Saturday, July 4, 2026

 

                                    অসীম রহস্য মাঝে

                                         মধুপর্ণা

হীমবান পর্বতে ধ্যান করিয়াছিলেন দেবী কৈশিকী। আর জঙ্গলে ঘুরিয়া প্রকৃতি সাধনা করিত সাধুয়ান। আর তাহাদের উত্যক্ত করিত কয়েকটি অসুর, রাক্ষস, মানুষের পোশাকের আড়ালে কয়েকটি ইতর বিকার। ধ্যানমগ্না নারীর সৌন্দর্য্যে তাহারা মুগ্ধ আছিল না, তাহারা ছিল রিপু পরায়ন আর হিংস্র। তাহারা একক, একেলা নারী দেখিয়া প্রথমটায় ভাবিল কি আর এমন বেগ পাইতে হৈবে, এই নারীকে বাঁধিয়া লৈয়া যাইব আর তাহার সর্বস্ব কাড়িয়া মণ্ড করিয়া নদীতে ফেলিয়া দিব। আসিয়া তাহারা দেবীর নিকট জল চাহিল। বলিল আমরা বহুদুর হৈতে আসিয়াছি, কাতর, আমরা দরিদ্র। আমাদের কিছু নাই। দেবী দয়াপরবশ হৈয়া তাহাদের জল দিলেন আর দিলেন কিছু খাদ্য। আর বললেন, দুর্ভাগ্যের জন্য চিন্তা করিও না, সকলই শুভ হৈবে। অসুরেরা ভাবিল, এই দয়া মায়ার সূবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা যাইবে না। এই সুযোগটাই কাজে লাগাইতে হৈবে। দেবী ফিরিয়া গেলেন ধ্যানাসনে। কিছু সময় পর চোখ খুলিয়া দেখিলেন, তাহার যজ্ঞশালা হৈতে সকলই চুরি গিয়াছে। প্রথমটায় বিশ্বাস করিতে পারিলেন না যে এই লোকগুলি নিয়া গিয়াছে, পুনরায় যজ্ঞ সাজাইয়া পুজা করিতে বসিলেন। উঠিয়া ভাবিলেন, আহা, তাহাদের অভাব সেকারণে লৈয়া গিয়াছে। সে যাক। তাহার পর কিছুদিন কাটিল, রাক্ষসেরা চুপিসারে আসিয়া দেবীর বাসগৃহে সিঁধ কাটিতেছিল। দেবী পর্বত শিখরে অরণ্যের ভিতর শিশুকাল হৈতে থাকিয়াছে। ভয় কাহাকে বলে জানা হয় নাই, কূটচক্র কাহাকে বলে জানা হয় নাই, অসুস্থ বিকার কাহাকে বলে জানা হয় নাই, মুখের আড়ালের মুখোস কাহাকে বলে জানা হয় নাই। এই বহুবিধ না জানার ভিতর সরল শান্তিতে চারিপাশের সকলের স্নেহে, ভালোবাসায় সে বাড়িয়া উঠিয়াছিল আনন্দে, সৌন্দর্য্যে। সুন্দর গুনাবলী গুলি একত্রিত হৈয়া কৈশিকী অপার সৌন্দর্য্যের আধার হৈয়া উঠিয়াছিল। তিনি যখন ধ্যান করিতেন অরণ্যের চারিদিক আলোকিত হৈয়া উঠিত। চারিপাশের জীবজন্তু পশুপাখি সকলের ভিতর খুশির আদান প্রদানে সেই স্থল ঝলমল করিয়া উঠিত। কৈশিকী ধীরে ধীরে এক একটি করিয়া ধাপ উঠিয়া যাইতেছিল তাহার সাধন মার্গে। সূক্ষ্ম হৈতে সূক্ষ্মতর হৈতেছিল তাহার বোধ, প্রজ্ঞা। এমতাবস্থায় রাক্ষস তাহাদের পরিকল্পনা আর হিংস্রতা লৈয়া উপস্থিত হৈল। কৈশিকী নঞর্থকতা, হিংস্রতা কাহাকে বলে জানিত না – এই বিপুল অজ্ঞানতা লৈয়া কিরূপে তাহার সিদ্ধি হৈবে বলিতে পারো ? এই অজ্ঞানতার মূল্য তাহাকে চুকাইতে হৈবে না? এই করাল সত্য প্রকট হৈবার প্রস্তুতি লৈতে ছিল। কৈশিকীর কমন্ডলু হৈতে জল পড়িয়া গেল সেদিন, তাহার পুস্পপাত্র হৈতে আবিষ্কৃত হৈল সর্প। আর কৈশিকী মাটিতে পা দিয়া অনুভব করিল তাহার দেহ থরথর করিয়া কাঁপিতেছে। কিসের অশনী সংকেত? কৈশিকীর কি যেন বেসুর ঠেকিল। কিসের যেন এক আশংকা আসিয়া উপস্থিত হৈল। সেদিন সে ধ্যানে মনস্থির করিতে পারিল না। কুডাক ডাকিতে লাগিল তাহার সমস্ত অন্তঃকরণ। তিনি ভাবিলেন, মনের ভ্রম। তিনি আবার নিজকাজে মন দিলেন। কিন্তু একটা সূক্ষ্ম এবং তীব্র কাঁটার মত কিছু বিঁধিয়া থাকে, কিছুতেই সরে না। রাক্ষসগুলি ওৎ পাতিয়া বসিয়া ছিল। আর ভাবিতেছিল কি কি প্রকারে কৈশিকীকে কব্জা করা যায়, অপদস্থ করা যায়। রাক্ষসেরা তাহার