Wednesday, September 30, 2026

 

                                           দণ্ড

                                          মধুপর্ণা

 

যোগিনীর সঙ্গে সকালে দেখা আচমকা। প্রাতঃকালীন সাক্ষাৎ। নির্দেশ বা আদেশের মত করিয়া বলে, চুপচাপ নীরবে কাজ গুলি করিয়া যা। করিয়া যা। সাধনা বিচ্যুতি সমস্ত সমস্যার কারন। দ্বিমত করিবার কোনো কারণ না দেখিয়া চুপ করিয়া যাই। তাহাকে অতি পুরাতন একটি পরিপক্ক আত্মা বলিয়া ভ্রম হয়, এই ভিন্ন দেশ কালে, এই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সে কি করিতেছে! কেনই বা সে এই বিন্যাসের ভিতর জন্মাইল। রা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে! উত্তর আসিয়া যায়, বোধ করি ঋণ রাখিয়াছি কিছু তাহাই শোধ করিতে আসিয়া পড়িয়াছি এইখানে। প্রশ্ন করি, তুই আছিলি কোথায়?  সে চুপ করিয়া যায় আর তাহার চোখের কোনা ছলছল করিয়া উঠে। বুঝিতে পারি সে আছিল কোনো উদ্যানে, অভয়ারন্যে। তাহার পর তাহার এইখানে আগমন। আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বিবেচনা দিয়া সে দেখিতে পায় শুনিতে পায় আর বুঝিতে পারে। সেই কথা সে বলিয়া বেড়ায়। কতদিনের জন্য আগমন, ফিরিবি কবে? সে প্রায় কাঁদিয়া ফেলে, আমার হাতে নাই সেই হিসাব, আমি জানি নে, কবে ফিরিব। আমার ঋণশোধ হৈলে আমি ফিরিব। কি আছ্র ররণ তোর বল আমায়, আমি শোধ দিয়া দিই, তুই ফিরিয়া যা। যোগিনী বলে, ঋণ   মকুব হয় না। অনেক সাধনার ফিরিয়া যাইতে পারিব। বলি, তোর দণ্ড তো বেশ জটিল। সে বলে, জটিল না, শিক্ষার জন্য মূল্য চুকাইতে হয়, আমি মূল্য দিয়া ফিরিব।  

Tuesday, September 29, 2026

 

                                                 ছাপ

                                                 মধুপর্ণা

 

