Tuesday, September 22, 2026

 

                                          বাদল দিনের ছবি ও গান

                                             মধুপর্ণা

তারপর পরিচিত বর্ষার কাছে রেখে দেবে পিছনের অনেক বছর। নতুন রাস্তার খোঁজে বর্ষা অতিথিশালার মত। পুরাতন ক্লেদ দেয় ধুয়ে, আর সবুজ চকচকে পাতাদের মত নতুন পথ এসে দেখা দেয় সামনে। বর্ষার দৃশ্য অক্সিজেনের মত টেনে নেওয়া যায়, নদীর কিনারা টৈটম্বুর, চারপাশে ঘাসেদের সজীব সামারোহ, ভিজে মাটির দৃশ্য, আর সরু জল কোন দিকে বয়ে যায়, গাছে গাছে পাতাদের আনন্দ প্রকট। এইসব বর্ষার দিনে নতুন সম্ভবনারা ইতিউতি উঁকি দেয় এখানে ওখানে। পাহাড়ে বর্ষা, শান্তিনিকেতনে বর্ষা আর মফস্বলী বীরভূমের বর্ষা – একটা ক্যানভাসের উপর অনেক গুলো আঁচরের মত। একটা ছবি মাথার ভিতর সাজিয়ে নিতে গেলে অনেক বর্ষার দৃশ্য, শব্দের সমাপতন দরকার। বহু নৈবনৈবচ র ভিতর একটা ছবি যদি প্রস্তুত করা যায় তাহলে অবসরে গাওয়া যায়… রিম ঝিম ঘন ঘন রে… বরষে…। একটা বর্ষার দিন লিটেরেচার রিভিউ এর মত বহু বহু পুরাতন বর্ষার দিন মনে করায়। পর পর চলে আসে তারা। বৃষ্টি দিনে গুম্ফা ঘুরে আসার কথা, সাদা শাড়ী কমলা পাড় উত্তরশিক্ষার দিন, ওল্ড বিল্ডিং থেকে নিউ বিল্ডিং যাতায়াত পাশে কদম্বের গাছ, ভিজে একসা হয়ে স্কুটিতে ইলামবাজার জঙ্গল, শাল গাছ আর ঘন বৃষ্টিতে পুকুরের জল থৈ থৈ। অনেক শৈশবে ভিজে এসে ভেজা দশ টাকার নোট শুকোতে দেবার দৃশ্য, ভিজে খোয়াই, পূর্ণ কোপাই, আর জারুল ফুল। খর বাস্তবের লোকে বলবে, ডিমিস্টিফিকেশনের কথা। রোমান্টিসাইজ করার কুফল ইত্যাদি। কিন্তু...  

 