দয়ালু মনোভাব, স্বচ্ছ্বতা সুযোগ হিসাবে দেখিল। একে একে তাহাকে সুঁচ বিঁধিতে লাগিল, আঘাত করিতে লাগিল, অপদস্থ করিতে লাগিল, অপমান করিতে লাগিল। দেবী স্থির অনড়, অবিচল, অটল। তাহার চতুর্দিকে জ্যোতির্বলয়। তাহার নৈঃশব্দ আর স্মিতহাস্য রাক্ষেসদের আরো উত্তেজিত করিয়া তুলিল। তাহাদের রোখ চাপিয়া গেল, দেবীর প্রতিক্রিয়া তাহাদের চাইই চাই। মহাদেব দেখিতে ছিলেন সমস্তই। দেখিয়া হাসিতেছিলেন। আর ভাবিতেছিলেন, কৈশিকী, তুমি সিদ্ধি চাহ আর তুমি দুনিয়ার ভয়ঙ্কর রূপ দেখিবে না তাহা হয় না, এইখানে তোমার পরীক্ষা, দেখি তুমি কি প্রকারে পার হও এই ভয়াল বিষের সমুদ্র। কৈশিকী বিষের বাস্পের ভিতর একান্তে নিজের সাধনা একমনে করিয়া যায়। কিন্তু সে বুঝিতে পারে, পূর্বের ন্যায় সেই আনন্দ, সেই বিস্ময়, সেই সমাবস্থা, সেই স্বাভাবিকতা আর নাই। যা কিছুই করিতেছে তাহাকে যেন জোর করিয়া করিতে হৈতেছে। তিনি তথাপি করিতে থাকিলেন। কিন্তু কি যেন বিস্বাদ ঠেকে। বেসুর থেকে। তাল কাটিয়া যায়। দেবী বুঝিতে পারিল,একটি অত্যন্ত নিম্নমানের আক্রমণ হৈয়াছে। খুব পরিকল্পিত একটি আবর্তের মধ্যে তিনি পড়িয়াছেন। একটি জাল যেন তাহাকে ধীরে ধীরে জড়াইয়া ফেলিবার জন্য আগাইয়া আসিতেছে। একটি ফাঁদ তিনি পুনরায় চেষ্টা করিতে থাকেন স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখিবার। কিন্তু বারংবার আক্রমণের মুখে পড়েন। তাহার শক্তি সামর্থ্য ভিন্ন পথে চালিত হৈয়া যাইতেছে তিনি বুঝিতে পারেন। বিভূতিভুষন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মেঘমল্লার’ যাহারা পড়িয়াছেন তাহারা জানেন, দেবী সরস্বতীকে বন্দী করিয়া তাহাকে মৃতপ্রায় করিয়া ফেলিয়াছিল অশুভ শক্তি।  তখন তিনি মহিমা ভুলিয়া গিয়াছিলেন তাহার আত্মবিস্মরণ হৈয়াছিল। তিনি ভয় পাইতেন। ধীরে ধীরে বিবর্ণ হৈয়া গিয়াছিলেন। তিনি অনন্যা হৈতে ধীরে ধীরে সাধারণে রূপান্তরিত হৈয়া গিয়াছিলেন। সেই বিবর্ণ রূপ দেখিতে পাইয়াছিল প্রদ্যুম্ন। সুন্দর কিছু দেখিলে কেহ মুগ্ধ হয়, কেহ তাহা নষ্ট করিতে চায়। কারণ তাহাতে নিজের ভিতরের কদর্য রূপটি স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়া উঠে, সুন্দর কিছু দেখিলে নষ্ট করিতে না পাইলে অসুস্থ লোকের অস্তিত্ত্বটিই বিফল হৈয়া যায়। হয় দখল করিব নয় নষ্ট করিব – এই বিদ্বেষের উপর ভিত্তি করিয়া বহু বিশ্বাস কাঠামো তৈরি করিয়া অনুশীলন করে। কিন্তু ইহাই শেষ কথা নহে। সরস্বতী যেমন আছেন, কালী, চামুন্ডাও প্রকট হন সময় উপস্থিত হৈলে। কৈশিকীর ধ্যানভঙ্গ করিয়াছিল যাহারা, দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তাহাকে ভাঙিয়া দিতে চাহিয়াছিল যাহারা তাহারা জানিত না, এইগুলি মোকাবিলা করিতে যুগে যুগে ভিন্ন রূপ ধরিতে হয় নারীদের। ঔদ্ধত্ব, অন্যায়, আর বিকার বাড়িয়া গেলে তাহাকে দমন করিতে ধীরে ধীরে অন্য রূপে প্রকট হন তাঁরা। তাহার দৃষ্টান্ত নিতান্ত কম নহে। কৈশিকীও বিরক্ত হৈয়াছিল। একসময় দেখিল এই উপদ্রব বন্ধ না করিলে সাধনার ব্যাঘাত ঘটিতেছে। তখন তিনি চামুন্ডা রূপ ধরিলেন এবং অসুর দমন করিয়া পুনরায় ধ্যানে বসিলেন। মহাদেব স্মিত হাসিলেন। এবং আসিয়া বলিলেন, ফসল ফলাইতে ক্ষেত্র প্রস্তুত করিতে হয়। তোমার ক্ষেত্র প্রস্তুত হৈয়াছে, তুমি এখন যাহা করিবে তাহাতেই সোনা ফলিবে। যাহা জানিতে না তাহা জানিয়াছ – এখন তুমি মুক্ত।

