Sunday, September 6, 2026

 

                                        সেপ্টেম্বরের সকাল

                                            মধুপর্ণা

 

মোহন সিং এর গানের মত একটা সকাল হয়। ‘দৈনন্দিন’ নামের একটা নিত্যনৈমিত্তিক বাতাস এসে জানান দেয় দিনের উপস্থিতি। সকালের আলো, সূর্যোদয়, সকালের শীতল বাতাস, দুলে ওঠা বারান্দার গাছ, খোলা বই, খোলা স্ক্রীন, তানপুরার নরম আওয়াজ, দিন শুরুর প্রশান্তি। মার নীরব উপস্থিতি। এইরকম নরম দিনগুলি পদ্মাসনে বসে থাকে, ভিতর থেকে কেউ বলে ‘ফুলের মত সহজ সুরে, প্রভাত মম উঠিবে পুরে’ এই সকাল বহুকাল লালিত অর্জন। পাহাড়ের সেই দার্শনিক দোকানীর কথা মনে পড়ে, কয়েক ঘন্টা ঘুরে অভ্যেস মত চায়ের দোকান খুঁজছি সেদিনও। মনেস্ট্রির ধাতস্থ শান্তির ঘোর তখনও কাটে নি। চা মিলেগা? মিলেগা। দোকানী দিলেন চা, তারপর এটা সেটা কথা, তারপর বেরোনোর আগে জিজ্ঞেস করি, কিতনা হুয়া? উত্তর আসে, চায়ে ইঁহা মিলতা হ্যা লেকিন বিকতা নেহি। ঘোরের ভিতর এই সব কথা শুনে অদ্ভুত লাগে, দোকান খুলে বসে আছেন, চা মিলেগা বললে বলছেন, মিলেগা তাহলে, চায়ে ইহা মিলতা হ্যা লেকিন বিকতা নেহি - এই কথার অর্থ কি? লোকটি অপ্রস্তুত, বলে, মাম্মিনে বানায়া, সল্ট টি। আপনি বললেন চা পাওয়া যায় কিনা তাই আমি বললাম পাওয়া যায়। আপনি তো জিজ্ঞেস করেন নি বিক্রি হয় কিনা। বলি, পাহাড়ের লোকজন অদ্ভুত তো, যাই হোক ভাল থাকবেন। চলে যাই দূরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে। ঘন্টা দুয়েক পর ঐ রাস্তা ধরে ফিরছি আবার। নানা ভোগান্তির পূর্বস্মৃতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে যথারীতি। চুপচাপ ধীরে ধীরে হেঁটে যাওয়া নেশার মত। দূর থেকে কেউ জিজ্ঞেস করছে, আর ইউ ক্রাইং? না তো। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার পাড়ে। তারপর এটা সেটা কথার পর জানা গেল, ভদ্রলোক কালিম্পং কোর্টের আইনজীবি, শৈশব থেকে বৌদ্ধগুম্ফায় থেকে পড়াশোনা করেছেন, পরবর্তীতে সামাজিক জীবন স্রোতে ফিরেছেন, ছুটিতে মায়ের দোকানে সাহায্য করতে বসে আছেন, দোকানদারীর কিছুই জানেন না। অসংখ্য গল্প কথা, বৌদ্ধ গুম্ফায় সন্নাসীদের জীবন সম্পর্ক যত কৌতুহল ছিল জানা গেল, প্রশ্ন কথা পল্লবিত হয়ে গেল বহুদূর। বৌদ্ধ পার্ক থেকে বৌদ্ধ গুম্ফায় যাবার দীর্ঘ ছায়াচ্ছন্ন পথ, রোজ একবার হেঁটে আসা যায়। পরদিন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে আবার গল্প হল অনেক, পূর্বের সন্নাসীজীবন, পড়াশোনা, বৌদ্ধদর্শন নিয়ে সাধনা আর চর্চা। এইরকম ছদ্মবেশী দার্শনিক দোকানী আমি দেখিনি কোনদিন। ভদ্রলোকের মা এলেন কিছু পর। পাহাড়ে গত দুই বছরে অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে এই বার লাভার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত।

