Monday, August 31, 2026

 

                                                যোগিনী সংবাদ

                                                 মধুপর্ণা

 

তারপর একটা সময় আসে, যখন আকাশ পরিষ্কার আর সূত্র গুলি চোখের সামনে সুবিন্যস্ত। যোগিনী বড় করিয়া একটা নিশ্বাস নেয় আর বলে, একটি ভিত্তির উপর দাঁড়া। আমি বলি, তোমার কথার আগাপাশতলা বুঝি না। যোগিনীর ভাষা বুঝিতে প্রায় বার বছর লাগিয়া গিয়াছে। সে বলিয়া যায়, শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়ায় আগে। তারপর শাখা প্রশাখা ছড়ায় গাছ। দেখেছিস? বলি, শিকড় ছাড়া গাছ দাঁড়াবে কেমন করে, মাটিতে গাঁথা তাই তার বিস্তার সুললিত, সুন্দর। যোগিনী মুখের কথা কাড়িয়া নেয়, বলে, গাছ যেমন শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়ায় আর শাখা মেলে উপরে। আমি তাহাই বলিতেছি। পায়ের তলা হৈতে মাটি কাড়িয়া লৈতে দুনিয়ার বহু আয়োজন। গাছ কাটিয়া ফেলিতেই পারে যে কেন যখন তখন কিন্তু উপরাইয়া ফেলিতে অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়া যাইতে হয়। পূর্ণ বিকাশ শিকড় ছাড়া হৈবে না। আমি কিঞ্চিত অবিশ্বাস লৈয়া চুপ করিয়া থাকি আর ঝগড়ার সুরে বলিতে চেষ্টা করি, তুমি সব জানো! তোমার এইসব মনগড়া কথা আমি বিশ্বাস করি না। যোগিনী হাসে। অভিজ্ঞ মানুষ অনভিজ্ঞতা দেখিয়া যেমন সুন্দর করিয়া হাসে তেমনি করিয়া হাসে। বলে, তুই আমাকে আগে শ্রদ্ধা ভক্তি করিতিস বিস্তর। ক্রমে তাহা প্রশ্নে অবিশ্বাসে রূপান্তরিত। বলি, তুই কি চাস! আনুগত্য! প্রশ্নহীন আনুগত্য! যোগিনী বলে, না। তুই আমাকে প্রশ্নে প্রতিযুক্তিতে ধ্বংস করিয়া দে তাহাই আমি আকাঙখা করি, কিন্তু অবিশ্বাস করিস না। এইখানে বড় ব্যাথা আমার। সব জয় করিয়াছি, এইটি এখনও ব্যাথা দেয়। সুযোগ পাইয়া রসিকতা করি! ব্যাথা আছে এখনও তোর! তুই যেমন পাষান,পিশাচী। তোকে কিছু ব্যাথা দেয় এখনও! যোগিনী নরম হৈয়া আসে। নরম করিয়া পাশে বসে। উগ্রচন্ডা ভাব তাহার কোমল হৈয়া যায়। চোখে চোখ রাখিয়া বলে, ভিত্তির উপর দাঁড়া। শিকড় বড় প্রয়োজন। শাখা মেলিতে শিকড় বড় প্রয়োজন। যোগিনীর সহিত সম্বন্ধ অম্লমধুর। অধিকাংশ সময়ই বিবাদ বিসম্বাদ। পারিলে পরস্পরকে আঁচড়াইয়া খাইয়া ফেলি আর কি। যোগিনী এই প্রথা চালু করিয়া রাখিয়াছে। আমিও তাহাতে সঙ্গত দিয়াছি। তর্ক বিতর্ক। কিন্তু শ্রদ্ধা অটুট। তাহাকে এই প্রকারে নরম হৈতে দেখিয়া ছ্যাঁত করিয়া উঠে। তাহাকে বলি, শোন তোকে উগ্রই মানায়। তোর নরম ব্যবহার দেখিতে পারি না। তুই ছাড় এইসব ভোলচাল। স্বমহিমায় ফিরিয়া আয়। যোগিনী তাহার সেই রক্তপিপাসু হাসি আবার ভাসিয়া উঠে। বলি, তুই বড় অসহ্য রে, তোকে না গিলিতে পারি, না ফেলিতে পারি। যোগিনী বলে, তোকে আমি মন্ত্র দিব। বলি, থাক। আমার আর মন্ত্রে কাজ নাই। তুই রগড় করিয়া আমার মাথা নষ্ট করিস না। যোগিনী তাহার স্বভাবে ফিরিয়া আসে, সেই রহস্যময়, সান্ধ্য আবছায়া ফিরিয়া আসে তাহার কথায়। বলে, যন্ত্রখানা মন্ত্র ছাড়া চলিবে না। তাহার আগে ভব নদীতে স্নান করিতে হৈবে আর তাহার পর একটি আয়না তোকে আমি দেখাইব। বলি, অবিশ্বাস আমি তোকে আর করিব না। তুই বলিলে অবলীলায় আগুনে দিব ঝাঁপ। বল কোথায় কি করিতে হৈবে। তাহার অন্তর্দৃষ্টির সামনে আগে অস্বস্তি লাগিত। এখন আর তাহা নাই। সে বলে, মন্ত্র লৈবি যদি তাহা হৈলে পুরাতন বসন ফেলিয়া আয়। অতীত একখানি সময়ের সুতা দিয়া তৈরি বসন বৈ তো না। জীর্ণ বস্ত্র বহুবার ত্যাগ করে মানুষ। নতুন বসনে স্নান করিয়া মন্ত্র লৈতে হয়। যোগিনী সেই নদীর কথা বলিতে শুরু করে, আর কি কি আচার আছে একে একে বলিতে থাকে। আর একসময় বলে, দ্বন্ধে কি খুঁড়িয়া খায়? বলি, না। চল।