 

Friday, July 3, 2026

 

                                             বাক্স -ব্যকরণ

                                               মধুপর্ণা

প্রত্যেকের একটা বাক্স আছে। স্নায়ুর সহন ক্ষমতা, শিক্ষা, রুচি আর মানসিকতা দিয়ে গড়া একটা করে বাক্স। অন্যকে সেই বাক্সে পুরে ফেলতে চায়। উদ্দেশ্য একটা আছে, কি উদ্দেশ্য? আত্ম প্রতিস্থাপন আর নিয়ন্ত্রণ। তার আগে একটা সূক্ষ্মধাপ, টলারেন্স চেক। অন্যে কতটা অবধি সহ্য করবে, কতটার পর চিৎকার করবে অথবা কতটার পর রুখে দাঁড়াবে, অথবা কতটা চাপ দিলে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে আর উঠে দাঁড়াবে না – তার হিসাব নিকাশ। তার মাপে বাক্স গুলোর মাপ বাড়ায় বা কমায়। মনস্তাত্ত্বিক এই খেলা যদি একবার দেখার চোখ তৈরি হয়ে যায় তাহলে এখান থেকে ফিরে যাবার আর কোনো পথ নেই। তুমি চোখ বন্ধ করেও দেখতে পাবে। আঁচ করতে পারবে। ইন্টার পার্সোনাল ডায়নামিক্স। এইটা চোখ থেকে একটা পর্দা সরে যাবার মত। বাইরের পর্দা আর আড়ালটা সরে গেলেই দেখতে পাবে জম্বি, ভ্যাম্পায়ার আর শিকারীর দঙ্গল। চামড়ার নীচে সূঁচের মত কিছু একটা ফুটতে থাকার অনুভূতি যদি তোমার হয়ে থাকে তাহলে তুমি চিনে যাবে ধীরে ধীরে নানান বাক্স -ব্যকরণ। কিছু বই যেমন আমরা স্বেচ্ছায় পড়ি না, বাধ্য হয়ে পড়ি, হাঁটতে হাঁটতে কয়েকটা মানুষ তোমাকে কিছু বই খুঁজে বের করতে বাধ্য করবে, পড়তে বাধ্য করবে। যেমন নার্সিসিজম, সাইকোপ্যাথ, আর সোশিওপ্যাথ বিষয়ে পড়তে জীবনে কোনো না কোনো সময় তুমি বাধ্য হয়ে থাকো, তাহলে তোমার বাস্তবের বিশ্বরূপ দর্শন হয়েছে, তোমাকে অভিবাদন। যেই পর্দাটা সরে গেল অমনি তুমি দেখবে পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন। প্রথমবার দেখার অভিজ্ঞতা তোমার মোটেই সুখকর হবে না, এই আবিষ্কার ভয়ংকর লাগবে। তারপর যখন ধাতস্থ হবে, তখন হাসি পাবে। তারপর শিখে যাবে আঘাতের বদলে প্রত্যাঘাত করতে। আনুগত্য আর নিয়ন্ত্রণের ভিতরের নকশা তুমি যেদিন বুঝতে পেরে যাবে সেদিন থেকে একটা মুক্তির অধ্যায় শুরু। বুঝে যাবে, আত্মপ্রতিস্থাপনের সূক্ষ্ম ইচ্ছা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারলে আত্মশ্লাঘার একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করে অনেকে। আত্মস্যাত করার একটা প্রবণতা খুব সূক্ষ্ম স্রোতের মত চলতে থাকে, একটা সময় তোমাকে মানুষের ভিতরের অন্ধকার চেনাবে, এই শিক্ষানবিশির সময়টি খুব যত্ন করে শিখতে হয়। খুব যত্ন করে প্রতিটা ধরণ, প্রতিটা অন্ধকারকে জানতে হয়। প্রত্যেকের অন্ধকার আর লালিত বাক্স গুলি যত্ন করে জানতে হয়। নরম মাটি দেখলে বিড়াল সেখানে আঁচড়ায়… শক্ত মাটিকে সমঝে চলে। তোমার পুর্ব সংস্কার তোমাকে দেখেও না দেখার ভাণ করতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে কিভাবে কাদা না ঘাঁটতে হয়, কিভাবে আলোর দিকে তাকাতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে তোমাকে নামিয়ে কাদা মাখাবেই, বেশ কাদাই যখন মাখতে হবে, তখন কাদার ব্যকরণটা জানো ভালো করে। তারপর দেখবে জায়গায় জিনিস জায়গায় চলে গেছে। তোমার প্লেটে পরিবেশিত হবে অনেক খেলা, এবং বলা হবে, ‘এটাই তোমার খেলা, এটাই তোমায় খেলতে হবে’। তুমি এবার করবে কি সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সেই খেলাটা খেলতে শুরু করবে। কিন্তু তুমি স্বাধীন মানুষ, তোমার স্বাধীনতা আছে এইকথা বলার, আমি নিজে পছন্দ করব এই স্বল্প জীবতকালে কোন খেলাটা খেলতে চাই, আর কি কি কেটে বাদ দিতে চাই। বা আদৌ তুমি পাশাখেলায় অংশ নিতে চাও না। এই গুলো জেনে যাওয়া আর না জেনে থাকার মধ্যবর্তী দূরত্ব অনেকখানি।   

 

 

Tuesday, June 30, 2026

 

                    সঠিক ভাবনার খোঁজে: মানুষের চাহিদার দাবানলে এথিক্সের লাগাম

                                         মধুপর্ণা কর্মকার

ভিন্নধারার ভূগোলবিদ এবং চিন্তক অধ্যাপক মলয় মুখোপাধ্যায়ের নতুন বই ‘সঠিক ভাবনার খোঁজে’। বইওয়ালা বুক ক্যাফে প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২৫ শে বৈশাখ ১৪৩৩ এ। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাদের ‘যাঁরা পৃথিবীকে আত্মীয়সম মনে করেন’। যখন ভোগবাদী ব্যবস্থায় পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের একমাত্র সম্বন্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভোগ্য আর ভোক্তার, ইকোফেমিনিজম যেখানে চিহ্নিত করেছে মানুষের সভ্যতা পৃথিবীকে, প্রকৃতিকে ‘ভোগ’ করে এক পাক্ষিক ভাবে, ‘এক্সপ্লয়টেশন’ একমাত্র সম্বন্ধ যেখানে, সেখানে সেই মানুষেরা উন্নয়নের যে ধরণ তৈরি করবে, যে পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে আবশ্যিক ভাবেই সেখানে ‘স্বার্থ’ কেবল ভোগের উপর ন্যস্ত থাকবে তা বলা বাহুল্য। এইখানে লেখকের প্রশ্ন, ভোগে অন্ধ সভ্যতা যে কাজ গুলি করে চলেছে সেগুলি কি ‘ঠিক’? উচিত কাজ ? ‘সঠিক’ শব্দটি যখন বইয়ের না্মের মধ্যে রয়েছে তখন একটা এথিক্সের প্রশ্ন এসে যায়,  কিসের এথিক্স ? উন্নয়নের নৈতিকতা, দৃষ্টিভঙ্গির নৈতিকতা। যা কিছু ঘটছে তার ভিতরে কি হওয়া দরকার বা কি হওয়া উচিত ছিল এবং বর্তমান পদক্ষেপ গুলি কি কি ভাবে সেখান থেকে বিচ্যুত - এই প্রশ্ন গুলো প্রাসংগিক হয়ে দাঁড়ায়। এখন ন্যারেটিভ মেকিং এর যুগ, যারা দলে ভারি এবং একটা মত, একটা মডেল যা বহুলোকে মেনে নেবে সেটাই প্রামান্য হয়ে ওঠে। কিন্তু তার প্রয়োগ আদৌ জরুরি কিনা, সেখান থেকে পৃথিবীর সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে কিনা তা বিবেচ্য নয়। এই খানেই আসে সেই ‘খোঁজ’। যা কিছু ঘটছে সেসব কতটা এথিক্যাল।

নারীবাদের ছাত্র হিসাবে ‘সঠিক ভাবনার খোঁজে’ বইটিকে আমি দেখতে চাইব দুটি দিক থেকে, প্রথমত, ইকোফেমিনিজমের প্রেক্ষাপট দিয়ে, দ্বিতীয়ত, নৈতিকতার দর্শন দিয়ে। বইটির গভীরতলের কাঠামো (deep structure) এই দুই অক্ষের ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করেছি। যে কোনো দুটি সত্ত্বার পারস্পরিক সম্বন্ধ নির্ধারণ করে মধ্যবর্তী ক্ষমতার বিন্যাস। মানুষেরা পৃথিবীকে মনে করে ‘ভোগের বাগান’, ‘আত্মীয়সম’ নয়। এইখানে মধ্যবর্তী ডায়নামিক্স থেকে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় আর তা প্রতিফলিত হয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এইখানে প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর দীর্ঘ গবেষণা -অধ্যাপনা-ক্ষেত্রসমীক্ষা -ভ্রমণের ভিতর থেকে বইটির প্রতিটি প্রবন্ধ গুলি একটি ভিন্ন দৃষ্টি বহন করে।