Tuesday, September 1, 2026

                                              বৃষ্টিদিনের পকেট

                                                  মধুপর্ণা

                         

তারপর একদিন সকালে বৃষ্টি হবে খুব। রাস্তায় ছাতা হাতে বেড়িয়ে দেখবে জলে জলময়। শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে। জলে নৌকা ভাসাতে গিয়ে কাকভেজা হয়ে ফিরে এসে মায়ের হাতে উত্তম মধ্যম খাবার দিন। তারপর ড্যামেজ ম্যানেজমেন্টের জন্য সারাদিন পড়াশোনার ভান। পড়তে বসে দিদির সঙ্গে খুনশুটি। স্কেল দিয়ে জায়গা ভাগ, একে অন্যের বইয়ের পাতা ছিঁড়ে দিয়ে হিংস্রতার হাতে খড়ি। তারপর মা জেনে যাবার আগে সেলোটেপ দিয়ে পাতা জোড়া। জলে জলময় চারিদিক, স্বচ্ছ জলের নীচে ঘাস। পুতুলের বাক্স। মাটির পুতুলের রান্নাঘরে কাঁঠাল পাতার লুচি। হোমিওপ্যাথির শিশি থেকে অজানা রোগের অজানা ওষুধ অবলীলায় খেয়ে নেওয়ার পাপ। তারপর মায়ের দুশ্চিন্তা। বৃষ্টি শেষে সন্ধ্যা হবার আগে আকাশ হয়ে উঠত রঙিন। নানান ছবি ভেসে উঠত তাতে। আকাশেই দেখা যেত শেয়াল, ডানা মেলা বক, মন্দিরের চূড়া। সেই মাটি বালি পাথর, জলের ধারা আর শৈশবের বৃষ্টি শেষের আকাশ। এক একটা বৃষ্টি দিনে স্মৃতির পকেট থেকে বেড়িয়ে আসে ছবি, শব্দ, গান। সময়ের নদী যায় বয়ে। কুমড়ো ফুলের হলুদ রং, গ্রামের স্টেশনারী দোকানে কাঁচের সবুজ চুড়ি, ভিজে উঠোনে ছোট পাখির ঘুরে বেড়ানো, স্কুলে কর্মশিক্ষা পরীক্ষায় রিলিফের কাজের জন্য কুমোর পাড়ায় মাটি আনতে যাবার রাস্তা, রাস্তায় গাছে হনুমান, সাইকেল চালানো শেখার আপ্রাণ চেষ্টা, বইয়ের দোকানে নতুন স্টিকারের খোঁজ, হ্যারি পটারের ছবি দেওয়া খাতা পেয়ে গেলে আনন্দে আত্মহারা অবস্থা, গোলাপ চারা আজ পুঁতে কাল কেন ফুল ফুটছে না - এই মর্মে অস্থিরতা, স্কুলের সেই সব অলৌকিক বেঞ্চ - এই সব দিয়ে গড়া মফস্বলী শৈশব বৃষ্টিদিনে ভেসে ওঠে। বৃষ্টিদিনের বিকেলে আশেপাশের পাড়া থেকে মাঠ থেকে ধরে আনা ছোট ছোট মাছ বিক্রি করতে আসতেন গ্রামের বধূরা। মাঠে কীটনাশক, পেস্ট্রিসাইড দেবার ফলে নারীদের এই পেশা ধীরে ধীরে কমে গেছে বা বিলুপ্ত। কারণ মাঠে আর ছোট মাছেরা আসে না বা জন্মায় না। প্রান্তিক নারীরা এই ভাবে আয়ত্ত্বের মধ্যে থাকা আয় হারিয়েছেন। বৃষ্টি দিনে স্মৃতির ভিতর অসংখ্য মুখ, অসংখ্য মুখের রেখা। ছবি শব্দ গান দিয়ে গড়া শৈশবের আরেকটি দিক। এইসব বৃষ্টিদিনে মস্তিস্কের স্মৃতির সুখবোধ, বাস্তবের নানা স্তরের চেহারা আলাদা আলাদা। বৃষ্টিদিনের পকেটে বহু দৃশ্য, কথা লুকোনো। মাটির রাস্তা বেয়ে কাদা জল বয়ে যাবার দৃশ্য, কাদার দৃশ্য, আর শান্তিনিকেতনে আসার পর বর্ষা মানে জারুল ফুলে মাতোয়ারা ভেজা গাছ, কোপাই আর আনন্দের অসীম আয়োজন। পাহাড়ে বৃষ্টি দেখে মনে হয়েছিল জীবনের জ্বর ছেড়ে যাবার এই হল পরম ঔষধী। ঝম ঝম ঝম ঝম একটা ছন্দে বৃষ্টি পড়ছে আর ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে চারিদিক। 