যোগিনী আসিয়া হাসিয়া বসে। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলিতে থাকে, দেখা কি কি সঞ্চয় করিলি আর কি কি বর্জন করিলি, আমি সরোজমিনে তদন্ত করি ! বলি, থাক, দুইয়ের পাল্লা সমান। বর্জনের পাল্লা কিঞ্চিত ভারী। অনেক ভাবিয়া সে বলে, কি সবচেয়ে ভয়ংকর ক্রুরতা জানিস ? বলি, জানি না। তুমি রাখো তোমার যাবতীয় আবোলতাবোল কথা। যোগিনী দমিয়া যায় না, আবার বলে, সবচেয়ে সূক্ষতর ভায়োলেন্স হচ্ছে, অন্যের মানসিক গঠনকে নষ্ট করা এবং ভিন্ন মানসিক গঠনে অনুবাদ করা। যখন এই আঁচ পাবি তখন হয় প্রতিরোধ করিবি নয় পলায়ন করিবি। বলি, ছাপের কথা বলিতেছ ? হ্যাঁ, তাহাই, মনকে অক্ষত রাখিতে হইবেই, এই খানে কোপ বসাইতে দেওয়া যাইবে না। বলি, আর যে ছাপ রাঙাইয়া তোলে অন্তর বাহির! সেই ছাপ? যোগিনী একপ্রকার নাচিয়া উঠে, সেই ছাপ খানি পাইতে সাধকচিত্ত পাগলপারা। সেই রং সে দনিয়া জুড়িয়া খুঁজিয়া বেড়ায়। সেই ছাপ একবার যে পাইয়াছে তাহাকে আর রাখে কে, আর মারে কে?  বলি, সেই ছাপ পাইলে মানুষে হয় দিব্যোন্মাদ! পথবৈরাগী। বুদ্ধে দিয়াছে সেই ছাপ, চৈতন্যে দিয়াছে আর দিয়াছে রবীন্দ্রনাথ।  যোগিনী বলে, আমি ভিন্ন ছাপের কথা বলিতেছি, ছাপের পাপের কথা। অন্যকে প্রভাবিত করিয়া, তাহার মানসভূমিতে বিষের গাছ পোঁতার কথা বলিতেছি। নারীদের মানসভূমি উচ্চফলনশীল। সেই ভূমিতে গাছ পুঁতিতে চায় বিষাক্ত আত্মারা। এইটা  হৈল নরকের রাস্তা। নীচে নামতে নামতে একেবারে তলিয়ে যাবার দরজা এইখানে শুরু হয়। প্রশ্ন করি, তুই জানিলি কি প্রকারে! এইসব প্রশ্নে সে চটিয়া যায়। সাবধান করিতে নানা কথা বলি, শুনিলে শোন, না শুনিলে দুর হৈয়া যা। বলি, শুনিতেই তো আসিয়াছি। তুমি যাহা বলিতেছ, তাহা শুধু শুনিতেছি তাহা নহে, জানিয়াছি এইসব অভিজ্ঞতা দিয়া। যোগিনী বলে, তুই কি ভাবিস, মানুষের কেবল বদন দেখিয়া ক্ষান্ত দিই সামনে এলে কেউ। তাহার ভিতর বাহির, মনোভাব, অতীত পড়িয়া ফেলিতে পারি। প্রবনতা, সম্ববনা,উদ্দেশ্য বিধেয় মুখ দেখিয়া বলিয়া দিতে পারি। তোকে দেখিয়া বুঝিয়াছিলাম সূক্ষতর ভায়োলেন্স অভিজ্ঞতার ভিতর আছে তোর।বলি, শুধু অভিজ্ঞতা নয়, প্রতিরোধ ও আছে। সূক্ষতর ভায়োলেন্স আরো সূক্ষ করাত দিয়া কাটিয়াছি। যোগিনী বলে, খুব সাবধান, মানসিক গড়ন আগলাইয়া রাখিতে হৈবে যে কোনো মূল্যে। কোনো কোনো সম্প্রদায় এই ভায়লেন্স খুব উদ্দেশ্য নিয়া, ছক কষিয়া করিতেছে। খুব সাবধান। বলি, উদ্দেশ্য বুঝিয়া তাহাদের পালটা দিবার ক্ষমতা বহুদিন আগে জোগাড় করিয়া লৈয়াছি। ভাবিও না, এখন নিজে বাঁচিব, অন্যদের বাঁচাইব। 

 

 

                                              শরতাবকাশ   

                                                মধুপর্ণা 

 