Saturday, August 22, 2026

 

 

                                      সাক্ষাত সমাচার

                                        মধুপর্ণা

যোগিনীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর বদলাইয়া যায় মানুষ। ক্ষমতার চাইতে শক্তি কতটা জরুরি জানিয়া যায়। একটি স্বচ্ছতা তাহাকে নদীর জলের মত স্বাধীন করিয়া তোলে। যোগিনীর সংস্পর্শ পরশমনির ন্যায় সক্রিয়। স্পষ্ট প্রজ্ঞা তাহাকে করিয়াছে কালদর্শী। তাহার মগ্নতা দেখিয়া এক এক সময় স্তব্ধ হৈয়া যাই। সে জিজ্ঞাসে, কি রে তোর এতেই দম শেষ? বলি এত কর্কশ কেন তুমি? সে বলে, তুই নরক দেখেছিস? বলি, দেখি নাই, তবে আঁচ পাইয়াছি। নরকের কীট কিছু আক্রমণ করিয়াছিল তাহাদের নারকীয় ব্যবহার দেখিয়া ধারণা পাইয়াছি নরক কেমন হইতে পারে। যোগিনী উৎসুক হৈয়া চোখ সরু করিয়া তাকায়। চুপ করিয়া থাকে। তাহার পর ধীরে ধীরে বলে, অভিজ্ঞতা এমন জিনিস সকলের ভাগ্যে জোটে না। তুই নরক দেখিয়া উঠিয়া আসিয়াছিস ইহাতে বোধ হয় তোর কিছু পূণ্যফল আছিল রে। বলি, শক্তির ব্যকরণ শিখিয়াছি। সে হাসিতে থাকে, আমার বিরক্তি ধরিয়া যায়, তুমি হাসো কেন? কি বেদনা ভিতরে তোমার তাই হাসি পায় এত? ইহাতে সে চটিয়া যায়, বলে, দূর হ। আমার সম্মুখে আসিস না আর। এতদিনে জানিয়াছি তাহার আচার ব্যবহার, তাই চুপ করিয়া যাই। এই মুহুর্তে চলিয়া যাইলে যোগিনী চুল ধরিয়া টানিয়া আনিয়া সামনে বসাইয়া অতীত ভবিষ্যত উদ্ধার করিয়া দিবে। আর যদি চুপ করিয়া বসিয়া থাকি তাহা হৈলে কিছুক্ষন পর বলিবে, নরক যে কামড় বসাইয়াছিল তাহার দাগ আমি মুছিয়া দিব। তুই কিঞ্চিত ধৈর্য্য ধরিতে পারিবি? তাহাকে ভালো না বাসিয়া উপায় নাই। বলি, তুই এত রুক্ষ রূঢ়, তোকে ভয় লাগে। সে পারিলে হাসি দিয়া স্নান করাইয়া দেয়। তাহার হাসিতে ভিজিয়া বসিয়া থাকি কিংকর্তব্যবিমুঢ়। হাওয়ার ভিতর কি যেন সূত্র খুজিয়া পাইয়া বলে, জন্মিয়াছিস শক্তি লৈয়া, ক্ষমতার দাবানল দেখিয়া বেভুলে কেন নিজের সাধনা ভুলিস! কি কারন! বলি, ভুলি নাই, কিন্তু প্রতিশোধ লৈতে চাই। তাহার চোখ দপদপ করিয়া জ্বলে, মুন্ড কাটিয়া রক্ত মাখিয়া নাচিতে ইচ্ছা যায়, ছেমরি! একটা মশাল জ্বলাইয়া রাখ নিভিতে দিবি না। একদিন আসিবে। একদিন আসিবে। কোমলতার নাটক করিয়া কেহ কিছু অর্জন করে না। দম থাকিতে হয় দম। বলি, তুই এই শক্তি পাইলি কি প্রকারে? সে বলে, নরকের ভিতর। 

Thursday, August 20, 2026

 