Monday, August 31, 2026

 

                                                যোগিনী সংবাদ

                                                 মধুপর্ণা

 

তারপর একটা সময় আসে, যখন আকাশ পরিষ্কার আর সূত্র গুলি চোখের সামনে সুবিন্যস্ত। যোগিনী বড় করিয়া একটা নিশ্বাস নেয় আর বলে, একটি ভিত্তির উপর দাঁড়া। আমি বলি, তোমার কথার আগাপাশতলা বুঝি না। যোগিনীর ভাষা বুঝিতে প্রায় বার বছর লাগিয়া গিয়াছে। সে বলিয়া যায়, শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়ায় আগে। তারপর শাখা প্রশাখা ছড়ায় গাছ। দেখেছিস? বলি, শিকড় ছাড়া গাছ দাঁড়াবে কেমন করে, মাটিতে গাঁথা তাই তার বিস্তার সুললিত, সুন্দর। যোগিনী মুখের কথা কাড়িয়া নেয়, বলে, গাছ যেমন শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়ায় আর শাখা মেলে উপরে। আমি তাহাই বলিতেছি। পায়ের তলা হৈতে মাটি কাড়িয়া লৈতে দুনিয়ার বহু আয়োজন। গাছ কাটিয়া ফেলিতেই পারে যে কেন যখন তখন কিন্তু উপরাইয়া ফেলিতে অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়া যাইতে হয়। পূর্ণ বিকাশ শিকড় ছাড়া হৈবে না। আমি কিঞ্চিত অবিশ্বাস লৈয়া চুপ করিয়া থাকি আর ঝগড়ার সুরে বলিতে চেষ্টা করি, তুমি সব জানো! তোমার এইসব মনগড়া কথা আমি বিশ্বাস করি না। যোগিনী হাসে। অভিজ্ঞ মানুষ অনভিজ্ঞতা দেখিয়া যেমন সুন্দর করিয়া হাসে তেমনি করিয়া হাসে। বলে, তুই আমাকে আগে শ্রদ্ধা ভক্তি করিতিস বিস্তর। ক্রমে তাহা প্রশ্নে অবিশ্বাসে রূপান্তরিত। বলি, তুই কি চাস! আনুগত্য! প্রশ্নহীন আনুগত্য! যোগিনী বলে, না। তুই আমাকে প্রশ্নে প্রতিযুক্তিতে ধ্বংস করিয়া দে তাহাই আমি আকাঙখা করি, কিন্তু অবিশ্বাস করিস না। এইখানে বড় ব্যাথা আমার। সব জয় করিয়াছি, এইটি এখনও ব্যাথা দেয়। সুযোগ পাইয়া রসিকতা করি! ব্যাথা