আর তারপর একদিন বিকেলে শান্ত একটা বাতাস ঘুরে বেড়াবে ঘরময়। শান্ত বাতাসের নীচে শান্ত টেবিল, তাতে বহু বহু আগের একটা শান্ত বিকেল এসে বসবে। আসন্ন পুজোর কাশের সারি, মায়ের নারকেল নাড়ু, আর নতুন জামার গন্ধ – এইসব দিয়ে সাজানো একটা দিন বহু পুরাতন দিনের সঙ্গে এসে জুড়ে যাবে। আনন্দের একটা গন্ধ এসে বাঙ্গালীর উঠোনে এসে ঘুরে বেড়ায় এই শরতকালে। আকাশে মেঘ উঠিয়াছে সুনীল, মাঠে মাঠে কাশ, আর বিকেলে বিকেলে থেকে থেকে ঘনঘোর বৃষ্টি, পুজোর মিস্টির জন্য মায়ের তোড়জোড় শুরু হয় ঠিক এই সময়। খড়ের কাঠামোয় মাটি লেগে গেছে ইতিমধ্যে। বাইরে গেলেই একটা পুজোর বাতাস এসে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে আচমকা। কিশোর পাঠ্য গল্প বই এর মত রোমাঞ্চ এসে দাঁড়াবে। বাস্তব বদলে যায়, বদলে যায় সবকিছু, শুধু বদলায় না শৈশবে শেখা বর্ণমালা, এখন ও প্রতিদিন প্রতিদিন সেই একই বর্ণমালায় দাগ বোলানো। একই অক্ষর দিয়ে শব্দ সাজানো। শৈশবের নিত্যবৃত্ত অতীত আর ঘটমান বর্তমান দুটো শাখা নদীর মত একত্রে এসে মেশে। আবাসনের উপরের তলায় কোনো খুদে পড়ুয়ার হাত ফস্কে এটা বেগুনি রঙের ‘আ’ এসে পড়েছিল বারান্দার স্নেকপ্ল্যান্টের টবে। উপরের বারান্দায় কেঊ রঙ্গীন বর্ণমালা শিখছেন। বর্ণ চিনছেন। আর নীচের ঘরে শান্ত টেবিলে সেই বর্ণমালা দিয়ে বুনে চলেছি দিন আর দৈনন্দিন।

Monday, September 28, 2026

 

 

                                                               তাহার কথা

                                                                 মধুপর্ণা

 

যোগিনী এক এক দিন এক এক গল্প ফাঁদিয়া বসে। শিখাইতে গেলে গল্পের ভিতর দিয়া শিখাইতে হয়, তাহার পর গান দিয়া শিখাইতে হয় এই তাহার যুক্তি। ভারতবর্ষে সাধনা একটি পেডাগজি। এই কথা সে গাঢ় করিয়া বলে, আর গল্প গাথা, গান তাহার সুফল প্রসূত বাই প্রোডাক্ট। সেদিন বলিল, মাড় বিজয় কি জানিস? বলি, জানি। সে সরু চোখে তাকায়। তারপর নিজের মনেই বলিতে থাকে, বুদ্ধ বোধিলাভের আগে এক পরীক্ষার মুখে পড়িয়াছিলেন, রাক্ষসে, যত রকম অশুভ শক্তি তাহার সাধনা ভঙ্গ করিতে আসিয়াছিল। তাহা তিনি জয় করিয়াছিলেন। বলি, অজন্তা ইলোরায় এই ঘটনার মূর্তি খোদাই করা আছে। আরো বহু গুম্ফায় এই ছবি রয়েছে। যোগিনী বলে, রাক্ষস গুলি বাহির হৈতে আসিল? নাকি ভিতর হৈতে বাহির হৈয়া আসিল? বলি, দ্বিতীয় কথাটি আমি মানিতে ইচ্ছুক নহি। পরীক্ষার খাতিরে এই ভয়াবহ বীভৎসাকার আবির্ভাব মানিতে পারি। বাহির হৈতে আসিয়াছে। যোগিনী দ্বিমত করে না। বলি, জানিস, লাইব্রেরীতে একদিন এক সন্ন্যাসিনীর সহিত আলাপ হয়, তাঁহার সহিত আলাপ বাড়ে, তিনি কথায় কথায় বলিয়াছিলেন, ভিতরের বাধা গুলি বাহিরে নানা আকারে প্রকট হয়। এ কথা কি সত্য? যোগিনী ছ্যাঁত করিয়া উঠে, বলে, সত্য কি মিথ্যা এই ভাবে প্রশ্ন করা উচিত নয়। অভিজ্ঞতা, উপলব্ধী, বোধদয় এইগুলি সত্য না মিথ্যা এই প্রকারে জিজ্ঞাসিলে যায় না জানা। ঘটে নাহয় ঘটে না, হয় নাহয় হয় না, যাহার হয় তাহার কাছে সত্য, যাহার হয় না তাহার কাছে মিথ্যা। অভিজ্ঞতার ভিতরে আসা আর বাহিরে থাকার ভিতরে পার্থক্য এইখানে প্রাসংগিক। অভিজ্ঞতার বিভিন্ন স্তরে সবাই রহিয়াছে, সবার যাত্রা আলাদা – এখন কেহ যাহা সত্য বলিতেছে কিছুদিন পর তাহা মিথ্যা বলিবে, এখন কেহ যাহা মিথ্যা বলিতেছে কিছুদিন পর তাহা সত্য বলিবে। অভিজ্ঞতার কোন স্তর রহিয়াছ তাহার উপর নির্ভর করে তুমি কি উপলব্ধি করিতেছ। মত বদলায়। সবকিছু বদলায়। বলি, তুই কি আজ শুধু মাড় বিজয়ের কথা বলিতে আসিয়াছিলি। যোগিনী ঝোলার ভিতর ভরিয়া নেয় তাহার আসন।