 বইটি তিনটি পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। ‘ভাবনার ওপাশটাতে’ পর্বে রয়েছে এগারোটি রচনা, ‘সদর্থক ভাবনার এপাশটাতে’ পর্বে রয়েছে তিনটি রচনা এবং ‘ভাবনার ঘরে প্রস্তাব’ অংশে একটি লেখা। ‘ওপাশে’ এবং ‘এপাশে’ এই শব্দ গুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ, একটি বিষয়ের বা সিদ্ধান্তের সবদিক বিবেচনার একটি ইংগিত এই শব্দচয়ন থেকে উঠে আসে। একপাক্ষিকতা থেকেই বর্বরতার জন্ম হয়, অন্যের দূর্ভোগের জন্ম হয়। আমাদের যে কোনো বিষয়ে পূর্নাঙ্গ ধারনা পেতে হবে যদি ‘সঠিক’ ভাবে ভাবতে চাই। ভায়োলেন্সের সূক্ষ্ম চেহারা দেখতে পাওয়া যায় সভ্যতা, আধুনিকতা, উন্নয়নের ভিতর আর তা যাচাই করার জন্য সংবেদনশীলতা নৈতিকতার মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে। এই বইতে একই ছাঁদে উন্নয়নের ব্যর্থতা এবং তার অসংবেদনশীলতার কথা উঠে এসেছে বারবার। কিভাবে পটভূমি, প্রেক্ষাপট বিযুক্ত উন্নয়ন আদিবাসীদের ‘নিজস্বতা’ আহত করেছে কিভাবে আপাতানিদের আত্মমর্যাদায় হস্তক্ষেপ করেছে। যেখানে উন্নয়নের নিশানা, আপাতানিদের মর্যাদাবোধের প্রতীকের থেকে উঁচু হয়ে যায়। কিভাবে ওঙ্গে জনজাতি পরিকল্পনায় উপকৃত হয় না বরং “কবল’ এ পড়ে। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ যেন মানুষের একার ভোগের বিষয়, সেখানে পৃথবীকে সচেতন সত্ত্বা হিসাবে অস্বীকার করার যে সংস্কার লেখক এইদিকটি বারবার উল্লেখ করেছেন। জীবনযাপনের প্রামাণ্য স্বরূপ কি এখনও ‘সভ্য’ মানুষেরা স্থির করতে পারে নি, তার পরও তারা পৃথিবীর অপাপবিদ্ধ সন্তান, আদিবাসীদের উন্নয়ন করে এবং তাদের বিনষ্টের দিকে নিয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ অর্থকরী করে তোলার নেশায় সেই উন্নতি আর অর্থবহ হয়ে ওঠে না। জল,জঙ্গল, জমির উপর মানুষের চাহিদার দাবানল আর তার ভয়াবহ দিকটি লেখক প্রথম পর্যায়ের প্রবন্ধ গুলিতে দেখেছেন। এখন এই বিনষ্টি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি। একেবারে শেষ প্রবন্ধে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলেছেন চাহিদায় লাগাম দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ১৯ নাম্বার পৃষ্টায় রয়েছে, “আসলে আমরা উন্নয়নের ছবি তৈরি করি একই ধাঁচে। স্থান কাল বিচার করি না। স্থানীয় মানুষদের মানসিকতা, সংস্কৃতি বা গ্রহনযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিই না। ভুলে যাই যে একই উন্নয়নের ভাবধারা সব জায়গার জন্য এক নয়”। মানুষের চাহিদার ওপর সীমারেখা টানার কথা বলেছেন লেখক, তিনি লিখছেন, “এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষের চাহিদার উপর সীমারেখা টানা যাবে কোন উপায়ে… পার্থিব চাহিদাকে স্তিমিত করানোর জন্য মানসিকতার উত্তোলন দরকার”। প্রকাণ্ড রাক্ষুসে চাহিদার কাছে পৃথিবীর প্রতি আচরণে, ব্যবহারে সংযম নেই, মমত্বহীন যেকোনো ব্যবহার সদর্থক পরিণতি তৈরি করে না -বইটির প্রবন্ধ গুলি পাঠে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়ের আগের বই গুলির মতই ‘সঠিক ভাবনার খোঁজে’ চিন্তার খাদ্য জোগায় এবং ‘সুখপাঠ্য’ শব্দটি এখানে ব্যবহার করব না, কারণ যে প্রশ্ন এবং ভয়াল বাস্তবতার কথা তিনি বলেছেন, চিন্তাশীল পাঠককে আঘাত দেবে, প্রকাণ্ড ভন্ডুলের ভিতর নৈতিকতার আঘাত।

 

 

 

 

Saturday, June 27, 2026

 

                                        হাইপোথ্যাটিক্যাল সখীরা

                                              মধুপর্ণা

একেক দিন কি হয়… যে নারীদের কথা, সারাদিন পড়ি, চর্চা করি তারা অবচেতনে ঘুরে বেড়ায়। ঘুমের ভিতর, তন্দ্রার ভিতর? নাকী আচ্ছন্নতার ভিতর। একটা স্পেস যার সময়ের সীমা ভূখন্ডের সীমার সঙ্গে লেনদেন নেই।  সেখানে ননীবালার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় হাইপেসিয়ার। সেখানে বৌদ্ধ দেবী সবুজ তারার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় জার্মিয়ান গ্রীয়ারের। স্থান, সময় ভেদ করে পাত্রীরা হাজির হয়। তাদের সময় আলাদা, কাজ আলাদা, চর্চা আলাদা, দূর্ভোগ আলাদা।কিন্তু তারা প্রত্যেকে প্রতিভাময়ী, প্রজ্ঞাময়ী আর হ্যাঁ যেকথাটা গুরুত্বপূর্ণ, তারা প্রতেকে কর্তৃত্ত্বশালীনী। বুদ্ধিমতী নারীরা যখন পরস্পরকে শ্রদ্ধা করে আর বন্ধু ভাবে, তার সৌন্দর্য্য অন্তত আমার কাছে অমূল্য, অতুল। সেদিন দেখা হল, ননীবালার সংগে হাইপেসিয়ার। আলেকজান্দ্রার দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী। (৩৫৫-৪১৫) শুদ্ধ জীবনচারিনী এবং ব্রহ্মচারিনী। সমস্ত ভোগবাসনা লালসা মুক্ত। ডাইনি বলে হত্যা করা হয় তাঁকে। ভোগে লিপ্ত সমাজ বরাবর ভয় পেয়ে এসেছে সাধিকা, যোগিনী, ব্রহ্মচারিণীদের। অঙ্কশাস্ত্র আর জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করেছিলেন তিনি। মুক্তমনা চিন্তার ধারক এবং বাহক হিসাবে হাইপেসিয়াকে স্মরণ করা হয়। তিনি মনে করতেন দর্শন হল ধর্মীয় রহস্য এবং ধর্মের পথে অন্তরের মধ্যে যে যুক্তির জ্যোতি রয়েছে, যে অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে তাকে আবিষ্কার ও উন্মোচন করা যায়। আর ননীবালা! উনিশ শতকের শেষ পর্বে জন্মে বিশশতকের গোড়ায় দেহ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে ননীবালা। করেছে যোগসাধনা আর বেঁধেছে গান। শব্দ আর ধ্বনির গূঢ় রহস্য জেনে যাবার অসীম শক্তি আর গাঢ় বেদনার দাগ রেখে গেছে পঙতিতে পঙতিতে। সবুজ তারা তার ধ্বনি সাজিয়ে রেখেছে বিশ্বজুড়ে, ‘ওম তারে তুত্তারে তারে সোহা’ তার সংগে সিমোন দ্য বভুয়ারের দেখা হয়ে যেতেই পারে।  কি কথা হবে তাদের? তারা কি পিতৃতান্ত্রিক বিশ্বের মত বলবে, আমাদের পথ আলাদা মত আলাদা আমাদের বিশ্বাস আলাদা দর্শন আলাদা তাই আমরা সবাই শত্রু। আমরা সুযোগের অপেক্ষায় আছি পরস্পরকে ডুবিয়ে দেবার। অওকাত দেখিয়ে দেবার। এই বিশ্বটা খুব মজার, দূর থেকে দেখতে মন্দ লাগে না। খুবই মুখোরোচক।  