আছে এখনও তোর! তুই যেমন পাষান,পিশাচী। তোকে কিছু ব্যাথা দেয় এখনও! যোগিনী নরম হৈয়া আসে। নরম করিয়া পাশে বসে। উগ্রচন্ডা ভাব তাহার কোমল হৈয়া যায়। চোখে চোখ রাখিয়া বলে, ভিত্তির উপর দাঁড়া। শিকড় বড় প্রয়োজন। শাখা মেলিতে শিকড় বড় প্রয়োজন। যোগিনীর সহিত সম্বন্ধ অম্লমধুর। অধিকাংশ সময়ই বিবাদ বিসম্বাদ। পারিলে পরস্পরকে আঁচড়াইয়া খাইয়া ফেলি আর কি। যোগিনী এই প্রথা চালু করিয়া রাখিয়াছে। আমিও তাহাতে সঙ্গত দিয়াছি। তর্ক বিতর্ক। কিন্তু শ্রদ্ধা অটুট। তাহাকে এই প্রকারে নরম হৈতে দেখিয়া ছ্যাঁত করিয়া উঠে। তাহাকে বলি, শোন তোকে উগ্রই মানায়। তোর নরম ব্যবহার দেখিতে পারি না। তুই ছাড় এইসব ভোলচাল। স্বমহিমায় ফিরিয়া আয়। যোগিনী তাহার সেই রক্তপিপাসু হাসি আবার ভাসিয়া উঠে। বলি, তুই বড় অসহ্য রে, তোকে না গিলিতে পারি, না ফেলিতে পারি। যোগিনী বলে, তোকে আমি মন্ত্র দিব। বলি, থাক। আমার আর মন্ত্রে কাজ নাই। তুই রগড় করিয়া আমার মাথা নষ্ট করিস না। যোগিনী তাহার স্বভাবে ফিরিয়া আসে, সেই রহস্যময়, সান্ধ্য আবছায়া ফিরিয়া আসে তাহার কথায়। বলে, যন্ত্রখানা মন্ত্র ছাড়া চলিবে না। তাহার আগে ভব নদীতে স্নান করিতে হৈবে আর তাহার পর একটি আয়না তোকে আমি দেখাইব। বলি, অবিশ্বাস আমি তোকে আর করিব না। তুই বলিলে অবলীলায় আগুনে দিব ঝাঁপ। বল কোথায় কি করিতে হৈবে। তাহার অন্তর্দৃষ্টির সামনে আগে অস্বস্তি লাগিত। এখন আর তাহা নাই। সে বলে, মন্ত্র লৈবি যদি তাহা হৈলে পুরাতন বসন ফেলিয়া আয়। অতীত একখানি সময়ের সুতা দিয়া তৈরি বসন বৈ তো না। জীর্ণ বস্ত্র বহুবার ত্যাগ করে মানুষ। নতুন বসনে স্নান করিয়া মন্ত্র লৈতে হয়। যোগিনী সেই নদীর কথা বলিতে শুরু করে, আর কি কি আচার আছে একে একে বলিতে থাকে। আর একসময় বলে, দ্বন্ধে কি খুঁড়িয়া খায়? বলি, না। চল।