                                         যোগিনী তোমাকে…২

                                             মধুপর্ণা

দেখিতে পাই এক যোগিনী হাঁটিয়া যায় সময়ের আলপথ ধরিয়া। কি এক মগ্নতায় আচ্ছন্ন তাহার অবয়ব। দৃঢ় পায়ে হাঁটিয়া যায়, তাহার দৃষ্টি নরম অথচ অতলস্পর্শী। এক একটা মায়ার জালিকা সে দেখিতে পায়। তাহাকে জিজ্ঞাসিলাম, তুমি যাও কোথায়? সে অদ্ভুত ভাবে হাসে, যাত্রা তাহার পথের অনুরাগে। সে পালটা জিজ্ঞাসে, তুমি দাঁড়িয়ে কেন, হাঁটো। বলি, কোন দিকে? সে বলে, যে কোনো একদিকে। সবদিকে রাস্তা। যে কোনো একদিক দিয়ে হাঁটিলেই এক গন্তব্যে পৌঁছায় সকলে। হাঁটিতে হাঁটিতে কথা হয়, যোগিনীর চারপাশে জ্যোতির্বলয়। নষ্ট আত্মা সামনে আসিলে হয় তড়িতাহত হৈয়া ছিটকাইয়া পড়িবে নয় খোল নলচে বদলাইয়া শুদ্ধতার পথ ধরিবে। বলি, কি প্রকারে সাধিলে এই অসম্ভব? উত্তর আসে, তুমি দেখিতেছি দুনিয়াদারীর নিয়ম কানুন কিছুই শিখো নাই, ক্ষমতা নাশ করিতে ক্ষমতার বিন্যাস জানিতে হয় সূক্ষ্ম আকারে। জানিয়া তাহার পর তাহাকে নস্যাত করিতে হয়। যোগিনীর রকম দেখিয়া আগ্রহ বাড়ে। কথার পিঠে কথা বাড়ে না। একটি প্রবাহ বহিতে থাকে। সাবলীল, স্বচ্ছন্দ। যোগিনী বলে, চোখ কান নাক কি শুধু ভোগ করিতে পাইয়াছো? গান শুনিতে আর আকাশ দেখিতে আর ফুলের সুগন্ধ পাইতে! এই গুলি সজাগ করিয়া রাখিতে হয়। যাহাতে, আঁচ করিতে পার কোন বিষ কোন পথ দিয়া আসিতেছে, যাইতেছে আর আসন পাতিতেছে। একদিকে চালিত করিয়া দিলে তোমার বিপদ তুমি আঁচ করিতে পারিবে না। যোগিনীর ধনুকের ছিলার মত গড়ন আর তাহার বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি তাহাকে প্রায় মায়াহরিণী করিয়া তুলিয়াছে। বলি, কত জন্ম ধরিয়া তুমি এই সূক্ষ্মতায় উপনীত? সে তাকায় এক প্রকারে, তাহার অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, যেন এক একটি স্তর ভেদ করিতে করিতে আগাইয়া চলে, সামনের দৃশ্য দেখে কেউ, কেউ দেখে দৃশ্যের ভিতরের বিন্যাস, কেউ দেখে দৃশ্যের অতীত ভবিষ্যত, কেহ দেখে প্রেক্ষাপটে দৃশ্যটির জটিল অবস্থান,কেহ দেখে দৃশ্যটির আশু প্রভাব, সূদুর প্রভাব। যোগিনীর দৃষ্টি যেন সবকটি স্তর ভেদ করিয়া দৃশ্যটির সঙ্গে একটি সম্পর্ক স্থাপন ক্রিয়া ফেরত আসে, আর দৃশ্যটি প্রভাবিত করিয়া রাখিয়া আসে। সাধারণে কেবল দৃশ্য দেখিয়া, শব্দ শুনিয়া প্রভাবিত হয়, গ্রহণ করে। যোগিনীর শক্তি সেইখানে, যেখানে দৃশ্যের সহিত তাহার দৃষ্টির ধাক্কা লাগিয়া তৃতীয় একটি মাত্রা নির্মিত হয়। দৃশ্যটি বদলাইয়া যায়। যোগিনী বদলায় না। স্থির প্রজ্ঞা এইমত তুমি পাইলে কোথায়? যোগিনী বলে, মানুষের বিষ ধারণ করিয়া ছিলাম বহুপূর্বে।বিষে আমাকে খাইবে কি তাহাকে খাইয়া হজম করিয়া ঔষধী বানাইয়াছি। সাপের বিষে কেহ মরে আর রকম জানিলে সেই থেকে ঔষধ বানায় কেহ। তাহাকে করজোরে নমস্কার করি। যোগিনী হা হা হাসিয়া উঠে। তাহার হাসিতে বোধ করি সামনে কাঁচ থাকিলে চুরমার হৈয়া ভাঙ্গিয়া যাইত। মানুষও খান খান হৈয়া ভাঙিয়া যায় হয়তো। যোগিনীর এই বিদ্যা দেখিয়া মস্তিস্কে একটি প্রকষ্ঠ খুলিয়া যায়। যোগিনী বলে, পা চালাও, ত্বরা করো, ধীরে চলিলে গন্তব্যের আগে সুর্য্য ডুবিবে। হাঁটিতে থাকি।