Wednesday, September 23, 2026

 

                                         যোগিনী সমাচার

                                           মধুপর্ণা

তাহাকে বলিবার মত যাহা কিছু সারা হৈয়াছে বলা, পুনর্বার সাক্ষাতে বলি যোগিনিকে, আমারে তুমি অশেষ করেছ। তাহার মানসভূমি কিঞ্চিত বন্ধুর। উঁচুনীচু, বেখাপ। জানো, ছোটনাগপুর মালভূমির লেজ, বিস্তৃত চাতালে জন্ম আমার। তোমার মন মর্জি ঐরকম ঢালু, টিলাময়। যোগিনী, বিভ্রান্ত করিয়া চুপ করিয়া থাকে। ফস করিয়া বলিয়া বসে, হোয়াট হ্যাপেন্ড! উত্তরে বলি, লাইফ হ্যাপেন্ড সিস্টার। নাথিং সিরিয়াস। এইবার তাহার মনোমত হৈয়াছে সংলাপ। বলে, শোন, যা জায়গায় ঘোরার যা নিয়ম, এই গ্রহটিতে ঘুরিতে মানুষের দেহ ধরিতে হয়। বেড়াইতে আসিয়া তোরা বড় গোল করিস! সঙ্গত দিয়া একখানা গানের একটা লাইন স্মরণ করাইয়া দিই, দিস ওয়ার্ল্ড ইজ নট মাই হোম, আই অ্যাম জাস্ট পাশিং থ্রু! যোগিনী বসিয়া বিড়ি ধরায়, বলে, ঘুরিতে গিয়া সেইখানে থাকিয়া যাইবার মত অদ্ভুত আচরণ কেহ কেহ করিয়া থাকে। তাহাতে সেই স্থানের সহিত সম্বন্ধটি নষ্ট হৈয়া যায়। হাসিয়া ফেলি, কোনো কোনো সম্প্রদায় দুনিয়ার উপর অধিকার কায়েম করিতে মরিয়া হৈয়া উঠে, দুনিয়া তাহাদের সর্বত্র হৈতে উৎখাত করিতেছে, খবর রাখো! যোগিনী বিড়িতে অন্তিম একটি টান দিয়া থুতু সমেত ফেলিয়া দেয়। জানি। আর জানিয়া মনের একটা কোনা বিরক্তিতে ভরিয়া যায়। কুকুর যে জায়গায় প্রস্রাব করিয়া আসে তাহার মনে হয় সেই জায়গা তাহার হৈল। অধিকার কায়েমের এই হল নিকৃষ্ট পন্থা। বলি, এ কেমন কথা! তুমি বলিতে বলিতে হঠাত অশ্লীল হৈয়া যাও। যোগিনী চড়াত করিয়া জ্বলিয়া উঠে, থাকো তুমি তোমার শ্লীলতা লৈয়া, শূন্যস্থান খিস্তি দিয়া ভরাইয়া দিব, কি করিতে পারিবি তুই! খিস্তি খেউড় খারাপ নাকি! যাহা যা তাহা সেই প্রকারে ব্যক্ত করিয়া সততা রক্ষা করিতে হয়। ভাষার ভিতর অনেক প্রকোষ্ঠ। একটি প্রকষ্ঠে বসিয়া তুমি কেবল সুমধুর কথা বলিয়া যাও আর রাক্ষসে তোমার সব বিনষ্ট করিয়া যাক। যোগিনীর সহিত সহমত হৈয়াও কথা বাড়াইতে, তাহার আরো কথা শুনিতে তর্ক করিয়া যাই, সে যে তাহা বুঝে না তাহা নহে। ফের বলে, বহির্বাটিতে ফুলের গাছ দিয়া সাজাইয়া গোজাইয়া তুমি কত নান্দনিক তাহা বিজ্ঞাপন করিয়া রাখো, কিন্তু যদি বাঁচিতে চাও ঘরের একেবারে ভিতরের কামরায়, দা, কুরুল, বেত, তলোয়ার রাখিও। সুত্র পাইয়া বলি, ভাষাও তেমনি না রে! মিষ্টিভাষণ সামাজিক মুদ্রা। কিন্তু প্রতিরক্ষার জন্য কিছু চপেটাঘাত রাখিতে হয়। একত্রে হাসি পাইয়া যায়। থামিয়া সে আবার বলে, হ্যাঁ যাহা বলিতেছিলাম, বেড়াইতে আসিয়া গোল করিবার কথা। অধিকার করিবার কথা চিন্তাতেও না আনিয়া যদি সেইখানে একটি গাছ পুঁতিয়া আসিতে পারো, যদি কিছু জায়গা পরিষ্কার করিয়া আসিতে পারো তাহা হৈলে সেই জায়গার সহিত একটি সম্বন্ধ স্থাপন হৈল। কল্যাণের সম্বন্ধ। আর তাহা চিরস্থায়ী হৈবে। আর যদি গিয়া কেহ লুটিতে থাকে, আর থাবা বসাইতে চাহে তাহাকে লাথি মারিয়া ফেলিয়া দিবে কিছুদিন পর। এই গ্রহে ঘুরিতে আসিবার বিষয়টিও তাই। তাহাকে বলি, তুমি যাহা কিছুর সহিত একটা মিলাইয়া জুলাইয়া বিরাট একটা কিছু বলিয়াছ এই প্রকার ভান করিতে চাহিতেছ! সব বিন্যাস এক! সব ম্যাট্রিক্স সমান! যোগিনী শান্ত হৈয়া বলে, ধরণ দেখিবার চোখ যেদিন তৈরি হৈয়া যাইবে সেইদিন বুঝিতে পারিবে। তাহার পূর্বে নাটক কিছু কম করো। তাহার পর তাহার ঝুলির ভিতর খুঁজিয়া বাহির করে একটি খাতা। পাতা ওল্টায়, কিছু লেখা, কিছু আঁকা। দিন তারিখ সমেত লিখিয়া রাখিয়াছে কি কি যেন। আবার খাতাটি ঝোলায় ভরিয়া রাখে। বলে, চল, সামনে নদী, পাড়ে গিয়া বসি।