Saturday, August 22, 2026

 

 

                                      সাক্ষাত সমাচার

                                        মধুপর্ণা

যোগিনীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর বদলাইয়া যায় মানুষ। ক্ষমতার চাইতে শক্তি কতটা জরুরি জানিয়া যায়। একটি স্বচ্ছতা তাহাকে নদীর জলের মত স্বাধীন করিয়া তোলে। যোগিনীর সংস্পর্শ পরশমনির ন্যায় সক্রিয়। স্পষ্ট প্রজ্ঞা তাহাকে করিয়াছে কালদর্শী। তাহার মগ্নতা দেখিয়া এক এক সময় স্তব্ধ হৈয়া যাই। সে জিজ্ঞাসে, কি রে তোর এতেই দম শেষ? বলি এত কর্কশ কেন তুমি? সে বলে, তুই নরক দেখেছিস? বলি, দেখি নাই, তবে আঁচ পাইয়াছি। নরকের কীট কিছু আক্রমণ করিয়াছিল তাহাদের নারকীয় ব্যবহার দেখিয়া ধারণা পাইয়াছি নরক কেমন হইতে পারে। যোগিনী উৎসুক হৈয়া চোখ সরু করিয়া তাকায়। চুপ করিয়া থাকে। তাহার পর ধীরে ধীরে বলে, অভিজ্ঞতা এমন জিনিস সকলের ভাগ্যে জোটে না। তুই নরক দেখিয়া উঠিয়া আসিয়াছিস ইহাতে বোধ হয় তোর কিছু পূণ্যফল আছিল রে। বলি, শক্তির ব্যকরণ শিখিয়াছি। সে হাসিতে থাকে, আমার বিরক্তি ধরিয়া যায়, তুমি হাসো কেন? কি বেদনা ভিতরে তোমার তাই হাসি পায় এত? ইহাতে সে চটিয়া যায়, বলে, দূর হ। আমার সম্মুখে আসিস না আর। এতদিনে জানিয়াছি তাহার আচার ব্যবহার, তাই চুপ করিয়া যাই। এই মুহুর্তে চলিয়া যাইলে যোগিনী চুল ধরিয়া টানিয়া আনিয়া সামনে বসাইয়া অতীত ভবিষ্যত উদ্ধার করিয়া দিবে। আর যদি চুপ করিয়া বসিয়া থাকি তাহা হৈলে কিছুক্ষন পর বলিবে, নরক যে কামড় বসাইয়াছিল তাহার দাগ আমি মুছিয়া দিব। তুই কিঞ্চিত ধৈর্য্য ধরিতে পারিবি? তাহাকে ভালো না বাসিয়া উপায় নাই। বলি, তুই এত রুক্ষ রূঢ়, তোকে ভয় লাগে। সে পারিলে হাসি দিয়া স্নান করাইয়া দেয়। তাহার হাসিতে ভিজিয়া বসিয়া থাকি কিংকর্তব্যবিমুঢ়। হাওয়ার ভিতর কি যেন সূত্র খুজিয়া পাইয়া বলে, জন্মিয়াছিস শক্তি লৈয়া, ক্ষমতার দাবানল দেখিয়া বেভুলে কেন নিজের সাধনা ভুলিস! কি কারন! বলি, ভুলি নাই, কিন্তু প্রতিশোধ লৈতে চাই। তাহার চোখ দপদপ করিয়া জ্বলে, মুন্ড কাটিয়া রক্ত মাখিয়া নাচিতে ইচ্ছা যায়, ছেমরি! একটা মশাল জ্বলাইয়া রাখ নিভিতে দিবি না। একদিন আসিবে। একদিন আসিবে। কোমলতার নাটক করিয়া কেহ কিছু অর্জন করে না। দম থাকিতে হয় দম। বলি, তুই এই শক্তি পাইলি কি প্রকারে? সে বলে, নরকের ভিতর। 

Thursday, August 20, 2026

 