                                লোকবিশ্বাসে গাছেরা কথা শোনে

                                          মধুপর্ণা

ভয়াবহ বৃষ্টির দিন আজ। রাজনগর, বীরভূম। উঠোনের গাছেরা কার্নিভাল করছে যেন। দুলে দুলে ভিজে যাচ্ছে। প্রতিটা গাছে সবুজের শেড আলাদা। দেবদারুর সবুজ আর নিমের সবুজ, পেয়ারা গাছের সবুজ আর আতার সবুজ, খিন্নি পাতার সবুজ আর টগর পাতার সবুজ ভিন্ন কিন্তু আলাদা নয়, সদৃশ কিন্তু এক নয়। আগাছা আর লেবু পাতার সবুজ এক কিন্তু সমান নয়। হিন্দুস্থানী ক্লাসিক্যাল চলছে ভিতরে। ম্যায়নে উম্র লাগাদি সারি… । কয়েকদিন আগে এক দাদা বলছিলেন, শান্তনিকেতনের গাছ গুলোর সৌষ্টব আলাদা, মজা করে বলি, রবীন্দ্রনাথের গান শুনে গাছ গুলো সুললিত সুন্দর। দাদা বলে, বোলপুরের গাছ গুলো দেখেছো? হ্যাঁ, আনহীলড। দেখে মনে হয় মহা ঝামেলার মধ্যে আছে। গাছেরা অনুভূতি বুঝতে পারে দাদা? তিনি এবার মজা শুরু করেন, হ্যাঁ, মনের কথা লিখে অথবা বলে গাছে ঢিল বেঁধে আসে অনেকে! বুঝতে পারে বৈকি! মানসিক কথার কথা বলছেন! সে তো লোকবিশ্বাস। দাদা হাসেন। মানুষের ভাষা তারা শুনতে পায় বা বুঝতে পারে কিনা জানিনা। কিন্তু যারা গাছের ভাষা জানে তাদের ভাষা গাছেরা বুঝতে পারে। বলি, বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের তলে বসলেন, বৃক্ষটি কি জানত বুদ্ধের কথা! দাদা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান, বলেন, বনের গাছ আর জঙ্গলের গাছের রকম আলাদা জানো! লোকালয়ের গাছ অন্য। লোককথায় আছে কোনো গাছ মেরে ফেলতে হলে তার সামনে গিয়ে গালিগালাজ করে আসত অনেকে, গাছটা এমনি মরে যেত আর যত্নে ভালোবাসায় গাছের বিস্তার অন্যরকম হয়! মনে পড়ে যায় আরো একটা লোকবিশ্বাস অথবা কিংবদন্তী অথবা মিথ অথবা প্রত্নপ্রতিমা… রাজনগরে যখন বিধর্মীদের আক্রমণ হয়েছিল, সব লুঠপাঠ করে দখল করার জান্তব প্রক্রিয়া তখন চলছে, সম্পদ এবং নারী – এই দুইয়ের প্রতি বিধর্মীদের লোভ, দখল আর লুঠপাঠ তাদের রক্তে, আর স্বচ্ছতা নয়, কৌশল একমাত্র হাতিয়ার। তখন রাজাকে মেরে ফেলে এবার তারা অন্দরমহলের দিকে ধাবিত। রানী তখন ছুটে গিয়েছিল রাজবাড়ির নিকটস্থ গাব গাছটির কাছে। গিয়ে বলে, আমাকে রক্ষা করো, বিধর্মীদের অসুস্থ বিকার আর রিরংসার হাত থেকে, রাজা মৃত। কথিত আছে, গাব গাছটি তার কথা শোনে আর তার কান্ড দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, রানী ভিতরে প্রবেশ করেন গাছের। বিধর্মী আক্রমণ কারীরা রানীকে  খুঁজে হন্যে। তারপর বাকী সবাই রানীকে খুঁজে পায় না। তারপর দেখা যায় গাছের কান্ডে রানীর কিছু চুল  আটকে থেকে গেছে, রানীকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে  গাছ তার দরজা বন্ধ করতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় কিছু চুল বাইরে থেকে যায়। রাজনগরের প্রতিটা শিশু কিশোর এই লোককথা শুনে বড় হয়। আমিও শুনেছি খুব ছোটবেলায়, ওয়ানে পড়ার সময়, রানীর স্নানঘর হামাম তখনও সংস্কার হয় নি, ঝোঁপঝাড়ে পুর্ণ তখন, কালীদহের জল নাকি সেই হামামে উঠে এলে রানী স্নান করতেন, আবার সেই জল দহে ফিরে যেত। কালীদহের মাঝে মা কালীর মন্দির সুড়ঙ্গ পথে ডাঙ্গা থেকে কালী মন্দিরে যাওয়া যেত। উল্টোদিকে হাওয়ামহলের সিঁড়ি, খিলান গম্বুজ সব খসে পড়েছে। আর তার পাশে গাব গাছটি এখনও দাঁড়িয়ে। একটি জীবন্ত লোককথা এখনো লোকমুখে ঘুরে ফেরে, গাছটি রানীর কথা শুনেছিল। রানীকে রক্ষা করেছিল। সামনে রাজার দালান নামে পরিচিত কাছারী বাড়ি,  পাশে হাটতলা তারপাশে বারুদখানা। মোট কথা হল, লোকবিশ্বাসের ভিতরে গাছেরা কথা বলে, মানুষের কথা শোনে। গাছে ঢিল বেঁধে এলে শোনে কিনা জানি না, কঙ্কালীতলায় পাকুর গাছে অনেক ঢিল বাঁধা রং বেরঙ্গের সুতো দিয়ে। তাদের আর্জি গাছ শুনবে কি না জানিনা, কিন্তু যাদের বলার ছিল তাদের বলা তো হল। লোকবিশ্বাসে গাছেরা কথা শোনে। দাদা বলেন, শুধু লোককথায় নয়, এমনিও শোনে, পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ, বলে দেখো, শুনবে। কার্শিয়াং এর চা বাগানে একটা বড় গাছের কথা মনে পড়ে। শুনতে পায় কিনা না জেনেও বলে এসেছিলাম কিছুকথা। তারপর পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল কিছুদিনের মধ্যে আমূল। 