Monday, August 10, 2026

 

 

                                           যোগিনী তোমাকে …

                                            মধুপর্ণা কর্মকার

 

অগ্যস্ত মুনির নারী সংস্করণের সঙ্গে দেখা। "দাঁড়াও মন অনন্ত ব্রহ্মান্ড মাঝে... এই বিশ্ব মহোৎসব দেখি মগন হল সুখে কবি চিত্ত ভুলি গেল সব কাজ" গাহিতে গাহিতে হাঁটিতে হাঁটিতে আসিয়া বসে। পিছন ফিরিয়া না দেখার আশ্চর্য শিক্ষা তাহাকে কে বা কাহারা শিখাইয়াছে বলিতে পারি না। কিন্তু শিখিয়াছে যত্ন করিয়া তাহা পরিস্কার। বলিয়া বসে, পিন্ডদান দেখিয়াছ? পিন্ডদান করিয়া কেহ পিছনে দেখে? বলি দেখি নাই, দিয়াছি পিন্ড বহু। দেখার সুযোগ হয় নাই। ঠা ঠা করিয়া হাসিয়া উঠে যোগিনী। বলি, কর্দমবৃত্তি কি জানো ? সে হাসে, চোখে মুখে হাতে পায়ে চুলে যত ভাবে হাসা সম্ভব। সমস্ত অস্তিত্ত্ব জুড়িয়া হাসে। আমারো হাসি পায়। যোগিনীর মুখের ভাষা কর্কশ, অশ্লীল, অশিষ্ট। নানা প্রকারে গালিগালাজ করিয়া সে আন্তরিকতা প্রকাশ করিয়া থাকে। ভগিনী জ্ঞান করিয়া সে নাকি গালি দিয়া থাকে। সে নাকি অশিষ্ট কথা বলিয়া বুঝাইয়া দেয় সামনের জন তাহার কতখানি আপন। বলি, এ কেমন ব্যবহার! সে বলে, ধুর মাগী… হাসির কান্ডকারখানা কি কম! না হাসিয়া পারি না। যাহারা আমারে বাঁধিতে চাহিয়াছিল হাসিয়া তাহাদের বাতাসে উড়াইয়া দিয়াছি, আর তুই আমাকে হাসি থামাইতে বলিস? তাহার হাসির সামনে আমার ভয় ধরিয়া যায়, এইরকম তো স্বয়ং কালী হাসিয়া থাকেন, ছিন্নমস্তা নিজের মুন্ড কর্তন করিয়া নিজের রক্ত পান করিতে করিতে কি হাসিয়া ছিল, জানা নাই। যোগিনী রগঢ় করিতে পারে বিস্তর। বলিল, না হাসিতে পারিলে বাঁচিতে পারিবি না, বিধর্মীতে, রাক্ষসে ফাঁদ পাতিলে হাসিয়া উড়াইয়া দিবি। হ্যাঁ কর্দমবৃত্তি কি বলিতেছিলি? বুঝাইয়া বল। বলি, কাদা লাগিল ধরো পায়ে, তুমি পা ছুঁড়িতে থাকো কাদা ছাড়াইতে। তুমি কাদা ছাড়াইতে চাহ আর কাদা তোমার পা ছাড়ে না। এই যে বিরক্তিকর সমীকরণ তাহাকে বলে কর্দমবৃত্তি। যোগিনী বলে, ওঝা দেখিয়াছিস, বেদেনী দেখিস নাই? বলি না। যোগিনী বলে, বিষ ছাড়াইতে জানিতে হয়, গুপ্ত বিদ্যা কিছু আছে, বিষদাঁত উঠাইয়া ফেলিতে জানিতে হয়। জানিয়া গেলে আর কেহ বিষ ঢালিতে আসিবে না। বলি, এই সব জানিয়া তুমি ধাতস্থ হৈয়াছ! যোগিনী বলে, শুধু সুন্দরের সাধনা করিয়া কেহ গন্তব্যে পৌঁছয় না, খানা খন্দ, অসুন্দর, আস্তাকুড় পার হৈতে হয়, সেকথা জানো কি? বলি, জানি। যোগিনী গান গাহে, গান লিখিয়া সে সুর বসায় না, তাহার সুষুম্নাকান্ড বাহিয়া সুর ভাসিয়া আসে, আসিবার পথে কথা কিছু সংগ্রহ করিয়া আনে, আর তাহাই সে আপনমনে গাহিতে থাকে। গান গাহিতে গাহিতে সে হাঁটিতে থাকে, কি এক দুনিয়ার সন্ধান পাইয়া তাহার কাটিয়া গিয়াছে শিকল, কাটিয়া গিয়াছে তাহার ভবের বেড়ী।