আমার দৃঢ় বিশ্বাস এবং প্রত্যয়, প্রজ্ঞাশালীনী নারীদের বিশ্ব ভিন্ন ভাবে কাজ করে। তারা যতই ভিন্ন হোক, তারা পরস্পরের জন্য একটা জায়গা রাখে সুরক্ষিত, একটা হাত বাড়িয়ে রাখে সহায়তার, গ্রহণযোগ্যতার, সৌন্দর্য্যের। সবুজ তারা সামনের আসনটি যত্ন করে পেতে দেবেন ননীবালাকে সমাদরে বসাবেন, হাইপেসিয়াকে উপহার দেবেন আনন্দ, সখীত্ব। সময় ভেদ করে তারা ভগিনী। সব ভিন্নতার বাইরে, বৈচিত্র্যের বাইরে ভগ্নিত্বটি উজ্জ্বল। সমাজ তাদের কি কি দিন থেকে ঘৃণা করেছে সেইসব নিয়ে হাসাহাসি হবে অনেক। মেল ইগো তারা কিভাবে কাঁচের গ্লাসের মত ঝনাৎ শব্দে চুরমার করেছে সেইসব নিয়ে অট্টহাসিও হবে। আর হবে অনেক আনন্দ। আর কথা হবে ফাঁদ নিয়ে, কিভাবে শিকারীরা ফাঁদ পেতেছিল এই নারীদের আত্মস্যাত করার জন্য, কিভাবে তারা সেইসব তুচ্ছ করে বেরিয়ে এসেছে সেইসব অপূর্ব সুন্দর কথা। আর হবে ধ্যানস্থ সাধনার কথা, লড়াই এর কথা। আর সচেতনতার কথা। আর অজস্র নারী যারা শৃঙ্খলা থেকে বেরোতে চাইছেন তাদের নিয়ে কথা হবে। কথা হবে স্ট্র্যাটেজি নিয়ে। ভিন্ন সময় আর স্থানের নারীদের এই কল্পবিশ্বের বাতাসে বড় করে প্রশ্বাস টেনে আবার পড়াশোনায় ডুবে যাওয়া যায়।

Wednesday, June 24, 2026

 

                                            বৃষ্টি দিনের কোপাই

                                                 মধুপর্ণা

এক একটা বৃষ্টির দিন মনে হয় বহুযুগের ওপার থেকে এসে পড়েছে এই আষাঢ়ে। ঘন কালো মেঘ ধীরে ধীরে আকাশ ছেয়ে ফেলেছে, ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। শান্ত হয়ে এসেছে চারপাশ। বড় গাছ  গুলো যেন কিছু বুঝতে পারে, হাওয়া দেয় অদ্ভুতভাবে। তারপর বৃষ্টি নামে ঝমঝম করে। গুলঞ্চ গাছ বৃষ্টিতে ভিজে একসা। নীচে পড়ে আছে একরাশ ফুল। ঘাসের উপরে বৃষ্টি পড়ে। চুপচাপ ভেজে ওরা। শ্রীনিকেতন হয়ে রূপপুরের রাস্তাটা সবুজে সবুজ, বৃষ্টি শেষের বিকেলে ঐ রাস্তা বেয়ে সোনাঝুরি হয়ে কোপাই এক চক্কর দিয়ে আসতে না পারলে অসুবিধা হয়। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কোপাই সবুজে সবুজ। বিশাল লম্বা ঘাসে ছেয়ে গেছে নদীর বুক। চারিদিকে সবুজের রকম আলাদা, তার ভিতর কোপাই বয়ে চলেছে, সবকিছু দেখে, সবকিছু সহ্য করে, সবকিছু নির্বিকারে মেখে। নদীর একদিকে শ্মশান। শান বাঁধানো ঘাট। পাশে নিভে যাওয়া চিতা। পোড়া কাঠ। আগে শ্মশান দেখে ভয় লাগত, কিসের ভয়! ভয় লাগত, ভয় পাওয়া উচিত বলে। তারপর এখন শ্মশানের পাশে বাঁধানো ঘাটে অবলীলায় বসে থাকি। সামনে কোপাই বয়ে যায়, নিভে যাওয়া চিতায় কালো পোড়া কাঠ দেখি চুপচাপ। কোপাই এর জলে ভেসে যায় ফুলের মালা, মৃতের মালা। যাবার আগে শেষ যত্ন তার ভেসে যায় কোপাই এর জলে। বৃষ্টি শেষের ভিজে মাটি কি প্রচন্ড সুন্দর। লতা গুলো ভাঙা প্রাচীর বেয়ে উঠেছে নিপূণ সৌন্দর্য্যে। অমলতাসের অজস্র পাতার ভিতর একটা দুটো ফুল থেকে গেছে ভুল বশত। চায়ের দোকানে বাঁশের মাচায় বসে আছে একটা বিড়াল। পাশে কদম গাছের তলায় বাঁধানো দাওয়ায় বাঊল। চারদিকে উৎসুক কেউ কেউ। দূরে আলুর ক্ষেত। তারও দূরে গাছের সারি, তারও দূরে আকাশ। কোপাই বছরের নানা সময় নানা রূপ নেয়। কখনও শীর্ণ, কখনও জলে জলে এলাকার। কোপাই সূর্যোদয় কোপাই এ সুর্যাস্ত, শীতের কুয়াশাঘন কোপাই, গ্রীষ্মে শুষ্ক কোপাই। বৃষ্টি শেষের কোপাই… শান্ত ধীর।