Sunday, September 20, 2026

 

                                             অথ যোগিনী কথা

                                                 মধুপর্ণা

 

  যোগিনী আজকাল অদ্ভূত মগ্নতায় ডুবে থাকে, পড়ন্ত বিকেলে বলে বসে, তারপর তুমি বুঝে যাবে সারল্য যারা অপব্যবহার করে, ভদ্রতাকে যারা দূর্বলতা ভাবে প্রকৃতি তাদের ক্ষমা করে না। শুধু চুপচাপ দেখে যাবার ধৈর্য্য থাকতে হবে তোমার। বলি, আর ওভার পাওয়ারিং এর পাপ! যোগিনী মৃদু হাসে, যারা ভেবেছিল, “ অন্যায় আর মিথ্যা প্রতিষ্ঠাযোগ্য তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে সময় লাগে না।“ তারপর একদিন সন্ধ্যেবেলার মৃদু বাতাস আর আবছা আলোছায়া বলে যাবে ঈশ্বরাভিমুখীকে আটকে রাখার ক্ষমতা কারো থাকে না। এই দরিয়া উত্তাল, শক্ত হাতে যে মাঝি নাও বায়, তাকে তরী ভীরে যায় গন্তব্যের কিনারে। ক্ষমতা এমন এক সূক্ষ্ম সুতো যে চেনে খাদের কিনার। অপব্যবহারের ব্যকরণ তোমাকে উচ্চতা চেনায় আর চেনায় খাদের অতলান্ত। স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের কথা শুনতে শুনতে মনে হয়, চুপচাপ দেখে যাওয়ার মত শান্তি নেই, যার যা দেখানোর আছে দেখে যাও, চুপচাপ, নির্বিকার। যোগিনী বলে, গল্প জানিস একখানা?  হিমবান পর্বতে একান্তে ধ্যান করেছিল কৈশিকী, আর তাকে টলাতে পারে নি অসুরেরা। দেবী কৈশিকীর শিক্ষার বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছিল দুইদিক জেনে। একদিকে আলো ফেলে জানা যায় না সমগ্র, তাই তাহার পরীক্ষা ছিল দুইদিক জেনে বেরিয়ে এসে আবার ধ্যানে ডুবে যেতে হবে। কৈশিকী যে দিকটি জানিত না সেইদিকটির পরীক্ষা তাকে দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল তার অধ্যবসায়। বলি, তুমি যা অতিন্দ্রীয় ঐশ্বরিক ভাবে দেখো, আমি তার ভিতর অন্য কিছু দেখতে পাই, পাওয়ার ডায়নামিক্স দেখতে পাই। যোগিনী চোখ দিয়ে হাসে,বলে, দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে নাকি! হতভম্ব হয়ে যাই। যোগিনী তাড়া দেখিয়ে উঠে যায়, কথা হবে, এই বিষয়ে আবার পরে কথা হবে।  

Saturday, September 19, 2026

 

 

                                           দৃশ্য সংস্কার

                                             মধুপর্ণা

 