Saturday, August 8, 2026

 

                                       নদীর পাড়ে  দেহঘর

                                             মধুপর্ণা 

একটা কোলাজ কে সাজায়, কোপাই এর পাশে পাহাড়ী বাঁকা পথ, তারপাশে অনন্ত শয্যায় মহাদেব, যোগীর গায়ে ভস্মমাখা, তারপাশে চিতার জলন্ত আগুন, তার পাশে ছাই, তারপাশে প্রাচীন বাংলা ভাষা চাদরের মত জড়িয়ে বসে আছে এক বালিকা, তারপাশে বয়ে যায় পাপনাশিনী গঙ্গা, তার পাশে নবীন সন্ন্যাসীর এককাপড়ের সংযম, তারপাশে মালসা ভোগ রাঁধে চিরনবীনা বাঊলানী। কি এক টানে উজানে মসগুল তাহার চিত্ত। তার পাশে পঞ্চশতকীয় পদাবলীকার তুলোট কাগজে লিখে যাচ্ছেন কথা, অথবা কথার ছবি, অথবা কথার সুর। তারপাশে এ আই তারপাশে চ্যাটজিপিটি। তারপাশে  নীল রঙের লেজ ওয়ালা টেক যন্ত্রমানব। অসংলগ্ন এই কোলাজ কে সাজায়, কে সাজে ! অজয়ের পাড়ে বাঁশির সুর বাতাসে উড়ে যেতে যেতে পাখি হয়ে যায়, সমাজচ্যুত এক মানবীর অট্টহাসি হঠাত ভেসে যেতে যেতে নৌকা হয়ে যায়, তাতে চড়ে বসে কয়েকটি বালিকা। সেই নৌকা ভেসে যায় সেতারের তার বেয়ে, কে বাজায় সেই সেতার? সন্ন্যাসিনীর নরুন পাড় শাড়ির আঁচলে সকালের ফুল, সুগন্ধ পথে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায়… মাটি কুড়িয়ে নেয়। রাঙা মাটির রং দিয়ে উত্তরীয় রাঙায়। তারপাশে পোড়া কাঠের বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এলোচুলের কেউ। লকলকে তার জীভ। তার নিঃশ্বাস আগুন হয়ে যায় বাতাসে ঘষা লেগে। লেলিহান শিখা তার। বনে লেগে যায় আগুন। আগুনের ছোট ছোট কণা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে পলাশ হয়ে, শিমুল হয়ে, আর বসন্ত বৌ হয়ে। আর সেই আগুনের তাপে মালসাভোগের পঞ্চতত্ত্ব সেদ্ধ হয়ে যায় বাউলানীর দোচালায়। শক্তিসাধিকার নরম চোখের দৃষ্টি যেখানে পড়ে সেখানে প্রকট হয়ে যায় কিছু, আকার নিয়ে নেয় ভেসে বেড়ানো কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস আর আনন্দ। একটা নদী বয়ে যায় কাল ভেদ করে তার তার তীরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ধনুকের ছিলার মত, এক যোগিনী। চোখের সামনে বয়ে যায় সময়ের বায়বীয় নদী। চোখের পাতা পড়ে না। স্থির অনড়।

Saturday, July 4, 2026

 