 

Wednesday, June 3, 2026

 

                                     সহজ লোকের মত এই গহন আঁধারে

                                                মধুপর্ণা             

চেতনাপ্রবাহ, stream of consciousness. এইখানে তুমি ভাণ করতে পারবে না, অকপট, আনফিল্টার্ড একটা প্রবাহ। র। সেখানে চিন্তার স্রোত কিভাবে প্রবাহিত হয় মানুষ তা জানে, আর সেটাই ব্যক্তির ব্যক্তিগত অন্ধকার। আর আলোর উৎস। মাথার ভিতর, মনের ভিতর, চেতনার ভিতর নাকি কোথায়! লোকেশন জানি না কিন্তু পর পর পর পর ঘটনা সারি সারি দিয়ে আসে যায়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, ভান্তে বলেছিল, জায়গাটা চিনতে পেরে যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই। চিন্তাশূন্যতা একদিনে আসে না। বন্ধ করে লাভ নেই, আসতে দিতে হয়, তারপর একদিন আর আসে না। প্রবাহকে বইতে দাও। বুঝতে পারি, এই প্রবাহের সময়, স্থান, ধারাবাহিকতা, কান্ডজ্ঞান কিচ্ছু নেই, কেবল বয়ে চলে। এই প্রবাহ উর্বরা জমি জেনেছে অনেক লেখক। কাঁচামাল ঘুরে বেড়ায়, সেই রান্নাঘরে যে দক্ষ রাঁধুনি তার কেল্লাফতে। এইটা রিপ্রোগ্রামিং করা যায়। সেই প্রবাহটি বহমান, সেই বানরটি লাফিয়ে বেড়ায়। মাংকি মাইন্ড। বিদ্যুতের গতিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা, এক ঘটনা থেকে অন্য ঘটনা, এক কথা থেকে অন্য কথা। এক সুর থেকে অন্য গান, এক যুক্তি থেকে ভিন্ন অযুক্তি। কথার ভিতর কথার খেই, কথার ভিতর কথার সুতো, চেতনাপ্রবাহ সেই বিনিসুতার মালা। কথার বেসাতি। এই প্রবাহের সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ যত সহজ তুমি তত সহজে চলতে পারবে, সহজ লোকের মত এই গহন আঁধারে।

 চেতনাপ্রবাহ, একটা স্রোত, নদীর মত বহিয়া চলে, তাহার হিসাব নিকাশের খাতা নাই, একজন বলিয়াছিল, মানুষকে জানিতে হৈলে তাহার আলোর সহিত তাহার অন্ধকার জানিতে হয়। কার্ল ইয়ুং, ফ্রয়েড জানিতেন মানুষের অন্ধকার। চেতনাপ্রবাহ বলিলেই মনে পড়ে বাদল সরকার, তাঁর লেখা নাটক ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’। প্রটাগনিষ্ট চেতনপ্রবাহের গতি রোধ করিত না। যাহা বহিয়া যাইত তাহাই বলিত। তাহাই লিখিত। বহু বহু কাল পূর্বে প্লেটো বলিয়া গিয়াছেন, সকলই অনুকরণ, অনুকরণের অনুকরণ। মানুষেরা সৃষ্টি করিতে পারে না, অনুকরন করে কেবল। ইমিটেশন অব ইমিটেশন। শিল্প সাহিত্য সকলই হাতফেরতা অনুবাদ। তথাপি মানুষ ‘আইডেন্টিটি’ ভালবাসে। একটা একটা জামার মত। জামার ভিতরে থাকিতে মানুষ ভালোবাসে খুব। এক একটা পরিচিতি সে আঁকড়াইয়া ধরিয়া মনে করে আমি তাহা, আর তাহার সামান্য বিচ্যুতিতে হয় পাগলপারা। গেল গেল সব গেল গো, আমার অর্জন, নির্মাণ সকলই গেল ছাড়েখাড়ে। তুমি যাহা আত্ম ভাবিতেছ, আপনার ভাবিতেছ তাহার অস্তিত্ত্বই নাই, যদি বলি তুমি শুনবে না। তথাপি একথা সত্য ‘সেলফ ডাস নট এগজিস্ট!’। মানুষ একটি নদী, বহিয়া যায়, যদি বলি তুমি আমারে বলিবে, এ কেমন কথা! তথাপি এই বহমানতা ভিন্ন আর কিছু স্থির নাই। বিজ্ঞানী সকল বলিয়াছেন, পরিবর্তন একমাত্র সত্য। আর পরিবর্তন দেখিয়া মাথার চুল ছিঁড়িতে থাকো, মাথা ঠুকিতে থাকো দেয়ালে। ব্রুশ লি র একটি সাক্ষাতকার দেখিতেছিলাম, উফ! কি সাংঘাতিক ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং। দূর্ধর্ষ। চাবুকের মত একটা লোক। তোমাকে এখন যদি বলি, ঘুরিয়া মরিতেছ মায়ায়, এই গুলি প্রহেলিকা। তুমি মুখ ঘুরাইয়া চলিয়া যাইবে। সেদিন স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের লেকচার শুনিতেছিলাম ইউটিউবের ক্লাশ ঘরে। খাতায় আর কলমে যাহারা তোমার শিক্ষক তাহারা তোমাকে বাক্সে ভরিবে আর দিবে বিষ ঢালিয়া, কত শত শিক্ষক দেখো আরো চারিপাশে।

 দাদা সুযোগ পেলেই বলছে, ‘পাগলীনেস এভ্রিহ্যয়র’ তার কারন কয়েকদিন আগে দাদাকে বলেছিলাম, ‘আগলিনেস এভ্রিহ্যয়র’। যে ভাষিক সমুদ্রে আমাদের বেঁচে থাকা সেইসব অকপটে বলে যাবার ‘গাটস’ আছে তোমার?  ফিল্টার না করে বলে যেতে পারবে মুহুর্তের চিন্তা, মুহুর্তের অনুভব? এই প্রশ্নের উত্তরে বলি পারব, একই লেখার ভিতর চলিত বাংলা, সাধু বাংলা, স্ল্যাং, যুক্তি, অযুক্তি, ভাবালুতা মিশিয়ে দেব, যেভাবে চলছে মগ্ন চৈতন্য একেবারে সেইটাই হাজির করব এনে। দাদা বলেছিল, সহজ নয়, মাথা থেকে হাতে এসে কি বোর্ড থেকে স্ক্রীণে যেতে যেতে অনেকবার রিফাইন করবে, এত সহজ নয়।

হ্যাঁ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভব কি?