Tuesday, September 22, 2026

 

                                          বাদল দিনের ছবি ও গান

                                             মধুপর্ণা

তারপর পরিচিত বর্ষার কাছে রেখে দেবে পিছনের অনেক বছর। নতুন রাস্তার খোঁজে বর্ষা অতিথিশালার মত। পুরাতন ক্লেদ দেয় ধুয়ে, আর সবুজ চকচকে পাতাদের মত নতুন পথ এসে দেখা দেয় সামনে। বর্ষার দৃশ্য অক্সিজেনের মত টেনে নেওয়া যায়, নদীর কিনারা টৈটম্বুর, চারপাশে ঘাসেদের সজীব সামারোহ, ভিজে মাটির দৃশ্য, আর সরু জল কোন দিকে বয়ে যায়, গাছে গাছে পাতাদের আনন্দ প্রকট। এইসব বর্ষার দিনে নতুন সম্ভবনারা ইতিউতি উঁকি দেয় এখানে ওখানে। পাহাড়ে বর্ষা, শান্তিনিকেতনে বর্ষা আর মফস্বলী বীরভূমের বর্ষা – একটা ক্যানভাসের উপর অনেক গুলো আঁচরের মত। একটা ছবি মাথার ভিতর সাজিয়ে নিতে গেলে অনেক বর্ষার দৃশ্য, শব্দের সমাপতন দরকার। বহু নৈবনৈবচ র ভিতর একটা ছবি যদি প্রস্তুত করা যায় তাহলে অবসরে গাওয়া যায়… রিম ঝিম ঘন ঘন রে… বরষে…। একটা বর্ষার দিন লিটেরেচার রিভিউ এর মত বহু বহু পুরাতন বর্ষার দিন মনে করায়। পর পর চলে আসে তারা। বৃষ্টি দিনে গুম্ফা ঘুরে আসার কথা, সাদা শাড়ী কমলা পাড় উত্তরশিক্ষার দিন, ওল্ড বিল্ডিং থেকে নিউ বিল্ডিং যাতায়াত পাশে কদম্বের গাছ, ভিজে একসা হয়ে স্কুটিতে ইলামবাজার জঙ্গল, শাল গাছ আর ঘন বৃষ্টিতে পুকুরের জল থৈ থৈ। অনেক শৈশবে ভিজে এসে ভেজা দশ টাকার নোট শুকোতে দেবার দৃশ্য, ভিজে খোয়াই, পূর্ণ কোপাই, আর জারুল ফুল। খর বাস্তবের লোকে বলবে, ডিমিস্টিফিকেশনের কথা। রোমান্টিসাইজ করার কুফল ইত্যাদি। কিন্তু...  

 