                                    অসীম রহস্য মাঝে

                                         মধুপর্ণা

হীমবান পর্বতে ধ্যান করিয়াছিলেন দেবী কৈশিকী। আর জঙ্গলে ঘুরিয়া প্রকৃতি সাধনা করিত সাধুয়ান। আর তাহাদের উত্যক্ত করিত কয়েকটি অসুর, রাক্ষস, মানুষের পোশাকের আড়ালে কয়েকটি ইতর বিকার। ধ্যানমগ্না নারীর সৌন্দর্য্যে তাহারা মুগ্ধ আছিল না, তাহারা ছিল রিপু পরায়ন আর হিংস্র। তাহারা একক, একেলা নারী দেখিয়া প্রথমটায় ভাবিল কি আর এমন বেগ পাইতে হৈবে, এই নারীকে বাঁধিয়া লৈয়া যাইব আর তাহার সর্বস্ব কাড়িয়া মণ্ড করিয়া নদীতে ফেলিয়া দিব। আসিয়া তাহারা দেবীর নিকট জল চাহিল। বলিল আমরা বহুদুর হৈতে আসিয়াছি, কাতর, আমরা দরিদ্র। আমাদের কিছু নাই। দেবী দয়াপরবশ হৈয়া তাহাদের জল দিলেন আর দিলেন কিছু খাদ্য। আর বললেন, দুর্ভাগ্যের জন্য চিন্তা করিও না, সকলই শুভ হৈবে। অসুরেরা ভাবিল, এই দয়া মায়ার সূবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা যাইবে না। এই সুযোগটাই কাজে লাগাইতে হৈবে। দেবী ফিরিয়া গেলেন ধ্যানাসনে। কিছু সময় পর চোখ খুলিয়া দেখিলেন, তাহার যজ্ঞশালা হৈতে সকলই চুরি গিয়াছে। প্রথমটায় বিশ্বাস করিতে পারিলেন না যে এই লোকগুলি নিয়া গিয়াছে, পুনরায় যজ্ঞ সাজাইয়া পুজা করিতে বসিলেন। উঠিয়া ভাবিলেন, আহা, তাহাদের অভাব সেকারণে লৈয়া গিয়াছে। সে যাক। তাহার পর কিছুদিন কাটিল, রাক্ষসেরা চুপিসারে আসিয়া দেবীর বাসগৃহে সিঁধ কাটিতেছিল। দেবী পর্বত শিখরে অরণ্যের ভিতর শিশুকাল হৈতে থাকিয়াছে। ভয় কাহাকে বলে জানা হয় নাই, কূটচক্র কাহাকে বলে জানা হয় নাই, অসুস্থ বিকার কাহাকে বলে জানা হয় নাই, মুখের আড়ালের মুখোস কাহাকে বলে জানা হয় নাই। এই বহুবিধ না জানার ভিতর সরল শান্তিতে চারিপাশের সকলের স্নেহে, ভালোবাসায় সে বাড়িয়া উঠিয়াছিল আনন্দে, সৌন্দর্য্যে। সুন্দর গুনাবলী গুলি একত্রিত হৈয়া কৈশিকী অপার সৌন্দর্য্যের আধার হৈয়া উঠিয়াছিল। তিনি যখন ধ্যান করিতেন অরণ্যের চারিদিক আলোকিত হৈয়া উঠিত। চারিপাশের জীবজন্তু পশুপাখি সকলের ভিতর খুশির আদান প্রদানে সেই স্থল ঝলমল করিয়া উঠিত। কৈশিকী ধীরে ধীরে এক একটি করিয়া ধাপ উঠিয়া যাইতেছিল তাহার সাধন মার্গে। সূক্ষ্ম হৈতে সূক্ষ্মতর হৈতেছিল তাহার বোধ, প্রজ্ঞা। এমতাবস্থায় রাক্ষস তাহাদের পরিকল্পনা আর হিংস্রতা লৈয়া উপস্থিত হৈল। কৈশিকী নঞর্থকতা, হিংস্রতা কাহাকে বলে জানিত না – এই বিপুল অজ্ঞানতা লৈয়া কিরূপে তাহার সিদ্ধি হৈবে বলিতে পারো ? এই অজ্ঞানতার মূল্য তাহাকে চুকাইতে হৈবে না? এই করাল সত্য প্রকট হৈবার প্রস্তুতি লৈতে ছিল। কৈশিকীর কমন্ডলু হৈতে জল পড়িয়া গেল সেদিন, তাহার পুস্পপাত্র হৈতে আবিষ্কৃত হৈল সর্প। আর কৈশিকী মাটিতে পা দিয়া অনুভব করিল তাহার দেহ থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। কিসের অশনী সংকেত? কৈশিকীর কি যেন বেসুর ঠেকিল। কিসের যেন এক আশংকা আসিয়া উপস্থিত হৈল। সেদিন সে ধ্যানে মনস্থির করিতে পারিল না। কুডাক ডাকিতে লাগিল তাহার সমস্ত অন্তঃকরণ। তিনি ভাবিলেন, মনের ভ্রম। তিনি আবার নিজকাজে মন দিলেন। কিন্তু একটা সূক্ষ্ম এবং তীব্র কাঁটার মত কিছু বিঁধিয়া থাকে, কিছুতেই সরে না। রাক্ষসগুলি ওৎ পাতিয়া বসিয়া ছিল। আর ভাবিতেছিল কি কি প্রকারে কৈশিকীকে কব্জা করা যায়, অপদস্থ করা যায়। রাক্ষসেরা তাহার দয়ালু