প্রায়। কারণ সহজ কথা যায় না বলা সহজে।

আচ্ছা, কেবল অনুবাদ, অনুকরণের অনুকরণ, চিন্তা অনুভব থেকে বলা আর লেখার মাঝখানে অনেক গুলো দরজা। আর মাঝাখানে যাত্রাপথটা আসলে ব্যক্তির অহং সত্ত্বা।

হ্যাঁ, ঐ খানে রঙ মেশায় আর ঐখানে ঢালে বিষ। ভেজালটা ঐ একটা করে দরজা পেরোয় যখন তখন হতে থাকে। আর তুমি ভাবছ শুধু জল মেশালেই সহজ হয়! পিওর ফর্মে যারা বলছে তারা বাকসিদ্ধ।

শব্দ আর ধ্বনির ক্ষমতা ভয়াবহ। যে জানে সে জানে আর যে জানে না তার না জানাই ভাল। তড়িতাহত হয়ে যাবে।

কারেন্টের শক বুঝলে! কিসের আঘাত, না শব্দের আঘাত। ধ্বনির আঘাত।

মন্ত্র তাহলে… সেই ব্যাকরণের আউটপুট?

সেসব অন্য, অনুশীলন করো, মুহুর্তেকে ফিল্টার ছাড়া লিখতে থাকো দেখবে সেখানে এথিক্স নেই, ক্রম নেই, ধারাবাহিকতা নেই।

সেই বানরকে শায়েস্তা করতে চাই, আর আপনি তাকে দিতে বলেন আস্কারা?

বানর টা আসলে খুব সত্যি একজন। যত বাঁধবে ততই লম্ফঝম্প বাড়বে, বয়ে যেতে দিতে হয়। বরং তাকে বলতে হয়, বলো কি বলতে চাও, শুনতে হবে তার কথা। তবেই বলা থামাবে।

 এই ভয়ঙ্কর গ্রীষ্মে শীতের কথা মনে পড়ে, বাবলা বনের কুয়াশায় মাকড়সা গুলো জাল বিছিয়েছিল ছোট ছোট করে তার ওপর শিশির। সারা মাঠ জুড়ে মনে হচ্ছিল তাবু খাটিয়েছে কেউ বা কারা। পৌষমেলায় নাগর দোলার উপর থেকে এইরকম লাগে মেলাটা। ছোট ছোট তাবু চারিদিকে। কোপাই পাড়ে, চায়ের দোকানে বাঁশের মাচা থেকে কোপাই এর জল দেখা যায়, তারপর পাশের শ্মশানে ভাঙা হাঁড়ি, পোড়া কাঠ। তারপর কংকালীতলায় রুরু ভৈরবের ধ্যানখানা। ছোট মন্দিরের মত। শিব মন্দিরের সামনে বসে আছে নন্দী। সেইসূত্রে মনে পড়ে,  বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ভিতর যে বৈদ্যনাথ মন্দির সেখানে শিবমন্দিরের সামনে নন্দীর বসে থাকা নিয়ে বলেছিল সেখানকার এক গবেষক বন্ধু। বলেছিল, নন্দীর কানে কানে বলে আয়, সে শিবকে পৌঁছে দেবে, জিজ্ঞেস করলাম, পার্সোনাল সেক্রেটারি? বলল, তার থেকে বেশি কিছু, মাধ্যম। ভায়া যেতে হবে, সরাসরি হবে না। সেইসূত্রে মনে পড়ে,  হাতের কাজ গুলো পড়িমড়ি করে শেষ করি পাহাড়ে যাবার তাগিদে। টাস্ক এন্ড রিওয়ার্ড।

    

Tuesday, June 2, 2026

 