তারপর একদিনের পর দুইদিন তার সঙ্গে বছর যোগ করে যে ধারাবাহিকতা তার প্রতি অসীম মমতা এসে জুড়ে যাবে। একদিন দেখা যাবে, পিঠে যারা অসংখ্য তীর বিঁধিয়ে রেখেছিল সেইসব তীরের ক্ষত আর নেই।  দেখা যাবে, কাজের সঙ্গে কাজ জুড়ে যে শৃংখলা তার সমাহার বড় সুন্দর। দেখা যাবে নতুন  টাস্ক এসে দেখে দিলে  উতসাহে ভরে যায় অন্তর বাহির। শৈশবের বন্ধুর সঙ্গে পুরোনো স্কুলের বিষয়ে কথা বলার মত একটা আবেগ এসে ধুয়ে দিয়ে যাবে যা কিছু ধুয়ে ফেলে দেবার মত। ঘুরতে ঘুরতে গল্প থেকে একটা দৃশ্য এসে চোখে এসে বিঁধে যাবে।  মেঘমল্লার গল্প যারা পড়েছে তারা জানে প্রদ্যন্মের বাঁশবনে পাথর হয়ে যাবার দৃশ্যের বেদনা, তারা জানে বাঁশবনে শনশন করে হাওয়া বয়ে যাবার কথা ভেবে কেমন অনুভুতি হয়। সেদিন মহুয়া গাছ খুঁজতে খুঁজতে পিয়ারসন পল্লীর ভিতর কতদূর চলে গেছি খেয়াল নেই, একটা দৃশ্য এসে সামনে দাঁড়ায়, বিদ্ধ করে দেয়। কে দাঁড়িয়ে ওখানে! কে ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! বাঁশবাগানের ভিতর! কোথায় যেন দেখেছি এই দৃশ্য, বহুবার ভেবেছি! তারপর মনে পড়ে বিভূতিভুষন বাঙালীকে শুধু গদ্য আর আখ্যান দেন নি, দিয়েছেন দৃশ্যের সংস্কার। দেবী সরস্বতীকে করাল বায়বীয় কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়ে প্রদ্যম্ন পাথর হয়ে গিয়েছিল। জঙ্গলের ভিতর বাঁশ বাগানে হু হু করে হাওয়া দিত আর দূর থেকে মনে হত যেন বাজছে মেঘমল্লার। সেইরকম একটা সুর কি এই ভরদুপুরে বেজে উঠল! না। কিন্তু দৃশ্যের ভিতর থেকে জমে থাকা মস্তিস্কের পুরোনো আর্কাইভ থেকে আরো একটা দৃশ্য টেনে আনল। আর কিছু না হয়তো।



 

 

Tuesday, September 15, 2026

 

                                          বিকেল বেলার গান

                                              মধুপর্ণা

তারপর একটা সময় আসে, বিকেল বেলা, শান্ত আলোয় ভরে যায় চারিদিক। গাছপালা গুলো সারাদিন কাজ করে যেন অবসর নিচ্ছে। স্নিগ্ধতার একটা আলাদা সৌন্দর্য্য আছে সবকিছু ব্যাতিরেকে। এই সব বিকেল গুলো চুপচাপ। তুমি ভেবে যাবে মানুষের মুখের বদল, ভেবে যাবে মনস্তত্ত্বের অন্ধকার, অপব্যবহারের ব্যাকরণ, আর ক্ষমতার দাবদাহ। এই সব বিকেলে সেই সব চিন্তাসূত্রের পেজ একে একে ক্লোজ হয়ে যাবে। একটা একটা করে মুছে যাবে নিজে নিজে। কি থাকবে জেগে? জেগে থাকবে শুধুমাত্র শান্ত বাতাস, নরম আলো আর তার চেয়েও বেশি সংবেদনশীল মানুষের উপস্থিতির স্মৃতি। বিকেলে জঙ্গলে মহুয়ার সুগন্ধে মাতোয়ারা হাওয়া, চাল ফোটানোর সান্দ্র আওয়াজ, আর তাল গাছে বেঁধে রাখা মাটির হাঁড়ি। ধরণ আর প্রকার হিসাব করার ইচ্ছা যাবে ধুয়ে। পেন্ডুলাম টা এদিক ওদিক করতে করতে সমে এসে, মাঝখানে এসে থামবে যখন সেই স্থিরতাটাই মূলসুর বলে যাবে এইসব বিকেল। আর সারি সারি বর্ণমালা আর তাদের অর্থ-অনর্থ বলে যাবে, এখনও আছে কিছু বাকি। 

Sunday, September 6, 2026

 

                                        সেপ্টেম্বরের সকাল

                                            মধুপর্ণা

 