মনোভাব, স্বচ্ছ্বতা সুযোগ হিসাবে দেখিল। একে একে তাহাকে সুঁচ বিঁধিতে লাগিল, আঘাত করিতে লাগিল, অপদস্থ করিতে লাগিল, অপমান করিতে লাগিল। দেবী স্থির অনড়, অবিচল, অটল। তাহার চতুর্দিকে জ্যোতির্বলয়। তাহার নৈঃশব্দ আর স্মিতহাস্য রাক্ষেসদের আরো উত্তেজিত করিয়া তুলিল। তাহাদের রোখ চাপিয়া গেল, দেবীর প্রতিক্রিয়া তাহাদের চাইই চাই। মহাদেব দেখিতে ছিলেন সমস্তই। দেখিয়া হাসিতেছিলেন। আর ভাবিতেছিলেন, কৈশিকী, তুমি সিদ্ধি চাহ আর তুমি দুনিয়ার ভয়ঙ্কর রূপ দেখিবে না তাহা হয় না, এইখানে তোমার পরীক্ষা, দেখি তুমি কি প্রকারে পার হও এই ভয়াল বিষের সমুদ্র। কৈশিকী বিষের বাস্পের ভিতর একান্তে নিজের সাধনা একমনে করিয়া যায়। কিন্তু সে বুঝিতে পারে, পূর্বের ন্যায় সেই আনন্দ, সেই বিস্ময়, সেই সমাবস্থা, সেই স্বাভাবিকতা আর নাই। যা কিছুই করিতেছে তাহাকে যেন জোর করিয়া করিতে হৈতেছে। তিনি তথাপি করিতে থাকিলেন। কিন্তু কি যেন বিস্বাদ ঠেকে। বেসুর থেকে। তাল কাটিয়া যায়। দেবী বুঝিতে পারিল,একটি অত্যন্ত নিম্নমানের আক্রমণ হৈয়াছে। খুব পরিকল্পিত একটি আবর্তের মধ্যে তিনি পড়িয়াছেন। একটি জাল যেন তাহাকে ধীরে ধীরে জড়াইয়া ফেলিবার জন্য আগাইয়া আসিতেছে। একটি ফাঁদ তিনি পুনরায় চেষ্টা করিতে থাকেন স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখিবার। কিন্তু বারংবার আক্রমণের মুখে পড়েন। তাহার শক্তি সামর্থ্য ভিন্ন পথে চালিত হৈয়া যাইতেছে তিনি বুঝিতে পারেন। বিভূতিভুষন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মেঘমল্লার’ যাহারা পড়িয়াছেন তাহারা জানেন, দেবী সরস্বতীকে বন্দী করিয়া তাহাকে মৃতপ্রায় করিয়া ফেলিয়াছিল অশুভ শক্তি।  তখন তিনি মহিমা ভুলিয়া গিয়াছিলেন তাহার আত্মবিস্মরণ হৈয়াছিল। তিনি ভয় পাইতেন। ধীরে ধীরে বিবর্ণ হৈয়া গিয়াছিলেন। তিনি অনন্যা হৈতে ধীরে ধীরে সাধারণে রূপান্তরিত হৈয়া গিয়াছিলেন। সেই বিবর্ণ রূপ দেখিতে পাইয়াছিল প্রদ্যুম্ন। সুন্দর কিছু দেখিলে কেহ মুগ্ধ হয়, কেহ তাহা নষ্ট করিতে চায়। কারণ তাহাতে নিজের ভিতরের কদর্য রূপটি স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়া উঠে, সুন্দর কিছু দেখিলে নষ্ট করিতে না পাইলে অসুস্থ লোকের অস্তিত্ত্বটিই বিফল হৈয়া যায়। হয় দখল করিব নয় নষ্ট করিব – এই বিদ্বেষের উপর ভিত্তি করিয়া বহু বিশ্বাস কাঠামো তৈরি করিয়া অনুশীলন করে। কিন্তু ইহাই শেষ কথা নহে। সরস্বতী যেমন আছেন, কালী, চামুন্ডাও প্রকট হন সময় উপস্থিত হৈলে। কৈশিকীর ধ্যানভঙ্গ করিয়াছিল যাহারা, দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তাহাকে ভাঙিয়া দিতে চাহিয়াছিল যাহারা তাহারা জানিত না, এইগুলি মোকাবিলা করিতে যুগে যুগে ভিন্ন রূপ ধরিতে হয় নারীদের। ঔদ্ধত্ব, অন্যায়, আর বিকার বাড়িয়া গেলে তাহাকে দমন করিতে ধীরে ধীরে অন্য রূপে প্রকট হন তাঁরা। তাহার দৃষ্টান্ত নিতান্ত কম নহে। কৈশিকীও বিরক্ত হৈয়াছিল। একসময় দেখিল এই উপদ্রব বন্ধ না করিলে সাধনার ব্যাঘাত ঘটিতেছে। তখন তিনি চামুন্ডা রূপ ধরিলেন এবং অসুর দমন করিয়া পুনরায় ধ্যানে বসিলেন। মহাদেব স্মিত হাসিলেন। এবং আসিয়া বলিলেন, ফসল ফলাইতে ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতে হয়। তোমার ক্ষেত্র প্রস্তুত হৈয়াছে, তুমি এখন যাহা করিবে তাহাতেই সোনা ফলিবে। যাহা জানিতে না তাহা জানিয়াছ – এখন তুমি মুক্ত।