                                     নতুন শৈল শহর আর বৃষ্টির দিন

                                               মধুপর্ণা 

ভরা বৃষ্টির দিন সেদিন, যাকে বলে একেবারে ‘বাদলা করিয়াছে’, মেঘ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছে তুমুল। ঝমঝম ঝমঝম একটা রিদমে বৃষ্টি পড়ছে, বৃষ্টির ধোঁয়ায় চারপাশ মুছে গেছে যেমন করে লেখা শেষে শ্লেট মুছে দেয় বালিকা। সেই সর্বৈব নেই এর ভিতরে শৈল শহর পেলিং এ একটা বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। একটা কুকুর নিশ্চিন্তে পাশে ঘুমোচ্ছে, একজন করমচার ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে, বৃষ্টি শেষে বিক্রি করবে বলে, ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে, যেন সিনেমার পর্দা উঠে গেছে, এইবার সামনে দৃশ্য, শব্দ আর চলনশীল সবকিছু। গাছের পাতা গুলো বৃষ্টি ফোঁটায় তখনও চমকে চমকে উঠছে। ভিজে রাস্তা বেয়ে হেঁটে যাওয়া নেশার মত, পথের পাশে ফার্ণ, নাম না জানা গুল্মলতা, তাতে বেগনি রঙের ফুল। দুলে উঠছে বাতাসে। দোকানীরা দোকান পাতছেন ফের, ছাতার তলায় উনোনে ভুট্টা পুড়ছে, চায়ের কেটলি দিয়ে সাপের জিভের মত ধোঁয়া, কুকুরগুলো উৎসাহ পেয়ে কিছুটা হাঁটছে, তারপর ছুটছে অকারণে। হাওয়া দিচ্ছে খুব। গাছপালারা ভিজে গিয়ে বেশ ফুর্তিতে রয়েছে তাদের দেখে বোঝা যায়। পাখিরা নেমে এসেছে মাটিতে কয়েকটা, কি যে ব্যস্ততা তাদের, কিসের যে আনন্দ! ঘুরে ঘুরে এটা সেটা দেখছে, ঠোঁট দিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছে, আবার ঘুরে আসছে এদিক সেদিক, শৈল শহরের অলি গলি হেঁটে বেড়ানোর ভিতর কি যে একটা সুখ আছে সে জানে সে জানে, যে জানে না তার কাছে বৃথা, ব্যার্থ সময়, কেবল পরিশ্রম। জলের সরু ধারা তখনও রাস্তা বেয়ে চলে যাচ্ছে। রঙিন ছাতা নিয়ে খোকা বেড়িয়েছে মার সঙ্গে। পায়ে তার নীল রঙের জুতো। যে দৃষ্টিতে সে পৃথিবীকে দেখে কিছু না জেনে না বুঝে, ঐখানে ঈর্ষা আছে আমার। সাদা পাতা খানি ভরে যাবার আগের দেখায়। শৈল শহর গুলিতে বৃষ্টি শেষে একটা ব্যস্ততা শুরু হয়, চারিদিক ঝটপট করে কিছুক্ষনের জন্য। তারপর আবার একটা ছন্দ ফিরে আসে। হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে যাই, ঘরদোর, মানুষের মুখ, সারল্য, হাসি, আনন্দের ঝিলিক। শাক্য গুম্ফার তরুণ সন্ন্যাসী। তার কাছে নিবিড় সময়। মনেস্ট্রি ঘুরে ঘুরে দেখান। প্রশান্ত তার উপস্থিতি। দেয়াল জুড়ে ম্যুরাল, ভাষা জানা নাই, তংখা পেইন্টিং বিষয়ে এটা সেটা কথা। মনেস্ট্রির দেয়াল গুলো একটা জগত, রঙের, দর্শনের, মনস্তত্ত্বের। অজানা ভাষার বই হাতে যেমন একলা হয়ে যায় পাঠক তেমনি দেয়ালের সামনে একলা দাঁড়িয়ে থাকা। গত দেড় বছরে কুড়ি থেকে পঁচিশটি বৌদ্ধ গুম্ফা ঘুরেছি। দেয়ালে কতশত ছবি, সন্ন্যাসীদের সমাহিত মুখ, বৌদ্ধ দেবী তারা উইশ পন্ডে কত শত পতাকা, কিচিপিডি লেকে খেলে অসংখ্য মাগুর মাছ, বনঝাকরি ঝর্ণার জল, হাঁটতে হাঁটতে কুয়াশায় কুয়াশায় দূর থেকে আরো দূর, তারপর বহুদূর, ছোট চায়ের দোকান, বিনুনি বাঁধা মেয়ের  স্কুল যাবার দৃশ্য, অর্কিড কতরকমের, লোমশ কুকুর দুলে দুলে হেঁটে যায়, দূরের নেশা বড় তীব্র, এক পাহাড় থেকে দূরে আরো পাহাড়, দিনের বহুভাগে সবুজ পাহাড় হয়ে গেল, মেঘে মেঘে সাদা, তারপর রোদ এসে দিয়ে গেল ভিন্ন রং, তারপর বিকেলে সে পাহাড় হয়ে যায় নীল, তারপর সন্ধ্যায় কালো পাহাড়ের গায়ে জ্বলে ওঠে ছোট ছোট আলো। এক একদিন বসে থাকি চুপ করে, শৈল শহরের কোনো এক নির্জন কোনে, একেবারে চুপ। শুধু দৃশ্যের সঙ্গে লেনদেন। শব্দের সঙ্গে। আর নৈঃশব্দের সঙ্গে। প্রতিটা শহরের সাঊন্ডস্কেপ আলাদা, প্রতিটা শহরের সন্ধ্যা, সকাল আলাদা, মাঝে মধ্যে এক একটা মিছিল, শোভাযাত্রা পেরিয়ে যায়। স্যুভেনিরের দোকান গুলো ঘুরে আসি। বৃষ্টি শেষে রামধনু ওঠে, একেবারে শিশুদের কালারিং বুকে ছবির মত দুইপাহাড়ের মাঝাখানে রামধনু। লোকজনের দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে যায় তারপর আবার যে যার কাজে। কারো চোখে ফের আনন্দ, কারো চোখে দায়িত্ব, কারো চোখে মায়া। নতুন শহরে সবাই অচেনা, কি প্রকান্ড স্বস্তি। অচেনা পথের ধার, অচেনা গাছ, অচেনা পাথর, অচেনা পাহাড়ের ঢাল। নতুন বাতাস, নতুন নদীর জল, নতুন শান্তি। বাঁকা পথ চলে গেছে কতদূর পাহাড়ের গায়ে গায়ে, আকাশের ওপারে আকাশ, মেঘের ওপারে ঘন মেঘ। তার ওপারে অচেনা কারো ঘড় দোর, উঠোনে ফুলের গাছ, মৃদু ঠান্ডা হাওয়া। হা ঈশ্বর এই বার মরে গেলে বৌদ্ধবিহারে একটি অশ্বত্থের গাছ করিও। ‘স্থানমাহাত্ম্য’ বাস্তব, কল্পকাহিনী নয়। পাহড়ে, মনেস্ট্রিতে, সন্ন্যাসীতে মিলে গড়েছে কি এক আবহাওয়া, সেইখানে আনন্দ আছে উপশম আছে আর আছে বিস্মৃতিমুক্তি। আর আছে ইন্দ্রজাল। যোগাযোগ খুব সূক্ষ্ম, সুর কেটে গেলে নিভে যায়। সোশিও এস্থেটিক সেন্সিবিলিটি বিষয়ে মোহিত চক্রবর্তীর একটা আর্টিকেল পড়ে অবাক লাগছিল গতমাসে। এভাবেও ভাবা যায়। নেহাত যাকে রোমান্টিসিজম বলে তাচ্ছিল্য করে কেজো লোক, প্রফেশনালিজম। যা কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে, গন্ধে গানে… সেইখানে ফিরে আসে সহৃদয়-হৃদয়সংবাদী। সেইখানে ফিরে আসা যায়।  

   চশমা, চাবি, ছাতা, চার্জার যদি হারানোর ব্যারাম যদি না থাকে তাহলে ভাল। কারন এইসকল সরনশীল পদার্থ হারিয়ে হারিয়ে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে এখন এইসকল জড়দের মাঝে মধ্যে বলতে ইচ্ছা করে, সঙ্গে থাকাটা তোমাদেরও একটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, কেবল আমার একার দায়িত্ব নয়। অনিশ্চয়তা, আনসার্টনিটির আর ভয় দেখাতে পারে না, বলি রোসো বাছা, অনেক করেছ, এইবার তুমি আমার দাস, তোমাকে আর তোয়াক্কা পর্যন্ত করিনে। তারপর ফিরে আসার রিমাইন্ডার। ঢঙ ঢঙ করে ঘন্টা পড়ে যায়। হাওয়ায় হাওয়ায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসি। তারপর, সমতল। শিলিগুড়িতে চায়ের দোকান খুঁজে যথারীতি বসে আছি। দোকানী চা দিয়ে রিল দেখতে বসলেন, কয়েক সেকেন্ড পর পর আলাদা শব্দ, আলাদা গান, আলাদা হাসির আওয়াজ, নেতার হুমকি, চটুল গলার কথা, ভালগার এরস, মধ্যে মধ্যে ডিভাইন কথাবার্তা। অন্যদিকে জানলায় অর্কিড ঝোলানো, জানলার ওপারে, কে ওপারে? ওপারে বুদ্ধমূর্তি। বুদ্ধ কি অনুমান করতে পেরেছিলেন, আমাদের রিল আর ডিজে সভ্যতার কথা? জানতেন এই জাহান্নামের আগুন কতটা গরম! তাহলে তাঁর শান্তির সংজ্ঞা কেমন হত! এ যন্ত্রণা ট্রেনে, পথে, হাটে ও বাজারে। পালাবার পথ নাই।

                                          উৎসবের মরসুম                                             মধুপর্ণা সেদিন পড়ন্ত বিকেল, আসন্ন শীত...