মোহন সিং এর গানের মত একটা সকাল হয়। ‘দৈনন্দিন’ নামের একটা নিত্যনৈমিত্তিক বাতাস এসে জানান দেয় দিনের উপস্থিতি। সকালের আলো, সূর্যোদয়, সকালের শীতল বাতাস, দুলে ওঠা বারান্দার গাছ, খোলা বই, খোলা স্ক্রীন, তানপুরার নরম আওয়াজ, দিন শুরুর প্রশান্তি। মার নীরব উপস্থিতি। এইরকম নরম দিনগুলি পদ্মাসনে বসে থাকে, ভিতর থেকে কেউ বলে ‘ফুলের মত সহজ সুরে, প্রভাত মম উঠিবে পুরে’ এই সকাল বহুকাল লালিত অর্জন। পাহাড়ের সেই দার্শনিক দোকানীর কথা মনে পড়ে, কয়েক ঘন্টা ঘুরে অভ্যেস মত চায়ের দোকান খুঁজছি সেদিনও। মনেস্ট্রির ধাতস্থ শান্তির ঘোর তখনও কাটে নি। চা মিলেগা? মিলেগা। দোকানী দিলেন চা, তারপর এটা সেটা কথা, তারপর বেরোনোর আগে জিজ্ঞেস করি, কিতনা হুয়া? উত্তর আসে, চায়ে ইঁহা মিলতা হ্যা লেকিন বিকতা নেহি। ঘোরের ভিতর এই সব কথা শুনে অদ্ভুত লাগে, দোকান খুলে বসে আছেন, চা মিলেগা বললে বলছেন, মিলেগা তাহলে, চায়ে ইহা মিলতা হ্যা লেকিন বিকতা নেহি - এই কথার অর্থ কি? লোকটি অপ্রস্তুত, বলে, মাম্মিনে বানায়া, সল্ট টি। আপনি বললেন চা পাওয়া যায় কিনা তাই আমি বললাম পাওয়া যায়। আপনি তো জিজ্ঞেস করেন নি বিক্রি হয় কিনা। বলি, পাহাড়ের লোকজন অদ্ভুত তো, যাই হোক ভাল থাকবেন। চলে যাই দূরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে। ঘন্টা দুয়েক পর ঐ রাস্তা ধরে ফিরছি আবার। নানা ভোগান্তির পূর্বস্মৃতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে যথারীতি। চুপচাপ ধীরে ধীরে হেঁটে যাওয়া নেশার মত। দূর থেকে কেউ জিজ্ঞেস করছে, আর ইউ ক্রাইং? না তো। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার পাড়ে। তারপর এটা সেটা কথার পর জানা গেল, ভদ্রলোক কালিম্পং কোর্টের আইনজীবি, শৈশব থেকে বৌদ্ধগুম্ফায় থেকে পড়াশোনা করেছেন, পরবর্তীতে সামাজিক জীবন স্রোতে ফিরেছেন, ছুটিতে মায়ের দোকানে সাহায্য করতে বসে আছেন, দোকানদারীর কিছুই জানেন না। অসংখ্য গল্প কথা, বৌদ্ধ গুম্ফায় সন্নাসীদের জীবন সম্পর্ক যত কৌতুহল ছিল জানা গেল, প্রশ্ন কথা পল্লবিত হয়ে গেল বহুদূর। বৌদ্ধ পার্ক থেকে বৌদ্ধ গুম্ফায় যাবার দীর্ঘ ছায়াচ্ছন্ন পথ, রোজ একবার হেঁটে আসা যায়। পরদিন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে আবার গল্প হল অনেক, পূর্বের সন্নাসীজীবন, পড়াশোনা, বৌদ্ধদর্শন নিয়ে সাধনা আর চর্চা। এইরকম ছদ্মবেশী দার্শনিক দোকানী আমি দেখিনি কোনদিন। ভদ্রলোকের মা এলেন কিছু পর। পাহাড়ে গত দুই বছরে অনেক অভিজ্ঞতার মধ্যে এই বার লাভার অভিজ্ঞতা অদ্ভুত।

Tuesday, September 1, 2026

                                              বৃষ্টিদিনের পকেট

                                                  মধুপর্ণা

                         