                                লোকবিশ্বাসে গাছেরা কথা শোনে

                                          মধুপর্ণা

ভয়াবহ বৃষ্টির দিন আজ। রাজনগর, বীরভূম। উঠোনের গাছেরা কার্নিভাল করছে যেন। দুলে দুলে ভিজে যাচ্ছে। প্রতিটা গাছে সবুজের শেড আলাদা। দেবদারুর সবুজ আর নিমের সবুজ, পেয়ারা গাছের সবুজ আর আতার সবুজ, খিন্নি পাতার সবুজ আর টগর পাতার সবুজ ভিন্ন কিন্তু আলাদা নয়, সদৃশ কিন্তু এক নয়। আগাছা আর লেবু পাতার সবুজ এক কিন্তু সমান নয়। হিন্দুস্থানী ক্লাসিক্যাল চলছে ভিতরে। ম্যায়নে উম্র লাগাদি সারি… । কয়েকদিন আগে এক দাদা বলছিলেন, শান্তনিকেতনের গাছ গুলোর সৌষ্টব আলাদা, মজা করে বলি, রবীন্দ্রনাথের গান শুনে গাছ গুলো সুললিত সুন্দর। দাদা বলে, বোলপুরের গাছ গুলো দেখেছো? হ্যাঁ, আনহীলড। দেখে মনে হয় মহা ঝামেলার মধ্যে আছে। গাছেরা অনুভূতি বুঝতে পারে দাদা? তিনি এবার মজা শুরু করেন, হ্যাঁ, মনের কথা লিখে অথবা বলে গাছে ঢিল বেঁধে আসে অনেকে! বুঝতে পারে বৈকি! মানসিক কথার কথা বলছেন! সে তো লোকবিশ্বাস। দাদা হাসেন। মানুষের ভাষা তারা শুনতে পায় বা বুঝতে পারে কিনা জানিনা। কিন্তু যারা গাছের ভাষা জানে তাদের ভাষা গাছেরা বুঝতে পারে। বলি, বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের তলে বসলেন, বৃক্ষটি কি জানত বুদ্ধের কথা! দাদা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান, বলেন, বনের গাছ আর জঙ্গলের গাছের রকম আলাদা জানো! লোকালয়ের গাছ অন্য। লোককথায় আছে কোনো গাছ মেরে ফেলতে হলে তার সামনে গিয়ে গালিগালাজ করে আসত অনেকে, গাছটা এমনি মরে যেত আর যত্নে ভালোবাসায় গাছের বিস্তার অন্যরকম হয়! মনে পড়ে যায় আরো একটা লোকবিশ্বাস অথবা কিংবদন্তী অথবা মিথ অথবা প্রত্নপ্রতিমা… রাজনগরে যখন বিধর্মীদের আক্রমণ হয়েছিল, সব লুঠপাঠ করে দখল করার জান্তব প্রক্রিয়া তখন চলছে, সম্পদ এবং নারী – এই দুইয়ের প্রতি বিধর্মীদের লোভ, দখল আর লুঠপাঠ তাদের রক্তে, আর স্বচ্ছতা নয়, কৌশল একমাত্র হাতিয়ার। তখন রাজাকে মেরে ফেলে এবার তারা অন্দরমহলের দিকে ধাবিত। রানী তখন ছুটে গিয়েছিল রাজবাড়ির