 

Friday, July 3, 2026

 

                                             বাক্স -ব্যকরণ

                                               মধুপর্ণা

প্রত্যেকের একটা বাক্স আছে। স্নায়ুর সহন ক্ষমতা, শিক্ষা, রুচি আর মানসিকতা দিয়ে গড়া একটা করে বাক্স। অন্যকে সেই বাক্সে পুরে ফেলতে চায়। উদ্দেশ্য একটা আছে, কি উদ্দেশ্য? আত্ম প্রতিস্থাপন আর নিয়ন্ত্রণ। তার আগে একটা সূক্ষ্মধাপ, টলারেন্স চেক। অন্যে কতটা অবধি সহ্য করবে, কতটার পর চিৎকার করবে অথবা কতটার পর রুখে দাঁড়াবে, অথবা কতটা চাপ দিলে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে আর উঠে দাঁড়াবে না – তার হিসাব নিকাশ। তার মাপে বাক্স গুলোর মাপ বাড়ায় বা কমায়। মনস্তাত্ত্বিক এই খেলা যদি একবার দেখার চোখ তৈরি হয়ে যায় তাহলে এখান থেকে ফিরে যাবার আর কোনো পথ নেই। তুমি চোখ বন্ধ করেও দেখতে পাবে। আঁচ করতে পারবে। ইন্টার পার্সোনাল ডায়নামিক্স। এইটা চোখ থেকে একটা পর্দা সরে যাবার মত। বাইরের পর্দা আর আড়ালটা সরে গেলেই দেখতে পাবে জম্বি, ভ্যাম্পায়ার আর শিকারীর দঙ্গল। চামড়ার নীচে সূঁচের মত কিছু একটা ফুটতে থাকার অনুভূতি যদি তোমার হয়ে থাকে তাহলে তুমি চিনে যাবে ধীরে ধীরে নানান বাক্স -ব্যকরণ। কিছু বই যেমন আমরা স্বেচ্ছায় পড়ি না, বাধ্য হয়ে পড়ি, হাঁটতে হাঁটতে কয়েকটা মানুষ তোমাকে কিছু বই খুঁজে বের করতে বাধ্য করবে, পড়তে বাধ্য করবে। যেমন নার্সিসিজম, সাইকোপ্যাথ, আর সোশিওপ্যাথ বিষয়ে পড়তে জীবনে কোনো না কোনো সময় তুমি বাধ্য হয়ে থাকো, তাহলে তোমার বাস্তবের বিশ্বরূপ দর্শন হয়েছে, তোমাকে অভিবাদন। যেই পর্দাটা সরে গেল অমনি তুমি দেখবে পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন। প্রথমবার দেখার অভিজ্ঞতা তোমার মোটেই সুখকর হবে না, এই আবিষ্কার ভয়ংকর লাগবে। তারপর যখন ধাতস্থ হবে, তখন হাসি পাবে। তারপর শিখে যাবে আঘাতের বদলে প্রত্যাঘাত করতে। আনুগত্য আর নিয়ন্ত্রণের ভিতরের নকশা তুমি যেদিন বুঝতে পেরে যাবে সেদিন থেকে একটা মুক্তির অধ্যায় শুরু। বুঝে যাবে, আত্মপ্রতিস্থাপনের সূক্ষ্ম ইচ্ছা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারলে আত্মশ্লাঘার একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করে অনেকে। আত্মস্যাত করার একটা প্রবণতা খুব সূক্ষ্ম স্রোতের মত চলতে থাকে, একটা সময় তোমাকে মানুষের ভিতরের অন্ধকার চেনাবে, এই শিক্ষানবিশির সময়টি খুব যত্ন করে শিখতে হয়। খুব যত্ন করে প্রতিটা ধরণ, প্রতিটা অন্ধকারকে জানতে হয়। প্রত্যেকের অন্ধকার আর লালিত বাক্স গুলি যত্ন করে জানতে হয়। নরম মাটি দেখলে বিড়াল সেখানে আঁচড়ায়… শক্ত মাটিকে সমঝে চলে। তোমার পুর্ব সংস্কার তোমাকে দেখেও না দেখার ভাণ করতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে কিভাবে কাদা না ঘাঁটতে হয়, কিভাবে আলোর দিকে তাকাতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে তোমাকে নামিয়ে কাদা মাখাবেই, বেশ কাদাই যখন মাখতে হবে, তখন কাদার ব্যকরণটা জানো ভালো করে। তারপর দেখবে জায়গায় জিনিস জায়গায় চলে গেছে। তোমার প্লেটে পরিবেশিত হবে অনেক খেলা, এবং বলা হবে, ‘এটাই তোমার খেলা, এটাই তোমায় খেলতে হবে’। তুমি এবার করবে কি সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সেই খেলাটা খেলতে শুরু করবে। কিন্তু তুমি স্বাধীন মানুষ, তোমার স্বাধীনতা আছে এইকথা বলার, আমি নিজে পছন্দ করব এই স্বল্প জীবতকালে কোন খেলাটা খেলতে চাই, আর কি কি কেটে বাদ দিতে চাই। বা আদৌ তুমি পাশাখেলায় অংশ নিতে চাও না। এই গুলো জেনে যাওয়া আর না জেনে থাকার মধ্যবর্তী দূরত্ব অনেকখানি।   

 

 

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...