                                         যোগিনী তোমাকে…২

                                             মধুপর্ণা

দেখিতে পাই এক যোগিনী হাঁটিয়া যায় সময়ের আলপথ ধরিয়া। কি এক মগ্নতায় আচ্ছন্ন তাহার অবয়ব। দৃঢ় পায়ে হাঁটিয়া যায়, তাহার দৃষ্টি নরম অথচ অতলস্পর্শী। এক একটা মায়ার জালিকা সে দেখিতে পায়। তাহাকে জিজ্ঞাসিলাম, তুমি যাও কোথায়? সে অদ্ভুত ভাবে হাসে, যাত্রা তাহার পথের অনুরাগে। সে পালটা জিজ্ঞাসে, তুমি দাঁড়িয়ে কেন, হাঁটো। বলি, কোন দিকে? সে বলে, যে কোনো একদিকে। সবদিকে রাস্তা। যে কোনো একদিক দিয়ে হাঁটিলেই এক গন্তব্যে পৌঁছায় সকলে। হাঁটিতে হাঁটিতে কথা হয়, যোগিনীর চারপাশে জ্যোতির্বলয়। নষ্ট আত্মা সামনে আসিলে হয় তড়িতাহত হৈয়া ছিটকাইয়া পড়িবে নয় খোল নলচে বদলাইয়া শুদ্ধতার পথ ধরিবে। বলি, কি প্রকারে সাধিলে এই অসম্ভব? উত্তর আসে, তুমি দেখিতেছি দুনিয়াদারীর নিয়ম কানুন কিছুই শিখো নাই, ক্ষমতা নাশ করিতে ক্ষমতার বিন্যাস জানিতে হয় সূক্ষ্ম আকারে। জানিয়া তাহার পর তাহাকে নস্যাত করিতে হয়। যোগিনীর রকম দেখিয়া আগ্রহ বাড়ে। কথার পিঠে কথা বাড়ে না। একটি প্রবাহ বহিতে থাকে। সাবলীল, স্বচ্ছন্দ। যোগিনী বলে, চোখ কান নাক কি শুধু ভোগ করিতে পাইয়াছো? গান শুনিতে আর আকাশ দেখিতে আর ফুলের সুগন্ধ পাইতে! এই গুলি সজাগ করিয়া রাখিতে হয়। যাহাতে, আঁচ করিতে পার কোন বিষ কোন পথ দিয়া আসিতেছে, যাইতেছে আর আসন পাতিতেছে। একদিকে চালিত করিয়া দিলে তোমার বিপদ তুমি আঁচ করিতে পারিবে না। যোগিনীর ধনুকের ছিলার মত গড়ন আর তাহার বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি তাহাকে প্রায় মায়াহরিণী করিয়া তুলিয়াছে। বলি, কত জন্ম ধরিয়া তুমি এই সূক্ষ্মতায় উপনীত? সে তাকায় এক প্রকারে, তাহার অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, যেন এক একটি স্তর ভেদ করিতে করিতে আগাইয়া চলে, সামনের দৃশ্য দেখে কেউ, কেউ দেখে দৃশ্যের ভিতরের বিন্যাস, কেউ দেখে দৃশ্যের অতীত ভবিষ্যত, কেহ দেখে প্রেক্ষাপটে দৃশ্যটির জটিল অবস্থান,কেহ দেখে দৃশ্যটির আশু প্রভাব, সূদুর প্রভাব। যোগিনীর দৃষ্টি যেন সবকটি স্তর ভেদ করিয়া দৃশ্যটির সঙ্গে একটি সম্পর্ক স্থাপন ক্রিয়া ফেরত আসে, আর দৃশ্যটি প্রভাবিত করিয়া রাখিয়া আসে। সাধারণে কেবল দৃশ্য দেখিয়া, শব্দ শুনিয়া প্রভাবিত হয়, গ্রহণ করে। যোগিনীর শক্তি সেইখানে, যেখানে দৃশ্যের সহিত তাহার দৃষ্টির ধাক্কা লাগিয়া তৃতীয় একটি মাত্রা নির্মিত হয়। দৃশ্যটি বদলাইয়া যায়। যোগিনী বদলায় না। স্থির প্রজ্ঞা এইমত তুমি পাইলে কোথায়? যোগিনী বলে, মানুষের বিষ ধারণ করিয়া ছিলাম বহুপূর্বে।বিষে আমাকে খাইবে কি তাহাকে খাইয়া হজম করিয়া ঔষধী বানাইয়াছি। সাপের বিষে কেহ মরে আর রকম জানিলে সেই থেকে ঔষধ বানায় কেহ। তাহাকে করজোরে নমস্কার করি। যোগিনী হা হা হাসিয়া উঠে। তাহার হাসিতে বোধ করি সামনে কাঁচ থাকিলে চুরমার হৈয়া ভাঙ্গিয়া যাইত। মানুষও খান খান হৈয়া ভাঙিয়া যায় হয়তো। যোগিনীর এই বিদ্যা দেখিয়া মস্তিস্কে একটি প্রকষ্ঠ খুলিয়া যায়। যোগিনী বলে, পা চালাও, ত্বরা করো, ধীরে চলিলে গন্তব্যের আগে সুর্য্য ডুবিবে। হাঁটিতে থাকি।