নিকটস্থ গাব গাছটির কাছে। গিয়ে বলে, আমাকে রক্ষা করো, বিধর্মীদের অসুস্থ বিকার আর রিরংসার হাত থেকে, রাজা মৃত। কথিত আছে, গাব গাছটি তার কথা শোনে আর তার কান্ড দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, রানী ভিতরে প্রবেশ করেন গাছের। বিধর্মী আক্রমণ কারীরা রানীকে  খুঁজে হন্যে। তারপর বাকী সবাই রানীকে খুঁজে পায় না। তারপর দেখা যায় গাছের কান্ডে রানীর কিছু চুল  আটকে থেকে গেছে, রানীকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে  গাছ তার দরজা বন্ধ করতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় কিছু চুল বাইরে থেকে যায়। রাজনগরের প্রতিটা শিশু কিশোর এই লোককথা শুনে বড় হয়। আমিও শুনেছি খুব ছোটবেলায়, ওয়ানে পড়ার সময়, রানীর স্নানঘর হামাম তখনও সংস্কার হয় নি, ঝোঁপঝাড়ে পুর্ণ তখন, কালীদহের জল নাকি সেই হামামে উঠে এলে রানী স্নান করতেন, আবার সেই জল দহে ফিরে যেত। কালীদহের মাঝে মা কালীর মন্দির সুড়ঙ্গ পথে ডাঙ্গা থেকে কালী মন্দিরে যাওয়া যেত। উল্টোদিকে হাওয়ামহলের সিঁড়ি, খিলান গম্বুজ সব খসে পড়েছে। আর তার পাশে গাব গাছটি এখনও দাঁড়িয়ে। একটি জীবন্ত লোককথা এখনো লোকমুখে ঘুরে ফেরে, গাছটি রানীর কথা শুনেছিল। রানীকে রক্ষা করেছিল। সামনে রাজার দালান নামে পরিচিত কাছারী বাড়ি,  পাশে হাটতলা তারপাশে বারুদখানা। মোট কথা হল, লোকবিশ্বাসের ভিতরে গাছেরা কথা বলে, মানুষের কথা শোনে। গাছে ঢিল বেঁধে এলে শোনে কিনা জানি না, কঙ্কালীতলায় পাকুর গাছে অনেক ঢিল বাঁধা রং বেরঙ্গের সুতো দিয়ে। তাদের আর্জি গাছ শুনবে কি না জানিনা, কিন্তু যাদের বলার ছিল তাদের বলা তো হল। লোকবিশ্বাসে গাছেরা কথা শোনে। দাদা বলেন, শুধু লোককথায় নয়, এমনিও শোনে, পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ, বলে দেখো, শুনবে। কার্শিয়াং এর চা বাগানে একটা বড় গাছের কথা মনে পড়ে। শুনতে পায় কিনা না জেনেও বলে এসেছিলাম কিছুকথা। তারপর পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল কিছুদিনের মধ্যে আমূল। 

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...