তারপর একদিন সকালে বৃষ্টি হবে খুব। রাস্তায় ছাতা হাতে বেড়িয়ে দেখবে জলে জলময়। শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে। জলে নৌকা ভাসাতে গিয়ে কাকভেজা হয়ে ফিরে এসে মায়ের হাতে উত্তম মধ্যম খাবার দিন। তারপর ড্যামেজ ম্যানেজমেন্টের জন্য সারাদিন পড়াশোনার ভান। পড়তে বসে দিদির সঙ্গে খুনশুটি। স্কেল দিয়ে জায়গা ভাগ, একে অন্যের বইয়ের পাতা ছিঁড়ে দিয়ে হিংস্রতার হাতে খড়ি। তারপর মা জেনে যাবার আগে সেলোটেপ দিয়ে পাতা জোড়া। জলে জলময় চারিদিক, স্বচ্ছ জলের নীচে ঘাস। পুতুলের বাক্স। মাটির পুতুলের রান্নাঘরে কাঁঠাল পাতার লুচি। হোমিওপ্যাথির শিশি থেকে অজানা রোগের অজানা ওষুধ অবলীলায় খেয়ে নেওয়ার পাপ। তারপর মায়ের দুশ্চিন্তা। বৃষ্টি শেষে সন্ধ্যা হবার আগে আকাশ হয়ে উঠত রঙিন। নানান ছবি ভেসে উঠত তাতে। আকাশেই দেখা যেত শেয়াল, ডানা মেলা বক, মন্দিরের চূড়া। সেই মাটি বালি পাথর, জলের ধারা আর শৈশবের বৃষ্টি শেষের আকাশ। এক একটা বৃষ্টি দিনে স্মৃতির পকেট থেকে বেড়িয়ে আসে ছবি, শব্দ, গান। সময়ের নদী যায় বয়ে। কুমড়ো ফুলের হলুদ রং, গ্রামের স্টেশনারী দোকানে কাঁচের সবুজ চুড়ি, ভিজে উঠোনে ছোট পাখির ঘুরে বেড়ানো, স্কুলে কর্মশিক্ষা পরীক্ষায় রিলিফের কাজের জন্য কুমোর পাড়ায় মাটি আনতে যাবার রাস্তা, রাস্তায় গাছে হনুমান, সাইকেল চালানো শেখার আপ্রাণ চেষ্টা, বইয়ের দোকানে নতুন স্টিকারের খোঁজ, হ্যারি পটারের ছবি দেওয়া খাতা পেয়ে গেলে আনন্দে আত্মহারা অবস্থা, গোলাপ চারা আজ পুঁতে কাল কেন ফুল ফুটছে না - এই মর্মে অস্থিরতা, স্কুলের সেই সব অলৌকিক বেঞ্চ - এই সব দিয়ে গড়া মফস্বলী শৈশব বৃষ্টিদিনে ভেসে ওঠে। বৃষ্টিদিনের বিকেলে আশেপাশের পাড়া থেকে মাঠ থেকে ধরে আনা ছোট ছোট মাছ বিক্রি করতে আসতেন গ্রামের বধূরা। মাঠে কীটনাশক, পেস্ট্রিসাইড দেবার ফলে নারীদের এই পেশা ধীরে ধীরে কমে গেছে বা বিলুপ্ত। কারণ মাঠে আর ছোট মাছেরা আসে না বা জন্মায় না। প্রান্তিক নারীরা এই ভাবে আয়ত্ত্বের মধ্যে থাকা আয় হারিয়েছেন। বৃষ্টি দিনে স্মৃতির ভিতর অসংখ্য মুখ, অসংখ্য মুখের রেখা। ছবি শব্দ গান দিয়ে গড়া শৈশবের আরেকটি দিক। এইসব বৃষ্টিদিনে মস্তিস্কের স্মৃতির সুখবোধ, বাস্তবের নানা স্তরের চেহারা আলাদা আলাদা। বৃষ্টিদিনের পকেটে বহু দৃশ্য, কথা লুকোনো। মাটির রাস্তা বেয়ে কাদা জল বয়ে যাবার দৃশ্য, কাদার দৃশ্য, আর শান্তিনিকেতনে আসার পর বর্ষা মানে জারুল ফুলে মাতোয়ারা ভেজা গাছ, কোপাই আর আনন্দের অসীম আয়োজন। পাহাড়ে বৃষ্টি দেখে মনে হয়েছিল জীবনের জ্বর ছেড়ে যাবার এই হল পরম ঔষধী। ঝম ঝম ঝম ঝম একটা ছন্দে বৃষ্টি পড়ছে আর ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে চারিদিক। 


                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...