Monday, August 10, 2026

 

 

                                           যোগিনী তোমাকে …

                                            মধুপর্ণা কর্মকার

 

অগ্যস্ত মুনির নারী সংস্করণের সঙ্গে দেখা। "দাঁড়াও মন অনন্ত ব্রহ্মান্ড মাঝে... এই বিশ্ব মহোৎসব দেখি মগন হল সুখে কবি চিত্ত ভুলি গেল সব কাজ" গাহিতে গাহিতে হাঁটিতে হাঁটিতে আসিয়া বসে। পিছন ফিরিয়া না দেখার আশ্চর্য শিক্ষা তাহাকে কে বা কাহারা শিখাইয়াছে বলিতে পারি না। কিন্তু শিখিয়াছে যত্ন করিয়া তাহা পরিস্কার। বলিয়া বসে, পিন্ডদান দেখিয়াছ? পিন্ডদান করিয়া কেহ পিছনে দেখে? বলি দেখি নাই, দিয়াছি পিন্ড বহু। দেখার সুযোগ হয় নাই। ঠা ঠা করিয়া হাসিয়া উঠে যোগিনী। বলি, কর্দমবৃত্তি কি জানো ? সে হাসে, চোখে মুখে হাতে পায়ে চুলে যত ভাবে হাসা সম্ভব। সমস্ত অস্তিত্ত্ব জুড়িয়া হাসে। আমারো হাসি পায়। যোগিনীর মুখের ভাষা কর্কশ, অশ্লীল, অশিষ্ট। নানা প্রকারে গালিগালাজ করিয়া সে আন্তরিকতা প্রকাশ করিয়া থাকে। ভগিনী জ্ঞান করিয়া সে নাকি গালি দিয়া থাকে। সে নাকি অশিষ্ট কথা বলিয়া বুঝাইয়া দেয় সামনের জন তাহার কতখানি আপন। বলি, এ কেমন ব্যবহার! সে বলে, ধুর মাগী… হাসির কান্ডকারখানা কি কম! না হাসিয়া পারি না। যাহারা আমারে বাঁধিতে চাহিয়াছিল হাসিয়া তাহাদের বাতাসে উড়াইয়া দিয়াছি, আর তুই আমাকে হাসি থামাইতে বলিস? তাহার হাসির সামনে আমার ভয় ধরিয়া যায়, এইরকম তো স্বয়ং কালী হাসিয়া থাকেন, ছিন্নমস্তা নিজের মুন্ড কর্তন করিয়া নিজের রক্ত পান করিতে করিতে কি হাসিয়া ছিল, জানা নাই। যোগিনী রগঢ় করিতে পারে বিস্তর। বলিল, না হাসিতে পারিলে বাঁচিতে পারিবি না, বিধর্মীতে, রাক্ষসে ফাঁদ পাতিলে হাসিয়া উড়াইয়া দিবি। হ্যাঁ কর্দমবৃত্তি কি বলিতেছিলি? বুঝাইয়া বল। বলি, কাদা লাগিল ধরো পায়ে, তুমি পা ছুঁড়িতে থাকো কাদা ছাড়াইতে। তুমি কাদা ছাড়াইতে চাহ আর কাদা তোমার পা ছাড়ে না। এই যে বিরক্তিকর সমীকরণ তাহাকে বলে কর্দমবৃত্তি। যোগিনী বলে, ওঝা দেখিয়াছিস, বেদেনী দেখিস নাই? বলি না। যোগিনী বলে, বিষ ছাড়াইতে জানিতে হয়, গুপ্ত বিদ্যা কিছু আছে, বিষদাঁত উঠাইয়া ফেলিতে জানিতে হয়। জানিয়া গেলে আর কেহ বিষ ঢালিতে আসিবে না। বলি, এই সব জানিয়া তুমি ধাতস্থ হৈয়াছ! যোগিনী বলে, শুধু সুন্দরের সাধনা করিয়া কেহ গন্তব্যে পৌঁছয় না, খানা খন্দ, অসুন্দর, আস্তাকুড় পার হৈতে হয়, সেকথা জানো কি? বলি, জানি। যোগিনী গান গাহে, গান লিখিয়া সে সুর বসায় না, তাহার সুষুম্নাকান্ড বাহিয়া সুর ভাসিয়া আসে, আসিবার পথে কথা কিছু সংগ্রহ করিয়া আনে, আর তাহাই সে আপনমনে গাহিতে থাকে। গান গাহিতে গাহিতে সে হাঁটিতে থাকে, কি এক দুনিয়ার সন্ধান পাইয়া তাহার কাটিয়া গিয়াছে শিকল, কাটিয়া গিয়াছে তাহার ভবের বেড়ী।

