা। ব্যাস। তখন আমাদের বিনোদন গুলোর আদল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, সময় উদযাপনের আয়োজন ছিল অন্যরকম। হস্টেলে অনেককেই দেখতাম নানা ধরনের হাতের কাজ করতে। দেখতাম,  যারা পাঠভবন থেকে পড়েছে তারা বহুরকমের কাজ জানে। রাখী তৈরি করা, কার্ড বানানো, সরা আঁকা, সেলাই  বহুকিছু। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বা বিভাগীয় অনুষ্ঠানের জন্য তারা বানাতো। আনন্দমেলায় বিক্রির জন্য সারা হস্টেল জুড়ে জিনিসপত্র বানানোও চলত। উত্তরশিক্ষায় কুমকুমদি কাজ দিতেন। আনন্দমেলার জন্য রুমাল করতে গিয়ে কুমকুমদির কাছ থেকে সেলাই শিখেছিলাম। এদিকে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় “ওয়ার্ক এডুকেশন” সূত্রে আমাদের রাজনগর বালিকা বিদ্যালয়ে সেলাই শেখানো হয়েছিল। শান্তনিকেতনে হস্টেলে গিয়ে কুমকুমদির কাছে থেকে শিখে আনন্দমেলার জন্য রুমাল বানাতে খুবই ভাল লাগত তখন।

যাবতীয় বিনোদন আর বিনোদনের অভ্যাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। হস্টেলে একে অন্যের কাছ থেকে বিভিন্ন দক্ষতা  ছাত্রীরা শিখত তারপর  নিজেরা চেষ্টা করত। পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে উত্তরশিক্ষায় আসা “বহিরাগত” ছাত্রীরা ধীরে ধীরে শিখে নিত নানা ধরনের কাজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর অন্যদের দেখতে দেখতে নিতান্ত আনাড়ী ছাত্রীটিও দক্ষ হয়ে উঠত নানাধরনের কাজে। সময় যাপনের নিজস্ব প্রকরণ আর উপায়ের স্বতন্ত্র একটি আদল নির্মিত হয়ে উঠত এইভাবে। বিনোদনের একটি নিভৃত বয়ান গড়ে উঠত প্রত্যেকের। কেউ সেলাই করে, কেউ পদ্য লেখে, কেউ সরা আঁকে অথবা পরিকল্পনা করে রাখে সামনের আনন্দবাজারে কি ধরনের কাজ সে করবে। পরীক্ষা শেষ হবার পর অনেককেই দেখতাম  কাপড়, সুতো কিনে আনতে অথবা কার্ড আর রং কিনে আনতে। বাড়ি যাবার আগে যতটা সময় পাওয়া যাবে তখন নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অথবা বাড়ি গিয়েও দীর্ঘ ছুটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা করে নিয়ে যাওয়া জরুরি ছিল অনেকের কাছেই। অবসর যাপনের এবং বিনোদনের একটি ভিন্ন মাত্রা ছিল যা কোনো সাপেক্ষতায় যুক্ত নয়, নিজের ভিতর থেকে উৎসারিত। বাইরে থেকে তীব্র কোনো প্রভাবক ছাড়াই নিজের নিভৃতির মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং বিভিন্ন কাজের ভিতরে নিজেকে প্রকাশ করার একটি নিবিড় প্রক্রিয়া সেইসূত্রে তৈরি হতে থাকত। এর ভিতরেই গড়ে উঠত বিনোদনের বিকল্প পরিসর যা আত্মক্ষয়ী নয়, আত্মনির্মাণে সহায়ক।যার যা তৈরি করতে ইচ্ছা করছে সে যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী না ও হয়, হস্টেল খুঁজে কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবেই সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য যে সেই বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। এইভাবে পারস্পরিক কাজ এবং দক্ষতা লেনদেনের একটি সাবলীল প্রক্রিয়া হস্টেলের মধ্যে বহমান ছিল। সোসাল মিডিয়া আর তীব্র উত্তেজক বিনোদনের কোনো অভ্যাস তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রমানসকে গ্রাস করে নি। নির্মাণের, সাধনার মধ্যে থেকে উঠে আসত নিজের বিনোদিত হবার স্বতন্ত্র ধাঁচ, যা কাউকে ছাপিয়ে নিজেকে জাহির করে না অথচ স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এই অনন্য ভাবে সাধারণ  হবার তালিম শান্তিনিকেতনের শিক্ষা দর্শনের মধ্যে যেমন রয়েছে তেমনি তা হস্টেলে মেয়েদের বিনোদিত হবার, আনন্দিত হবার স্বতন্ত্র আদলটিও গঠন করে দিত অজান্তেই।

দ্বাদশ শ্রেনীর প্রি ডিগ্রী পরীক্ষা হবার পর স্নাতকে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত যে সময় পাওয়া গেছিল তাতে আমিও তৈরি করেছি্লাম দুটো সালোয়ার। কুমকুমদি নকশা করে দিয়েছিলেন আর সেলাই গুলোও শিখিয়েছিলেন। আর আমি সেলাই গুলো করেছিলাম। প্রায় ষোল বছরের আবাসজীবনে এই লকডাউন সূত্রে দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার সুবাদে সেইসব খুঁজে পাওয়া গেল। মনে পড়ে গেল অজস্র কথা আর দৃশ্য পরম্পরা। 





Friday, August 20, 2021

 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শ শালা -  মধুপর্ণা কর্মকার। ২৩ শে কার্তিক ১৪২৭।  নভেম্বার ৯ ,২০২০। 

অরন্ধন - ছবি প্রদর্শশালা।  - মধুপর্ণা কর্মকার।  ৩ জানুয়ারী ২০২১ / ১৯ শে পৌষ ১৪২৭। 


শান্তিনিকেতেন, ডিসেম্বার,  ২০২০। 




                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...