Saturday, August 8, 2026

 

                                       নদীর পাড়ে  দেহঘর

                                             মধুপর্ণা 

একটা কোলাজ কে সাজায়, কোপাই এর পাশে পাহাড়ী বাঁকা পথ, তারপাশে অনন্ত শয্যায় মহাদেব, যোগীর গায়ে ভস্মমাখা, তারপাশে চিতার জলন্ত আগুন, তার পাশে ছাই, তারপাশে প্রাচীন বাংলা ভাষা চাদরের মত জড়িয়ে বসে আছে এক বালিকা, তারপাশে বয়ে যায় পাপনাশিনী গঙ্গা, তার পাশে নবীন সন্ন্যাসীর এককাপড়ের সংযম, তারপাশে মালসা ভোগ রাঁধে চিরনবীনা বাঊলানী। কি এক টানে উজানে মসগুল তাহার চিত্ত। তার পাশে পঞ্চশতকীয় পদাবলীকার তুলোট কাগজে লিখে যাচ্ছেন কথা, অথবা কথার ছবি, অথবা কথার সুর। তারপাশে এ আই তারপাশে চ্যাটজিপিটি। তারপাশে  নীল রঙের লেজ ওয়ালা টেক যন্ত্রমানব। অসংলগ্ন এই কোলাজ কে সাজায়, কে সাজে ! অজয়ের পাড়ে বাঁশির সুর বাতাসে উড়ে যেতে যেতে পাখি হয়ে যায়, সমাজচ্যুত এক মানবীর অট্টহাসি হঠাত ভেসে যেতে যেতে নৌকা হয়ে যায়, তাতে চড়ে বসে কয়েকটি বালিকা। সেই নৌকা ভেসে যায় সেতারের তার বেয়ে, কে বাজায় সেই সেতার? সন্ন্যাসিনীর নরুন পাড় শাড়ির আঁচলে সকালের ফুল, সুগন্ধ পথে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায়… মাটি কুড়িয়ে নেয়। রাঙা মাটির রং দিয়ে উত্তরীয় রাঙায়। তারপাশে পোড়া কাঠের বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এলোচুলের কেউ। লকলকে তার জীভ। তার নিঃশ্বাস আগুন হয়ে যায় বাতাসে ঘষা লেগে। লেলিহান শিখা তার। বনে লেগে যায় আগুন। আগুনের ছোট ছোট কণা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে পলাশ হয়ে, শিমুল হয়ে, আর বসন্ত বৌ হয়ে। আর সেই আগুনের তাপে মালসাভোগের পঞ্চতত্ত্ব সেদ্ধ হয়ে যায় বাউলানীর দোচালায়। শক্তিসাধিকার নরম চোখের দৃষ্টি যেখানে পড়ে সেখানে প্রকট হয়ে যায় কিছু, আকার নিয়ে নেয় ভেসে বেড়ানো কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস আর আনন্দ। একটা নদী বয়ে যায় কাল ভেদ করে তার তার তীরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ধনুকের ছিলার মত, এক যোগিনী। চোখের সামনে বয়ে যায় সময়ের বায়বীয় নদী। চোখের পাতা পড়ে না। স্থির অনড়।

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...